খুঁজুন
, ,

ফরিদপুর স্কুলে ঢুকে এসএসসি পরীক্ষার্থীকে হাতুড়িপেটা

হাসানউজ্জামান, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৭:৫৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর স্কুলে ঢুকে এসএসসি পরীক্ষার্থীকে হাতুড়িপেটা

ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকায় নুরুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত করেছে এক বখাটে যুবক।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে খবর পেয়ে ওই হামলাকারী যুবককে গ্রেপ্তার করে ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানা পুলিশ। আহত এসএসসি পরীক্ষার্থী শেখ সিয়াম ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে।

সারেজমিনে গিয়ে জানা যায়, হামলাকারী আশিক খান ( ২৩) স্থানীয় বখাটে যুবক। সে এবং তার সহযোগীরা স্কুলের ছাত্রীদের দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। আশিক স্থানীয় মুন্সীডাঙ্গী এলাকার শেখ জিন্নাহর পুত্র ।

স্কুলের শিক্ষক মো. হাসান আলী বলেন, ‘বখাটে যুবকরা প্রায়ই স্কুলের ছাত্রীদের বিরক্ত করে। এতে বাধা দিলে তারা শিক্ষকদের দিকে তেড়ে আসে। আজ ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারী ওই যুবক স্কুলের এক ছাত্রকে মারধর করছিল। আমি বাধা দিতে গেলে তখন সে হাতুড়ি নিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসে। আমাকে সেভ করতে গিয়ে আহত হন এসএসসি পরীক্ষার্থী শেখ সিয়াম।’

নুরুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়েরর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রোকেয়া বেগম জানান, হামলাকারী ওই যুবক ক্লাস চলাকালে স্কুলে প্রবেশ করে আমাদের এক নিরীহ ছাত্রকে মারধর করছিল। এর প্রতিবাদ করতে গিয়েই হামলার শিকার হয় শেখ সিয়াম। স্কুলের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তৎপরতা বৃদ্ধির আবেদন জানান এই শিক্ষক।

এ ব্যাপারে ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে আমি স্কুলটিতে গিয়ে হামলাকারী ওই বখাটে যুবককে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসি। স্কুলের শিক্ষক হাসান আলী বাদী হয়ে ওই হামলাকারী যুবকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। আমরা এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত সকলকেই আইনের আওতায় আনবো।

ফরিদপুরে খাল খনন শেষে ১ কোটি টাকা ফেরত দিলেন দুই ইউএনও

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৫:৪৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে খাল খনন শেষে ১ কোটি টাকা ফেরত দিলেন দুই ইউএনও

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয়ের প্রবণতার বিপরীতে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও সদরপুর উপজেলার দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। খাল পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করে সব ব্যয় মিটিয়েও উদ্বৃত্ত ১ কোটি ৮০ হাজার ৫৩৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান এবং সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফ শাওন।

উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারের দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা-সদরপুর-চরভদ্রাসন) আসনের ভাঙ্গা ও সদরপুর উপজেলায় মোট চারটি খাল পুনঃখননের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। প্রায় তিন মাস ধরে চলা এই প্রকল্পে দুই উপজেলায় মোট ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে।

দুই উপজেলার চারটি প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার ২৬৯ টাকা। এর মধ্যে ভাঙ্গা উপজেলায় বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৬০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৬৫ টাকা। প্রকল্পের সব কাজ সম্পন্ন করে ৬৪ লাখ ৩৯ হাজার ৯১৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়।

অন্যদিকে সদরপুর উপজেলায় বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮০৪ টাকা। সেখান থেকে কাজ শেষে উদ্বৃত্ত ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ৬২০ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।

ভাঙ্গা উপজেলায় ঘারুয়া ইউনিয়নের শরিফাবাদ হালন ফকিরের বাড়ি সংলগ্ন এলাকা থেকে খারদিয়া হয়ে শাহজাহান শেখের বাড়ি পর্যন্ত এবং সেখান থেকে কুমার নদী পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়। এছাড়া মানিকদাহ ইউনিয়নের বলেরবাগ থেকে সোনাখোলা পর্যন্ত আরও ৮ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে উপজেলাটিতে ১৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন সম্পন্ন হয়।

সদরপুর উপজেলায় লোহারটেক ব্রিজ থেকে শ্রীরামদী বাজার পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এবং দড়িকৃষ্ণপুর কাটাখাল ব্রিজ থেকে ভুবনেশ্বর নদীমুখী প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এতে উপজেলাটিতে মোট সাড়ে ৮ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খালগুলো পুনঃখননের ফলে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে, জলাবদ্ধতা কমবে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, অপচয় ও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ থাকলেও ফরিদপুরের এই দুই উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্রের। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে তদারকি, সঠিক পরিমাপ, প্রকৃত শ্রমিকের মাধ্যমে কাজ এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্বৃত্ত রেখে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল নিয়মিত প্রকল্পের অগ্রগতি তদারকি করেন। কাজের গুণগত মান পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলামও প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তারা কাজের মান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার প্রশংসা করেন।

এছাড়া গত ১৬ মার্চ ভাঙ্গা উপজেলায় দেশব্যাপী নদী-নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রকল্পের উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদাহ ইউনিয়নের প্রকল্প সদস্য জুয়েল বলেন, “ইউএনও স্যার নিয়মিত প্রকল্প এলাকায় এসে কাজ তদারকি করেছেন। কোথাও যেন অনিয়ম না হয়, সেদিকে তিনি সবসময় নজর রেখেছেন।”

ঘারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনসুর বলেন, “এই প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রেখে কাজ হয়েছে। শ্রমিকদের মজুরি থেকে শুরু করে সব ধরনের বিল যথাযথ নিয়মে পরিশোধ করা হয়েছে।”

সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর এলাকার প্রকল্প সদস্য জহুরুল মুন্সি বলেন, “অন্যান্য অনেক জায়গার তুলনায় এখানে অনেক ভালো কাজ হয়েছে। বর্তমান ইউএনওর আন্তরিকতা ও কঠোর নজরদারির কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।”

চর বিষ্ণুপুর এলাকার প্রকল্প সদস্য বাচ্চু কাজী বলেন, “খালের কাজ যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি কোনো ধরনের নয়-ছয় হয়নি। তাই প্রকল্পের উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়েছে।”

ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহামুদুল হাসান বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল উন্নয়ন কাজের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সততা নিশ্চিত করা। সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কাজ শেষে যে অর্থ উদ্বৃত্ত ছিল, তা নিয়ম অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা হয়। আমরা শুরু থেকেই সেদিকে কঠোর নজরদারি করেছি।”

তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কও প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন।

সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরিফ শাওন বলেন, “এটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প। আমাদের উপজেলার দুটি খাল দেশের প্রথম পর্যায়ে উদ্বোধন হওয়া ১৮টি প্রকল্পের মধ্যে ছিল। আমরা কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ দিইনি। সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারই সুশাসনের অন্যতম ভিত্তি। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক টাকাও ব্যয় না করে উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।”

প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে একদিকে যেমন কাজের গুণগত মান বজায় থাকে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থও সাশ্রয় হয়। ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও সদরপুর উপজেলার এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীর আমৃত্যু কারাদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৫:০১ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীর আমৃত্যু কারাদণ্ড

ফরিদপুরে এক লাখ টাকা যৌতুক না পেয়ে রমা বিশ্বাস (২৫) নামের এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে স্বামী মনোজিত সরকারকে (৪৩) আমৃত্যু কারাদণ্ড ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত।

জরিমানার এই সম্পূর্ণ টাকা আদায় করে ভুক্তভোগীর পরিবারকে দেওয়ার জন্য ফরিদপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসককে দায়িত্ব দিয়েছেন আদালত।

সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর দেড়টার দিকে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শামীমা পারভীন এ রায় ঘোষণা করেন।

রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মনোজিত সরকার আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন। পরে তার নামে ওয়ারেন্ট জারি করা হয়।

এ মামলায় সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার এজাহারভুক্ত অন্য ছয় আসামিকে, যারা প্রত্যেকেই মনোজিতের নিকটাত্মীয়, তাদেরকে আদালত বেকসুর খালাস প্রদান করেন। তারা হলেন, বিপুল সরকার (৫৩), সরজিৎ সরকার (৪৬), লিটন সরকার (৩৬), বিপ্লব সরকার (৩৩), সবুজ সরকার (৩০) ও দীপালী সরকার (৪৮)।

মামলার বিবরণী ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী জেলার মধুখালী উপজেলার জারজাননগর গ্রামের রঞ্জন বিশ্বাসের মেয়ে রমা বিশ্বাসের সঙ্গে একই উপজেলার কলাইকান্দা গ্রামের চিত্তরঞ্জন সরকারের ছেলে মনোজিত সরকারের বিয়ে হয়। এই দম্পতির নয় বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালে রমার বিয়ের সময় চার লাখ টাকা, সাড়ে তিন ভরি সোনা এবং ৫০ হাজার টাকার ফার্নিচার যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয় মনোজিতকে। এরপর ধাপে ধাপে ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত নগদ আরও এক লাখ টাকা যৌতুক হিসেবে তাকে দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে নগদ এক লাখ টাকা যৌতুকের দাবি করে মনোজিত। এই টাকা দিতে না পারায় ২০ এপ্রিল বিকেল চারটার দিকে স্ত্রী রমা বিশ্বাসকে গলায় নাইলনের সুতা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে স্বামী।

মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, স্ত্রীকে হত্যা করে মধুখালী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেন মনোজিত। এছাড়া শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে জানান পেটের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে রমা আত্মহত্যা করেছে।

পরে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয় রমাকে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতান্ত্রিক প্রতিবেদন আসার পর ২০১৮ সালের ১০ মে রমার বাবা রঞ্জন বিশ্বাস বাদী হয়ে মনোজিত ও তার ৬ জন আত্মীয়ের নাম উল্লেখ করে তার মেয়েকে যৌতুকের দাবিতে হত্যার অভিযোগ এনে মধুখালী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন জামান আইনে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এ মামলাটি তদন্ত করেন মধুখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহাবুল করিম। তিনি মামলাটি তদন্ত করে ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর মনোজিত সরকার ও তার ৬ জন আত্মীয়কে অভিযুক্ত করে মোট ৭ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। যৌতুকের প্রবণতা কমাতে এবং অপরাধ করলে যে অবশ্যই সাজা পেতে হবে, এ রায়ের মাধ্যমে সেই বার্তা সমাজে পৌঁছাবে।

তিনি বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর ফলে সমাজে এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা কমে আসবে।

ফরিদপুর রেলস্টেশনের সেই হাজেরা বিবির পঁচে যাচ্ছে পা, মাছি ভনভন করছে পচা ঘায়ে!

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৩:৩৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর রেলস্টেশনের সেই হাজেরা বিবির পঁচে যাচ্ছে পা, মাছি ভনভন করছে পচা ঘায়ে!

ফরিদপুর রেলস্টেশন। প্রতিদিন এখানে শত শত মানুষ আসে, ট্রেনে ওঠে, আবার চলে যায়। ব্যস্ততার সেই ভিড়ে একটি মুখ যেন সবার অগোচরেই থেকে যায়। ছোট ছোট পায়ে কুঁজো হয়ে হাঁটা সেই বৃদ্ধা—হাজেরা বিবি। অনেকেই তাকে চেনেন, কেউ কয়েন দেন, কেউ একবেলা খাবার দেন, আবার অনেকেই পাশ কাটিয়ে চলে যান। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, এই স্টেশনই এখন তার ঘর, তার আশ্রয়, তার পৃথিবী।

বয়স ষাট পেরিয়েছে অনেক আগেই। মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই নেই। পরিবার আছে কি নেই, সেই প্রশ্নের উত্তরও যেন সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। দিনের আলো ফুটলে মানুষের কাছে হাত পাতেন, আর রাত নামলে স্টেশনের কোনো এক কোণে শুয়ে পড়েন। এভাবেই কেটে গেছে তার জীবনের কয়েকটি বছর।

সোমবার সকাল। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। স্টেশনের গোলচত্বরে বসে আছেন হাজেরা বিবি। অন্য দিনের মতো মানুষের দিকে তাকিয়ে নেই তিনি। মুখটা মলিন, চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত। কাছে গিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করা হলো, “কেমন আছেন?”

এই একটি প্রশ্ন যেন তার বুকের জমে থাকা সব কষ্ট ভেঙে দিল। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন তিনি।

কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, “বাবা, কয়দিন হলো ডান পায়ের গোড়ালিতে বড় ঘা হয়েছে। এখন পা পচে যাচ্ছে। ফুসকুড়ি, পুঁজ, মাছি পড়ে। টিস্যু দিয়ে ঢেকে রাখি, তবুও রক্ষা হয় না। ব্যথায় দাঁড়াতে পারি না। মানুষের কাছে হাত পাততেও যেতে পারি না। বৃষ্টি এলেও নড়তে পারি না। মনে হয় পা-টা বুঝি খসে পড়বে। এই পা দিয়ে আর কোনোদিন হাঁটতে পারব না বাবা…।”

কথাগুলো বলতে বলতে আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

একজন অসহায় মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা শুধু ক্ষুধা নয়, অসুস্থ হয়েও চিকিৎসা না পাওয়া। হাজেরা বিবির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। হয়তো সময়মতো চিকিৎসা পেলে আজ তার পা এতটা ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছাত না। কিন্তু চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সামর্থ্য নেই, হাসপাতালে যাওয়ার মতো মানুষও নেই পাশে। তাই প্রতিদিন ঘা আরও বড় হচ্ছে, সংক্রমণ বাড়ছে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে হয়তো একদিন তার পা কেটে ফেলতে হতে পারে।

তার কাঁপা হাতে কিছু টাকা তুলে দেওয়া হলো। কিন্তু সেই সামান্য অর্থ দিয়ে কি একটি মানুষের চিকিৎসা সম্ভব? কয়েকটি ওষুধ কেনা যেতে পারে, কিন্তু একটি জীবন কি এভাবে বাঁচানো যায়?

হাজেরা বিবির মতো মানুষ আমাদের সমাজে খুব বেশি নেই, কিন্তু একেবারেই নেই তাও নয়। তারা আমাদের চোখের সামনেই বেঁচে থাকেন, অথচ অদৃশ্য হয়ে যান আমাদের ব্যস্ততার ভিড়ে। আমরা হয়তো প্রতিদিন তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, কিন্তু তাদের কষ্টের গভীরতা অনুভব করার সময় হয় না।

আজ হাজেরা বিবির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একজন চিকিৎসক, একটি হাসপাতালের শয্যা, কিছু ওষুধ এবং কয়েকটি সহানুভূতির হাত। হয়তো কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি, কোনো সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী দল কিংবা সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে আবারও চিকিৎসা পেতে পারেন তিনি। হয়তো আবার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতে পারবেন।

একটি মানুষের জীবন বাঁচাতে সব সময় লাখ লাখ টাকা লাগে না। অনেক সময় লাগে শুধু একটু মানবতা, একটু দায়িত্ববোধ এবং পাশে দাঁড়ানোর আন্তরিক ইচ্ছা।

হাজেরা বিবি আজ কারও কাছে ভিক্ষা নয়, বেঁচে থাকার সুযোগ চাইছেন। তার চোখের জল যেন আমাদের বিবেককে একবার হলেও প্রশ্ন করে—একজন অসহায় বৃদ্ধা কি চিকিৎসার অভাবে এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে শেষ হয়ে যাবেন, নাকি আমরা সবাই মিলে তার জীবনে নতুন করে আশার আলো জ্বালাব?