খুঁজুন
, ,

ফরিদপুরে রাজু শেখ হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন, ৮ আসামি গ্রেপ্তার; উদ্ধার ৫টি দেশীয় অস্ত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬, ৩:১২ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে রাজু শেখ হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন, ৮ আসামি গ্রেপ্তার; উদ্ধার ৫টি দেশীয় অস্ত্র

ফরিদপুর শহরের বহুল আলোচিত রাজু শেখ হত্যা মামলার মূল রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় এজাহারনামীয় ও তদন্তে প্রাপ্ত মোট ৮ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পাঁচটি দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।

সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে ফরিদপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেন পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ২ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফরিদপুর শহরের গুহলক্ষীপুর এলাকার স্টেশন মাছ বাজারের পশ্চিম পাশে মুরাদের মাংসের দোকানের সামনে রাজু শেখ (৩৬) নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারে ভর্তি করলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেদিন রাত ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নিহতের মা ছবি খাতুন (৫৫) বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।

পুলিশ জানায়, নিহত রাজু শেখ মূলত মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি স্টেশন বস্তি এলাকার কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাদক সংগ্রহ করে খুচরা বিক্রি করতেন। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। পরিবার তাকে বারবার নিষেধ করলেও তিনি মাদক ব্যবসা চালিয়ে যান। এ কারণে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার প্রায়ই বিরোধ সৃষ্টি হতো।

তদন্তে আরও জানা যায়, প্রায় ৮-৯ মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে তার ছোট ভাই মো. ইব্রাহীম শেখ রাজুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়েছিল। এরপর থেকে দুই ভাইয়ের মধ্যে শত্রুতা চলছিল। ঘটনার তিন দিন আগে রাজু আবার ইব্রাহীমকে হত্যার উদ্দেশ্যে কোপ দেয় এবং গলায় ছুরি চালানোর চেষ্টা করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ইব্রাহীম তার ভাইকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

এ পরিকল্পনায় অংশ নেয় হৃদয়, সাকিব, রবিউল, মারুফ ও স্বপ্নসহ আরও কয়েকজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন তারা স্টেশন মাছ বাজার এলাকায় গিয়ে রাজুকে ডেকে আনে এবং ইয়াবা চাওয়ার কথা বলে কথাকাটাকাটির সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে হৃদয় রাজুকে পেছন থেকে ধরে ফেলে। তখন ওৎ পেতে থাকা অন্যরা চাপাতি ও ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। রাজু নিস্তেজ হয়ে পড়লে তাকে মৃত ভেবে ঘটনাস্থলেই ফেলে রেখে সবাই পালিয়ে যায়।

পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

পুলিশের অভিযানে এজাহারভুক্ত অমিত রায়, নুর ইসলাম, মেহেরুন নেছা ও হৃদয়সহ মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে পাবনার সাথিয়া থানা এলাকা থেকে এবং একজনকে স্টেশন বস্তি এলাকা থেকে আটক করা হয়।

পুলিশ আরও জানায়, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের নিয়ে সোমবার (১৬ মার্চ) ভোরে কোতয়ালী থানার ১ নম্বর হাবেলী গোপালপুর এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় বায়তুল মামুর জামে মসজিদের পাশে রেললাইনের উত্তর পাশে গাছের পাতার নিচে লুকিয়ে রাখা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চারটি চাপাতি ও একটি স্টিলের ছোরা উদ্ধার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “রাজু শেখ হত্যা মামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাহিমা ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামছুল আজম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আজমীর হোসেনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সাংবাদিক কাজী শরিফুল ইসলাম শাকিলের মুক্তির দাবি বিপিজেএফের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৪৫ অপরাহ্ণ
সাংবাদিক কাজী শরিফুল ইসলাম শাকিলের মুক্তির দাবি বিপিজেএফের

বাংলাদেশ পেশাদার সাংবাদিক ফোরামের (বিপিজেএফ) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও ভয়েজ বিডি ২৪ ডটকমের সম্পাদক কাজী শরিফুল ইসলাম শাকিলকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানানো হয়েছে।

​বুধবার (০৭ অক্টোবর) বিকেলে এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনটির পক্ষে এই দাবি জানান বিপিজেএফ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মাহাবুব আলম বাবু এবং সাধারণ সম্পাদক মো. রোমান আকন্দ।

​বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, সাংবাদিক কাজী শরিফুল ইসলাম শাকিল দীর্ঘদিন ধরে পেশাদারি ও নিষ্ঠার সঙ্গে সাংবাদিকতা করে আসছেন। সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা মামলায় শেরেবাংলা নগর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এ ধরনের পদক্ষেপ স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

​বিপিজেএফ নেতারা আরও উল্লেখ করেন, কোনো সাংবাদিক কিংবা সাংবাদিক নেতাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার বা হয়রানি করে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা মেনে নেওয়া যায় না।

​অবিলম্বে সাংবাদিক শাকিলের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাঁর নিঃশর্ত মুক্তি এবং সাংবাদিকদের কাজের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বান জানায় সংগঠনটি। দাবি মানা না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা।

​বাংলাদেশ পেশাদার সাংবাদিক ফোরামের (বিপিজেএফ) দপ্তর সম্পাদক এসএম রেজাউল করিম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

ফরিদপুর জেলা জিওপির আংশিক কমিটির অনুমোদন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর জেলা জিওপির আংশিক কমিটির অনুমোদন

গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) ফরিদপুর জেলা শাখার আংশিক কমিটি আগামী এক বছরের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

অনুমোদিত কমিটিতে সভাপতি—ফরহাদ হোসেন এবং সহ-সভাপতি—ফিরোজ শেখ, মমিন চৌধুরী, জিয়া খান, আলমগীর শিকদার, আনিসুজ্জামান বাবুল শরীফ, দেলোয়ার হোসেন ও তারেক আজিজ।

সাধারণ সম্পাদক—রুবেল শেখ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক—মো. ফরহাদ মিয়া, আলমগীর শেখ, জিয়া শেখ, শিমুল মোল্যা, মিন্টু হোসেন ও সাইদুল ইসলাম।

সাংগঠনিক সম্পাদক—শেখ জাহিদ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক—মোহাম্মদ মতিয়ার, মো. ওমর ফারুক, সুমন ইসলাম নীরব, ইমদাদুল ইসলাম (বিন্দু) ও মো. শহিদ মোল্লা টুকু।

এ ছাড়া দপ্তর সম্পাদক—আলআমিন হোসেন লিখন; অর্থ সম্পাদক—মো. শহিদুল্লাহ; প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক—মো. জনি বিশ্বাস; সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক—নূরু মিয়া ও খলিলুর রহমান।

আইন সম্পাদক—অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম; মানবাধিকার সম্পাদক—আলমগীর হোসেন; ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মর্যাদা বিষয়ক সম্পাদক—মাওলানা শাওন আলী মীর; মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয়স্বার্থ বিষয়ক সম্পাদক—কামরুল হাসান; প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্পাদক—আফজাল আকাম।

যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক—বক্কার হাওলাদার; ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক—রাসেল খান; শ্রম ও কর্মসংস্থান সম্পাদক—মো. মিরাজ শিকদার মিন্টু এবং কার্যকরী সদস্য—সাইদুল ইসলাম।

দলীয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অনুমোদিত এ আংশিক কমিটি এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে।

শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ: কতটা প্রস্তুত আমাদের সমাজ?

নিকোলাস বিশ্বাস
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৬ অপরাহ্ণ
শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ: কতটা প্রস্তুত আমাদের সমাজ?

একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবার শুধু সন্তানকেই হারায় না; হারায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। উদ্বিগ্ন বাবা-মা সন্তানের ছবি হাতে থানায় জিডি করছেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়াচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো – একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের ব্যবস্থা কত দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? আর শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষার দায়িত্বই বা কার?

সংখ্যা শুধু গল্পের একটি অংশ

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৩,৬৭৯ শিশু উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২,০৩৮ শিশু তথনো নিখোঁজ রয়েছে। তবে জিডির সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনাই তুলে ধরে; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে, কারণ কিছু ঘটনা হালনাগাদ হয় না, আবার অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না।

সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এক ধরনের নয়। কোনো শিশু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যায় বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে; আবার কেউ অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হতে পারে। তাই শুধু কতজন নিখোঁজ হলো তা জানাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে কেন তারা নিখোঁজ হচ্ছে, এরপর তাদের কী ঘটছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর।

ইউনিসেফসহ (UNICEF) আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়া, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

নিখোঁজ শিশু কোনো সাধারণ নিখোঁজ ব্যক্তির মামলা নয়

শিশু নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সবসময় রাখে না; তাকে সহজেই প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দরিদ্র শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বিলম্ব হলে অপরাধীরা শিশুকে সরিয়ে নিতে বা পাচারের সুযোগ পেতে পারে।

জিডি করাই পুলিশের চূড়ান্ত কাজ নয়, বরং কাজের শুরু। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান ও ঝুঁকির বিষয় দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন।

পরিবারের অসহায়ত্ব যেন একটি ফাইলে আটকে না থাকে

সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা-মা পুলিশের কাছে গেলে উদাসীনতা, সন্দেহ বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করতে হবে। পুলিশ ও পরিবারের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক।

প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন, যিনি পরিবারকে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাবেন, নিয়মিত তথ্য দেবেন এবং প্রয়োজনে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। অসহায় মা-বাবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো – কেউ তাদের কথা শুনছে এবং সন্তানের সন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

শিশু ফিরে এলেই দায়িত্ব শেষ নয়

নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবার স্বস্তি পায়, কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল? কার সঙ্গে ছিল? তাকে কি নির্যাতন, ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হতে হয়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে; শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা, ভয় দেখানো বা দায়ী করা যাবে না। তার প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পুনর্বাসন। মূল ঝুঁকি চিহ্নিত না করে শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে সে আবার একই বিপদে পড়তে পারে।

সুরক্ষা শুরু হোক পরিবার ও বিদ্যালয় থেকে

যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও নীরবতা বড় বাধা। সামাজিক কলঙ্ক বা পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না; কখনো শিশুকেই দোষারোপ করা হয়।

এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে – তাদের ভয় দেখানো বা অস্বস্তিতে ফেলার অধিকার কারোর নেই। কেউ ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে কিংবা গোপন কিছু রাখতে বললে শিশুকে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। আর শিশু যখন কথা বলবে, বড়দের তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।

স্কুল ও মাদ্রাসা হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ও। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি (Child Safeguarding Policy) থাকা এবং শিক্ষক-কর্মীদের নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া ও শিশুর গোপনীয়তা রক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষাও জরুরি।

তথ্য-প্রযুক্তি ঝুঁকি তৈরি করে, আবার সহায়তাও করতে পারে

একটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ফুটেজও সহায়ক হতে পারে।

ঢাকার কোনো থানায় শিশু নিখোঁজ হলে সেই তথ্য যেন একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; শিশুকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানাতে হবে।

হেলফ লাইন-১০৯৮ সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবে

Child Helpline 1098 শিশু সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার কতজন অভিভাবক ও শিশু এই নম্বরটি জানে? স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ১০৯৮ নম্বর দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা উচিত। শিশুদের কাছে বার্তা হোক সহজ – বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও।

শিশু সুরক্ষা সবার দায়িত্ব

শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম – সবারই ভূমিকা রয়েছে।

স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্ত ও পরিবারকে সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।

গণমাধ্যমকে নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গোপনীয়তা বিবেচনা করতে হবে; এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিরোধ

একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে এমন সমাজ গড়া, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়।

এমন সমাজ চাই, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, স্কুলে সুরক্ষিত থাকবে, অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে জানবে এবং নির্যাতনের কথা ভয় ছাড়াই বলতে পারবে। আর শিশু যখন মুখ খুলবে, তাকে দোষী নয় – সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে দেখতে হবে।

শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার বলে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন এই বাণী সত্যিকার অর্থে অনুধাবনপূর্বক বাস্তবায়ন করে।

শিশু নিরাপত্তা; শিশুর একটি অধিকার

শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয় – “শিশুটি কোথায়?” আরও জিজ্ঞেস করতে হবে – “কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?”

আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন দেরিতে না হয়, কারণ শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ – তাকে নিরাপদ রাখা। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।

নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddzam@gmail.com