স্বামী-স্ত্রীর যেসব ভুল সংসারে অশান্তি ডেকে আনে? জেনে নিন এক পলকে
একটি সুখী সংসার ভালোবাসা, বিশ্বাস, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং মানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। কিন্তু কখনো কখনো স্বামী-স্ত্রীর অতিরিক্ত সন্দেহ, অযথা রাগ-অভিমান, সকল বিষয়ে হস্তক্ষেপ, একে-অপরের পরিবারকে অবজ্ঞা, অতিরিক্ত চাহিদা এবং স্বামীর প্রতি অসম্মানের কারণে ধীরে ধীরে দাম্পত্যের শান্তি নষ্ট হতে থাকে।
শুরুতে ছোট মনে হওয়া এসব আচরণ একসময় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দূরত্ব তৈরি করে এবং এর প্রভাব পড়ে উভয়ের পুরো পরিবারের ওপরও। নিম্নে তার কারণগুলো বর্ণনা করা হল।
১.অতিরিক্ত সন্দেহ করা: স্বামীকে অকারণে সন্দেহ করা এবং তার প্রতিটি কাজে কৈফিয়ত চাওয়া, প্রত্যেকটা কাজে নেতিবাচক অর্থ খোঁজা দাম্পত্যজীবনে অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হলে যত্নে গড়া সম্পর্কেও ধীরে ধীরে দূরত্ব হয়। দুজনের ভালোবাসাও ফিকে হয়ে যায়। ইসলামও অমূলক সন্দেহ থেকে সতর্ক করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয়ই কোনো কোনো ধারণা পাপ। (সুরা হুজুরাত: ১২)
২.সব বিষয়ে ঝগড়া করা: ছোটখাটো বিষয়েও অতিরিক্ত উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়লে সংসারের স্বাভাবিক শান্তি নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিটি সমস্যার সমাধান ঝগড়ার মাধ্যমে করতে গেলে একসময় উভয়ের মধ্যেই বিরক্তি চলে আসে। এমনকি রাগের মাথায় মানুষ এমনও কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, যা পরবর্তীতে অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ রাসুল সা. রাগ সংবরণ করতে সবসময় গুরুত্ব দিয়ে বলতেন, শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সেই সবচেয়ে শক্তিশালী, যে রাগের সময়ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (বুখারি: ৬১১৪)
এক্ষেত্রে হযরত আবু দারদা রা. একটি চমৎকার কাজ করতেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলেন, আমি রাগ করলে তুমি আমাকে শান্ত করবে, আর তুমি রাগ করলে আমি তোমাকে শান্ত করব।
৩.স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারের দেখভাল না করা: সংসার একটি যৌথ দায়িত্ব। দুজনের যত্নেই গড়ে ওঠে একটি সুখময় দাম্পত্যজীবন। কিন্তু কখনো স্বামীর অনুপস্থিতিতে স্ত্রী যদি সংসারের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতে দায়িত্বশীল না হন, তাহলে সংসারে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। ইসলামও নারীর পারিবারিক দায়িত্বের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। রাসুল সা. বলেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। অর্থাৎ, স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের দায়িত্বশীল। সে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। (বুখারি: ২৫৮৮)
৪.পরপুরুষ বা পরনারীর সাথে মেলামেশা: অপরিচিত মানুষের সঙ্গে প্রয়োজনে স্বাভাবিক কথাবার্তা আর অনুচিত ঘনিষ্ঠতা এক নয়। দাম্পত্যের সীমারেখা অতিক্রম করে স্ত্রী পরপুরুষের সাথে ঘনিষ্ঠ হলে একদিকে যেমন আল্লাহ তায়ালার সাথে নাফরমানি, অন্যদিকে তেমনি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বিশ্বাস ও দাম্পত্যজীবনে দুজনেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। (সুরা আন নূর: ৩১) একই হুকুম পুরুষদের ক্ষেত্রেও।
৫.স্বামীর পরিবারকে অসম্মান করা: স্বামীর পরিবারের প্রতি অকারণে অসম্মানজনক আচরণ দাম্পত্যে চাপ তৈরি হতে পারে। আবার পরিবারের কারো সঙ্গে মতবিরোধ হলে তা সমাধানের পরিবর্তে স্বামীর কাছে কান ভারী করা দাম্পত্যে কলহ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। মতপার্থক্য থাকতেই পারে; তবে তা শালীনতা ও ধৈর্যের সাথে সমাধান করা জরুরি। এর থেকে বেঁচে থাকার অন্যতম উপায় হল, পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রেখে কথা বলা। আল্লাহ তায়ালা তাই বলেন, তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বল। (সুরা বাকারা: ৮৩)
৬.অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ: স্বামীর ব্যক্তিগত বিষয়, কাজ কিংবা প্রতিটি সিদ্ধান্তে অযাচিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা একসময় সম্পর্ককে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে। এতে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একে অপরের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সংসারে পরামর্শ ও মতামত থাকবেই; বরং দাম্পত্যজীবন সুন্দর করতে দুজনেরই আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা উচিত। তবে সেই সঙ্গে একে-অপরের ব্যক্তিস্বাধীনতা, পছন্দ ও সম্মানের জায়গাটিও বজায় রাখা প্রয়োজন।
৭.অন্যের সঙ্গে তুলনা করা: অমুকের স্বামী এমন, অমুকের সংসার এতকিছু, অমুকের স্বামী তাকে এত ভালো রাখে—এভাবে অন্যের সঙ্গে নিজের স্বামী ও সংসারের তুলনা করলে স্বামীর মনে কষ্ট ও অপূর্ণতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এতে স্বামীর আত্মবিশ্বাস ও কর্মস্পৃহায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কর্মের গতিও কমে যেতে পারে। সারাদিন বাইরে কাজকর্ম করে স্বামী যখন একটুখানি মানসিক শান্তির জন্য ঘরে ফেরে, তখন এসব কথায় ঘরেও তার মন বসে না। এর ফলে স্বামী একসময় অন্যদিকে ঝুঁকেও যেতে পারে। তাই প্রয়োজন, স্বামীর উপার্জন ও পরিশ্রমের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং তাকে গুরুত্ব দেওয়া। তাহলেই সংসার সুখের হয়ে উঠবে। রাসুল সা. বলেন, তোমাদের কারো যদি এমন লোকের উ
ওপর নজর পড়ে, যাকে মাল-ধন ও দৈহিক গঠনে অধিক মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তবে সে যেন এমন লোকের দিকে নজর দেওয়া, যে তার চেয়ে নিম্ন স্তরে রয়েছে। (বুখারি: ৬৪৯০)
৮.দাম্পত্যের ব্যক্তিগত বিষয় বাইরে প্রকাশ করা: স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পোশাকস্বরূপ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তারা তোমাদের পোশাক, তোমরা তাদের পোশাক। (সুরা বাকারা: ১৮৭) অর্থাৎ উভয়ে উভয়ের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখবে। কিন্তু দাম্পত্যের ব্যক্তিগত সমস্যা বা ঝগড়া বন্ধু, আত্মীয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে তিনটি ক্ষতি হয়। এক. গোপনীয়তা নষ্ট হয়। দুই. নিজেদের মান-সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়। তিন. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্কে ফাটল ধরে। রাসুল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের দোষ গোপন রাখে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন, ( মুসলিম: ২৫৯০)। প্রয়োজন হলে সংসারের জটিল সমস্যা হলে বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ কোনো আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। তবে নিজেদের গোপনীয় বিষয়গুলো সকলের আলোচ্য বিষয় বানানো কখনোই উচিত নয়।
৯.ক্ষমা না করা: সংসারে মনোমালিন্য হতেই পারে। দুজনের মাঝে অতীতের ভুল-ত্রুটি থাকাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু ঝগড়া হলেই পেছনের গল্প টেনে আনা, এটা কোনো সচেতন ব্যক্তির কাজ নয়। পুরোনো ভুলগুলো সমাধানের পরও সেগুলো দিয়ে বারবার খোঁটা দিলে সম্পর্কের মধ্যে নীরব তিক্ততা তৈরি হয় এবং ক্ষতকে আরও গভীর করে তোলে। রাসুল সা. বলেন, যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন। (মুসলিম: ২৫৮৮)
১০.দায়িত্বহীনতা: সংসার একটি আমানত। এই আমানতের অবহেলা করলে অশান্তি আসবেই। স্বামীর কষ্টে উপার্জিত টাকা হিসাব-নিকাশ ছাড়া খরচ করা, পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় ও পরিকল্পনার ব্যাপারে বেখেয়াল থাকা, সন্তান ও ঘরের কাজে উদাসীনতা— এসব দায়িত্বহীনতার কারণে দাম্পত্যে অসন্তোষ ও আর্থিক সমস্যা তৈরি হয়। পারিবারিক বিষয় স্বামীর পাশাপাশি স্ত্রীরও পরামর্শ ও দায়িত্বশীল মনমানসিকতা থাকা জরুরি। রাসুল সা. বলেন, স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের দায়িত্বশীল। কিয়ামতের দিন তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে। (বুখারি: ২৫৫৮)
১১.কথা না বলে অভিমান জমিয়ে রাখা: ঝগড়া হলে ভুলে বোঝাবুঝি ভুলে যাওয়া, সমস্যা হলে তা নিয়ে আলোচনা করে সমাধান করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু অনেক সময় রাগ-অভিমান করে কথা না বলে নীরবতা অবলম্বন করা হয়। এই অভিমান দীর্ঘদিন মনের মধ্যে পুষে রাখলে তা পাহাড় সমান হয়। এতে সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব বাড়ে। ভালোবাসা কমে যায়। আর এভাবে কোনো সম্পর্কও টেকসই হয় না।
এজন্য শান্ত পরিবেশে নিজের সুবিধা-অসুবিধার কথা স্পষ্ট করে বললে অনেক ভুল বুঝাবুঝিই দূর হয়ে যায়। রাসুল সা. বলেন, কোনো মুসলমানের জন্য তার ভাইয়ের (অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রীসহ যেকোনো মুসলিম) সাথে তিন দিনের বেশি কথাবার্তা বন্ধ রাখা বৈধ নয়। তাদের সাক্ষাৎ হয়, তখন সে এদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং সে ওদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর তাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে প্রথমে সালাম দিয়ে কথা শুরু করে। (বুখারি: ৬০৭৭)
মনে রাখা জরুরি- একটি সুখী সংসার গড়তে স্ত্রীর পাশাপাশি স্বামীকেও দায়িত্বশীল, ক্ষমাশীল ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। ভুল-ত্রুটি হলে তা নিয়ে ঝগড়া না করে বোঝাপড়া ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করাই উত্তম। আল্লাহ তায়ালা সকলের দাম্পত্যকে ভালোবাসা, শান্তি ও বরকতে ভরে দিন। আমিন।
সূত্র : এনপিবি নিউজ

আপনার মতামত লিখুন
Array