খুঁজুন
, ,

ফরিদপুরে বিদেশি ওয়ান শুটারসহ অস্ত্রধারী গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে বিদেশি ওয়ান শুটারসহ অস্ত্রধারী গ্রেপ্তার

ফরিদপুর শহরের গুহলক্ষীপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি ওয়ান শুটার গানসহ মো. শাহিন মোল্লা (৩৩) নামে এক অস্ত্রধারীকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১০। র‌্যাবের দাবি, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযানে তার নিজ বসতবাড়ির শয়নকক্ষ থেকে আগ্নেয়াস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব-১০ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (২ আগস্ট) দিবাগত রাত ৪টার দিকে শহরের গুহলক্ষীপুর এলাকার ২ নম্বর কুটিবাড়ীর লাশকাটা ঘর সংলগ্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব-১০। এ সময় শাহিন মোল্লার বসতবাড়ির শয়নকক্ষে তল্লাশি চালিয়ে একটি বিদেশি ওয়ান শুটার গান উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে ঘটনাস্থল থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার শাহিন মোল্লা গুহলক্ষীপুর এলাকার ২ নম্বর কুটিবাড়ী এলাকার মো. তারা মোল্লা ছেলে। র‌্যাব জানিয়েছে, শাহিনের বিরুদ্ধে এর আগে মাদক ও চুরির অভিযোগে মোট তিনটি মামলা রয়েছে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রটি কীভাবে তার কাছে এসেছে, এর উৎস কোথায় এবং এটি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এ বিষয়ে র‌্যাব-১০ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার তপন সরকার বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে একটি বিদেশি ওয়ান শুটার গান উদ্ধার এবং একজন অস্ত্রধারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অস্ত্রের উৎস শনাক্ত এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে র‌্যাবের গোয়েন্দা তৎপরতা ও অভিযান ধারাবাহিকভাবে চলমান রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “অপরাধ দমনে র‌্যাব সবসময়ই জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।”

প্লাস্টিকমুক্ত শহর গড়ার আহ্বানে ফরিদপুরে মানববন্ধন, পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়াতে জোর দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ৮:০২ পূর্বাহ্ণ
প্লাস্টিকমুক্ত শহর গড়ার আহ্বানে ফরিদপুরে মানববন্ধন, পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়াতে জোর দাবি

পরিবেশ দূষণ রোধে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। একই সঙ্গে প্লাস্টিকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই শহর গড়ে তুলতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

শনিবার (১ আগস্ট) বিকেলে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সামনে সমকাল সুহৃদ সমাবেশ, ফরিদপুর এবং পরিবেশ উন্নয়ন ফোরাম-এর যৌথ উদ্যোগে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। কর্মসূচির প্রতিপাদ্য ছিল— “প্লাস্টিক বর্জন করি, পরিচ্ছন্ন শহর গড়ি।”

সমকাল সুহৃদ সমাবেশ, ফরিদপুরের সভাপতি মো. হারুনার রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবেশ উন্নয়ন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির।

এ সময় বক্তব্য দেন সমকাল সুহৃদ সমাবেশের সহ-সভাপতি মুহাম্মদ নাজমুল ইসলাম মিরান, সাধারণ সম্পাদক আবরাব নাদিম ইতু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রভাত সিং এবং পরিবেশ উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি কাজী সিরাজুল ইসলাম, সহ-সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, রেহেনা প্রিয়া ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক তানিয়া ইসলাম।

বক্তারা বলেন, প্লাস্টিক বর্তমানে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় হুমকি। অপরিকল্পিতভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট হচ্ছে, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, নদ-নদী ও খাল-বিল দূষিত হচ্ছে এবং কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা (মাইক্রোপ্লাস্টিক) খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।

তারা বলেন, বাংলাদেশ পাট উৎপাদনে বিশ্বে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। পরিবেশবান্ধব ও জৈবভাবে পচনশীল পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা সম্ভব হবে, অন্যদিকে দেশের কৃষক ও পাটশিল্পও নতুন গতি পাবে। এজন্য পাটজাত ব্যাগ, মোড়ক, গৃহস্থালি সামগ্রী ও অন্যান্য বিকল্প পণ্যের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং ব্যবহারে সরকারি প্রণোদনা ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তারা।

মানববন্ধনে বক্তারা ধাপে ধাপে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার সীমিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত করতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি জানান। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

মানববন্ধনে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সদস্যসহ সচেতন নাগরিকরা অংশ নেন।

ফরিদপুরে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলছিল গৃহবধূর মরদেহ

মো. ইকবাল হোসেন, আলফাডাঙ্গা:
প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলছিল গৃহবধূর মরদেহ

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার বুড়াইচ ইউনিয়নের শৈলমারী গ্রামে সুমাইয়া শিমু (২৫) নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতের পরিবারের দাবি, সুমাইয়াকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তবে স্বামীর পরিবার এটিকে আত্মহত্যা বলে দাবি করেছে।

শনিবার (০১ আগস্ট) সকালে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এর আগে শুক্রবার (৩১ জুলাই) সন্ধ্যার আগে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে আলফাডাঙ্গা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

নিহত সুমাইয়া শিমু শৈলমারী গ্রামের মোস্তফা শেখের মেয়ে এবং একই গ্রামের কাঠমিস্ত্রি জসিম কাজীর স্ত্রী। তাদের সাত বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় আট বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের জেরে জসিম কাজী ও সুমাইয়া পালিয়ে বিয়ে করেন। সে সময় সুমাইয়ার পরিবার অপহরণের অভিযোগে মামলা করলেও প্রায় দুই বছর আগে উভয় পরিবার তাদের সংসার মেনে নেয়। তবে স্বামীর নেশা করা, অনিয়মিত কাজ করা এবং সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন নিয়ে প্রায়ই তাদের মধ্যে বিরোধ লেগে থাকত।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, শুক্রবার প্রতিবেশীর একটি অনুষ্ঠানে যাওয়াকে কেন্দ্র করে দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হয়। দুপুরে সুমাইয়া তার ছেলে মাহিরকে বড় বোনের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় বড় বোন শাহিনুর জসিমকে ফোন করলে তিনি খারাপ আচরণ করেন এবং সুমাইয়াকে হত্যার হুমকিও দেন বলে অভিযোগ করেন। সন্ধ্যার আগে জসিম নিজেই ফোন করে জানান, সুমাইয়া আত্মহত্যা করেছেন।

সুমাইয়ার বোন শাহিনুর ও সুরাইয়া দাবি করেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা দেখেন মরদেহ ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলছে। তাদের ভাষ্য, ঘরের আড়ার উচ্চতা বিবেচনায় সুমাইয়ার পক্ষে ওইভাবে ফাঁস নেওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া ঘটনার পর জসিম ঘর তালাবদ্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান বলেও অভিযোগ করেন তারা।

অন্যদিকে জসিমের মা ছিয়ারন বেগম বলেন, “ঘটনার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম না। পরে শুনেছি আমার ছেলের স্ত্রী গলায় ফাঁস দিয়েছে। আমার ছেলে এমন কাজ করতে পারে না, সে নির্দোষ।”

আলফাডাঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ আল-আমিন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করেছে। শনিবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। অভিযোগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

সালথায় জামু ফকির হত্যার পর থমকে গ্রেপ্তার, চলছে চাঁদাবাজি ও ত্রাসের রাজত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর ও সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৫৩ অপরাহ্ণ
সালথায় জামু ফকির হত্যার পর থমকে গ্রেপ্তার, চলছে চাঁদাবাজি ও ত্রাসের রাজত্ব

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের কুমারকান্দা গ্রামে নৃশংসভাবে নিহত পান্নু ফকির ওরফে জামু ফকির (৪২) হত্যার দীর্ঘদিন পার হতে চললেও মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। একদিকে প্রিয়জনকে হারিয়ে সুবিচারের আশায় বুক বাঁধছে নিহতের পরিবার, অন্যদিকে এই বিষাদ ও সুযোগ নিয়ে এলাকায় চলছে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহলের রামরাজত্ব। মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে নিরপরাধ মানুষ ও প্রবাসীদের পরিবার থেকে চাঁদা আদায়, প্রতিপক্ষের ক্ষেতের পাট কাটতে বাধা এবং বাজারে দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে।

​নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ, তদন্তের বর্তমান অবস্থা, নিহতের স্বজনদের আকুতি এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরা হলো এই বিশেষ প্রতিবেদনে।

হত্যাকাণ্ডের পেছনের ইতিহাস: যেভাবে ঘটেছিল নৃশংসতা:

​২০২৬ সালের ২৪ জুন রাতে কুমারকান্দা গ্রামের রহমান ফকিরের ছেলে পান্নু ফকির ওরফে জামু ফকির স্থানীয় একটি জমিজমা সংক্রান্ত সালিশ বৈঠকে অংশ নেন। দীর্ঘদিন ধরেই গ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মালিকানা এবং স্থানীয় মসজিদের একটি ঘটনা নিয়ে জামু ফকিরের সঙ্গে প্রতিপক্ষের বিরোধ চলছিল। সালিশ বৈঠক শেষে রাতে একা বাড়ি ফেরার পথে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

​প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়, রাস্তার পাশের একটি পাটক্ষেতে নিয়ে জামু ফকিরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার শরীরে ৪০টিরও বেশি কোপের চিহ্ন পাওয়া যায়। খুনিরা তার হাত-পা কেটে শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেয় এবং ঘটনা আড়াল ও অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্য মরদেহটি কুমারকান্দার প্রধান সড়কের ওপর ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।

​পরদিন ২৫ জুন সকাল ৯টার দিকে স্থানীয় পথচারীরা রক্তাক্ত অবস্থায় মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দিলে সালথা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

পাঁচ দিনের সন্তান কোলে রেখে জামু ফকির খুন:

​হত্যাকাণ্ডের পর যদুনন্দী ইউনিয়নের কুমারকান্দা গ্রামে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। কোলে দেড় মাসের শিশুসন্তানকে জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিচার চাইছিলেন নিহতের স্ত্রী রুমা বেগম (রুপা)।

​তিনি কান্না সামলে বলেন, “আমার কোলজুড়ে তখন মাত্র পাঁচ দিনের বাচ্চা। সেই সময় আমার স্বামীকে এভাবে পশুপাখির মতো কুপিয়ে হত্যা করা হলো। তার শরীরে ৪০টিরও বেশি কোপের দাগ ছিল। ঘটনা ঘটার পর প্রশাসন আমাদের দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু আজ দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও অদৃশ্য কারণে মূল আসামিরা অধরা। আসামিরা অনেক টাকা-পয়সার মালিক এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাই আমরা বিচার পাওয়া নিয়ে চরম সংশয় ও আতঙ্কে ভুগছি।”

​নিহতের স্বজনরা জানান, হত্যার আগেও জামু ফকিরের ওপর একাধিকবার অত্যাচার চালানো হয়েছিল। নিহতের চাচাতো ভাই মিজান ফকির বলেন, “জামুকে হত্যার কিছুদিন আগে তার বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তার নিজ জমির মেহগনি গাছ পর্যন্ত কাটতে দেওয়া হয়নি। এরপরই পরিকল্পিতভাবে তাকে খুন করা হলো। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের পুলিশ কেন ধরছে না, আমরা বুঝতে পারছি না।”

​আরেক চাচাতো ভাই ওবায়দুর ফকির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের এলাকায় সাধারণত খুনের ঘটনা ঘটলে প্রতিপক্ষের বাড়িতে লুটপাট করা হয়। কিন্তু আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কারো বাড়িতে সামান্য ক্ষতিও করিনি। অথচ পুলিশ আমাদের বলে আসামিদের খুঁজে বের করে দিতে! আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখ থেকে এমন কথা শোনা অত্যন্ত দুঃখজনক।”

লাশের রাজনীতি ও চাঁদাবাজির বিস্ফোরক অভিযোগ:

​জামু ফকির হত্যার পর থেকে যদুনন্দী এলাকায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসী ও আসামিপক্ষের পরিবারের অভিযোগ, এ হত্যাকাণ্ডকে হাতিয়ার বানিয়ে এলাকার একাংশ প্রভাবশালী নেতা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসা শুরু করেছে।

​বিশেষ করে যদুনন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মনিরুজ্জামান হুমায়ুন খাঁ, সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম ওরফে নজরুল বিডিআর এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কাইয়ুম মোল্যার বিরুদ্ধে একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

প্রধান প্রধান অভিযোগসমূহ:

মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি: হত্যা মামলায় নাম জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নির্দোষ গ্রামবাসী এবং প্রবাসী পরিবারগুলোর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যারা টাকা দিচ্ছেন, কেবল তারাই এলাকায় থাকতে পারছেন।

পাট কাটতে বাধা: প্রতিপক্ষ ও সাধারণ কৃষকদের ক্ষেতের পাট কাটতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে মোটা অংকের চাঁদা পরিশোধ করলে পাট কাটার সুযোগ মিলছে।

দোকানে ডাবল তালা: বাজারের একাধিক মুদির দোকানে জোরপূর্বক জোড়া তালা ঝুলিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে রাখা হয়েছে।

প্রবাসীদের ব্ল্যাকমেইল: ইউনিয়নটির প্রবাসীদের পরিবারকে টার্গেট করে অর্থ হাতানোর সরাসরি অভিযোগ এসেছে।

​নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রামবাসী জানান, ওই তিন নেতার রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে এসব নেতাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ও বাদীপক্ষের বক্তব্য:

​এসব গুরুতর অভিযোগের জবাবে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে বাদী ও নিহতের ছেলে রুমান ফকির এবং স্ত্রী রুমা বেগম বিষয়গুলো আংশিক স্বীকার করলেও তা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে করা হয়েছে বলে দাবি করেন।

​দোকানে তালা দেওয়ার বিষয়ে রুমান ফকির বলেন, “আমরা দোকানে জোড়া তালা লাগিয়েছি যাতে প্রতিপক্ষের লোকজন নিজেরাই মালামাল সরিয়ে নিয়ে উল্টো আমাদের নামে মিথ্যা চুরির অপবাদ দিতে না পারে।” আর পাট কাটতে বাধা দেওয়ার বিষয়ে তারা বলেন, “তারা নিজেরা পাট কাটলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু অন্য এলাকা থেকে লোক ভাড়া করে এনে পাট কাটাচ্ছে। এতে তারা নিজেরা ঝামেলা করে আমাদের ওপর দোষ চাপাতে পারে, তাই বাধা দেওয়া হয়েছে।” তবে কোনো প্রকার চাঁদাবাজির সঙ্গে তারা যুক্ত নন বলে স্পষ্ট দাবি করেন।

​অন্যদিকে, অভিযুক্ত নেতারা তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

অভিযোগের ব্যাপারে যদুনন্দী ইউনিয়নের ​সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কাইয়ুম মোল্যা বলেন, “আমি আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। তাই আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছে। আমি বরং এলাকা শান্ত রাখার চেষ্টা করছি।”

​এদিকে অভিযোগের ব্যাপারে যদুনন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মনিরুজ্জামান হুমায়ুন খাঁ বলেন, “জামু আমাদের দলের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন। তাকে খুন করার পরও আমরা এলাকা শান্ত রেখেছি। এই গ্রামে কোনো লুটপাট বা সহিংসতা হতে দিইনি। যেখানে মার্ডার হয়, সেখানে আসামিদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়; কিন্তু আমরা একটি সুতাও নাড়াতে দিইনি। আমার বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগ মিথ্যা।”

অন্যদিকে যদুনন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম ওরফে নজরুল বিডিআর বলেন, “আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা হয়রানির কোনো তথ্য-প্রমাণ তদন্তে পেলে আমি রাজনীতি থেকেই পদত্যাগ করব। আমি এ ধরনের রাজনীতি করি না। নিহত জামুর পরিবার আমার কোনো কমান্ড মানছে না, তারা অন্যদিকে পরিচালিত হচ্ছে। তাই আমি তাদের মামলার বিষয়ে বা মিলাদেও অংশ নেইনি।”

শক্ত অবস্থান ও অপকর্মের দায় নেবে না বিএনপি:

​বিএনপি নেতাদের নাম জড়িয়ে এমন বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় ও জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তারা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, দল কোনোভাবেই অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না।

এ​ব্যাপরে সালথা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার বলেন, দল কখনোই কোনো অন্যায়কারী বা দলের নাম ভাঙিয়ে খাওয়া চাঁদাবাজদের ছাড় দেয় না। কেউ ব্যক্তিগত অপরাধ করলে দল তার দায়ভার নেবে না।”

এব্যাপারে কয়েকদিন আগে সালথা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আসাদ মাতুব্বর বলেন, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করার সুযোগ কারো নেই। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যদি কেউ অন্যায় করে থাকে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

এ ব্যাপারে সালথা উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ​খায়রুল বাসার আজাদ বলেন বলেন, ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে—দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপরাধ করলে কোনো ছাড় নেই। তাই কেউ অপরাধ করলে দল তার দায়ভার নিবে না।”

ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ​এ.কে.এম কিবরিয়া স্বপন বলেন, “এ ধরনের অপকর্ম বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খোঁজ নিয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।”

পুলিশের পদক্ষেপ ও তদন্তের অগ্রগতি:

​জামু ফকির হত্যা মামলায় পুলিশ এ পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে, যিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে মামলার বাকি মূল আসামিরা এখনো পলাতক রয়েছে।

​হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী চাঁদাবাজি সংক্রান্ত বিষয়ে সালথা থানা এবং জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:

এ ​ব্যাপারে সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান বলেন, “জামু ফকির হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের ধরতে আমাদের কয়েকটি ইউনিট একযোগে কাজ করছে। তবে মূল আসামিরা কোনো ধরনের মোবাইল ফোন বা প্রযুক্তি ব্যবহার না করায় তাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করতে বেগ পেতে হচ্ছে। দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া এই হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে যদি কেউ সাধারণ মানুষকে হয়রানি, চাঁদাবাজি বা অরাজকতা সৃষ্টি করে, অভিযোগ পেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ ব্যাপারে ​ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা-সালথা সার্কেল) মুহম্মদ আল ফাহাদ বলেন, “একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না। আমরা আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করেছি। একইসঙ্গে এলাকায় নিরীহ মানুষকে মামলার ভয় দেখানো, প্রবাসীদের কাছে চাঁদা দাবি কিংবা কৃষকের পাট কাটতে বাধা দেওয়ার বিষয়ে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

সার্বিক পরিস্থিতি ও জনমনে আতঙ্ক:

​হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন পেরিয়ে গেলেও সালথার যদুনন্দী ইউনিয়নে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসেনি। একদিকে বিচার না পাওয়ার শঙ্কা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবার, অন্যদিকে গ্রেফতার আতঙ্কে পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে কয়েকটি গ্রাম। এর ওপর স্থানীয় গুটিকয়েক নেতার ‘মামলা বাণিজ্যে’ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের স্বজনরা।

​এলাকাবাসীর আকুল আবেদন—পুলিশ প্রশাসন যেন অবিলম্বে জামু ফকিরের প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে এবং একইসঙ্গে হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা চাঁদাবাজি ও হয়রানির সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে যদুনন্দীতে শান্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনে।