খুঁজুন
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০ ফাল্গুন, ১৪৩২

ফরিদপুরে হৃদরোগীদের হাহাকার: অচল ৮ কোটি টাকার ক্যাথল্যাব, নেই সচলের উদ্যোগ

হারুন-অর-রশীদ ও আবরাব নাদিম ইতু, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:১৪ পিএম
ফরিদপুরে হৃদরোগীদের হাহাকার: অচল ৮ কোটি টাকার ক্যাথল্যাব, নেই সচলের উদ্যোগ

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত কয়েক কোটি টাকার হৃদরোগ বিভাগের অত্যাধুনিক ক্যাথল্যাব দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে আছে। ফলে স্বল্প খরচে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ। ২০১৬ সালে স্থাপন করা এই ক্যাথল্যাবটি আজও অজ্ঞাত কারণে চালু না হওয়ায় একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে সরকারি সম্পদ, অন্যদিকে বাড়ছে রোগীদের ভোগান্তি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা ক্যাথল্যাবটি চালু থাকলে এখানে এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি (রিং পরানো)সহ হৃদরোগের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কম খরচে দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।

রাজধানীমুখী রোগীর ঢল, বাড়ছে ঝুঁকি:

বর্তমানে ফরিদপুরে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর ক্যাথল্যাব নেই। ফলে জরুরি অবস্থায় রোগীদের ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরে ছুটতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি।

চিকিৎসকদের মতে, হৃদরোগের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত এনজিওগ্রাম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেলে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হৃদরোগ ও রক্তনালির রোগে প্রতিদিন প্রায়  অনুমানিক ৫৬২ থেকে ৭৭৭ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে ভেজাল, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ধূমপান ও মানসিক চাপ বৃদ্ধির কারণে হৃদরোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্যাথল্যাব চালু থাকা অত্যন্ত জরুরি।

বেসরকারি নির্ভরতায় অসহায় নিম্ন আয়ের মানুষ:

ফরিদপুরে বর্তমানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ক্যাথল্যাব সেবা থাকলেও সেখানে চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক বেশি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর পক্ষে সেই সেবা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়রা জানান, সরকারি হাসপাতালে ক্যাথল্যাব চালু হলে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হতো এবং অনেক জীবন রক্ষা পেত।

রোগীদের কণ্ঠে ক্ষোভ ও হতাশা:

হৃদরোগে আক্রান্ত ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে বেশি খরচ করে বাইরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল করিম (৫৬) ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “আমার হার্টের সমস্যা ধরা পড়ার পর ডাক্তার এনজিওগ্রাম করতে বলেছেন। এখানে ব্যবস্থা না থাকায় ঢাকায় যেতে হয়েছে। যাতায়াত, পরীক্ষা আর চিকিৎসা মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গরিব মানুষের জন্য এটা খুব কষ্টকর।”

আরেক রোগীর স্বজন সাজেদা বেগম (৪২) ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “হঠাৎ বুকে ব্যথা উঠলে আমার বড় বোনকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু এখানে উন্নত কোনো ব্যবস্থা নেই। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়েছে। যদি এখানে ক্যাথল্যাব চালু থাকত, তাহলে হয়তো এত ঝামেলা পোহাতে হতো না।”

সালথা উপজেলার বাসিন্দা মো. হান্নু মোল্যা ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “রাতে হার্টের সমস্যা হলে ঢাকায় নিতে নিতে অনেক সময় চলে যায়। এই সময়টাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। ফরিদপুরে ক্যাথল্যাব থাকলে অনেক রোগী বেঁচে যেত।”

নগরকান্দা উপজেলার বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “আমার বাবা গত বছর হার্ট অ্যাটাক করেছিল। তখন তাকে ফরিদপুরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু সেখানে হৃদরোগের চিকিৎসা না পেয়ে ফরিদপুরের বেসরকারি হাসপাতালে আবার নিয়ে যাই, তার কয়েকদিন পরেই মারা যায় আমার বাবা। আমার বাবা যদি তাৎক্ষণিক উন্নত চিকিৎসা পেত। তাহলে আমার বাবাকে বাঁচানো যেত।

সচেতন মহলের উদ্বেগ:

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এত বড় একটি সরকারি প্রকল্প বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা দুঃখজনক। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে। তারা দ্রুত ক্যাথল্যাবটি চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

এহসানুল হক নামে একজন শিক্ষক ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “এটি শুধু একটি মেশিন নয়, এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এটি অচল থাকা মানে মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে রাখা।”

কী কারণে বন্ধ ক্যাথল্যাব?

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যাথল্যাব চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল যেমন ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান থাকলেও মূল সমস্যা হচ্ছে যন্ত্রপাতি সচল না থাকা।

দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় মেশিনটি অনেকটাই অকেঁজো হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

যা জানালেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ:

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. আজমল হোসেন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “আমাদের প্রয়োজনীয় ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান রয়েছে। কিন্তু ক্যাথল্যাবের মেশিনটি দীর্ঘদিন চালু না থাকায় অনেকটা অকেঁজো হয়ে গেছে। মেশিনটি ঠিক করা গেলে আমরা খুব দ্রুতই সেবা চালু করতে পারব।”

হাসপাতালটির পরিচালক ডা. মো. হুমায়ূন কবির ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “ক্যাথল্যাবটি দীর্ঘদিন অচল রয়েছে। আমরা এটি সচল করার জন্য নিমিউকে (ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইক্যুপমেন্ট মেইনটেইনেন্স ওয়ার্কশপ) চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা জানিয়েছে, মেশিনটি ভালো নেই এবং তারা কাজ করতে পারবে না। তারা পরামর্শ দিয়েছে, যেখান থেকে মেশিনটি কেনা হয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা ফিলিপস কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তবে এখন পর্যন্ত তারা কার্যকর কোনো সমাধান দেয়নি।”

ফিলিপস কোম্পানির পাল্টা দাবি:

এ বিষয়ে ফিলিপস কোম্পানির তৎকালীন প্রতিনিধি মো. রফিক ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করলে আমরা মেশিন সারাতে চাহিদা পত্র দিয়েছিলাম,পরবর্তীতে আমাদের সাথে আর যোগাযোগ কেউ করে নি”

দ্রুত সমাধানের দাবি:

স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে ক্ষতি আরও বাড়বে। কারণ দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে মেশিন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তখন নতুন করে বিপুল অর্থ ব্যয় করে সেটি স্থাপন করতে হবে।

তারা মনে করছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত ক্যাথল্যাবটি সচল করা জরুরি।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাথল্যাব চালু হলে শুধু ফরিদপুর নয়, আশেপাশের জেলাগুলোর মানুষও উপকৃত হবে। এতে কম খরচে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত হবে এবং অনেক হৃদরোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

তাই স্থানীয়দের একটাই দাবি—অচল পড়ে থাকা কোটি টাকার এই ক্যাথল্যাব দ্রুত চালু করে জনগণের সেবায় কাজে লাগানো হোক।

‘স্মৃতি’

ড. আবুল কালাম আজাদ
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:৫০ পিএম
‘স্মৃতি’

তোমার চলে যাওয়াটা আমায় কাঁদায়
আজো প্রতিটা মুহূর্ত ভীষণ জ্বালায়।
তুমি কাছে নেই, তবু চেতনায় আছো
আগুনের মতো মোরে দগ্ধ করে মারছো।

সেই তির্যক চাহনি দুষ্টু মিষ্টি হাসি
কি দারুণ, আকর্ষণ! ভাবি অমানিশি
অনুরাগে রিক্ত সিক্ত হচ্ছি দিবানিশি
কোথা যেন চলে গেলে পাইনা কোনো দিশি।
বার বার মনে পড়ে সেই অনুভূতি
একসাথে কাটানো প্রেম-আবেগ-আকুতি।

প্রণয়ের স্মৃতি বেয়ে সমুদ্রের তীরে
জলাশয়, জলোচ্ছ্বাসে গহীন সাগরে
লোহার প্রাচীর ভেঙে ছিন্নভিন্ন করে
মরুভূমি কাঁটাতার ডিঙিয়ে সুদূরে।

আকাশে নক্ষত্র লক্ষ তারা ভেদ করে
পাহাড়-পর্বত-গিরি টেলিস্কোপ ধরে,
প্রকৃতির সরোবরে বিশ্ব চরাচরে
তোমাকে পাওয়ার জন্য জীবনবাজি ধরে
আজো ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হাঁপিয়ে বেড়াই,
কখনো পাবো না ভেবে দুমড়ে মুচড়ে যাই।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ।

‘বসন্তের কোনো এক উদাস দুপুরে’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:৩৩ পিএম
‘বসন্তের কোনো এক উদাস দুপুরে’

বসন্তের দুপুরগুলো কেমন যেন আলাদা হয়—না গরম, না ঠান্ডা; যেন বাতাসের ভেতরেও একটা নরম ক্লান্তি লেগে থাকে। রোদ থাকে, কিন্তু সেই রোদ ঝলসে দেয় না; বরং মাটির ওপর নরম করে হাত রেখে যায়। এমনই এক দুপুরে, গ্রামের এক প্রাচীন শিমুলগাছের ডালে বসে ছিল একটি কাঠঠোকরা পাখি।

গাছটা ছিল গ্রামের প্রান্তে, পুরোনো পুকুরটার ধারে। শিমুলগাছটি যেন নিজের মতো করে বসন্তকে সাজিয়ে তুলেছিল। তার ডালভরা লাল-কমলা ফুলগুলো দূর থেকে দেখতে আগুনের মতো লাগে। কাছে গেলে বোঝা যায়—ওগুলো আগুন নয়, ওগুলো জীবনের রঙ। আর সেই ফুলের মাঝেই কাঠঠোকরা পাখিটি ঠোঁট দিয়ে আলতো করে ফুল ছুঁয়ে দেখছিল, যেন ফুলের ভেতর লুকোনো মধুর স্বাদ খুঁজছে। এই দৃশ্যটা দেখছিল রাশেদ।

রাশেদ শহর থেকে এসেছে। ঢাকা শহরের কোলাহল, গাড়ির হর্ন, ধোঁয়া আর দৌড়ঝাঁপের জীবন থেকে সে কয়েক দিনের জন্য মুক্তি নিতে এসেছে তার দাদুর গ্রামে। ছোটবেলায় এখানে অনেকবার এসেছে, কিন্তু তারপর পড়াশোনা, চাকরি—সবকিছু মিলিয়ে এই গ্রাম যেন তার জীবনের বাইরে চলে গিয়েছিল।

কিন্তু এবার সে ফিরে এসেছে—কিছুটা ইচ্ছায়, কিছুটা বাধ্য হয়ে।

তার জীবনে যেন সবকিছু হঠাৎ করে থেমে গেছে। চাকরিতে সমস্যার পর সমস্যা, প্রেম ভেঙে যাওয়া, বন্ধুদের দূরে সরে যাওয়া—সব মিলিয়ে সে যেন নিজের ভেতরেই আটকে গেছে। শহরের ভিড়ে থেকেও সে একা হয়ে পড়েছিল। তাই হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিয়েই সে চলে আসে এই গ্রামে।

দাদু তাকে দেখে খুশি হয়েছিল, কিন্তু খুব বেশি প্রশ্ন করেনি। শুধু বলেছিল, —“কিছুদিন থাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

রাশেদ তখন বুঝতে পারেনি—কীভাবে সব ঠিক হবে?

সেই উত্তর খুঁজতেই হয়তো আজ সে এই শিমুলগাছের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। পাখিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাশেদের মনে হলো—পাখিটা যেন কিছু বলতে চায়। তার গায়ে হলুদ, কালো আর সাদা রঙের মিশেল; মাথায় লাল ঝুঁটি—অদ্ভুত সুন্দর। ঠোঁট দিয়ে সে বারবার গাছের ডালে ঠোকর দিচ্ছে, তারপর আবার ফুলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

—“তুই কী খুঁজছিস?” নিজের অজান্তেই বলে উঠল রাশেদ। পাখিটা যেন থেমে তাকাল। সত্যিই কি তাকাল, নাকি শুধু রাশেদের কল্পনা—সে বুঝতে পারল না। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো, —“ওরা খাবার খোঁজে। গাছের ভেতর থেকে পোকা বের করে খায়।”

রাশেদ ঘুরে তাকাল। একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে—মাঝারি উচ্চতা, গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা, চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি। হাতে একটা বাঁশের ঝুড়ি।
—“তুমি কে?” রাশেদ জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটা হাসল, —“আমি মিতা। এই গ্রামেই থাকি। তুমি নতুন এসেছ, তাই না?”
রাশেদ মাথা নাড়ল, —“হ্যাঁ। অনেক বছর পর এলাম।”

মিতা শিমুলগাছটার দিকে তাকাল, —“এই গাছটা আমার খুব প্রিয়। বসন্ত এলে আমি প্রায় প্রতিদিন এখানে আসি।”
রাশেদ বলল, —“পাখিটা খুব সুন্দর।”
—“হুম,” মিতা বলল, “ওরা খুব পরিশ্রমী। সারাদিন গাছ ঠোকরায়, খাবার খোঁজে। কখনো থামে না।”
রাশেদ একটু হেসে বলল, —“আমাদের মতো না। আমরা থেমে যাই।”

মিতা তাকাল তার দিকে, —“তুমি থেমে গেছ?”
প্রশ্নটা এত সরাসরি ছিল যে রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, —“হ্যাঁ, হয়তো। মনে হয় কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছে না।”

মিতা কিছু বলল না। শুধু শিমুলগাছের একটা ফুল ছিঁড়ে হাতে নিল। ফুলটার দিকে তাকিয়ে বলল, —“দেখো, এই ফুলগুলো কত সুন্দর। কিন্তু এরা খুব অল্প সময় থাকে। তারপর ঝরে যায়।”
—“তাই?” রাশেদ বলল।
—“হ্যাঁ। কিন্তু গাছটা কি দুঃখ পায়? না। আবার নতুন পাতা আসে, নতুন ফুল আসে।”

রাশেদ মৃদু হেসে বলল, —“গাছ তো মানুষ না।”
মিতা মাথা নাড়ল, —“কিন্তু মানুষ গাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে।”
সেদিনের পর থেকে রাশেদ প্রায় প্রতিদিন বিকেলে ওই শিমুলগাছের নিচে আসে। আর প্রায় প্রতিদিনই মিতার সঙ্গে দেখা হয়।

মিতা খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু তার কথা গুলো গভীর। সে গ্রামের মানুষ, কিন্তু তার চিন্তাগুলো যেন অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
একদিন রাশেদ তাকে জিজ্ঞেস করল, —“তুমি পড়াশোনা করো?”
—“করতাম,” মিতা বলল, “কলেজ পর্যন্ত। তারপর আর হয়নি।”
—“কেন?”
মিতা একটু থেমে বলল, —“বাবা অসুস্থ। সংসার সামলাতে হয়।”

রাশেদ চুপ করে গেল। শহরে বসে সে অনেক স্বপ্ন দেখেছে—ক্যারিয়ার, টাকা, সফলতা। কিন্তু এখানে এসে সে দেখছে, জীবনের অন্য একটা রূপ আছে—যেখানে প্রতিদিন বেঁচে থাকাটাই একটা বড় অর্জন।
সেই দিনও কাঠঠোকরা পাখিটা গাছে বসে ছিল। রাশেদ তাকিয়ে বলল, —“ওটা কি প্রতিদিনই আসে?”
—“হ্যাঁ,” মিতা বলল, “ওর বাসা এই গাছেই কোথাও।”
—“ও কখনো ক্লান্ত হয় না?”

মিতা হাসল, —“হয়তো হয়। কিন্তু ও থামে না।”
একদিন দুপুরে হঠাৎ ঝড় উঠল। কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল। হাওয়া বইতে শুরু করল জোরে। শিমুলগাছটা দুলতে লাগল, ফুলগুলো একে একে ঝরে পড়তে লাগল।

রাশেদ তখন গাছের নিচেই ছিল। সে ভেবেছিল আজ হয়তো মিতা আসবে না। কিন্তু ঠিক তখনই সে দেখল—মিতা দৌঁড়ে আসছে।
—“এই ঝড়ে তুমি এখানে কেন?” রাশেদ চিৎকার করে বলল।
—“গাছটা দেখতে!” মিতা বলল, “ঝড়ে অনেক ডাল ভেঙে যায়।” হঠাৎ একটা বড় ডাল ভেঙে পড়ে গেল মাটিতে। রাশেদ চমকে উঠল।

ঝড়ের শব্দের ভেতরেও সে একটা কিচিরমিচির শব্দ শুনতে পেল। মাটিতে পড়ে থাকা ডালের পাশে একটা ছোট্ট পাখির বাচ্চা কাঁপছে।
—“দেখো!” রাশেদ বলল।
মিতা দৌঁড়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে তুলে নিল, —“এটা কাঠঠোকরার বাচ্চা।”
রাশেদের বুকটা হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেল। সে উপরে তাকাল—গাছের ডালে সেই কাঠঠোকরা পাখিটা অস্থির হয়ে উড়ছে।

—“এখন কী করব?” রাশেদ জিজ্ঞেস করল।
মিতা বলল, —“ওকে আবার বাসায় তুলতে হবে।”
—“কিন্তু বাসা কোথায়?”
মিতা চারদিকে তাকাল। তারপর গাছের একটা ফাঁপা অংশ দেখিয়ে বলল, —“ওখানে।”
—“ওটা তো অনেক উঁচু!”
—“তবু চেষ্টা করতে হবে।”

রাশেদ কখনো গাছে ওঠেনি। শহরের মানুষ হিসেবে তার জীবনে গাছে ওঠার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু আজ সে দ্বিধা করল না।
মিতা নিচে দাঁড়িয়ে রইল, হাতে পাখির বাচ্চাটা। রাশেদ ধীরে ধীরে গাছে উঠতে লাগল। ঝড়ের হাওয়ায় গাছ দুলছে, হাত পিছলে যাচ্ছে, তবু সে থামল না।

একসময় সে সেই ফাঁপা জায়গাটার কাছে পৌঁছাল। ভেতরে তাকিয়ে দেখল—আরও দুটো বাচ্চা আছে।
—“এখানে দাও!” সে নিচে চিৎকার করল।
মিতা সাবধানে বাচ্চাটাকে উপরে তুলল। রাশেদ সেটাকে নিয়ে বাসার ভেতরে রাখল।
ঠিক তখনই কাঠঠোকরা পাখিটা তার কাছেই এসে বসে পড়ল। খুব কাছে। এত কাছে যে রাশেদ তার চোখ দেখতে পেল।

পাখিটার চোখে ভয় ছিল, উদ্বেগ ছিল—কিন্তু সেই সঙ্গে একটা বিশ্বাসও ছিল।
রাশেদের মনে হলো—সে যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে।

ঝড় থেমে যাওয়ার পর তারা দু’জন গাছের নিচে বসে রইল। চারদিকে ঝরে পড়া ফুল। লাল-কমলা রঙে ভরে গেছে মাটি।
মিতা বলল, —“তুমি আজ খুব ভালো কাজ করেছ।”
রাশেদ চুপ করে রইল। তার ভেতরে অদ্ভুত একটা শান্তি কাজ করছিল।

—“জানো,” সে বলল, “অনেক দিন পর মনে হচ্ছে আমি কোনো কাজ ঠিকভাবে করতে পেরেছি।”
মিতা মৃদু হাসল, —“তুমি সব সময়ই পারো। শুধু নিজেকে বিশ্বাস করতে হয়।”
দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। বসন্ত ধীরে ধীরে শেষের দিকে এগোতে লাগল। শিমুলগাছের ফুল কমে আসতে লাগল, নতুন পাতা গজাতে শুরু করল।
একদিন বিকেলে রাশেদ গাছের নিচে এসে দেখল—মিতা নেই।
সে অপেক্ষা করল। কিন্তু মিতা এল না।
পরদিনও না।

তৃতীয় দিন সে খোঁজ নিতে গেল। গ্রামের মানুষদের কাছে জানতে পারল—মিতার বাবা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

রাশেদের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল—মিতাকে সে কতটা মিস করছে।
সেই রাতে সে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না। তার মনে হতে লাগল—এই গ্রাম, এই গাছ, এই পাখি—সবকিছু যেন মিতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
পরদিন সকালে সে সিদ্ধান্ত নিল—সে শহরে যাবে।
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে রাশেদের মনে হচ্ছিল—সে যেন আবার সেই পুরোনো জীবনে ফিরে এসেছে। চারদিকে দৌড়ঝাঁপ, উৎকণ্ঠা, অস্থিরতা।
সে মিতাকে খুঁজে পেল একটা বেঞ্চে বসে।
—“মিতা,” সে ডাকল।
মিতা তাকাল। তার চোখ লাল, মুখ ক্লান্ত।
—“তুমি এখানে?” সে অবাক হয়ে বলল।
রাশেদ বলল, —“তোমার খোঁজ নিতে এসেছি।”
মিতা কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করল।
—“চিন্তা করো না,” রাশেদ বলল, “সব ঠিক হয়ে যাবে।”

মিতা মৃদু হাসল, —“তুমিও তো একদিন এটাই বলেছিলে—সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন কি বিশ্বাস করো?”
রাশেদ একটু থেমে বলল, —“হ্যাঁ। এখন করি।”
—“কেন?”
—“কারণ আমি দেখেছি—ঝড়ের পরও গাছে আবার ফুল ফোটে।”
মিতা তাকাল তার দিকে। তার চোখে এবার একটু আলোর ঝিলিক।
কয়েকদিন পর মিতার বাবা কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন। তারা গ্রামে ফিরে এল।
সেদিন বিকেলে আবার তারা শিমুলগাছের নিচে দাঁড়াল।
গাছটায় এখন আর আগের মতো ফুল নেই। কিন্তু নতুন পাতা এসেছে—তরতাজা সবুজ।
কাঠঠোকরা পাখিটা আবার এসেছে। এবার তার সঙ্গে তিনটা ছোট্ট পাখি—ওর বাচ্চারা।

রাশেদ হাসল, —“ওদের দেখো।”
মিতা বলল, —“ওরা উড়তে শিখছে।”
—“হুম,” রাশেদ বলল, “একদিন ওরাও উড়ে যাবে।”
মিতা বলল, —“সবাইকে একদিন উড়তে হয়।”
রাশেদ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, —“আমাকেও যেতে হবে।”
মিতা তাকাল, —“শহরে?”
—“হ্যাঁ,” রাশেদ বলল, “আমার জীবনটা আবার শুরু করতে হবে।”
মিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —“যাও। কিন্তু মাঝে মাঝে ফিরে আসবে?”
রাশেদ হাসল, —“অবশ্যই।”

বসন্ত শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু রাশেদের জীবনে যেন একটা নতুন ঋতু শুরু হয়েছে।
সে এখন আর আগের মতো ভেঙে পড়া মানুষ নয়। সে জানে—জীবনে ঝড় আসবে, ফুল ঝরে যাবে, কিন্তু আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করা যায়।
আর কোথাও না কোথাও—কোনো এক শিমুলগাছের ডালে—একটা কাঠঠোকরা পাখি তখনও ঠোকর দিয়ে যাবে, জীবনকে থামতে দেবে না।

বসন্তের সেই উদাস দুপুরটা তাই আর শুধু উদাস নয়—সেটা হয়ে উঠেছে নতুন শুরুর গল্প।

– লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

যে ভুলে অল্প বয়সে মাথায় বাড়ছে পাকা চুলের সংখ্যা?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:০৮ এএম
যে ভুলে অল্প বয়সে মাথায় বাড়ছে পাকা চুলের সংখ্যা?

বয়স হলে সাদা হবে চুল। বার্ধক্যের মতো এটাও অনিবার্য। ইদানীং আবার অল্প বয়সে চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে অনেকেরই।

পাকা চুল এখন আর বয়স বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ নয়। অল্প বয়সেই চুলের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে পারে সাদা চুল। এক বার চুলে পাক ধরতে শুরু করলে তা স্বাভাবিক ভাবে কখনও কালো হয় না।

তা ছাড়া এক বার চুল পাকতে শুরু করলে খুব দ্রুত মাথার বাকি অংশও সাদা হতে থাকে। জিনগত কারণে বা শারীরিক সমস্যার কারণে অল্প বয়সে চুল পাকতেই পারে। এ ছাড়াও রোজের জীবনে কোন কোন ভুল পাকা চুলের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে? এই ভুলগুলি করছেন না তো?

১) নিয়মিত ধূমপান করার অভ্যাস থাকলেও সতর্ক হোন। এই অভ্যাসের কারণেও চুল পেকে যেতে পারে।

২) রাত জেগে ওয়েব সিরিজ় দেখার ফলে ঘুমের গোলমাল হচ্ছে? সকালে অফিসের তাড়ায় তাড়াতাড়ি উঠে পড়ছেন। ফলে ঘুম সম্পূর্ণ হচ্ছে কই? এই অভ্যাসের কারণেও কিন্তু চুলে পাক ধরতে পারে।

৩) শরীরে খনিজ ও ভিটামিনের অভাবে চুল পাকতে পারে। আয়োডিন, আয়রন, কপারের মতো খনিজ, ভিটামিন বি, ওমেগা ৩-এর মতো পুষ্টিগুণের অভাব হলে চুলে পাক ধরতে পারে। তাই রোজের ডায়েটে কাঠবাদাম, আখরোট, কুমড়োর বীজ রাখতে পারেন। এর পাশাপাশি বেশি করে মরসুমি ফল ও শাকসব্জি আর দুধ, দই খেতে হবে।

৪) সারা দিন অত্যধিক চাপের মধ্যে কাজ করেন? খুব বেশি মানসিক চাপ থাকলে শরীরে নোরপাইনফ্রাইন বলে এক ধরনের রসায়নিক তৈরি হয়। যার ফলে ফলিক্‌লগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাড়াতাড়ি চুল পেকে যায়। তাই মানসিক চাপ কমাতে নিয়ম করে যোগাভ্যাস করতে হবে। পাশাপাশি, কাজের ফাঁকে সময় বার করে মন ভাল রাখার জন্য বেড়াতে যাওয়া, গানবাজনা করা, গান শোনার মতো কাজগুলি করতে পারেন।

৫) চুলে লাল, নীল, সবুজ রং করতে ভালবাসেন? বেশির ভাগ চুলের রঙেই হাইড্রোজ়েন পারঅক্সাইড থাকে। এই রাসায়নিকটি কিন্তু চুলের পাক ধরার অন্যতম কারণ হতে পারে।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা