খুঁজুন
, ,

টিকাদানে অনীহায় ফরিদপুরে বাড়ছে হাম, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৪ রোগী, মৃত্যু ১০

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ১:১৭ অপরাহ্ণ
টিকাদানে অনীহায় ফরিদপুরে বাড়ছে হাম, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৪ রোগী, মৃত্যু ১০

ফরিদপুর জেলায় দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম রোগীর সংখ্যা। শিশুদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মানুষও আক্রান্ত হচ্ছেন এ ভাইরাসজনিত রোগে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে আরও ৫১ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তবে স্বস্তির খবর হলো, এ সময়ে নতুন কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

বুধবার (১৩ মে) জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত ফরিদপুর জেলায় মোট হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৯৯ জনে। একই সময়ে হামজনিত কারণে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন।

উপজেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ফরিদপুর সদর উপজেলায়। সেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫৯ জন। এছাড়া সালথায় ২২ জন, সদরপুরে ১৪ জন, বোয়ালমারীতে ১৪ জন, ভাঙ্গায় ১২ জন, চরভদ্রাসনে ৬ জন, মধুখালীতে ৩ জন এবং নগরকান্দায় ২ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক অভিভাবক এখনও শিশুদের নিয়মিত টিকাদানে উদাসীন থাকায় হাম সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকাদান কার্যক্রমে অনীহা ও সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ৬৯ জন এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১৫ জন হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় দুই হাসপাতালে মোট ৫১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৪ জন।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, হাম প্রতিরোধে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম, জনসচেতনতামূলক প্রচার এবং আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের নির্ধারিত সময়ে এমআর টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ঘুমন্ত স্বামীর গোপনাঙ্গ কেটে দেওয়ার অভিযোগ, স্ত্রী আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ১২:৪১ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ঘুমন্ত স্বামীর গোপনাঙ্গ কেটে দেওয়ার অভিযোগ, স্ত্রী আটক

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় ঘুমন্ত স্বামীর গোপনাঙ্গ ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্ত্রীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গুরুতর আহত স্বামীকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর অভিযুক্ত স্ত্রীকে আটক করেছে পুলিশ।

সোমবার (২৯ জুন) সকালে ভাঙ্গা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হোগলাডাঙ্গী সদরদী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

আহত হানিফ শেখ (২৪) ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়নের পুখুরিয়া গ্রামের রফিক শেখের ছেলে। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। অভিযুক্ত স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারের (২২) বাড়িও একই এলাকায়। তবে কয়েক মাস ধরে তারা হোগলাডাঙ্গী সদরদী গ্রামের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় মাস আগে তারা ওই এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন। এরপর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই পারিবারিক কলহ চলছিল। রোববার রাতেও তাদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়। এরই জেরে সোমবার সকালে হানিফ ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার গোপনাঙ্গে আঘাত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

হানিফের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন। প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসক তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে।

এদিকে ঘটনার পর উত্তেজিত এলাকাবাসী অভিযুক্ত সুমাইয়া আক্তারকে আটক করে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে খবর পেয়ে ভাঙ্গা থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে হেফাজতে নিয়ে থানায় নিয়ে যায়।

ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, “খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। অভিযুক্ত নারীকে আটক করা হয়েছে। আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বিশ্বরেকর্ড করলেন লিওনেল মেসি

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ
বিশ্বরেকর্ড করলেন লিওনেল মেসি

লিওনেল মেসি মাঠে নামবেন আর নতুন কোনো রেকর্ড হবে না- এ যেন অবিশ্বাস্য। চলতি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে বেশ কিছু রেকর্ড গড়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটাও এখন তার দখলে। 

জর্ডানের বিপক্ষে শুরুর একাদশে ছিলেন না। ম্যাচের ৬০ তম মিনিটে বদলি হিসেবে নামলেন। তার কিছু পরই ফ্রি-কিক থেকে জালের দেখা পেলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।

এ নিয়ে বিশ্বকাপে টানা ৭ ম্যাচে গোল করার অনন্য এক কীর্তিতে নাম লেখালেন লিওনেল মেসি। এর আগে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলের দিনে টানা ৬ ম্যাচে গোল করে ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন (১৯৫৮) ও ব্রাজিলের জেয়াজিনহোর (১৯৭০) সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন।

এ ছাড়া চলমান বিশ্বকাপে নিজের ষষ্ঠ গোল করলেন মেসি। এর আগে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন।

মাদকের আগ্রাসনে বিপন্ন পরিবার ও সমাজ : রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়

রেহেনা ফেরদৌসী
প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ
মাদকের আগ্রাসনে বিপন্ন পরিবার ও সমাজ : রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়

একজন বাবা নিজের সন্তানকে হত্যা করেছেন। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষ থেকে পৌঁছে গেছেন পুনর্বাসন কেন্দ্রে। একজন মা শেষ সম্বল জমি বিক্রি করেও ছেলেকে নেশার অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায়, আদালতের নথিতে, হাসপাতালের বেডে কিংবা অসংখ্য পরিবারের নিভৃত কান্নায় ফিরে ফিরে আসে একই শব্দ মাদক।

২৬ জুন, আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়েছে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শুধু সেমিনার, ব্যানার আর র‍্যালি কি এই ভয়াবহ সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট? কারণ মাদক এখন আর কেবল একজন ব্যক্তির নেশা নয়; এটি একটি সামাজিক মহামারি, যা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি এবং জাতির ভবিষ্যৎ।

মাদক নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই আমরা সংখ্যা শুনি লাখ লাখ আসক্ত, কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য, শত শত মামলা কিংবা অসংখ্য উদ্ধার অভিযান। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি মানুষের গল্প, একটি পরিবারের বেদনা, একটি অপূর্ণ স্বপ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো তরুণদের সম্পৃক্ততা।

কিশোর, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী তরুণ, এমনকি বিদ্যালয়গামী অনেক শিক্ষার্থীও মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। যে প্রজন্ম দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ হওয়ার কথা, সেই প্রজন্মের একটি অংশ ধীরে ধীরে নেশার জালে আটকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে আলোচিত মাদক হলো ইয়াবা, যা মূলত মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে তৈরি। অল্প সময়ের জন্য এটি কৃত্রিম উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ক ও শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে। এর পাশাপাশি ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), কোকেইন, এলএসডি, বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় ট্যাবলেট এবং নতুন প্রজন্মের কিছু সিনথেটিক মাদকও দেশে প্রবেশ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক ব্যবসায়ীরা সময়ের সঙ্গে কৌশল বদলাচ্ছে। আগে যেখানে সীমান্তভিত্তিক সরবরাহ বেশি ছিল, এখন অনলাইন যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গোপন ডেলিভারি নেটওয়ার্কও ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে যেমন বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারীদের কাছেও এটি একটি সংবেদনশীল অঞ্চল। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলকে বহুবার মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারত সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা এবং অন্যান্য মাদক প্রবেশের ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উঠে এসেছে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক মাদক চক্র বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, কনটেইনার পরিবহন, কুরিয়ার সার্ভিস এবং ট্রানজিট ব্যবস্থাকেও ব্যবহার করার চেষ্টা করে। ফলে মাদক সমস্যাকে শুধুমাত্র একটি অপরাধ হিসেবে নয়, বরং সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র এবং অর্থনৈতিক অপরাধের সমন্বিত চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখতে হবে।

কেন তরুণরা মাদকের দিকে ঝুঁকছে? এ প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়। বন্ধুমহলের চাপ, কৌতূহল, হতাশা, বেকারত্ব, সম্পর্কের ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সবকিছু মিলেই একজন তরুণকে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অনেকেই প্রথমে মনে করে, “একবার চেষ্টা করলে ক্ষতি কী?” কিন্তু নেশার জগতের সবচেয়ে বড় প্রতারণা হলো এটি শুরু করা সহজ, কিন্তু বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন।

চিকিৎসকদের মতে, মাদক মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। দীর্ঘদিন ইয়াবা বা অন্যান্য উত্তেজক মাদক গ্রহণের ফলে দেখা দিতে পারে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোকের ঝুঁকি, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, স্নায়বিক সমস্যা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া ইত্যাদি। মানসিকভাবে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। একজন আসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে বিষণ্নতা, সন্দেহপ্রবণতা, হ্যালুসিনেশন, অনিদ্রা এবং আক্রমণাত্মক আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি বাস্তবতা ও কল্পনার পার্থক্য হারিয়ে ফেলেন।

মাদকের সবচেয়ে বড় ট্র‍্যাজেডি ঘটে পরিবারের ভেতরে। যে বাবা একদিন সন্তানের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই বাবাই নেশার ঘোরে পরিবারকে আতঙ্কের মধ্যে ফেলছেন। যে সন্তান একদিন বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল, সে-ই হয়ে উঠছে পরিবারের দুঃস্বপ্ন। সংসারের অর্থ চলে যাচ্ছে নেশার পেছনে। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে জমি, গয়না, সঞ্চয়। বাড়ছে কলহ, নির্যাতন ও বিচ্ছেদ। দেশে বিভিন্ন সময়ে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মাদকাসক্ত ব্যক্তির হাতে সন্তান, স্ত্রী কিংবা পরিবারের সদস্য নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনা শুধু অপরাধ নয়; এগুলো মানবিক মূল্যবোধের ভাঙনের নির্মম প্রতিচ্ছবি।

একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির কারণে শুধু একজন মানুষ নয়, পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। মাদকাসক্তি ও অপরাধের সম্পর্ক নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। নেশার অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেকেই জড়িয়ে পড়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, প্রতারণা ও সহিংসতায়। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি, এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাস এবং নানা অপরাধ কর্মকান্ডের পেছনেও মাদকের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যখন সমাজের একটি অংশ মাদকের প্রভাবে নৈতিক বোধ হারিয়ে ফেলে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সামাজিক আস্থা, নিরাপত্তা এবং মানবিক সম্পর্ক।

মাদকের কারণে একজন কর্মক্ষম মানুষ ধীরে ধীরে উৎপাদনশীলতা হারায়। কর্মস্থলে অনুপস্থিতি বাড়ে, দক্ষতা কমে যায়, কর্মজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে চিকিৎসা, পুনর্বাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, বিচারিক কার্যক্রম এবং অপরাধ দমনে রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, মাদকের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তার বড় অংশই সরাসরি হিসাবের বাইরে থেকে যায়। কিন্তু এর প্রভাব পড়ে জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর।

এ অবস্থায় মাদকবিরোধী অভিযান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু গ্রেপ্তার ও উদ্ধার অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক সচেতনতা কার্যক্রম, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে তরুণদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, সহজলভ্য পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা, পরিবারে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে নয়, চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে এমন একজন মানুষ হিসেবেও দেখতে হবে।

এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার…মাদক একটি মানুষকে ধ্বংস করে। একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়। একটি সমাজকে দুর্বল করে। একটি জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত আমরা কি শুধু দিবস পালন করব, নাকি সত্যিই মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য কাজ করব? কারণ মাদক একটি টান দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায় স্বপ্ন, সম্পর্ক, সম্মান, সম্ভাবনা এবং জীবনকে। আসুন, মাদককে না বলি। জীবনকে হ্যাঁ বলি। প্রজন্মকে বাঁচাই, পরিবারকে বাঁচাই, দেশকে বাঁচাই। মাদকমুক্ত বাংলাদেশই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার। মাদকমুক্ত দেশ গড়তে চাই সামাজিক প্রতিরোধের জাগরণ এবং প্রতিরোধেই মুক্তির পথ।

লেখক: সহ-সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, কেন্দ্রীয় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।