খুঁজুন
শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ২৮ চৈত্র, ১৪৩২

ভোটের দিনেই ‘কারচুপি’, সালথায় সেনাবাহিনীর অভিযানে আটক বিএনপির দুই সমর্থকসহ ৩ জন

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৫১ অপরাহ্ণ
ভোটের দিনেই ‘কারচুপি’, সালথায় সেনাবাহিনীর অভিযানে আটক বিএনপির দুই সমর্থকসহ ৩ জন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা ও সালথা) আসনে ভোটগ্রহণের দিন সালথা উপজেলায় ভোট কারচুপি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে তিনজনকে আটক করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে উপজেলার ইউসুফদিয়া, নারানদিয়া ও জয়ঝাপ এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়।

আটক ব্যক্তিরা হলেন—কালাম মাস্টার, আমজাদ হোসেন ও মো. রবিউল। স্থানীয়দের দাবি, এর মধ্যে কালাম মাস্টার ও রবিউল বিএনপির সমর্থক ও আমজাদ রিকশার সমর্থক।

আটককৃতদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কেন্দ্রগুলোতে প্রভাব বিস্তার, ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে দায়িত্বরত সেনা সদস্যরা তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করেন।

জানা গেছে, আটক কালাম মাস্টার গট্টি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটগণ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। নির্বাচনে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।”

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফরিদপুর-২ আসনে শুরু থেকেই ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং রিকশা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আল্লামা শাহ আকরাম আলী। দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে টানটান উত্তেজনার মধ্যেই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র‍্যাব সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোটগ্রহণ চলাকালে যেকোনো অনিয়মের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত ফরিদপুরের দিপালি, বাড়িতে শোকের মাতম

মুস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:০৫ অপরাহ্ণ
ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত ফরিদপুরের দিপালি, বাড়িতে শোকের মাতম

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের বোমা হামলায় ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার এক প্রবাসী নারী নিহত হয়েছেন। নিহত দিপালী (৩৪) উপজেলার পূর্ব চর শালেপুর গ্রামের বাসিন্দা সেক মুকার মেয়ে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (০৮ এপ্রিল) দিবাগত রাতে বৈরুতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে দিপালী ছিলেন চতুর্থ। পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে প্রায় দুই বছর আগে তিনি লেবাননে পাড়ি জমান এবং সেখানে গৃহকর্মীর কাজ করছিলেন।

দিপালীর ছোট বোন লাইজু বেগম জানান, প্রতিদিনের মতো বুধবার বিকেলেও ইমুতে তার সঙ্গে কথা হয়। তখনও দিপালী স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছিলেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে প্রায় এক মাস আগে তিনি কর্মস্থল পরিবর্তন করে তার গৃহকর্তার পরিবারের সঙ্গে বৈরুতে আশ্রয় নেন।

লাইজু বেগম বলেন, “পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে আপুকে ফোন দিলে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। পরে আপুর মালিকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। একপর্যায়ে তাদের পরিবারের এক সদস্যের মাধ্যমে জানতে পারি, বুধবারের বোমা হামলায় আমার আপুসহ তাদের পরিবারের আরও ছয়জন মারা গেছেন।”

জানা গেছে, হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় দিপালীকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে হার মানেন। বর্তমানে তার মরদেহ বৈরুতের একটি হাসপাতালে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। চর হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সেক ফালু জানান, “দিপালী খুবই অসচ্ছল পরিবারের মেয়ে ছিল। সংসারের হাল ধরতেই সে বিদেশে গিয়েছিল। আমরা চাই তার মরদেহ দ্রুত দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।”

এদিকে, উপজেলা প্রশাসনও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে। চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুরাইয়া মমতাজ বলেন, “দিপালী নিহত হওয়ার খবর আমরা পেয়েছি। ইতোমধ্যে ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। বিধি মোতাবেক তার মরদেহ দেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে লেবাননসহ বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

দিপালীর অকাল মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এই নারীকে হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা। দ্রুত তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে যথাযথ দাফনের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসীও।

ফরিদপুরে ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে বিধবাকে হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ, ঢাকায় গ্রেফতার যুবক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:০৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে বিধবাকে হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ, ঢাকায় গ্রেফতার যুবক

ফরিদপুরে ফ্যামিলি কার্ড ও বিধবা ভাতার কার্ড করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক অসহায় বিধবাকে আবাসিক হোটেলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত সুজন শেখকে (৩৫) রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-১০)।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকার হাজারীবাগ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র‍্যাব-১০ এর কোম্পানি কমান্ডার মো. তারিকুল ইসলাম।

জানা গেছে, ভুক্তভোগী নারী ফরিদপুর শহরের আলীপুর এলাকার বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন তিনি। প্রায় ১০ বছর আগে স্বামী হারানোর পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করছেন। জীবিকার তাগিদে অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোভাবে দিন পার করেন। সরকারি কোনো সহায়তা না পাওয়ায় তিনি ছিলেন চরম হতাশায়।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী সুজন শেখ তাকে ফ্যামিলি কার্ড ও বিধবা ভাতার কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। গত ২ এপ্রিল সকালে উপজেলা পরিষদে নেওয়ার কথা বলে তিনি ওই নারীকে রিকশায় তুলে নেন। পরে বাস টার্মিনাল সংলগ্ন একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে গিয়ে সেটিকেই অফিস বলে পরিচয় দেন।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সেখানে নেওয়ার পর তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস (ওসিসি) সেন্টারে ভর্তি করা হয়। চারদিন চিকিৎসা শেষে গত ৬ এপ্রিল তিনি বাড়ি ফেরেন।

পরবর্তীতে ৭ এপ্রিল ফরিদপুর কোতোয়ালী থানায় সুজন শেখের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী নারী।

বিচার দাবি করে তিনি বলেন, “আমি কোনো অফিস চিনতাম না। তার কথায় বিশ্বাস করে গিয়েছিলাম। সরকারের সুবিধা পাইতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে আমার সর্বনাশ করছে। আমি এর বিচার চাই।”

এদিকে অভিযুক্ত সুজন শেখ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, এটি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তিনি বলেন, ওই নারী তার বাড়িতে যাতায়াত করতেন এবং ঘটনার দিন একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে মারধর করা হয়েছিল, যার জের ধরে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুজন শেখের সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির সখ্য রয়েছে বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। তবে ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ কে কিবরিয়া স্বপন বলেন, “আমাদের দলে সুজন নামে কোনো সক্রিয় নেতা বা কর্মী আছে বলে জানা নেই। অপরাধী যেই হোক, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।”

ফরিদপুর কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, “ভুক্তভোগী প্রায় ৫০ বছর বয়সী একজন নারী। ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। আমরা শুরু থেকেই আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছিলাম। র‍্যাব তাকে গ্রেফতার করেছে, এখন আইনি প্রক্রিয়া চলবে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অভিযুক্তকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হবে এবং মামলার তদন্ত দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে।

ফরিদপুরে সংঘর্ষের জেরে দুই মাস ধরে শতাধিক ব্যবসায়ীর দোকান বন্ধ

নুরুল ইসলাম নাহিদ, সালথা:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:১৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে সংঘর্ষের জেরে দুই মাস ধরে শতাধিক ব্যবসায়ীর দোকান বন্ধ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তীতে ফরিদপুরের একটি বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অব্যাহত হামলা ও হুমকির মুখে শতাধিক ব্যবসায়ী  তাদের দোকানে যেতে পারছেন না। এতে করে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েড়েছেন তারা, বেকার হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী ও শ্রমিকরা।

সালথা ও বেয়ালমারী উপজেলার দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে প্রতিপক্ষের ভয়ে গত দুই মাস শতাধিক ব্যবসায়ী স্থানীয় ময়েনদিয়া বাজারে থাকা তাদের দোকানে যেতে পারছেন না বলে  জানিয়েছেন। টানা দুই মাস ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে না পারায় দোকানে  কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হচ্ছে ।  এমন অবস্থায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।

সরেজমিনে সালথার খারদিয়া গ্রাম ও বোয়ালমারীর ময়েনদিয়া বাজারের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত অত্র এলাকার সবচেয়ে বড় হাট ময়েনদিয়া বাজার| বাজারে অন্তত এক হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে । দীর্ঘদিন ধরে বাজারটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নানের সাথে সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের খারদিয়া গ্রামের বিএনপি সমর্থক টুলু মিয়া এবং জিহাদ মিয়ার বিরোধ চলে আসছে।  টুলু মিয়া ও জিহাদ মিয়ার বাড়ি খারদিয়া গ্রামে আর আব্দুল মান্নানের বাড়ি ময়েনদিয়া বাজার এলাকায়।

স্থানীয়রা জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ময়েনদিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন মান্নান চেয়ারম্যান| আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন হান্নান চেয়ারম্যানের বাড়ি পুড়িয়ে দেয় প্রতিপক্ষের লোকজন। একপর্যায় মান্নান চেয়ারম্যান ও তার নেতাকর্মীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়| পরে ময়েনদিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণে নেন টুলু ও জিহাদ মিয়া। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির এক নেতার সহযোগিতায় এলাকায় ফিরে আসেন মান্নান চেয়ারম্যান। এরপর মান্নান ও তার সমর্থকরা ময়েনদিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা করলে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে সালথার খারদিয়া গ্রামের শতাধিক ব্যবসায়ী ময়েনদিয়া বাজারে থাকা তাদের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারছেন না। বাজারের গেলেও মান্নানের সমর্থকরা তাদের উপর হামলা করে ও হুমকি ধামকি দেয়। এমন অবস্থায় গত দুই মাস ধরে খারদিয়া গ্রামের ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ রাখায় তাদের কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

খারদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও ময়েনদিয়া বাজারের মিনহাজ টেডার্সের মালিক মো. ফায়েক বলেন, দুই মাস ধরে ময়েনদিয়া বাজারে থাকার আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারছি না। এতে আমার দোকানে সিমেন্ট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শুধু আমি একা নয়, আমার মতো শতাধিক ব্যবসায়ী মান্নান চেয়ারম্যান ও তার ভাই সিদ্দিক মাতুব্বরের সমর্থকদের ভয়ে বাজারে থাকা তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে না। এতে আমাদের ব্যবসায়ীদের কোটি টাকার সম্পদ ও মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা ব্যবসায়ী, আমাদের কোনো দলপক্ষ নেই। তারপরেও বাজারে যেতে দেয়া হচ্ছে না আমাদের।

কাপড় ব্যবসায়ী আকরাম শিকদার বলেন, সংঘর্ষ হয়েছে দুটি পক্ষের মধ্যে, কিন্তু আমাদের ব্যবসায়ীদের কি দোষ? আমাদের দোকান কেন খুলতে দিচ্ছে না। কোনো ব্যবসায়ী বাজারে গেলেও তাকে মারধর করা হয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে না পেরে আমরা পথে বসে যাচ্ছি।  আমাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা না খেয়ে মরবো। বিষয়টি আমরা প্রশাসনকে জানানো পরেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

খারদিয়া গ্রামের ভ্যানচালক ছায়েদুল মুন্সী বলেন, কয়েকদিন আগে আমি ভাড়া নিয়ে ময়েনদিয়া বাজারে গেলে মান্নান চেয়ারম্যানের ভাই সিদ্দিক ও তার লোকজন আমাকে মারধর করে বলে, তোরা খারদিয়া গ্রামের কোনো লোকজন ময়েনদিয়া বাজারে আর আসবি না।

ময়েনদিয়া বাজারের ইজারাদার টুলু মিয়া বলেন, আমার বাড়ি খারদিয়া হওয়ায় সংঘর্ষের পর থেকে বাজার থেকে ইজারার টাকা তুলতে দিচ্ছে না মান্নান চেয়ারম্যানের সমর্থকরা। আমার লোকজন বাজারে গেলেই তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বাজার থেকে বের করে দেয়। এমন অবস্থায় বাজার থেকে ইজারার টাকাও তুলতে পারছি না।

শাহিন মিয়া নামে ময়েনদিয়া বাজারের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থেকে বাজারের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তারা নিজেরা ব্যবসা করতে না পারলে অন্যদেরও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং ব্যবসায়ীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে বর্তমানে বাজারের পরিস্থিতি  স্বাভাবিক রয়েছে।

অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জেলে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তার ভাই ময়েনদিয়া বাজারের বাসিন্দা সিদ্দিক মাতুব্বরের ছেলে মো. শাহিন মিয়া বলেন, গত ৫ আগস্টের ঘটনার পর তার চাচা পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মান্নান মাতুব্বরের বাড়িসহ তাদের বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। এরপর প্রায় দেড় বছর তারা নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেননি।

তিনি বলেন, যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। তার দাবি, বাজারে এখনো স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে এবং অধিকাংশ ব্যবসায়ী নির্ভয়ে দোকান খুলছেন। যারা বাজারে আসতে পারছেন না বা আসছেন না, তাদের একটি অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম  বলেন, অনেক আগে থেকেই ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রন নিয়ে ওই দুই পক্ষের মধে বিরোধ চলমান ছিলো, উভয় পক্ষের দায়ের করা একাধীক মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ গত ১৪  ফেব্রুয়ারী ময়েনদিয়া ও খারদিয়াবাসীর মধ্যে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়, বেশ কয়েকটি দোকানে অগ্নি সংযোগ ও লুটপাট করা হয়। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নজরে রেখছে জেলা পুলিশ বিভাগ।

তিনি বলেন, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দায়ের করা মামলায় আমরা বেশ কিছু আসামিকে ধরতে সক্ষম হয়েছি, আরো কয়েকজনকে খুঁজছি, আশা করি ধরতে সক্ষম হব শীঘ্রই। এ ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় চাপা ক্ষোভ রয়েছে। সাধারণ মানুষ ও নিরাপরাধ ব্যবসায়ীরা যাতে বাজার এলাকায় নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করতে পারে তার নিশ্চয়তা দিতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। কোন নিরীহ বা নির অপরাধ লোককে করা হবে না। কেউ কাউকে হুমকি দিলেও সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাধারণ মানুষের কাজকর্ম ও চলাচলে বাধা দিলে কোন ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।