খুঁজুন
, ,

আপনার টাকা-পয়সা বাড়াতে চান? এই ৫ বই অবশ্যই পড়ুন

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬, ৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ
আপনার টাকা-পয়সা বাড়াতে চান? এই ৫ বই অবশ্যই পড়ুন

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের ডিগ্রি অর্জন করতে শেখায়, ভালো ফলের উপায় বাতলে দেয় এবং একটি ভালো চাকরির জন্য প্রস্তুত করে। কিন্তু জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘অর্থ বা টাকা কীভাবে কাজ করে’, তা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব কমই দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। ফলে সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ঋণ কিংবা চক্রবৃদ্ধি হারের মতো জরুরি বিষয়গুলো আমাদের কাছে অজানাই থেকে যায় এবং অনেকেই ভুল পরামর্শ বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আর্থিক শিক্ষা নিতে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হন।

তবে বিশেষজ্ঞ ও সফল ব্যক্তিদের মতে, আর্থিক সমৃদ্ধি কোনো জাদুকরী বিষয় নয়, বরং এটি সঠিক পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলার ফসল। আপনি যদি আপনার টাকা-পয়সা বাড়াতে এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হতে চান, তবে কিছু কালজয়ী বই আপনার চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। এই বইগুলো আপনাকে রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখাবে না, বরং ধীরস্থির এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্পদ বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদী পথ দেখাবে।

টাকা-পয়সা বাড়াতে এবং আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করতে যে ৫টি বই অবশ্যই পড়া উচিত, সেগুলো হলো:

১. রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড (রবার্ট কিয়োসাকি)

অর্থনীতি নিয়ে মানুষের পড়া প্রথম বইগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এই বইটি শেয়ার বাজারের টিপস বা ট্যাক্সের নিয়ম নিয়ে নয়, বরং আপনার মানসিকতা নিয়ে কথা বলে। লেখক এখানে তার দুই বাবার উদাহরণ দিয়েছেন—একজন উচ্চশিক্ষিত হয়েও আর্থিক সংকটে ভুগতেন, অন্যজন ব্যবসায়ী হয়েও সম্পদের পাহাড় গড়েছিলেন। এই বইয়ের মূল শিক্ষা হলো, সম্পদ (Assets) আপনার পকেটে টাকা আনে, আর দায় (Liabilities) আপনার পকেট থেকে টাকা বের করে নেয়। গাড়ি বা দামি বাড়ি কেনার আগে সেগুলো সম্পদ নাকি দায়, তা বুঝতে এই বইটি সাহায্য করবে।

২. দ্য সাইকোলজি অব মানি (মরগান হাউসেল)

টাকা মানেই কেবল গণিত বা জটিল ফর্মুলা নয়; এর সাথে জড়িয়ে থাকে মানুষের আবেগ, ভয়, অহংকার এবং ধৈর্য। এই বইটিতে ছোট ছোট গল্পের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে কেন বুদ্ধিমান ব্যক্তিরাও মাঝে মাঝে ভুল আর্থিক সিদ্ধান্ত নেন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতি-বুদ্ধিমান হওয়ার চেয়ে ধৈর্যশীল হওয়া যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা এখানে চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। অন্যের সাথে নিজের আর্থিক অবস্থার তুলনা করা যে দরিদ্র বোধ করার দ্রুততম উপায়, লেখক সেই সত্যটিও তুলে ধরেছেন।

৩. দ্য ইন্টেলিজেন্ট ইনভেস্টর (বেঞ্জামিন গ্রাহাম)

ওয়ারেন বাফেট এই বইটিকে ‘বিনিয়োগের ওপর লেখা সর্বশ্রেষ্ঠ বই’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এটি হয়তো খুব সহজপাঠ্য কোনো বই নয়, তবে বিনিয়োগের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে এর বিকল্প নেই। লেখক এখানে লটারি ধরার মতো অনুমাননির্ভর বিনিয়োগ না করে ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে বিনিয়োগ করার শিক্ষা দিয়েছেন। ‘মার্জিন অব সেফটি’ বা নিরাপত্তার মার্জিন রেখে বিনিয়োগ করা এবং বাজারের সাময়িক উত্থান-পতনে বিচলিত না হওয়ার কৌশল এই বইয়ের মূল উপজীব্য।

৪. আই উইল টিচ ইউ টু বি রিচ (রামিত শেঠি)

এটি দৈনন্দিন আর্থিক জীবন গুছিয়ে নেওয়ার একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত বই। লেখক সঞ্চয়, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার, অটোমেশন এবং বিনিয়োগের সহজ উপায় বাতলে দিয়েছেন। এই বইয়ের বিশেষত্ব হলো, এটি আপনাকে শখের কাজে খরচ করতে মানা করে না, বরং মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক রেখে কীভাবে অপরাধবোধ ছাড়া খরচ করা যায় তা শেখায়। যারা একটি সুশৃঙ্খল এবং সাধারণ জীবনযাপন করেও সম্পদ বাড়াতে চান, তাদের জন্য এটি আদর্শ।

৫. থিঙ্ক অ্যান্ড গ্রো রিচ (নেপোলিয়ন হিল)

সম্পদ তৈরির যাত্রা শুরু হয় আপনার চিন্তা থেকে। লেখক কয়েকশ সফল ব্যক্তির জীবন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, বিশ্বাস, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাস কীভাবে মানুষকে সফল করে তোলে। যদি ভয় বা অনিশ্চয়তা আপনাকে বিনিয়োগ বা নতুন কিছু করা থেকে পিছিয়ে রাখে, তবে এই বইটি আপনার মনে সাহস জোগাবে। সম্পদ অর্জনের জন্য কেবল টাকাই যথেষ্ট নয়, বরং একটি সঠিক মানসিক গঠন প্রয়োজন।

উপসংহার

কেবল বই পড়লেই কেউ জাদুকরীভাবে ধনী হয়ে যায় না। তবে এই বইগুলো আপনার মনের ভয় কমাবে, ভুল করার প্রবণতা কমাবে এবং আপনার অভ্যাস পরিবর্তন করতে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন, অর্থ বৃদ্ধি কোনো একক দিনের মেধা নয়, বরং এটি ধৈর্য এবং শৃঙ্খলার দীর্ঘমেয়াদী ফল। আজই এর মধ্য থেকে যেকোনো একটি বই দিয়ে শুরু করুন!

তথ্যসূত্রটাইমস অব ইন্ডিয়া

ফরিদপুরে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৩:১৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ

কঠিন বিষয় সমূহের ফলাফলে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনার দাবিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে  ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

প্রশ্নপত্রের কঠিনতা কমানো, মানবিকভাবে খাতা মূল্যায়ন, কঠিন বিষয়ে ফলাফলে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও উত্থাপন করেন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, তাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তারা দাবি করেন, বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারছে না। এছাড়া চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে পরীক্ষা আয়োজন বাস্তবসম্মত নয় বলেও তারা মন্তব্য করেন।

কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন শর্মিষ্ঠা কর্মকার, তাজুল ইসলাম তুহিন, জুনায়েদ আহমেদ, মোহাম্মদ রকিব, সাইমা আক্তার, মেধা আক্তার প্রমুখ।

পরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও স্লোগান দেন। এতে কিছু সময়ের জন্য প্রেসক্লাবসংলগ্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। কর্মসূচি থেকে বুধবার দুপুর ১টায় একই স্থানে আবারও বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়।

বন্যার পানিতে যে ১০ ভুল কখনো করবেন না?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ
বন্যার পানিতে যে ১০ ভুল কখনো করবেন না?

টানা বর্ষণ, উজানের ঢল কিংবা আকস্মিক বন্যা যেকোনো সময় স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। অনেক সময় বন্যার চেয়ে মানুষের অসতর্কতাই বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, পানিবাহিত রোগ, সাপের কামড় কিংবা দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বহু মানুষ প্রাণ হারান বা আহত হন। তাই বন্যার সময় কিছু ভুল এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী, বন্যার পানিতে নিচের ১০টি ভুল কখনোই করা উচিত নয়।

১. অপ্রয়োজনে বন্যার পানিতে নামবেন না

বন্যার পানি দেখতে শান্ত মনে হলেও এর নিচে থাকতে পারে খোলা ম্যানহোল, গর্ত, ভাঙা রাস্তা, ধারালো বস্তু কিংবা বৈদ্যুতিক তার। তাই প্রয়োজন ছাড়া পানিতে নামা ঝুঁকিপূর্ণ। যদি নামতেই হয়, তাহলে লাঠি দিয়ে সামনে পরীক্ষা করে ধীরে ধীরে এগোন এবং সম্ভব হলে শক্ত জুতা বা বুট ব্যবহার করুন।

২. পানিতে দাঁড়িয়ে বৈদ্যুতিক সুইচ বা যন্ত্র স্পর্শ করবেন না

বন্যার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। পানিতে দাঁড়িয়ে কখনো সুইচ অন বা অফ করবেন না। ভেজা হাতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রও ধরবেন না। সন্দেহ হলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে প্রবেশ থেকে বিরত থাকুন।

৩. বন্যার পানি পান বা রান্নায় ব্যবহার করবেন না

বন্যার পানিতে নর্দমার বর্জ্য, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, রাসায়নিক পদার্থ ও বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু মিশে থাকতে পারে। শুধু ফুটানো, বিশুদ্ধ বা বোতলজাত পানি পান করুন। প্রয়োজনে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করুন।

৪. খালি পায়ে পানিতে হাঁটবেন না

অনেকেই খালি পায়ে পানি মাড়িয়ে চলাফেরা করেন। এতে পায়ে কাটা, সংক্রমণ, এমনকি সাপ বা বিষাক্ত প্রাণীর আক্রমণের ঝুঁকি থাকে। রাবারের বুট বা শক্ত স্যান্ডেল ব্যবহার করাই নিরাপদ।

৫. বন্যার পানির সংস্পর্শে আসা খাবার খাবেন না

পানিতে ভিজে যাওয়া বা দূষিত খাবার খেলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগ হতে পারে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্রিজের নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকা খাবারও খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

৬. শিশুদের একা পানির কাছে যেতে দেবেন না

বন্যার সময় শিশুরা পানিতে খেলতে আগ্রহী হয়। কিন্তু অল্প গভীর পানিতেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শিশুদের সবসময় বড়দের নজরদারিতে রাখুন এবং তাদের বন্যার পানিতে খেলতে নিরুৎসাহিত করুন।

৭. সাপ বা অচেনা প্রাণী দেখলে ধরার চেষ্টা করবেন না

বন্যার সময় সাপ, গুইসাপসহ বিভিন্ন প্রাণী আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের বসতবাড়িতে চলে আসে। সাপ দেখলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। নিজে ধরতে না গিয়ে স্থানীয় উদ্ধারকর্মী বা বন বিভাগের সহায়তা নিন।

৮. বন্যার পানিতে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানোর ঝুঁকি নেবেন না

অনেক সময় পানির গভীরতা বোঝা যায় না। এতে গাড়ি আটকে যেতে পারে বা স্রোতে ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, রাস্তার অবস্থা নিশ্চিত না হলে পানির মধ্যে দিয়ে যানবাহন চালানো উচিত নয়।

৯. প্রশাসনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করবেন না

অনেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়ি ছাড়তে চান না। এতে বিপদের মাত্রা বেড়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসন, আবহাওয়া অধিদপ্তর বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

১০. পানি নেমে গেলেই ঘরে ঢুকে পড়বেন না

বন্যার পানি সরে গেলেও ঝুঁকি শেষ হয় না। ভেজা বৈদ্যুতিক সংযোগ, দুর্বল দেয়াল, গ্যাস লিক বা বিষাক্ত প্রাণীর উপস্থিতি থাকতে পারে। তাই ঘরে প্রবেশের আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ পরীক্ষা করিয়ে নিন।

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

বন্যা পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও এর ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। একটু সতর্কতা, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চললে নিজের পাশাপাশি পরিবারকেও নিরাপদ রাখা যায়।

মনে রাখবেন, বন্যার সময় সাহস দেখানোর চেয়ে সচেতন থাকা বেশি জরুরি। কারণ একটি ছোট ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

তথ্যসূত্র: সিডিসি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

ফরিদপুরে নিজস্ব তিনতলা বাড়িতে নিঃসঙ্গ মৃত্যু, শেষ বিদায়ে এলেন না কোনো স্বজন

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে নিজস্ব তিনতলা বাড়িতে নিঃসঙ্গ মৃত্যু, শেষ বিদায়ে এলেন না কোনো স্বজন

তিনতলা নিজের বাড়ি। নিচতলায় ভাড়াটিয়া, ওপরে একটি ফ্ল্যাটে একা থাকতেন তিনি। একসময় যে ঘরে বাবা-মায়ের স্নেহ, ভাই-বোনের হাসি আর সংসারের কোলাহল ছিল, সেই ঘরই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল নিঃসঙ্গতার ঠিকানায়। শেষ পর্যন্ত সেই ঘর থেকেই অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হলো কোয়েল চৌধুরীকে (৫৪)। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানালেন, তিনি আর নেই।

আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, মৃত্যুর খবর বিদেশে থাকা একমাত্র বোন ও আত্মীয়স্বজনকে জানানো হলেও কেউ শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে আসেননি। শেষ বিদায়ের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন প্রতিবেশী আর স্থানীয় মানুষজন। তাঁদের উদ্যোগেই বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন কোয়েল চৌধুরী।

রোববার (১২ জুলাই) সকালে ফরিদপুর শহরের পূর্ব খাবাসপুর এলাকার ‘চৌধুরী ভিলা’য় প্রতিদিনের মতো একজন ভাড়াটিয়া তাঁর জন্য খাবার নিয়ে যান। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের খবর দেওয়া হয়। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।

পুলিশ দরজা ভেঙে কোয়েল চৌধুরীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল, পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০০০ সালের দিকে সরকারি চাকরিজীবী দম্পতি হাশমত আলী চৌধুরী ও আছিয়া খানম এই বাড়িটি কিনে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র মেয়ে পরবর্তীতে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দুই ছেলে—বাবু চৌধুরী ও কোয়েল চৌধুরী—দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন।

তবে তাঁদের নিয়ে মানুষের স্মৃতিতে ভয় বা বিরক্তি নয়, বরং রয়েছে মমতার গল্প।

শহরের অনেকেই এখনও মনে করতে পারেন, দুই ভাইকে প্রায় সব সময় একসঙ্গেই দেখা যেত। কখনো পাশাপাশি হাঁটছেন, কখনো একজন আরেকজনের হাত ধরে ধীর পায়ে শহরের রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছেন। যেন বাইরের পৃথিবীতে তাঁদের আর কেউ নেই—দুজনই ছিলেন একে অপরের সবচেয়ে কাছের মানুষ।

প্রায় দেড় বছর আগে বড় ভাই বাবু চৌধুরীর মৃত্যু হলে কোয়েল চৌধুরীর জীবন আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। বিশাল বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে একাই কাটত তাঁর দিন-রাত। নিজের দেখাশোনার মতো ঘনিষ্ঠ কেউ ছিলেন না। ভবনের ভাড়াটিয়ারাই নিয়মিত খাবার দিতেন, প্রতিবেশীরা খোঁজ নিতেন, প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়াতেন।

প্রতিবেশী আশিকুর রহমান খান বলেন, “সকালে ভাড়াটিয়া খাবার দিতে গিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে আমাদের খবর দেয়। আমরা ৯৯৯-এ ফোন করি। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে তাঁকে উদ্ধার করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।”

তিনি জানান, “কানাডায় থাকা তাঁর একমাত্র বোনকে মৃত্যুর খবর দেওয়া হলে তিনি দাফন করে দিতে বলেন। অন্য আত্মীয়দেরও জানানো হয়েছিল, কিন্তু কেউ আসেননি। পরে এলাকার মানুষ মিলে আলীপুর কবরস্থানে তাঁর বাবা-মায়ের কবরের পাশেই দাফনের ব্যবস্থা করেন। দাফনের পর দূরসম্পর্কের কয়েকজন আত্মীয় এসেছিলেন।”

এলাকায় একটি প্রচলিত কথা রয়েছে, ছোটবেলায় বাবা-মা কর্মস্থলে যাওয়ার আগে দুই সন্তানকে ঘুমের ওষুধ খাওয়াতেন, যা তাঁদের মানসিক অবস্থার অবনতির কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো সরকারি বা চিকিৎসাগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহামুদুল হাসান বলেন, “৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাঁকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।”

কোয়েল চৌধুরীর জীবনের শেষ অধ্যায় যেন নীরবে একটি প্রশ্ন রেখে গেল—রক্তের সম্পর্ক সবসময় কি সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক? নাকি মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়ে প্রতিবেশী, ভাড়াটিয়া আর আশপাশের মানুষই হয়ে ওঠেন প্রকৃত আপনজন?

একটি তিনতলা বাড়ি ছিল তাঁর। ছিল স্মৃতিভরা একটি পরিবার। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে ছিল শুধু নিঃসঙ্গতা। আর শেষ বিদায়ে, স্বজনের বদলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলেন প্রতিবেশীরাই।