খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

ঘুচছেই না সামাজিক ব্যবধান

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশিত: বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ৩:০২ অপরাহ্ণ
ঘুচছেই না সামাজিক ব্যবধান

‘বিদগ্ধ নাগরিকের মার্জিত ভাষা যেন ভিটামিন বর্জিত ছাঁটা সিদ্ধ চালের ফ্যানগালা ভাত। তার না থাকে স্বাদ, না থাকে পুষ্টি’—এ মন্তব্য একদা অন্নদাশঙ্কর রায় করেছিলেন ‘বাংলার রেনেসাঁস’ নামে বইয়ে।

বাংলার রেনেসাঁস বহু অঘটন ঘটিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ভদ্রলোক শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণির মধ্যকার ব্যবধানটি ঘোচাতে পারেনি। আর এই ব্যবধানেরই একটি অভিব্যক্তি হচ্ছে ভাষার ব্যবধান।

 

সাহিত্যের ভাষাকে রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি আনার ব্যাপারে যথেষ্ট করেছেন, এনেছেনও খানিকটা, কিন্তু খুব বেশি দূর এগোয়নি। সাহিত্যের ভাষা আলাদা হয়েই রইল। আর সেই ভাষাই হয়ে দাঁড়াল বিদগ্ধ নাগরিকের মার্জিত ভাষা।
আমরা অবশ্য জানি কেউ কেউ চেষ্টা করেছিলেন চলতি বুলিকেই সাহিত্যের বুলি করবেন—যেমন প্যারীচাঁদ মিত্র ও কালীপ্রসন্ন সিংহ, কিন্তু তাঁদের ভাষা কল্কে পায়নি, বিদগ্ধ মার্জিতজনেরা নিজেদের ভাষাকে আলাদা করে রেখেছেন জনগণের ভাষা থেকে।

অতি সম্প্রতি দেখলাম একজন প্রবীণ সাহিত্যিক ডি. এইচ লরেন্সীয় ভঙ্গিতে রোমহর্ষক শব্দাবলি উপহার দিয়েছেন তাঁর লেখায়, সেই বইয়ের ব্যাপার নিয়ে আমি উচ্চবাচ্য করছি না, খামোখা খামোখা তার কাটতি বাড়াতে রাজি নই আমি, তবে সত্য এই যে এসব শব্দ ব্যবহার করে যতই শিহরন ব্যক্তি বিশেষের লভ্য হোক না কেন, তাতে ভাষা বদলাবে না, বরঞ্চ ওই সব শব্দগুলোই শিলাবৃষ্টির শিলার মতো মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গলে যাবে।
বলা হয়ে থাকে যে ইংরেজি ভাষা এ দেশে এসে শিক্ষিতে-অশিক্ষিতে যে সামাজিক ব্যবধান তৈরি করে তেমনটি আগে কখনো ছিল না। কথাটা সত্যও বটে মিথ্যাও বটে। কারণ ইংরেজি ভাষা সামাজিক ব্যবধান সৃষ্টির অন্যতম কারণ ঠিকই, কিন্তু একমাত্র কারণ অবশ্যই নয়।

ব্যবধানটা তো আসলে আর্থ-সামাজিক, ভাষা সেটা বাড়িয়েছে মাত্র এবং ব্যবধানকে প্রকাশ করেছে যে সেটাও ঠিক, কিন্তু এর সব দায়দায়িত্ব ভাষার ওপরে চাপানোটা একপেশে কাজ বটে। ইংরেজিকে আজও যে কিছুতেই হটানো যাচ্ছে না তার একটা কারণ এই যে ওই সামাজিক ব্যবধান ঘুচছে না। আর সত্যি সত্যি যদি এমন অলৌকিক ঘটনা কোনো দিন ঘটে যায় যে সব শিক্ষিত বাঙালি শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলছে (ইংরেজি আধা ও তিন-পোয়া বাক্যাবলি বাদ দিয়ে)—সেদিনও বাঙালিতে বাঙালিতে তফাত অবশ্যই থাকবে, দূরত্ব দেখা যাবে শিক্ষিতে-অশিক্ষিতে এবং অবশ্যই ধনী ও দরিদ্রে। মানুষই ভাষা সৃষ্টি করে, উল্টোটা সত্য নয়।
সাহিত্যের ভাষা কেন জনগণবিচ্ছিন্ন তার ব্যাখ্যা শ্রী রায় দিয়েছেন এভাবে, ‘…লেখেন যাঁরা তাঁরা ভদ্রলোক।

পড়েন যাঁরা তাঁরাও ভদ্রলোক; ভদ্রলোকদের পালিশ-করা ভাষাতেই লেখা হয়। ’ অবশ্যই। এই ভদ্রলোকদের যে আর যাই করা যাক শ্রমজীবীতে পরিণত করা কিছুতেই সম্ভব হবে না সে বিষয়ে তাঁর মতও সর্বাংশে সত্য। তিনি বলেছেন, ‘একই রকম ইউনিফর্ম পরিয়েও একজন ভদ্রলোককে একজন শ্রমিক করতে পারা যাবে না। শ্রমিককে ভদ্রলোক করলেও করতে পারা যায়, কিন্তু ভদ্রলোককে শ্রমিক করা কারো সাধ্য নয়। যদি না তাঁকে জেলে পাঠিয়ে ঘানি ঘোরাতে বাধ্য করা যায়। কিংবা সমস্ত দেশটাকে একটা কারাগারে পরিণত করা যায়। তার মানে প্রোলেটারিয়েট ডিক্টেটরশিপ। ’
সামাজিক ব্যবধান ঘুচছে নাঘানি অবশ্যি আমরা সবাই কমবেশি টানছি। জিজ্ঞেস করে দেখুন, ভদ্রলোক মাত্রেই একবাক্যে বলবেন যে ঘানি টেনে টেনে শেষ হলেন। আর পারেন না। প্রাণ কণ্ঠাগত। জেল খাটার কথাও বলবেন, বলবেন কয়েদির দশা—শুধু পোশাকটা নেই, এই যা। কিন্তু এই ঘানি, ওই কারাগার—এরা যে প্রকৃত বস্তু থেকে বহু দূরে তা বুঝতে কোনো কষ্ট হয় না, বিশেষ করে অহমিকার মুহূর্তে। তখন কে কত স্বাধীন সেটা প্রকাশের প্রতিযোগিতা চলে।

ব্যবধান ঘুচবে না এটা পয়লা নম্বর সত্য। যত দিন যাচ্ছে ততই ব্যস্ততা বাড়ছে আমাদের। শ্রমজীবীরা বরঞ্চ বেকার থাকে, কাজ খোঁজে হন্যে হয়ে। ভদ্রলোকেরা কাজেই আছেন। কাজের কাজ কি না, শ্রমঘন কি না সে বিচার দরকার নেই। এইটুকু অবশ্যই বলা যাবে যে সব ভদ্রলোকই কাজ করেন এবং কাজকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন। শ্রমজীবীরাও তাই, অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে—কাজকে ঘৃণা করার ব্যাপারে—শ্রমিকে-ভদ্রলোকে ব্যবধান নেই। কারণ অন্য কিছু নয়, কারণ এই যে শ্রমিক মাত্রেই মনে মনে ভদ্রলোক। শ্রমের মর্যাদা দিলে ভদ্রলোক ভদ্রলোক থাকেন না। তখন তখনই তাঁর ফাঁসি হয়ে যায়— সাংস্কৃতিকভাবে।

কাজ দেওয়াটা অবশ্য খুবই কঠিন কাজ। বেকার সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করছে। একেকজন অভিভাবককে দেখি আর চমকে চমকে উঠি। যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অবস্থা সচ্ছল, অন্নচিন্তা মোটেই নেই। কিন্তু ওই যে এক জিজ্ঞাসা, ছেলে-মেয়েদের কী দিয়ে ব্যস্ত রাখেন, ওই ভূত তো পিছু ছাড়ে না।

না, কাজ দিতে পারব না। না পারব কাজ দিতে নিজেদের সন্তানদের, না পারব গরিবকে। অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছেন, ভদ্রলোককে শ্রমিকে পরিণত করতে হলে প্রোলেটারিয়েট ডিক্টেটরশিপ দরকার হবে। ভরসা এই যে তাঁর ওই কথাটার মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা পরিহাস আছে, নইলে এই কথার জন্য ভদ্রসমাজ থেকে তাঁর নির্বাসন প্রাপ্য হতো। অন্যের দরকার ছিল না নিজেই খারিজ করে দিতেন নিজেকে। ওর বিকল্প কি? কেন, গণতন্ত্র! গণতন্ত্রের কথা তিনি অবশ্যই বলেছেন। নবজাগরণে (রেনেসাঁসে) যা সম্ভব হয়নি গণজাগরণে তা সম্ভব হবে। গণজাগরণ আসবে কেমন করে? কেন, গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে। আর গণতন্ত্র? নটে গাছটির বৃত্তান্ত বুঝি। যাই বলি, গণতন্ত্রের কথা বলতে গেলে আজ আর তেমন জোর পাওয়া যায় না। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে গণতন্ত্রের হাল দেখে অতি বড় গণতন্ত্র প্রেমিকও আশা ছেড়ে দেবেন, হয়তো বা প্রেমও ভুলবেন, প্রেমকেই বা কতকাল অন্ধকার ঘরে রাখা যায়?

ব্যবধান সত্য হয়ে থাকে। থাকবেও। এই যে কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি অত্যাসন্ন, এতে ব্যবধান কমবে না, উল্টো বাড়বে। এই বৃদ্ধিতে সেইসব লোকের কতটা কপাল ফিরবে বলা মুশকিল রোজ যারা টুকরি হাতে বসে থাকে কামলা খাটার জন্য, কিংবা রিকশা টানে, ঠেলাগাড়ি ঠেলে। তাদের কাউকে বরঞ্চ ভীষণ উদ্বিগ্ন দেখেছি জিনিসের দাম আরো বাড়বে এই আশঙ্কায়। এ নিয়ে আমাদের নিজস্ব মহলে আলাপ যে হয় না তা বলা যাবে না। হয়।

নবজাগরণ এ দেশে সত্যি সত্যি ঘটেছে কি না তা নিয়ে তর্ক আছে, কিন্তু নানা উত্থান যে ঘটেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাঘ-ভল্লুক সবই রয়েছে। আর আছে কী? আছে ধাড়ি ইঁদুর। কবি বীরেন চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘পাহাড়গুলি কাঁপছে প্রসব যন্ত্রণায়/এবার তবে জন্ম নেবে/ কয়েক লক্ষ ধাড়ি ইঁদুর, মানুষখেকো বাঘের চেয়ে ভীষণ’। বাঘও আছে, ইঁদুরও আছে, যেমন রয়েছে তাদের দন্তবিদীর্ণ মানুষ। ভাষায় যে কেবল ভদ্রতার আওয়াজ পাই তা নয়, দন্তনির্ঘোষও বিলক্ষণ শুনতে পাই। সাবধান, কামড়ে দেবে।

আর যে বলেছেন ভাষা যেন ‘ভিটামিনবর্জিত সিদ্ধ ধানের ফ্যানগালা ভাত’…সে প্রসঙ্গে বলতে হয় যে মোটে মা’য় রাঁধে না, তপ্ত আর পান্তা! সমস্যাটা ভাতের স্বাদের ততটা নয়, যতটা ভাত খেতে না পাওয়ার। মূল ব্যবধান ওইখানেই। কেউ খায়, কেউ পায় না।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা