খুঁজুন
, ,

সালথায় রশি টেনে কুমার নদ পার হন ১০ গ্রামের মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩৩ অপরাহ্ণ
সালথায় রশি টেনে কুমার নদ পার হন ১০ গ্রামের মানুষ

ঘাটে নৌকা আছে, কিন্তু কোনো মাঝি নেই। নদী পার হওয়ার একমাত্র ভরসা—নৌকার সাথে বাঁধা একটি রশি। সেই রশি টেনে নিজের শক্তিতেই নৌকা পার হতে হয় যাত্রীদের। কোনো পুরুষ মানুষ সঙ্গে না থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় নারী ও শিশুদের।

​ফরিদপুরের সালথা উপজেলার কুমার নদের বড়দিয়া-দিয়াপাড়া খেয়াঘাটের প্রতিদিনের দৃশ্য এটি। একটি সেতুর অভাবে বছরের পর বছর ধরে এভাবে চরম ভোগান্তি আর ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার হচ্ছেন স্থানীয় ১০টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ।

​কুমার নদের পূর্ব পাড়ে রয়েছে বড়দিয়া বাজার, মেহেরদিয়া, নারায়নদিয়া, ছোট লক্ষণদিয়া ও বড় লক্ষণদিয়া গ্রাম। আর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত দিয়াপাড়া, রসুলপুর, রঘুয়ারকান্দি, জয়ঝাপ ও বালিয়া গট্টি গ্রাম। দুই পাড়ের হাজারও মানুষ প্রতিদিন এই খেয়াঘাট দিয়ে যাতায়াত করেন।

​সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। নদীর দুই পাড়েই রয়েছে একাধিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা। প্রতিদিন ক্লাস ধরার তাড়ায় ঝুঁকি নিয়ে রশি টেনে নদী পার হতে হয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের। বর্ষা মৌসুমে নদীতে স্রোত ও ঢেউ বাড়লে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

​স্থানীয় কলেজছাত্রী তামান্না আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, “ব্রিজ না থাকায় প্রতিদিন আমাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। আমরা মেয়েরা সহজে রশি টেনে নৌকা পার করতে পারি না। তাই ঘাটে কোনো পুরুষ মানুষ আসার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেক সময় ঘাটে অপেক্ষা করতে করতেই আমাদের কলেজের গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস মিস হয়ে যায়।”

​সেতু না থাকায় কেবল যাতায়াতই নয়, স্থবির হয়ে পড়েছে এলাকার অর্থনীতিও। স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান জানান, নদী পার হওয়ার সুব্যবস্থা না থাকায় কৃষিপণ্য হাটে নিতে তাদের ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় যেমন নষ্ট হয়, তেমনই বাড়ে পরিবহন খরচ।

​ব্যবসায়ী নজরুল শেখ ও স্থানীয় বাসিন্দা লুতফর রহমান বলেন, “শত বছর ধরে মানুষ এভাবে রশি টেনে নদী পার হচ্ছে। বড়দিয়া-দিয়াপাড়া পয়েন্টে একটি ব্রিজ নির্মিত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হতো, এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসত।”

​গট্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান লাবলু কুমার নদে সেতুর দাবির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “সেতু না থাকায় ১০টি গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চরম কষ্ট পাচ্ছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, নারী ও রোগীদের ভোগান্তি বর্ণনাতীত। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। দ্রুত এখানে একটি সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন।”

​সালথা উপজেলা প্রকৌশলী আবু জাফর মিয়া বলেন, “বড়দিয়া বাজারসংলগ্ন কুমার নদের ওপর সেতু নির্মাণের জন্য স্থানীয়রা একাধিকবার দাবি জানিয়েছেন। গুরুত্ব বিবেচনা করে আমরা ইতিমধ্যে সেতু নির্মাণের প্রস্তাবনা পাঠ্যপুস্তক আকারে তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে মাননীয় মন্ত্রীর ডিও লেটারও (Demand Order) পাওয়া গেছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই এখানে একটি সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারব।”

চরভদ্রাসনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত

মুস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫৭ অপরাহ্ণ
চরভদ্রাসনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে র‍্যালি ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ উদযাপিত হয়েছে।

​উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে সোমবার (৫ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‍‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় একই স্থানে এসে শেষ হয়। পরবর্তীতে উপজেলা পরিষদ হলরুমে শিক্ষকদের অংশগ্রহণে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

​উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাস হোসেন সৌরভের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন চরভদ্রাসন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর চন্দ্রমোহন হালদার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মো. মাকসুদুর রহমান, থানা কর্মকর্তা ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সফর আলী, কৃষি কর্মকর্তা ইমরান বিন ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আজিজুর রহমান খান, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান এবং প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম।

​আলোচনা সভায় বক্তারা শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন ও শিক্ষক সমাজকে সম্মানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরেন।

​অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান এবং উপজেলার নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকমণ্ডলী উপস্থিত ছিলেন।

সদরপুরে স্কুল ভবনের উদ্বোধন ঘিরে বিরোধ, ৬ দিন ধরে ক্লাসে আসছে না ৩০ শিক্ষার্থী

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সদরপুরে স্কুল ভবনের উদ্বোধন ঘিরে বিরোধ, ৬ দিন ধরে ক্লাসে আসছে না ৩০ শিক্ষার্থী

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ভাষাণচর ইউনিয়নের চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দাওয়াত না দেওয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধের জেরে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নির্দেশে গত ছয় দিন ধরে অভিভাবকেরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।

​বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে উদ্বোধনের তারিখ জানানোয় কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাওয়াত দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে দাবি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।

​তবে অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পেয়ে ক্ষুব্ধ হন স্থানীয় প্রভাবশালী কামরুল হাসান। অভিযোগ রয়েছে, এরপর তিনি স্থানীয় অভিভাবকদের নিয়ে সভা করে শিক্ষার্থীদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করার নির্দেশ দেন। তার প্রভাবেই অনেকে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী অন্যান্য স্কুলে সন্তানদের ভর্তির চেষ্টা করছেন।

​১০৭ জন শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে আগে নিয়মিত ৬৫ থেকে ৭০ জন উপস্থিত থাকলেও, গত ছয় দিন ধরে উপস্থিতি নেমে এসেছে ২৫ থেকে ৩০ জনে। ফলে স্বাভাবিক পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

​বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন, “হঠাৎ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী না আসায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”

​প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী খান জানান, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ উদ্বোধনের কথা জানানোয় কাউকে দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ পাইনি। বিষয় টি কামরুল হাসানকে বুঝিয়ে বললেও তিনি কর্ণপাত করেননি।”

​তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কামরুল হাসান দাবি করেন, “অভিভাবকেরা নিজ ইচ্ছায় সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। সেখানে ঠিকমতো পড়াশোনা হয় না এবং শিক্ষকেরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।” পাশাপাশি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি গঠনে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তোলেন তিনি।

​এ বিষয়ে সদরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান জানান, প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে বিষয়টি তিনি জেনেছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৭ বছর ধরে ঘরের খুঁটিতে বাঁধা লিমনের জীবন

সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪২ অপরাহ্ণ
১৭ বছর ধরে ঘরের খুঁটিতে বাঁধা লিমনের জীবন

বয়সের হিসাবে ২০ ছুঁয়েছেন, কিন্তু জীবনের গতি থেমে গেছে মাত্র তিন বছর বয়সেই। এরপর থেকেই এক পায়ে লোহার শিকল পেঁচিয়ে ঘরের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে তাঁকে। এভাবেই শিকলবন্দি অবস্থায় কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ ১৭টি বছর।

​করুণ এই গল্পটি ফরিদপুরের সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের উজিরপুর গ্রামের। দিনমজুর মো. হাফেজ শরিফের ছেলে লিমন শরিফের সারাদিনের জীবন এখন কাটছে মাত্র কয়েক ফুট লোহার শিকলের পরিধিতে।

​পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মাত্র তিন বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে লিমনের জীবন অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে কমে যায় কথা বলার সক্ষমতা। বর্তমানে বাবা-মা ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে তেমন কথা বলতে পারেন না তিনি, চলাফেরাও করতে পারেন না স্বাভাবিক মানুষের মতো।

​শিকলবন্দি রাখার কারণ জানাতে গিয়ে বাবা হাফেজ শরিফ বলেন, “কোনো বাবা-মা চায় না নিজের সন্তানকে এভাবে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে। কিন্তু ওকে মুক্ত রাখলে বাড়ি থেকে দূরে চলে যায়—কখনো উঁচু গাছে উঠে পড়ে, আবার কখনো পুকুরে নেমে যায়। নিজের নিরাপত্তার বোধটুকুও তার নেই। গ্রাম ঘুরে তাকে খুঁজে আনতে হয়। বাধ্য হয়েই নিরাপত্তার স্বার্থে গত ১৭ বছর ধরে ওকে এভাবে শিকলে আটকে রাখতে হচ্ছে।”

​তিন শতক জমির ওপর পলিথিন ও প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে ঘেরা জরাজীর্ণ এক টিনের ঘরে বাস পরিবারটির। দিনমজুরির সামান্য আয়ে সংসার চালানোই যেখানে দায়, সেখানে লিমনের মতো একজন মানসিক ভারসাম্যহীন সন্তানের উন্নত চিকিৎসা চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইতিপূর্বে সাধ্যমতো চিকিৎসা করালেও অর্থের অভাবে তা আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

​স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. ওয়াহিদুল আলী বলেন, “লিমন মানসিকভাবে অসুস্থ এবং তার একটি সরকারি প্রতিবন্ধী কার্ড রয়েছে। পরিবারটি মারাত্মক আর্থিক সংকটে রয়েছে, তাদের থাকার ঘরটির অবস্থাও করুণ। লিমনের সুচিকিৎসা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করতে সরকারি ও সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন।”

​বিষয়টি জানতে পেরে পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. দবির উদ্দিন। তিনি জানান, দ্রুতই পরিবারটিকে ঘরের জন্য টিনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি লিমনের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সরকারি সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে উপজেলা প্রশাসন।