খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

খোঁজ নেয়নি সন্তানরা, ফরিদপুরের বৃদ্ধাশ্রমে বাবা-মায়ের অশ্রুসিক্ত ঈদ

সিকদার সজল, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ৮ জুন, ২০২৫, ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ
খোঁজ নেয়নি সন্তানরা, ফরিদপুরের বৃদ্ধাশ্রমে বাবা-মায়ের অশ্রুসিক্ত ঈদ

বৃদ্ধাশ্রমে আছে ঈদ সামগ্রী, কিন্তু নেই প্রিয়জনের ভালোবাসা। আর তাই চোখের জলে নিঃসঙ্গ ঈদ পালন করছেন তারা। বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের মাঝে প্রিয় সন্তানের জন্য মুখ লুকিয়ে নীরবে কাঁদছেন বাবা-মা। অতীতের সুখ-গল্প আঁকড়ে ধরে বুকে পাথর চেপে জীবনযাপন করছেন।

বকুল বেগম। বয়স ষাটোর্ধ্ব। অসুস্থ অবস্থায় পরে রয়েছেন শান্তি নিবাসে। নিজ হাতে খেতে পারেন না, তাকে খাইয়ে দিতে হয়। কথাও তেমন বলতে পারেন না। তারপরও কথা বলার চেষ্টা করেন। বকুল বেগম সময় সংবাদকে জানান, বিয়ে হয়েছিল। স্বামীর আগের পক্ষের সন্তান ছিল। ওই সন্তানদের আদর যত্নও করতেন তিনি। কিন্তু সৎ মায়ের কপালে যা থাকে সেটাই ঘটেছে তার জীবনে। এক পর্যায়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয় সন্তানরা, পরে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে আশ্রয় হয় শান্তি নিবাসে। দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন এখানে। কেউ খোঁজ নেয় না তার।

আরেকজন লতিফ শিকদার। বয়স ৬০ বছর। তিনি শান্তি নিবাসে রয়েছেন এক বছর ধরে। লতিফ শিকদার কথা বলতে পারেন না। তবে কিছু বললে তিনি শুনতে পারেন। শান্তি নিবাসে কর্মরতদের কাছ থেকে জানা যায় তার সম্পর্কে।

লতিফ শিকদারের বাড়ি নড়াইল জেলায়। দর্জির কাজ করে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। হঠাৎ করেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হন। এরপর আবার স্টোক করেন, ওই সময় থেকে তিনি কথা বলতে পারেন না। ছেলেরা হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়, কিন্তু এরপর আর কোনো খবর নেয়নি। কিছুটা সুস্থ হয়ে প্রতিবেশীর মাধ্যমে শান্তি নিবাসে এসে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তিনি এখানেই রয়েছেন, তবে কথা বলতে পারেন না। সন্তানদের কথা বলতেই তার মুখ মলিন হয়ে যায়।

আরেকজন সাজ্জাদ শেখ। তিনি সরকারি চাকরি করতেন। স্ত্রী, সন্তানরা সবকিছু লিখে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। সব হারিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন তিনি। এরপর ভবঘুরে সাজ্জাদের ঠাঁই হয় শান্তি নিবাসে। আগের মতো আর সন্তানদের হাতে হাত রেখে যেতে পারেন না ঈদের কেনাকাটা করতে। শান্তি নিবাসের চার দেয়ালের মাঝে মুখ লুকিয়ে নীরবে ফেলেন চোখের পানি। গত ৮ বছর ২ মাস ধরে আছেন শান্তি নিবাসে।

সাজ্জাদ শেখ বলেন, ‘সবই আমার কপাল। বিয়ে করার পর স্ত্রীর নামে সব সম্পত্তি লিখে দিয়েছিলাম। স্ত্রী ও সন্তানরা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করি, সেই স্ত্রীও সম্পত্তি লিখে নিয়ে আমাকে বের করে দিল। পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে ঠাঁই হলো শান্তি নিবাসে।’

তিনি বলেন, ‘সন্তান জন্ম দিয়ে ভুল করেছি, সম্পত্তি করেও ভুল করেছি। এত সম্পদ না থাকলে আমার সাথে এমনটি হতো না। এখন আমার কেউ খোঁজ নেয় না। তারা অনেক ভালো আছে। আমিও এখানে ভালো থাকার চেষ্টা করি। ভালোই আছি, ভুলের খেসারত দিচ্ছি। ছেলে মন্ত্রী হলেও তার কাছে যাবোনা। এখানে অনেক ভালো আছি।’

সাজ্জাদ শেখ, বকুল বেগমই নন, শান্তি নিবাসে রয়েছেন ময়না বেগম, ঝড়ী বেগম, আয়শা খাতুন, মনা সহ অনেকেই। সবারই গল্প একই রকম।

শান্তিনিবাসে পরিবারহীন বাবা-মায়ের সংখ্যা ১৫ জন। তাদের সবার ঈদ কাটছে পরিবারহীন। যাদের জীবনের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে এসেছেন সন্তানের জন্য। সেই সন্তানদের ছাড়া শান্তিনিবাসে যত্নে থাকলেও ভালো নেই বাবা-মা।

শনিবার (০৭ জুন) ঈদুল আযহার দিন সকালে ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকায় অবস্থিত সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত শান্তি নিবাসে গিয়ে দেখা যায় মলিন মুখে ঈদ উদযাপন করছেন তারা। ঈদের দিন সকালে তাদের দেয়া হয়েছে উন্নত মানের খাবার। সকালে খিচুড়ি, সেমাই ও ডিম। দুপুরে পোলাও, গরুর মাংস, খাসির মাংস, রোস্ট ও মিষ্টি। রাতেও রয়েছে উন্নতমানের খাবার। দেয়া হয়েছে নতুন পোশাক।

শান্তি নিবাসে বেশিরভাগই পরিস্থিতির শিকার হয়ে এসেছেন। অনেকেই সন্তানদের অবহেলার শিকার। একজন মা সারাজীবন সন্তানদের লালন-পালন করে বড় করেছেন, কিন্তু বয়সের ভারে যখন তিনি অসহায় হয়ে পড়লেন, তখন তার জায়গা হলো বৃদ্ধাশ্রমে। বাবাদের গল্পও আলাদা নয়, যারা একসময় পরিবারের স্তম্ভ ছিলেন, আজ তারা যেন সেই পরিবারের বোঝা হয়ে গেছেন।

বিশেষ দিনগুলোতে হতাশা আর শূন্যতা নিয়ে সন্তানের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান বৃদ্ধাশ্রমে থাকা এসব মানুষ। সন্তানদের অপেক্ষায় থাকেন, হয়তো কেউ আসবে, হয়তো একটু খোঁজ নেবে এই আশায় তাদের দিন কাটে। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হয় না।

শান্তি নিবাসে বর্তমানে ১০ জন নারী ও ৫ জন পুরুষ রয়েছেন। এর মধ্যে তিন জন খুবই অসুস্থ। তাদের চিকিৎসাও দেয়া হচ্ছে এখানে। এর মধ্যে দুই জন নারী ও একজন পুরুষ কথা বলতে পারেন না।

শান্তি নিবাসে ময়না বেগম রয়েছেন দীর্ঘদিন। কথা হয় তার সাথে। ময়না বেগম জানান, তিনি বিয়ে করেননি। ভাইয়ের সাথেই থাকতেন। একপর্যায়ে ভাইয়ের স্ত্রী তার সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করেন। তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা ঘাটে দিন কাটে তার। এক সময় ঠাঁই হয় শান্তি নিবাসে।

ময়না বেগম বলেন, ‘বাপের সম্পত্তি থেকেও আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। খারাপ ব্যবহার করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এখানে ভালো আছি। ঈদের আনন্দ এখানকার সবার সাথে ভাগাভাগি করে নিয়েছি। পরিবারের সদস্যদের কথা মনে পড়ে, কিন্তু কী করবো। যে কয়টা দিন বেঁচে আছি এখানেই কাটিয়ে দেব। সবকিছু ভুলে গিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করছি।’

আরেক বাসিন্দা আয়শা বলেন, ‘কেউ নেই আমার। এখানে আছি অনেকদিন। ঈদের আনন্দ এখানকার সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছি। সকালে নতুন পোশাক দিয়েছে, তা পরেছি। সেমাই দিয়েছে, খিচুরি ও ডিম খেয়েছি। দুপুরে মাংস, ভাত, মিষ্টি দিয়েছে। রাতেও ভালো খাবার আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু ঈদের দিনই নয়, সারা বছরই এখানে ভালো খাবার দেয়, যত্ন করে। অনেক ভালো আছি। কেউ নেই মনে হয় না। অসুস্থ হয়ে পড়লে এখান থেকেই চিকিৎসা দেওয়া হয়।’

ফরিদপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক এ এস এম আলী আহসান জানান, শান্তি নিবাসে ১০ জন নারী ও ৫ জন পুরুষ রয়েছেন। এর মধ্যে দুই জন নারী ও একজন পুরুষ খুবই অসুস্থ, তাদের সুস্থ করতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। যারা রয়েছেন তাদের থাকা-খাওয়া, চিকিৎসাসহ সব ব্যবস্থা এখান থেকেই করা হয়।

তিনি জানান, ঈদুল আজহা উপলক্ষে সব নিবাসীকে নতুন কাপড় দেয়া হয়েছে। এছাড়া ঈদের দিন সকালে খিচুরি, রুটি-সেমাই, মিষ্টিসহ বিভিন্ন খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুপুরে ও রাতে পোলাও, মুরগির রোস্ট, গরু ও খাসির মাংসসহ বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করা হয়েছে।

উপ-পরিচালক জানান, এখানে যারা রয়েছেন তাদের নিজের বাবা-মায়ের মতো করেই যত্ন করা হয়। তাদের কখনো বুঝতে দেওয়া হয়না যে তারা বাড়িতে নেই, এখানে তাদের বাড়ির মতো করেই যত্ন করা হয়।

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা