শেষ আশাটুকু কেড়ে নিল মাদকসেবীরা: কান্নায় ভেঙে পড়লেন ভিক্ষুক শিরিয়া বেগম
পাঁচ বছরের কষ্ট, মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাতা আর প্রতিদিনের অপমান সয়ে জমানো ৮০ হাজার টাকা—সবই এক মুহূর্তে হারালেন শিরিয়া বেগম (৬৫)। এই টাকাই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। কিন্তু সেই সঞ্চয় চুরির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, টাকা ফেরত চাইতে গেলে ওই বৃদ্ধাকে মারধর ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দুপুরে কান্নাভেজা চোখে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে এসে নিজের দুঃখগাথা তুলে ধরেন শিরিয়া বেগম। তিনি নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের মীরেরগ্রাম আশ্রয়ণ প্রকল্পে গত পাঁচ বছর ধরে বসবাস করছেন। তিন দিন আগে তাঁর ঘর থেকে জমানো সব টাকা চুরি হয় বলে জানান তিনি।
শিরিয়া বেগমের জীবনের গল্প যেন দারিদ্র্যের দীর্ঘ ছায়া। প্রায় চার দশক আগে স্বামী রাশেদ খান মারা গেলে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর সংগ্রাম। ফেরি করে কাপড় বিক্রি করে কোনোরকমে সংসার চালিয়েছেন, সেই আয় দিয়েই মেয়ের বিয়ে দেন। কিন্তু বয়সের ভার ও অসুস্থতায় ছয় বছর আগে বন্ধ হয়ে যায় সেই ব্যবসা। ভূমিহীন এই নারী আশ্রয় নেন গুচ্ছগ্রামে। এরপর জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে বেছে নেন ভিক্ষাবৃত্তি।
দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ভিক্ষা করে জমানো ৮০ হাজার টাকা তিনি ঘরের চৌকির তোশকের নিচে ও এক কোণে লুকিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, পাশের ঘরে ভাড়া নিয়ে থাকা মন্ডল নামের এক ব্যক্তি এই টাকা চুরি করেছেন। অভিযুক্ত মন্ডল কুষ্টিয়া জেলার বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন ধরে ওই গুচ্ছগ্রামে বসবাস করে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেন শিরিয়া বেগম।
তিনি আরও জানান, প্রতিদিন রাত হলেই ওই ঘরে মাদক ও জুয়ার আসর বসে। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা অজ্ঞাত লোকজন সেখানে রাতভর আড্ডা দেয়। টাকা চুরির পর প্রতিবাদ জানাতে গেলে মন্ডল ও তার সহযোগীরা তাঁকে মারধর করেন। উজ্জ্বল নামে এক ব্যক্তি তাঁকে বেধড়ক মারধর করেছেন বলেও অভিযোগ তাঁর।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিরিয়া বেগম বলেন, “আমি এই টাকা একদিনে জোগাড় করি নাই। বছরের পর বছর মানুষের কাছে হাত পেতে জমাইছি। এই টাকা দিয়া ওষুধ কিনতাম, কোনোমতে বাঁচতাম। এখন সব শেষ।”
অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
এব্যাপারে ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে ওই ভিক্ষুক থানাতে এসে লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভিক্ষায় জমানো শেষ সম্বল হারিয়ে আজ শিরিয়া বেগম শুধু টাকার নয়, হারিয়েছেন জীবনের নিরাপত্তা ও ভরসাও।

আপনার মতামত লিখুন
Array