খুঁজুন
মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

ফরিদপুর-৪ : কৃষক দল নেতা বাবুলের বিরুদ্ধে ৪০ মামলা—হলফনামায় যা বলছে বাবুল

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ৭:৫০ এএম
ফরিদপুর-৪ : কৃষক দল নেতা বাবুলের বিরুদ্ধে ৪০ মামলা—হলফনামায় যা বলছে বাবুল

ফরিদপুর-৪ আসন (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন) থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও কৃষক রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি এই আসনে আলোচিত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামা অনুযায়ী তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, শিক্ষাগত, পেশাগত ও আর্থিক তথ্য উঠে এসেছে।

পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পরিচয়:

মো. শহিদুল ইসলাম বাবুলের পিতার নাম মো. সিরাজুল ইসলাম খান এবং মাতার নাম মরিয়ম বেগম। তাঁর স্ত্রী নাজনীন রীনা পেশায় একজন চাকরিজীবী এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত এবং পারিবারিকভাবে স্থিতিশীল বলে জানা গেছে।

তাঁর বর্তমান ঠিকানা ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পূর্ব শ্যামপুর গ্রামে। অপরদিকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের কোনাগ্রাম। জন্মসূত্রে ফরিদপুরের সন্তান হওয়ায় এলাকার মানুষের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে।

শিক্ষা ও পেশাগত জীবন:

হলফনামা অনুযায়ী শহিদুল ইসলাম বাবুল শিক্ষাগতভাবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। পেশাগত জীবনে তিনি একজন ব্যবসায়ী। তিনি ‘মানিপ্লান্ট লিংক প্রা: লিমিটেড’ এবং ‘ইউনিসার্ভিস’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।

তাঁর স্ত্রী নাজনীন রীনা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুবাদে নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মজীবন পরিচালনা করছেন, যা পারিবারিক আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাজনৈতিক পরিচয় ও অভিজ্ঞতা:

রাজনৈতিকভাবে মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল বিএনপির একজন পরিচিত মুখ। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কৃষক অধিকার, গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন ইস্যুতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এবং ফরিদপুর অঞ্চলে কৃষক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এ কারণেই দলীয় মনোনয়নে তিনি এগিয়ে রয়েছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।

আয় ও সম্পদের বিবরণ:

নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, মো. শহিদুল ইসলাম বাবুলের বার্ষিক আয় ১৮ লাখ ৮৫ হাজার ৭৯৪ টাকা। তাঁর স্ত্রীর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ১৩ লাখ ১৬ হাজার ৩৯ টাকা।

অস্থাবর সম্পদের হিসাবে তার নিজের নামে নগদ অর্থ রয়েছে ১৫ হাজার ৭০২ টাকা। ব্যাংকে জমা রয়েছে ৮ লাখ ৮২ হাজার ৭২০ টাকা। এছাড়া তার মালিকানায় প্রাইভেটকার, বাস ও ট্রাকসহ যানবাহনের মূল্য দেখানো হয়েছে ২৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তার নিজের নামে কোনো স্বর্ণালংকার নেই বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অপরদিকে তার স্ত্রী নাজনীন রীনার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। তার নগদ অর্থ রয়েছে ২৭ লাখ ৬৬ হাজার ৫৩৮ টাকা এবং ব্যাংকে জমা রয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ২১৯ টাকা। সঞ্চয়পত্র, ফিক্সড ডিপোজিট ও ডাক সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ রয়েছে মোট ৩২ লাখ টাকা। এছাড়া তার নামে ২১ ভরি স্বর্ণালংকার, ১ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকার ইলেকট্রনিক পণ্য এবং ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার আসবাবপত্র রয়েছে।

আয়কর ও আইনগত তথ্য:

আয়কর সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, শহিদুল ইসলাম বাবুল সর্বশেষ আয়বর্ষে ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৭৯ টাকা আয়কর পরিশোধ করেছেন। তার স্ত্রী নাজনীন রীনা আয়কর দিয়েছেন ৪১ হাজার ৩৪৫ টাকা।

মামলা সংক্রান্ত তথ্যের ঘরে উল্লেখ করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে মোট ৪০টি মামলা ছিল। তবে হলফনামা অনুযায়ী তিনি সবগুলো মামলা থেকেই খালাস পেয়েছেন। আইনগতভাবে বর্তমানে তার বিরুদ্ধে কোনো বিচারাধীন মামলা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচনী প্রেক্ষাপট:

ফরিদপুর-৪ আসনটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি আসন। ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থান প্রধান নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শহিদুল ইসলাম বাবুল তাঁর নির্বাচনী প্রচারে কৃষক স্বার্থ, উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে, ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আর্থিক স্বচ্ছতার বিবরণসহ মো. শহিদুল ইসলাম বাবুলের হলফনামা ফরিদপুর-৪ আসনের ভোটারদের সামনে একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। এখন দেখার বিষয়, ভোটাররা তার এই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রতিশ্রুতিকে কতটা মূল্যায়ন করেন।

রমজানের শিক্ষা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা: সালথায় জামায়াতের ইফতার মাহফিল

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
রমজানের শিক্ষা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা: সালথায় জামায়াতের ইফতার মাহফিল

পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সালথা উপজেলা শাখার উদ্যোগে ইফতার মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।

সোমবার (৯ মার্চ) বিকেলে সালথা উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্থানীয় মুসল্লি, আলেম-ওলামা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। রমজানের তাৎপর্য ও নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা এবং মিলনমেলার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়।

উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মো. তরিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক মাওলানা আবুল ফজল মুরাদ।

আলোচনা সভায় প্রধান ও বিশেষ অতিথিরা মাহে রমজানের শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, রমজান কেবল রোজা পালনের মাসই নয়, এটি আত্মসংযম, ধৈর্য, ত্যাগ ও নৈতিকতার অনুশীলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। রমজানের শিক্ষা ব্যক্তি জীবনকে শুদ্ধ করার পাশাপাশি সমাজে ন্যায়, ইনসাফ ও সহমর্মিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

বক্তারা আরও বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- ফরিদপুর জেলা জামায়াতের অফিস সেক্রেটারি মাওলানা মিজানুর রহমান, নগরকান্দা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা সোহরাব হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বকুল মিয়া, নগরকান্দা উপজেলা জামায়াতের সুরা সদস্য ও তালমা ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মো. এনায়েত হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাবেক কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মাওলানা মাহবুব হোসেন, ঢাকা মহানগরীর মুহাম্মদপুর থানা জামায়াতের সুরা সদস্য ও সাবেক ছাত্রনেতা মুহাম্মদ সাইফুর রহমান হিটু।

এ ছাড়া উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি চৌধুরী মাহবুব আলী সিদ্দিকী নসরু, সালথা প্রেসক্লাবের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভা শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পরে উপস্থিত সকলের অংশগ্রহণে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৯:৪৪ পিএম
১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করেছে সরকার। এ বিষয়ে সোমবার (৯ মার্চ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক উপকমিশনার (পশ্চিম) কোহিনূর মিয়ার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হবে। পাশাপাশি তিনি বিধি অনুযায়ী সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দুটি বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। এ কারণে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তকরণের গুরুদণ্ডও দেওয়া হয়। পরে তিনি ফৌজদারী মামলা দুটির অভিযোগ থেকে আদালতের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণ হয়ে খালাস পান।

এছাড়া তার গুরুদণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন রাষ্ট্রপতি মঞ্জুর করায় আরোপিত চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশটি বাতিল করা হয়। তাই কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলায় ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে তার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হলো এবং তিনি বিধি মোতাবেক সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

 

 

বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও লাবলু মিয়া, সালথা:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৮:৫৯ পিএম
বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি। নেই কোনো ঘর, নেই আধুনিক সেলুনের ঝাঁ চকচকে সাজসজ্জা। তবু এই পুকুরপাড়েই প্রতিদিনের মতো বসে মানুষের চুল-দাড়ি কাটেন ৮৭ বছর বয়সী অকিল শীল। হাতে পুরোনো কাঁচি আর ক্ষুর—এই সামান্য সরঞ্জাম নিয়েই তিনি টানা ৬৬ বছর ধরে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামেও এখন গড়ে উঠেছে অসংখ্য সেলুন। উন্নত চেয়ার, আয়না, বৈদ্যুতিক ট্রিমার আর সাজানো দোকান—সবই আছে সেখানে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারের এই পুকুরপাড়ে বসা বৃদ্ধ নাপিতের কাছে এখনও ভিড় করেন অনেকেই। কারণ তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বছরের স্মৃতি, বিশ্বাস আর গ্রামীণ জীবনের এক সরল অধ্যায়।

শৈশবেই পেশায় যুক্ত:

অকিল শীলের বাড়ি পাশের নগরকান্দা উপজেলার সদর গ্রামের চৌমুখা এলাকায়। তাঁর পিতা হরিবদন শীল ছিলেন পেশায় নাপিত। ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে বসে তিনি এই কাজ শেখেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাই কৈশোরেই জীবিকার তাগিদে পেশাটিকে বেছে নিতে হয় তাকে।

প্রথমদিকে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন তিনি। পরে ধীরে ধীরে নিজেই কাজ শুরু করেন। প্রায় ৬৬ বছর আগে মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে বসেই তিনি নিজের কর্মজীবনের যাত্রা শুরু করেন। সেই শুরু থেকে আজও একই জায়গায় বসেই কাজ করে যাচ্ছেন অকিল শীল।

হাটের দিনেই জমে ওঠে সেলুন:

মাঝারদিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। সাধারণত হাটের দিন সকাল থেকেই পুকুরপাড়ে চলে আসেন অকিল শীল। সঙ্গে থাকে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি, পুরোনো কাঁচি, ক্ষুর আর কয়েকটি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

পুকুরপাড়ে পিঁড়ি পেতে বসেই শুরু হয় তাঁর দিনের কাজ। গ্রামের মানুষজন একে একে এসে বসেন তাঁর সামনে। কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন, কেউ আবার সিরিয়াল ধরে বসে থাকেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহে কোনো ঘাটতি নেই। মনোযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে কাঁচি চালিয়ে চুল কাটছেন তিনি। মাঝে মাঝে ক্ষুর দিয়ে দাড়িও ছেঁটে দেন।

এই পুকুরপাড়ের ছোট্ট জায়গাটিই যেন তাঁর সেলুন, আবার কর্মজীবনের স্মৃতিবহ স্থান।

গ্রাহকদের কাছে প্রিয় ‘অকিল দা’:

স্থানীয় অনেকেই এখনও আধুনিক সেলুন ছেড়ে অকিল শীলের কাছেই চুল কাটতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ তাঁদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বৃদ্ধ নাপিতের সঙ্গে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মাতুব্বর বলেন, “আমি সেলুনে চুল কাটাই না। ছোটবেলা থেকে অকিল দার কাছেই চুল কাটাই। এখন বয়স হয়েছে, তবু তাঁর হাতের কাঁচির ওপর ভরসা আছে।”

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “ওনার কাছে ধনী-গরিব সবাই চুল কাটান। কেউ তাকে অবহেলা করে না। বরং অনেকেই গল্প করতে করতে চুল কাটান। ওনার কাছে চুল কাটাতে অন্যরকম একটা আনন্দ আছে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, অকিল শীল শুধু একজন নাপিত নন, তিনি যেন বাজারের একটি জীবন্ত ইতিহাস।

সামান্য আয়েই চলে সংসার:

অকিল শীল জানান, বর্তমানে তিনি প্রতি জনের চুল কাটার জন্য ৫০ টাকা নেন। হাটের দিনে তাঁর কাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক আসেন। সেই হিসেবে প্রতিদিন খুব বেশি আয় হয় না।

তবুও এই সামান্য আয়ের ওপরই ভর করে তিনি নিজের সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। তখন বাজারে কোনো সেলুন ছিল না। পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালিয়েছি। এখন অনেক সেলুন হয়েছে, তবুও পুরোনো গ্রাহকেরা আসে।”

বয়সের কারণে কাজ করা কঠিন হলেও তিনি এখনো থামতে চান না।

অকিল শীল বলেন, “বয়স তো অনেক হয়েছে। শরীরও আগের মতো শক্তি পায় না। কিন্তু কাজ না করলে মন ভালো লাগে না। তাই যতদিন পারি কাজ করেই যেতে চাই।”

পরিবারের কেউ নেননি পেশা:

অকিল শীলের পাঁচ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তবে তাঁদের কেউই বাবার পেশাকে অনুসরণ করেননি। সবাই ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি কখনো জোর করিনি। তারা যার যার মতো কাজ করছে। আমি আমার কাজ নিয়েই খুশি।”

তবে তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ কর্মযাত্রা এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।

গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক প্রতীক:

স্থানীয়দের মতে, মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড় মানেই অকিল শীল। বহু বছর ধরে তিনি এই জায়গাটিকে নিজের কর্মস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

একসময় গ্রামে এভাবেই খোলা আকাশের নিচে বসে নাপিতেরা মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন। আধুনিকতার ঢেউয়ে সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারে এখনও সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রেখেছেন অকিল শীল।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখছি উনি এখানে বসে চুল কাটছেন। বাজারের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, দোকানপাট বেড়েছে, কিন্তু উনার জায়গা বদলায়নি।”

কাঁচির টুংটাং শব্দে লেখা জীবনের গল্প:

পুকুরপাড়ে বসে কাঁচির টুংটাং শব্দ তুলতে তুলতে যেন নিজের জীবনের গল্পই লিখে চলেছেন অকিল শীল।

গ্রামীণ জীবনের সরলতা, পরিশ্রম আর আত্মমর্যাদার এক অনন্য উদাহরণ তিনি। বয়সের ভার, আধুনিকতার চাপ—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।

হাটের দিনগুলোতে এখনো মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে দেখা যায় সেই পরিচিত দৃশ্য—একটি ছোট পিঁড়ি, হাতে কাঁচি ও ক্ষুর, আর সামনে বসা গ্রাহক।

সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও, অকিল শীল যেন এখনো ধরে রেখেছেন সেই পুরোনো দিনের গল্প। তাঁর কাঁচির টুংটাং শব্দেই যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে গ্রামীণ বাংলার এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।