খুঁজুন
, ,

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই

নিকোলাস বিশ্বাস
প্রকাশিত: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই

আদিবাসী জনগণের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের নানামূখী চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। এ দিবসটি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যগত জ্ঞান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নে আদিবাসী জনগণের অসামান্য অবদানকেও স্বীকৃতি জানায়। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য: “জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে আদিবাসী ধাত্রীদের অনন্য অবদানকে সম্মান জানানো” যা মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কল্যাণ ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণের ওপর আলোকপাত করে।

বাংলাদেশে আদিবাসী জনগণের বর্তমান পরিস্থিতি

বাংলাদেশ তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। এ দেশ বৈচিত্র্যময় জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য আবাসস্থল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি এখানে ৫৪টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস, যারা অন্তত ৩৫টি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, সাঁওতাল, ওরাঁও, গারো, মাহাতো, পাংখোয়া, রাখাইন, মুন্ডা, মণিপুরীসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী যুগ-যুগ ধরে তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বজায় রেখে বসবাস করে আসছে।

আমাদের সংবিধান ও সমঅধিকারের অঙ্গীকার

বাংলাদেশের সংবিধান সমতা ও ন্যায়বিচারের একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ কিংবা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তবে আরও স্পষ্টীকরণের জন্য সংবিধানে ‘জাতিসত্তা (Ethnicity) অথবা আদিবাসী (Indigenous Peoples)’ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন নং ১০৭ অনুসমর্থন করলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে দেশের জাতিগত বৈচিত্র্য স্বীকৃত হলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আদিবাসী জনগণ (Indigenous Peoples)’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। যদিও কিছু সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, ভূমির মালিকানা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা, বিশেষ করে আইএলও -এর Committee of Experts on the Application of Conventions and Recommendations (CEACR), বার বার গুরুত্বারোপ করেছে যে, এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; যেখানে আদিবাসী জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করতে পারেন।

আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা

সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনও একটি গুরুতর মানবাধিকার সংকট। Kapaeeng Foundation -এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩২ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুকে কেন্দ্র করে মোট ২৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির মতো অপরাধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী নারীদের চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার প্রতিফলন। তবে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়।

প্রতিশোধের আশঙ্কা, সামাজিক কলঙ্ক, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, আইনি সহায়তা ও সহায়ক সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার বহু ঘটনাই নথিভুক্ত হয় না। এসব প্রতিবন্ধকতা শুধু ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে না; বরং সহিংসতা, প্রান্তিকীকরণ এবং বৈষম্যের চক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। তাই জরুরি ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা ব্যবস্থা এবং অর্থবহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হবে না।

 বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত

“বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত” – এই বহুল প্রচলিত উক্তিটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সহিংসতার অসংখ্য বেঁচে থাকা মানুষের জন্য বিচার শুধু ধীরগতির নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা অধরাই থেকে যায়। তদন্তে বিলম্ব, দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া, যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বহু ক্ষেত্রে অপরাধীদের জবাবদিহিতার অভাব বিচারপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরী ও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত হন। এতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি: ঊনত্রিশ বছরের অপূর্ণ বাস্তবায়ন

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরও এর বহু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল অধিকতর স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের কার্যকর সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা। পরবর্তী বিভিন্ন সরকার চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করলেও আদিবাসী প্রতিনিধিদের মতে, অর্থবহ বিকেন্দ্রীকরণ, কার্যকর ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বেশ কয়েকটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। এই বাস্তবায়ন ঘাটতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের এক নতুন সুযোগ

সম্প্রতি সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংরক্ষিত মহিলা আসন ১৯ -এর সংসদ সদস্য আন্না মিনজের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি সাক্ষাতে অংশ নেয়। বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে প্রতিনিধিরা তাদের ন্যায্য দাবিসমূহ তুলে ধরে একটি সুপারিশপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। আদিবাসী নেতৃবৃন্দের এই উদ্যোগ নতুন করে দেশের জাতীয় আলোচনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ নির্মাণ

সংলাপ, সহনশীলতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ বহু জাতীয় সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। একই অঙ্গীকার এখন প্রয়োজন, যাতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীও সংবিধানের পূর্ণ সুরক্ষা এবং অন্যান্য নাগরিকের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে। তাদের কল্যাণে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো দ্রুত বিবেচনার দাবি রাখে:

ভূমি বিরোধের সমাধান: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সরকারকে একটি কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইসঙ্গে সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা জরুরি।

ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করা: আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত আইনি সহায়তা, সুরক্ষা, দ্রুত তদন্ত এবং কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণ ও বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে যাতে তারা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতির নিয়মিত ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সকল অংশীজনের মধ্যে নতুন করে গঠনমূলক সংলাপ শুরু করা অপরিহার্য।

বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ দেশের বাইরের কেউ নয়; বরং তারা এই রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম অংশীদার। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বহু সদস্য বাঙালি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। দেশের প্রতি তাদের এই অবদান শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে নয়, বরং তাদের অধিকার, মর্যাদা এবং সমান নাগরিকত্ব নিশ্চিতকারী নীতিমালার মাধ্যমে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের শক্তি কখনোই সাংস্কৃতিক একরূপতার ওপর নির্ভর করেনি। বরং এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষায়। তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি এবং পূর্বপুরুষের ভূমি রক্ষা করা কোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি দয়া প্রদর্শন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই ভবিষ্যতের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন উন্নয়নকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com

ফরিদপুরে সিজারের পর পেটে গজ রেখেই সেলাই, চার মাস পর নার্স বীথির মৃত্যু

ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে সিজারের পর পেটে গজ রেখেই সেলাই, চার মাস পর নার্স বীথির মৃত্যু

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই করার দীর্ঘ ছয় মাস পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের বিথী আক্তার (২৫) নামের এক ডিপ্লোমা মিডওয়াইফ নার্স।

​বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

​নিহত বিথী আক্তার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের তমিজ উদ্দিন মৃধার পাড়া এলাকার বাসিন্দা। তার স্বামী রাকিবুল ইসলাম মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

​পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিথী আক্তারের সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন করেন ডা. তামান্না ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দ। অপারেশনের মাধ্যমে এক কন্যাসন্তানের জন্ম হলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের অবহেলায় বিথীর পেটের ভেতরে গজ রেখেই সেলাই দিয়ে দেওয়া হয়।

​অপারেশনের পর থেকেই তীব্র পেটে ব্যথা ও শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগতে থাকেন বিথী। দিন দিন তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় জন্ম দেওয়া নবজাতক সন্তানকেও বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেননি তিনি। শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি হলে প্রথম অপারেশনের প্রায় দুই মাস পর, গত ১৫ জুলাই আবারও তার পেটে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা হয়।

​পরবর্তীতে অবস্থার কোনো উন্নতি না হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। একপর্যায়ে গত ৪ অক্টোবর উন্নত চিকিৎসার জন্য বিথীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ তার মৃত্যু হয়।

​নিহতের স্বামী রাকিবুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “চিকিৎসকদের চরম অবহেলায় আমার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এখন এই দুধের শিশুকে নিয়ে আমি কোথায় যাব? আর যেন কোনো মায়ের কোল খালি না হয় বা কেউ এমন অবহেলার শিকার না হন, তাই দোষী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মামলা করব এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।”

​ঘটনার বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল হুদা বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। কিছুদিন আগে আমি নিজে এবং গত বুধবার জেলা প্রশাসক মহোদয় বিথীর সন্তানকে দেখতে গিয়েছিলাম। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”

ফরিদপুরে ইয়াবা সেবন ও বিক্রির অপরাধে দু’জনের ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড

ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩১ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ইয়াবা সেবন ও বিক্রির অপরাধে দু’জনের ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় মাদক (ইয়াবা) সেবন ও বিক্রির অপরাধে দুইজনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

​বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এ দণ্ডাদেশ দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ।

​দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন— উপজেলার গাজিরটেক ইউনিয়নের বিন্দুডাঙ্গী গ্রামের শেখ মোকলেসের মেয়ে রিমা আক্তার (২০) এবং একই ইউনিয়নের ব্যাপারিডাঙ্গী গ্রামের আবুল মৃধার ছেলে রাশেদ মৃধা (২৮)।

​আদালত সূত্রে জানা যায়, রিমাকে ৬ মাসের ও রাশেদকে ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উভয়কে ১০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ এর ৩৬(৫) ধারা অনুযায়ী এ জরিমানা ও সাজা ঘোষণা করা হয়।

​অভিযান পরিচালনকারী কর্মকর্তা ফরিদপুর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. বেলায়েত হোসেন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে রিমা ও রাশেদের বাড়িতে পৃথক অভিযান পরিচালনা করা হয়। হাতেনাতে ইয়াবা সেবনরত অবস্থায় তাদের আটক করা হয়। এ সময় রিমার কাছ থেকে ৪টি এবং রাশেদের কাছ থেকে ২টি ইয়াবাসহ সেবনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

​তিনি আরও জানান, আটক দুইজনের মধ্যে রিমা আক্তার দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা সেবনের পাশাপাশি কেনাবেচার সঙ্গেও জড়িত।

ফরিদপুরে যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে ‘গুল’ খাইয়ে হত্যা, স্বামীর যাবজ্জীবন

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:২২ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে ‘গুল’ খাইয়ে হত্যা, স্বামীর যাবজ্জীবন

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন এবং পরবর্তীতে বিষাক্ত ‘গুল’ খাইয়ে হত্যার দায়ে স্বামী মো. জিল্লুর মোল্যাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

​বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুপুরে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শামীমা পারভীন এ রায় ঘোষণা করেন।

​রায় ঘোষণার সময় আসামি জিল্লুর মোল্যা আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

​দণ্ডপ্রাপ্ত জিল্লুর মোল্যা আলফাডাঙ্গা উপজেলার চরডাঙ্গা গ্রামের আছাদ মোল্যার ছেলে।

​মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, পরিবারিকভাবে জিল্লুর মোল্যার সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন তিনি। ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ বিকেলে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে নিহতের স্বজনেরা জানতে পারেন যে, পারিবারিক কলহের জেরে দুপুর ১টার দিকে ওই নারী ‘গুল’ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।

​সংবাদ পেয়ে নিহতের স্বজনেরা আসামির বাড়িতে গিয়ে উঠানে চৌকির ওপর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পরবর্তীতে এ ঘটনায় নিহতের দুলাভাই ইমরান মোল্লা বাদী হয়ে আলফাডাঙ্গা থানায় একটি মামলা করেন।

​মামলার তদন্ত এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে যে, ঘটনাটি আত্মহত্যা ছিল না। নিহতের শ্বাসনালি ও পরিপাকতন্ত্রে উচ্চমাত্রার নিকোটিনজাত বিষক্রিয়া পাওয়া যায় এবং চিকিৎসকের মতামতে এটিকে হত্যাজনিত মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

​মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আলফাডাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নাজিমুদ্দিন তদন্ত শেষে জিল্লুর মোল্যাকে একমাত্র অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত আজ এ রায় দেন।

​বিষয়টি নিশ্চিত করে রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া রতন বলেন, যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় বিচারক দৃষ্টান্তমূলক রায় দিয়েছেন। আদালতের এই কঠোর রায় সমাজে অপরাধ দমনে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।