ফরিদপুরে ‘সবুজ সোনা’ তোষা পাটের মাঠ দিবস
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসল পাটের উৎপাদন ও গুণগত মান আরও উন্নত করতে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ‘বিজেআরআই তোষা পাট-৯ (সবুজ সোনা)’ জাতের মাঠ দিবস ও কৃষক সমাবেশে ফরিদপুরের কৃষকদের ছিল ব্যাপক সাড়া। নতুন এই জাতের অধিক ফলন, উন্নতমানের আঁশ এবং রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখে আগামী মৌসুমে চাষের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন শতাধিক কৃষক।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ফরিদপুর সদর উপজেলার হাট গোবিন্দপুর মোল্লাপাড়ায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাট গবেষণা আঞ্চলিক কেন্দ্র, ফরিদপুরের উদ্যোগে দিনব্যাপী এ মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ. টি. এম. মোর্শেদ আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. লুৎফর রহমান, ড. রণজিৎ কুমার ঘোষ এবং পাট গবেষণা আঞ্চলিক কেন্দ্র, ফরিদপুরের ইনচার্জ ড. মো. রিশাদ আব্দুল্লাহ। এছাড়া স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা অংশ নেন।
প্রদর্শনী প্লট পরিদর্শন শেষে কৃষি বিজ্ঞানীরা জানান, ‘বিজেআরআই তোষা পাট-৯’ বর্তমানে উদ্ভাবিত অন্যতম সম্ভাবনাময় তোষা পাটের জাত। প্রচলিত জাতের তুলনায় এটি প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন দিতে সক্ষম। মাত্র ১১০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যেই ফসল কাটার উপযোগী হওয়ায় কৃষকেরা সময়মতো পরবর্তী ফসল আবাদ করতে পারেন।
বিজ্ঞানীরা আরও জানান, এ জাতের আঁশ অত্যন্ত উজ্জ্বল, সোনালি রঙের, মসৃণ ও শক্তিশালী হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা ও মূল্য তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও কমে আসে।
প্রধান অতিথি ড. এ. টি. এম. মোর্শেদ আলম বলেন, ‘বিজেআরআই তোষা পাট-৯’ গড়ে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩.২৫ টন আঁশ এবং ৬.৪৮ টন পাটকাঠি উৎপাদন করতে সক্ষম। গাছের গড় উচ্চতা প্রায় ৩.০৪ মিটার এবং কাণ্ডের ব্যাস ১৬.২৫ মিলিমিটার, যা উন্নত আঁশ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের পাট উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে এ জাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রদর্শনী প্লটের কৃষক মোক্তার মোল্লা বলেন, “এবারই প্রথম বিজেআরআই তোষা পাট-৯ চাষ করেছি। অন্যান্য বছরের তুলনায় ফলন অনেক ভালো হয়েছে। গাছগুলো সমানভাবে লম্বা ও মোটা হয়েছে। প্রতিদিন আশপাশের এলাকার কৃষকেরা এই পাট দেখতে আসছেন। আগামী মৌসুমে অনেকেই এই জাতের পাট চাষ করবেন বলে জানিয়েছেন।”
মাঠ দিবসে অংশ নেওয়া অন্যান্য কৃষকেরাও নতুন জাতটির প্রশংসা করে বলেন, এ পাট পানিতে দীর্ঘ সময় ভালো থাকে, ঝড়-বৃষ্টিতে সহজে হেলে পড়ে না এবং রোগবালাইও তুলনামূলক কম হয়। তারা সরকারিভাবে পর্যাপ্ত বীজ সরবরাহের দাবি জানান, যাতে আরও বেশি কৃষক এই জাতের পাট চাষে উৎসাহিত হন।
বিকেলে আয়োজিত উন্মুক্ত মতবিনিময় সভায় কৃষকেরা পাট চাষের নানা সমস্যা, সম্ভাবনা ও মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। জবাবে কৃষি বিজ্ঞানীরা আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ ব্যবহারের কৌশল, রোগবালাই দমন এবং অধিক ফলন নিশ্চিত করার বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ দেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে পাটের উৎপাদন বাড়াতে উন্নত জাত ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সময়োপযোগী বীজ সরবরাহ ও কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ফরিদপুরসহ দেশের পাট উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে ‘সবুজ সোনা’ আবারও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

আপনার মতামত লিখুন
Array