ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বেলজানী-খরসূতী এলাকার মানুষের একমাত্র ভরসা খরসূতী সরকারি কলেজ থেকে খরসূতী ঈদগাহ পর্যন্ত আধা কিলোমিটারের একটু বেশি দীর্ঘ সড়কটি। কিন্তু ইটের সলিং বিছানো দীর্ঘদিনের পুরাতন খানাখন্দে ভরা রাস্তাটি এখন চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠেছে।
কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, চোখে আগামীর স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন এই পথেই স্কুলে যায় শিশুরা। তবে ভাঙা ইটে পদে পদে হোঁচট খেয়ে ছোট ছোট পাগুলো ছিলে রক্ত ঝরছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর আগেই কোমলমতিদের সইতে হচ্ছে অবর্ণনীয় কষ্ট। এলাকাবাসীর প্রশ্ন—আর কতকাল সইতে হবে এই ভোগান্তি?
দৈর্ঘ্যে আধা কিলোমিটারের সামান্য বেশি হলেও এটিই পুরো এলাকার যোগাযোগের মূল চালিকাশক্তি। এর পূর্ব প্রান্তে রয়েছে খরসূতী ঈদগাহ ময়দান, যেখানে প্রতি দুই ঈদে ময়না, ঘোষপুর, সাতৈর ও গুনবহাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষ সমবেত হন। কাছেই বেলজানী-খরসূতী কাশেমুল উলুম মাদরাসা, একটি মহিলা মাদরাসা এবং বর্ণী বাজার।
পশ্চিমে রয়েছে খরসূতী সরকারি কলেজ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চন্দ্র কিশোর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ডাকঘর ও খরসূতী বাজার। এই পথ ব্যবহার করেই পাশের মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার জাঙ্গালিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ ও কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য নিয়ে হাটে যান। বানিয়াড়ী, হাটখোলা, রানীদৌলা-কুঠি ও ইচাখালী গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের গন্তব্য এই জরাজীর্ণ সড়ক।
স্থানীয় বাসিন্দা ও একটি জাতীয় দৈনিকের সহযোগী ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মিজান উর রহমান জানান, ১৯৯১ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য প্রয়াত জননেতা আব্দুর রউফ মিয়া ফরিদপুর চিনিকলের বরাদ্দে এখানে ইটের সলিং করেছিলেন। এরপর দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকে সংস্কারের কোনো ছোঁয়া লাগেনি।
যত্ন আর মেরামতের অভাবে ইট উঠে গিয়ে পুরো রাস্তাটি এখন বড় বড় গর্তে পরিণত হয়েছে। ভারী যানবাহন তো দূরের কথা, রিকশা-ভ্যান বা পায়ে হেঁটে চলাই দায়। বর্ষাকালে পানি জমে কাদা-পানিতে একাকার হয়ে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নেয়।
সম্প্রতি ফরিদপুর-১ (মধুখালী-বোয়ালমারী-আলফাডাঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য ড. ইলিয়াস মোল্লার কাছে সড়কটি দ্রুত পাকাকরণের জোর দাবি জানান স্থানীয়রা। এমপি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। ময়না ইউনিয়নের জামায়াত আমীর মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, “এমপি মহোদয়কে গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি জানানো হয়েছে। আশা করছি, পরবর্তী বাজেটে বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু হবে।”
এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা প্রকৌশলী পূর্ণেন্দু সাহা জানান, সড়কটির বেহাল দশার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে সড়কটির আইডি ভেরিফিকেশন ও আইডি অন্তর্ভুক্তির প্রাক-প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। নতুন প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) তৈরি করে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হচ্ছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই দরপত্র আহ্বান করে কাজ শুরু করা হবে।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম. রকিবুল হাসান বলেন, “জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ যাতায়াত করেন। সড়কটি দ্রুত মেরামতের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দ্রুত চিঠি পাঠাব, যাতে জনগণের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর হয়।”
এখন কেবল বাস্তবায়নের অপেক্ষা। হাজারো মানুষের প্রত্যাশা—অচিরেই যেন প্রশাসনিক আশ্বাস বাস্তবায়িত হয় এবং শিশুরা নিশ্চিন্তে মসৃণ পথে স্কুলে যেতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন
Array