পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি ও গ্রামীণ জীবনের অকৃত্রিম রূপকার জসীমউদ্দীন–এর ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ শনিবার (১৪ মার্চ)। গ্রামবাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, লোকসংস্কৃতি ও সহজ-সরল জীবনের চিত্র কবিতার ভাষায় তুলে ধরার জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যে “পল্লীকবি” হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে তার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পৈতৃক নিবাস ছিল একই জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। তার পিতা আনসারউদ্দীন মোল্লা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। পারিবারিক পরিবেশ ও গ্রামীণ জীবনধারা তার সাহিত্যচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলে।
শৈশবে ফরিদপুর হিতৈষী স্কুলে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয়। পরে ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ ও বিএ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তার কবিত্ব প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। কলেজে অধ্যয়নকালে রচিত তার বিখ্যাত কবিতা ‘কবর’ তাকে সাহিত্যাঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।
জসীমউদ্দীনের কর্মজীবনের শুরু হয় পল্লীসাহিত্য সংগ্রাহক হিসেবে। স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রখ্যাত সাহিত্য গবেষক দীনেশচন্দ্র সেন–এর সহযোগিতায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর বাংলা বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন এবং কয়েক বছর সেখানে শিক্ষকতা করেন। পরে তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক সরকার এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রচার বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে ডেপুটি ডিরেক্টর পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি।
বাংলা সাহিত্যে তার অবদান অসামান্য। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী’ তাকে সাহিত্যজগতে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। এরপর ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘রঙিলা নায়ের মাঝি’, ‘মাটির কান্না’, ‘পদ্মা নদীর দেশে’, ‘পদ্মাপার’, ‘বেদের মেয়ে’, ‘পল্লীবধূ’, ‘গ্রামের মায়া’সহ অসংখ্য কাব্য, গল্প ও স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। তার বিখ্যাত কাব্য ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বাংলা সাহিত্যে লোকজ জীবনচিত্রের অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত।
গ্রামবাংলার মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, প্রেম-বিরহ এবং লোকঐতিহ্যকে সহজ-সরল ভাষায় তুলে ধরার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার লেখায় গ্রামীণ জীবনের আবেগ ও মানবিকতার যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা আজও পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে।
১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান কবি। মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের অবদান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

আপনার মতামত লিখুন
Array