দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নকল প্রতিরোধ দীর্ঘদিনের আলোচিত একটি বিষয়। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বারবার এই ইস্যুকে সামনে আনছেন—যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমানে প্রচলিত সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে আগের মতো সরাসরি নকলের সুযোগ অনেকটাই কমে এসেছে। কারণ এখন প্রশ্ন মুখস্থনির্ভর নয়; বরং বিশ্লেষণধর্মী ও প্রয়োগভিত্তিক।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—নকল কমলেই কি শিক্ষার মান বেড়েছে? উত্তরটি এতটা সরল নয়।
সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর আগে পরীক্ষায় মূল্যায়ন ছিল কঠোর—সঠিক উত্তরে পূর্ণ নম্বর, ভুল হলে শূন্য। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে আংশিক সঠিক উত্তরের জন্য আংশিক নম্বর দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নীতিগতভাবে এটি শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নম্বর প্রদানে অতিরিক্ত উদারতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে প্রকৃত মেধা যাচাই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভালো ও দুর্বল শিক্ষার্থীর মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এখন নকল দমন নয়, বরং বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যায়নের মান নিশ্চিত করা।
শিক্ষাব্যবস্থার এই পর্যায়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি—
প্রথমত, শিক্ষকদের নিয়মিত ও কার্যকর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কারিকুলাম পরিবর্তন করলেই হবে না, সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য শিক্ষকদের দক্ষ করে তোলা অপরিহার্য।
দ্বিতীয়ত, পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বশীল তদারকি জোরদার করতে হবে, যাতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ থাকে।
তৃতীয়ত, খাতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা ও কঠোরতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ না করলে শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখা সম্ভব নয়।
চতুর্থত, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান উন্নয়নে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালু করতে হবে। বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদান কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারছে না, যার প্রভাব সরাসরি পরীক্ষার ফলাফলে পড়ছে।
এর পাশাপাশি শিক্ষকদের আর্থিক ও পেশাগত প্রণোদনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন অনুপ্রাণিত শিক্ষকই একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি।
নতুন কারিকুলাম নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও এর ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বিশেষ করে গণিতসহ কিছু বিষয়ের বই যথেষ্ট আধুনিক ও সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নম্বরভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি হঠাৎ করে বাতিল করার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পরিমাপের একটি কার্যকর মাধ্যমকে দুর্বল করে দিয়েছে। উন্নত পাঠ্যবই ও নম্বরভিত্তিক মূল্যায়নের সমন্বয় ঘটানো গেলে শিক্ষার মান আরও উন্নত হতে পারত।
নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে যে সমস্যাগুলো স্পষ্ট হয়েছে, সেগুলোও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই—
– তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়ন, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক কেউই প্রস্তুত ছিল না
– সব শ্রেণি ও বিষয়ে একযোগে পরিবর্তন আনার অযৌক্তিকতা
– মূল্যায়ন কাঠামোর হঠাৎ পরিবর্তনে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্তি
শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি চাপিয়ে দেওয়া যায় না; বরং সময় নিয়ে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হয়। অতীতে সৃজনশীল পদ্ধতি ধাপে ধাপে চালু হওয়ায় তা সহজে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। নতুন কারিকুলামের ক্ষেত্রেও যদি একই কৌশল অনুসরণ করা হতো, তাহলে হয়তো আজকের চিত্র ভিন্ন হতে পারত।
সবশেষে বলা যায়, শুধুমাত্র নকল দমন দিয়ে শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক ও ধীরস্থির পরিকল্পনা, যেখানে মূল্যায়নের ন্যায্যতা, শিক্ষার মান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সক্ষমতা—সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
নইলে ‘নকলমুক্ত পরীক্ষা’ অর্জন হলেও ‘মানসম্মত শিক্ষা’ অধরাই থেকে যাবে।
লেখক:
আপনার মতামত লিখুন
Array