খুঁজুন
, ,

কাকে ভোট দেবেন? ইসলামের চোখে ভোটার ও প্রার্থীর জবাবদিহি

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:৪৬ পূর্বাহ্ণ
কাকে ভোট দেবেন? ইসলামের চোখে ভোটার ও প্রার্থীর জবাবদিহি

ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট একটি আমানত, তা সঠিক ব্যক্তিকে দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব এবং ইসলামের নির্দেশ। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে ভোটের আমানত জলাঞ্জলি দেওয়া অনৈতিক ও দ্বিনি শিক্ষার পরিপন্থী। ভোটারের দ্বিনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতা না থাকলে দেশের অধঃপতন অনিবার্য। সমাজের বেশির ভাগ মানুষ ভোটকে নিছক পার্থিব বিষয় মনে করে, অথচ এটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত এবং প্রয়োগে পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন  আমানত তার হকদারকে প্রত্যর্পণ করতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে।’
(সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

ব্যক্তিস্বার্থে ভোট নয়

ভোটাধিকার প্রয়োগে যদি মানুষ ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে দেশ ও জাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। ভোটার যদি দেশ ও জাতির স্বার্থ বিবেচনা না করে ভোট দেয়, তবে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে সন্ত্রাস, মাদক, দুর্নীতি, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব কখনো দূর হবে না।

মানুষের জীবনযাত্রার মানও কখনো উন্নত হবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন আমানত বিনষ্ট হয় তখন তোমরা কিয়ামতের অপেক্ষা কোরো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৯৬)

ভোট বিক্রয়যোগ্য নয়

ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষরাই বেশি ভুল করে থাকে। অনেকেই এই সময়টাকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ মনে করে।

তারা সামান্য অর্থের বিনিময়ে এমন ব্যক্তি ও দলে ভিড়ে যায়, তাদের পক্ষে স্লোগান দেয় এবং মিছিল করে যাদের সে নিজেও অন্তর থেকে পছন্দ করে না। এমনকি এই ব্যক্তির সব দোষত্রুটি জানার পরও তার পক্ষে ভোট চায় এবং ভোট দেয়। ফকিহ আলেমরা বলেন, অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তি ও পাপিষ্ঠকে ভোট দেওয়া এক প্রকারের ঘুষ। এটা সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! জেনেশুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানত সম্পর্কেও বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২৭)

পক্ষ নেওয়ার আগে লক্ষ করুন

কোনো ব্যক্তির পক্ষে মিছিল করা, স্লোগান দেওয়া এবং তার পক্ষে ভোট চাওয়া এক প্রকারের সাক্ষ্য। কোনো প্রার্থীকে ভোট দেওয়াও সাক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত। আর মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া গুরুতর অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা বর্জন করো মূর্তি পূজার অপবিত্রতা এবং দূরে থাকো মিথ্যা কথা থেকে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা সাবধান হও মিথ্যা কথার ব্যাপারে এবং তোমরা সাবধান হও মিথ্যা সাক্ষ্যের ব্যাপারে (অর্থাৎ তোমরা পরিহার কোরো)।’

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৭৬)

প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, কাউকে ভোট দেওয়া এবং কারো পক্ষে প্রচারণা চালানো সুপারিশের মতো। আর সুপারিশ করার আগে ব্যক্তি তার যোগ্য কি না সেটাও বিবেচনা করা জরুরি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ কোনো ভালো কাজের সুপারিশ করলে তাতে তার অংশ থাকবে এবং কেউ কোনো মন্দ কাজের সুপারিশ করলে তাতে তার অংশ থাকবে। আল্লাহ সর্ববিষয়ে নজর রাখেন।’

(সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৫)

তাসফিরবিদরা বলেন, উত্তম সুপারিশ হলো যা যোগ্য ব্যক্তির জন্য করা হয় এবং মন্দ সুপারিশ হলো যা অযোগ্য ব্যক্তির জন্য করা হয়। এ জন্য আলেমরা বলেন, প্রার্থী নির্বাচনে জয় লাভ করবে কি না সে বিবেচনা না করে প্রার্থী যোগ্য কি না সেটা বিবেচনা করা উচিত। কেননা যোগ্য প্রর্থীকে ভোট দেওয়ার পর সে যদি পরাজিতও হয়, তবু উত্তম সুপারিশ করার সওয়াব পাওয়া যাবে। অন্যদিকে যারা অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেবে, সে অযোগ্য ব্যক্তিকে উকিল নিযুক্ত করার কারণে গুনাহগার হবে। অযোগ্য প্রার্থী কোনো অন্যায় করলে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করার জন্য ভোটারকেও দায় বহন করতে হবে।

প্রার্থীর দ্বিনদারিও বিবেচ্য বিষয়

প্রার্থী নির্বাচনে একজন মুসলমান প্রার্থীর বাহ্যিক যোগ্য ও দক্ষতার পাশাপাশি তার দেশপ্রেম, কল্যাণকামিতা, নীতি-নৈতিকতা ও দ্বিনদারির দিকগুলোও বিবেচনা করবে। যারা প্রকাশ্যে ইসলাম, ইসলামী শিক্ষা, দ্বিন, শরিয়ত, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলে প্রতি ধৃষ্টতা দেখায় তাদের ভোট দেওয়া উচিত নয়। দুই প্রার্থীর ভেতরে যে দ্বিনদারির ক্ষেত্রে অগ্রগামী মুসলমান তাকেই প্রাধান্য দেবে। যারা দেশদ্রোহী, যারা দেশবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত, যারা অন্যায় ও জুলুমের সঙ্গে জড়িত তাদেরও ভোট দেওয়া যাবে না। কোনো প্রার্থীই যদি যোগ্যতা, দ্বিনদারি ও দেশপ্রেমের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ না হয়, তবে ভোট দান থেকে বিরত থাকা যাবে, এমনকি না ভোটও দেওয়া যাবে।

প্রার্থী কারা হবে, কারা হবে না

যারা নির্বাচনে প্রার্থী হয় তারা মূলত পুরো জাতির সামনে দুটি বিষয়ের দাবি করে। এক. সে এই দায়িত্ব পালনের যোগ্য এবং এই দায়িত্ব পালনে আগ্রহী, দুই. সে এই দায়িত্ব যথাযথভাবে আমানতদারিতার সঙ্গে পালন করবে। এই দাবির ক্ষেত্রে সে যদি সত্যবাদী হয় তবে তো ভালো, কিন্তু বাস্তবতার আলোকে দাবি মিথ্যাও হতে পারে। তাই উত্তম হলো সমাজের একদল দ্বিনদার ও আল্লাহভীরু মানুষ সম্মিলিত পরামর্শের মাধ্যমে একজন যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা এবং তাকে নির্বাচন করতে অনুরোধ করা। কেননা আল্লাহ না করুন সে যদি নিজেই প্রার্থী হয় এবং নিজেকে যোগ্য ঘোষণা করে আর পরে সে ব্যর্থ হয়, দুর্নীতি করে, তবে সে আল্লাহর দরবারে খিয়ানতকারী হিসেবেই বিবেচিত হবে। মানুষের অধিকার নষ্ট করার কারণে তাকে জাহান্নামে যেতে হতে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রার্থিতা কোনো সাধারণ বিষয় নয়, এটা হলো অসংখ্য ও অগণিত মানুষের দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে নেওয়া। যার ভেতর এই দায়িত্ব পালনের সৎ সাহস নেই, তার উচিত নয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া। আবদুর রহমান ইবনে সামুরা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেন, হে আবদুর রহমান, তুমি কখনো নেতৃত্ব চেয়ে নিয়ো না। কেননা তুমি যদি চেয়ে নিয়ে তা লাভ করো, তাহলে তোমাকে ওই দায়িত্বের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে (তুমি দায়িত্ব পালনে হিমশিম খাবে, কিন্তু কোনো সহযোগিতা পাবে না)। আর না চাইতেই যদি তা পাও তাহলে তুমি সে জন্য সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৪৭)

প্রার্থীদের আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। তা হলো তিনি একজন জনপ্রতিনিধি। আর প্রতিনিধির আরবি হলো উকিল। জনগণ ভোট প্রদানের মাধ্যমে প্রার্থীকে নিজের এবং এলাকার উকিল বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন। আর প্রতিনিধির দায়িত্ব হলো তার মক্কেল বা নিযুক্তকারীর প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করা, তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করা এবং মক্কেলের স্বার্থ রক্ষা করা। এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারী হওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

ভোট দেওয়া দ্বিনি দায়িত্ব

ওপরের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো ভোট সাক্ষ্য, ভোট আমানত, ভোট সুপারিশ এবং ভোট উকিল নিযুক্ত করার মাধ্যম। শরিয়তের দৃষ্টিতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে, আমানত নষ্ট করলে, মন্দ সুপারিশ করলে এবং অযোগ্য উকিল নিযুক্ত করলে যেমন গুনাহ হয়, তেমনি সত্য সাক্ষ্য দেওয়া, আমানত আদায় করলে, উত্তম সুপারিশ করলে এবং যোগ্য ব্যক্তিকে উকিল নিযুক্ত করলে অনেক সওয়াব পাওয়া যায়। আল্লাহ মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষের পরিচয় তুলে ধরে বলেন, ‘তবে যারা সত্য উপলব্ধি করে তার সাক্ষ্য দেয়, তারা ছাড়া।’ (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৮৬)

অনেক দ্বিনদার ব্যক্তি ভোট দেওয়াকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন, কিন্তু গবেষক আলেমরা বলেন, ভোট দেওয়া একটি নৈতিক ও দ্বিনি দায়িত্ব। কেননা কোনো দ্বিনদার ব্যক্তি যদি ভোট দান থেকে বিরত থাকেন, তবে একজন যোগ্য প্রার্থীই ভোটপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন এবং দুর্নীতিবাজদের পাল্লা ভারী হয়। এ বিষয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশনা হলো, ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন কোরো না, যে কেউ তা গোপন করে অবশ্যই তার অন্তর পাপী। তোমরা যা করো আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৩)

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

ফরিদপুরের সালথায় পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষোভে পানিতে ফেলে দিচ্ছেন কৃষক

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬, ১:৪৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের সালথায় পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষোভে পানিতে ফেলে দিচ্ছেন কৃষক

দেশের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল ফরিদপুরের সালথায় ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় অনেকেই ক্ষোভ, হতাশা ও অসহায়ত্ব থেকে খাল, পুকুর ও ডোবার পানিতে পেঁয়াজ ফেলে দিচ্ছেন। মাঠে ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদিত ফসলের এমন পরিণতি স্থানীয়দেরও ব্যথিত করেছে।

সম্প্রতি সালথা উপজেলার খোয়াড় গ্রামের একটি ডোবার পানিতে কৃষকদের পেঁয়াজ ফেলে দিতে দেখা যায়। এ দৃশ্য স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। কৃষকদের ভাষ্য, বাজারে বর্তমান দামে পেঁয়াজ বিক্রি করার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ফেলে দেওয়াই যেন কম কষ্টের।

পেঁয়াজ চাষি দাউদ মাতুব্বর বলেন, “বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদন করতে সার, বীজ, সেচ, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এরপর মৌসুম শেষে ঘরের চাঙ বা মাচায় সংরক্ষণ করতে হয়। পাঁচ-ছয় মাস পর সংরক্ষণের কারণে ওজন কমে এক মণ পেঁয়াজ প্রায় ৩০ কেজিতে নেমে আসে। সব মিলিয়ে লোকসান ছাড়া কিছুই থাকছে না।”

একই গ্রামের কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, “কৃষকের এমন দুর্দশা দেখেও সরকারের তেমন কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে একসময় মানুষ চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।”

শুধু সালথা নয়, জেলার নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরাও একই সংকটে রয়েছেন। উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে দাম না থাকায় অধিকাংশ কৃষক লোকসান গুনছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। এখন সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সালথার কৃষক আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, “এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয়। এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর পেঁয়াজ চাষ করবো কি না, সেটাই ভাবছি।”

পাইকারি ব্যবসায়ীরাও বলছেন, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে গেছে। ফরিদপুর শহরের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহজাহান বেপারি বলেন, “এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকেও প্রচুর পেঁয়াজ বাজারে আসছে। ফলে দাম কমেছে। তবে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবের কারণে প্রতিবছরই পেঁয়াজের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। দাম বাড়লে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর দাম কমে গেলে সর্বস্ব হারান কৃষকরা। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করেন কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ফেলে দেন।

এ বিষয়ে সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “চলতি মৌসুমে সালথা উপজেলায় পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর। তবে কৃষকদের আগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এ বছর উপজেলায় মোট প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের গড়ে প্রায় ২৪ টাকা খরচ হয়, অর্থাৎ প্রতি মণের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৯৬০ টাকা।”

তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। কৃষকদের সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাজারমূল্য নির্ধারণ কৃষি বিভাগের হাতে নেই।”

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “পেঁয়াজের দাম না থাকায় কৃষক কষ্টে আছেন, এটি সত্য। তারা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না বলে অবগত হয়েছি। বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ের হলেও আমি ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও মাননীয় পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি তুলে ধরব, যাতে কৃষকদের স্বার্থে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়।”

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তা দিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে ৭০০টি বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে পেঁয়াজ সংগ্রহ, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ধীরে ধীরে পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে যাবেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের কৃষি অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।

ডিগ্রির পরীক্ষার আগেই কফিনে ফিরল সুমন, কৃষক বাবার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার

নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬, ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ
ডিগ্রির পরীক্ষার আগেই কফিনে ফিরল সুমন, কৃষক বাবার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার

“আমার তিন বছরের ছোট ভাইটা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। অথচ আজ আমার বৃদ্ধ বাবাকে নিজের সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে হবে। এর চেয়ে কষ্টের দৃশ্য আর কী হতে পারে! ভাইয়ের ডিগ্রি পরীক্ষা দেওয়া আর হলো না। বাবা একজন কৃষক, কত কষ্ট করে আমাদের লেখাপড়া করিয়েছেন। আমার ভাইটার সব স্বপ্ন শেষ করে দিল ওরা।”

কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় বারবার ভেঙে পড়ছিলেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় নিহত কলেজছাত্র সুমন শেখের বড় বোন সরজনা। কখনো মাটিতে বসে পড়ছেন, কখনো স্বজনদের জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছেন। তাঁর আহাজারিতে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ পূর্বপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। উঠানজুড়ে স্বজন, প্রতিবেশী ও বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসা মানুষের ভিড়। কেউ শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ নীরবে চোখের জল মুছছেন। পুরো বাড়িজুড়ে শুধু কান্না আর আহাজারির শব্দ।

এর আগে শুক্রবার (২৬ জুন) সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলে যাওয়ার পথে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় কাশিয়ানী এম.এ. খালেক ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমন শেখকে (২৪)। পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের পূর্বশত্রুতার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।

নিহতের মা শেফালী বেগম ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে বারবার বিলাপ করছিলেন। শোকে তিনি কয়েক দফা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁর আর্তনাদ, “আমার সুমনকে ফিরিয়ে দাও। আমার ছোট ছেলেটাকে আমি আর একবার দেখতে চাই”—উপস্থিত সবার হৃদয় ভারাক্রান্ত করে তোলে।

অন্যদিকে সত্তরোর্ধ্ব বাবা শেখ আলাউদ্দিন, যিনি একজন সাধারণ কৃষক, ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই মানুষটি শুধু একবার ছেলের নাম ধরে ডাকছেন, আবার নির্বাক হয়ে বসে থাকছেন। স্বজনরা তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করলেও তিনি বারবার বলছিলেন, “আমার সুমন কোথায়?”

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শেখ আলাউদ্দিন অভাব-অনটনের মধ্যেও দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছেন। সুমন ছিল পরিবারের সবচেয়ে ছোট এবং সবার আদরের সন্তান। উচ্চশিক্ষা নিয়ে পরিবারের হাল ধরার স্বপ্ন ছিল তার। সামনে ডিগ্রি প্রথম বর্ষের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষার ফরমও পূরণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষার হলে বসার আগেই তাকে চলে যেতে হলো চিরবিদায়ের পথে।

ছোট বোন সরজনা বলেন, “আমার ভাই কারও ক্ষতি করেনি। সে শুধু পড়াশোনা করত। বাবা কৃষক হলেও আমাদের শিক্ষিত করতে জীবনের সব কষ্ট সহ্য করেছেন। ভাইটাও বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন নির্মমভাবে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা শুধু এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।”

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, সুমন শান্ত, ভদ্র ও মিশুক স্বভাবের ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের কাজেও সহযোগিতা করতেন। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না গ্রামের কেউ।

নিহতের মরদেহ শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নিজ গ্রাম বড়ভাগে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পরে স্থানীয় বড়ভাগ ঈদগাহ ময়দানে বাদ মাগরিব জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। শেষবারের মতো প্রিয় মুখটি দেখতে সকাল থেকেই গ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন তাঁর বাড়িতে।

একদিকে উঠানে পড়ে আছে সুমনের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, অন্যদিকে ঘরের ভেতরে বুক চাপড়ে কাঁদছেন মা। বৃদ্ধ বাবা নির্বাক, ভাই-বোনেরা শোকে স্তব্ধ। যে ঘরে কয়েকদিন আগেও ডিগ্রি পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল, সেই ঘরেই আজ শুধু কান্নার প্রতিধ্বনি। এক কৃষক পরিবারের বহু বছরের স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।

স্বজনদের একটাই দাবি—সুমন হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে আর কোনো কৃষক বাবাকে এভাবে সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে না হয়।

দিনের বেলা কত মিনিট ঘুমানো সবচেয়ে ভালো? এক পলকে দেখে নিন

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
দিনের বেলা কত মিনিট ঘুমানো সবচেয়ে ভালো? এক পলকে দেখে নিন

ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে দুপুরের দিকে একটু ঘুমিয়ে নেওয়া বা ‘পাওয়ার ন্যাপ’ আমাদের অনেকেরই অভ্যাস। গবেষকরা বলছেন, দিনের বেলার এই ছোট্ট ঘুম আমাদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং বার্ধক্যজনিত ক্ষয় রোধে অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে। তবে এই ঘুমের সুফল পেতে হলে এর সঠিক সময়সীমা জানা জরুরি।

গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের বেলা মাত্র ১০ মিনিটের একটি ন্যাপ আমাদের সতর্কতা এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি কার্যকর। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ১০ থেকে ৬০ মিনিটের ছোট ঘুম দ্রুত মেজাজ ভালো করতে এবং ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়া ২০২১ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, ছোট ন্যাপ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং শারীরিক সক্ষমতা উন্নত করতেও ভূমিকা রাখে।

কেন দীর্ঘ সময় ঘুমানো ক্ষতিকর?

দিনের বেলা বেশিক্ষণ ঘুমানো স্বাস্থ্যের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। অধিকাংশ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৩০ মিনিটের কম সময় ঘুমানো সবচেয়ে বেশি উপকারী। এর কারণ হলো:

স্লিপ ইনারশিয়া: ৩০ মিনিটের বেশি ঘুমালে শরীর গভীর ঘুমের স্তরে চলে যেতে পারে। এর ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর এক ধরণের জড়তা, অস্বস্তি বা মাথা ঘোরার অনুভূতি হয়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্লিপ ইনারশিয়া’ বলা হয়।

রাতের ঘুমের ব্যাঘাত: বিশেষজ্ঞ ড. ইশান ঝু-এর মতে, দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমানো অনেকটা ‘রাতের খাবারের আগে কেক খাওয়ার মতো।’ এটি রাতের স্বাভাবিক ঘুমের চাহিদা কমিয়ে দেয় এবং অনিদ্রার কারণ হতে পারে। তিনি পরামর্শ দেন যে, দিনের বেলা ন্যাপ যেন কোনোভাবেই ৪০ মিনিটের বেশি না হয়।

অতিরিক্ত ঘুমের স্বাস্থ্যঝুঁকি

দিনের বেলা ৬০ মিনিটের বেশি সময় ঘুমানো স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় দিনের বেলা ঘুমানোর ফলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

মস্তিষ্কের বয়স কমাতে ন্যাপ

একটি গবেষণায় ৩৫,০৮০ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, যারা নিয়মিত অল্প সময় ঘুমান তাদের মস্তিষ্কের আয়তন বা ভলিউম বেশি থাকে। নিয়মিত ন্যাপ নেওয়া ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের বয়স, ন্যাপ না নেওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ২.৬ থেকে ৬.৫ বছর কম বলে প্রতীয়মান হয়। আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়, আর দিনের বেলার পরিমিত ঘুম এই প্রক্রিয়াকে ধীর করতে সাহায্য করে।

কিছু জরুরি টিপস

দিনের বেলার ঘুমকে আরও কার্যকর করতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে পারেন:

অ্যালার্ম সেট করুন: দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে পড়া এড়াতে অবশ্যই অ্যালার্ম ব্যবহার করুন।

হাঁটাচলা করুন: যদি ক্লান্তি বোধ করেন কিন্তু রাতে ভালো ঘুম না হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে ঘুমানোর বদলে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি বা শারীরিক পরিশ্রম করতে পারেন। অনেক সময় কেবল অবসাদ বা পুষ্টির অভাবেও ক্লান্তি লাগে, সেক্ষেত্রে ঘুমানোর চেয়ে সক্রিয় থাকা বেশি উপকারী।

সূত্র : কালবেলা