খুঁজুন
শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১২ বৈশাখ, ১৪৩৩

জামদানির ‘মিথ’ ভাঙলেন ফরিদপুরের মোস্তাফিজুর

প্রবীর কান্তি বালা, ফরিদপুর
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫, ১২:২৪ অপরাহ্ণ
জামদানির ‘মিথ’ ভাঙলেন ফরিদপুরের মোস্তাফিজুর

৩০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থের একটি টিনের ঘর। এর মধ্যে সারিবদ্ধভাবে সাজানো ছয়টি তাঁত। প্রতিটি তাঁতে দুজন করে বসে একসঙ্গে কাজ করছেন ১২ জন। রেশম সুতা, বাইনা সুতা ও জরির বুননে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের ঐতিহ্য জামদানি শাড়ি।

এভাবেই মোস্তাফিজুর রহমানের ছোট্ট টিনের ঘরে মাসে ২২ থেকে ২৫টি জামদানি শাড়ি তৈরি হচ্ছে। সেগুলো বিক্রিও হয়ে যাচ্ছে। তাঁর এই কারখানার অবস্থান ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের পানাইল গ্রামে।

অজপাড়াগাঁয় বসেই বাংলাদেশের প্রথম জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া জামদানি বুনছেন মোস্তাফিজুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, ‘অনেকে বলেন শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে তৈরি জামদানি শাড়ির মান ভালো। এ মিথ আমি ভেঙে দিয়েছি। সঠিক উপকরণের সঠিক ব্যবহার করলে এবং কাজের প্রতি মমত্ববোধ ও একাগ্রতা থাকলে দেশের যেকোনো জায়গা থেকেই ভালো মানের জামদানি শাড়ি প্রস্তুত করা সম্ভব।’

মোস্তাফিজুরের শাড়ির মান ভালো হওয়ার কারণে ক্রেতারা বাড়িতে এসে কিনে নেন। আবার বিভিন্ন পার্বণ উপলক্ষে আগে থেকেও তাঁকে শাড়ির ফরমাশ দিয়ে রাখেন অনেকে। আবার অনেক সময় রূপগঞ্জের বিসিক শিল্পনগরীতেও পাঠান তাঁর শাড়ি।

প্রথমে শিখেছেন, এখন শেখাচ্ছেন

জামদানির নকশা সুচিকর্মে ফুটিয়ে তোলা হয় না, ছাপাও হয় না। এর বুনন এক বিস্ময়কর বয়নকৌশল। বাবা থেকে ছেলে, ওস্তাদ থেকে শাগরেদ—শ্রুতি ইতিহাস আর হাতে–কলমে শেখার মধ্য দিয়ে পরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে চলেছে এই বয়নশিল্প।

অভাবের সংসারে পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর আর পড়াশোনা করা হয়ে ওঠেনি মোস্তাফিজুর রহমানের। এ কারণে শৈশব থেকেই জীবিকার সন্ধানে নিয়োজিত করেন নিজেকে। ১৬ বছর বয়সে ২০০৭ সালে তিনি চলে যান নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার জামদানিপল্লিতে। সেখানেই তিনি জামদানি শাড়ি তৈরির কাজ শেখেন। এরপর রূপগঞ্জেই একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। সেখানে কাটিয়ে দেন ১৪ বছর।

একসময় মন চায় নিজ এলাকায় ফিরতে। ২০২১ সালে তিনি ফিরে আসেন ফরিদপুরের পানাইল গ্রামের নিজ বাড়িতে। সেখানেই একটি তাঁত বসিয়ে জামদানি শাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেন। আগ্রহী অন্যদেরও বুননের কাজ শেখাতে থাকেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁত ও কারিগরের সংখ্যা। এখন তাঁর মোট ছয়টি তাঁত। এতে কাজ করছেন তিনিসহ ১২ জন। ইতিমধ্যে স্ত্রী নিলা বেগম তাঁতের কাজ শিখে নিয়েছেন। তিনিও সংসারের কাজের ফাঁকে স্বামীর সঙ্গে জামদানি বোনায় হাত লাগান।

নিজের কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই মোস্তাফিজুরের। শাড়ি বিপণনের জন্য তিনি একটি নামও দিয়েছেন—‘মুসলিম জামদানি ঘর’। যদিও বাড়ির কোথাও এ নামে কোনো সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়নি। মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শাড়ি উৎপাদনে এখন পর্যন্ত তিনি পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। একটা শাড়িতে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ রেশমি সুতা থাকে। রেশমি সুতা কেনা হয় রাজশাহী থেকে। একটি শাড়িতে সুতা বাবদ ব্যয় হয় অন্তত দুই হাজার টাকা। সুতা কেনা থেকে শুরু করে কারিগরদের বেতন দেওয়ার পরও প্রতি মাসে তাঁর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাভ থাকে।

মোস্তাফিজুর রহমানের মোট ছয়টি তাঁত। এতে কাজ করেন তিনিসহ ১২ জন
মোস্তাফিজুর রহমানের মোট ছয়টি তাঁত। এতে কাজ করেন তিনিসহ ১২ জন

আছে সংকটও

ফরিদপুর সদর থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা লাগোয়া পানাইল গ্রাম। এলাকায় বেকারের সংখ্যা কম নয়। তারপরও মোস্তাফিজুরের কারখানায় জনবলসংকট লেগেই থাকে। কারণ হিসেবে মোস্তাফিজুর জানান, অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করতে পারেন, মানুষ পরিশ্রম করতে চায় কম, কাজের প্রতি ততটা মনোযোগী হতে পারেন না। ধরে রাখতে পারেন না ধৈর্য। এ কারণে শিখতে আসা ব্যক্তিদের ঝরে পড়ার সংখ্যাও কম নয়। এরপরও গ্রামে গ্রামে ঘুরে লোক সংগ্রহ করেন তিনি। মোস্তাফিজুর বলেন, ‘সারা বছরই জনবলের সংকট থাকে। তারপরও আমি কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’

মোস্তাফিজুরের শাড়ির কারখানায় কারিগর হিসেবে কাজ করেন আলফাডাঙ্গার টগরবন্দ ইউনিয়নের পানাইল গ্রামের মোহাম্মদ হোসাইন (২৯)। আগে তিনি রূপগঞ্জে কাজ করতেন। পরে এলাকায় এসে মোস্তাফিজুরের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘এলাকায় যখন এ কাজ শুরু হলো এবং দেখলাম সুযোগ-সুবিধা একই, এ জন্য আমি মোস্তাফিজুর ভাইয়ের কারখানায় এসে যোগ দিয়েছি। ঘরের ভাত খেয়ে কাজ করতে পারছি। এতে আমার লাভই হচ্ছে।’

উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের পাতরাইল গ্রামের তরুণ মো. হামীমের (১৮) জামদানি বুননের হাতেখড়ি মোস্তাফিজুরের কাছেই। দরিদ্র কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি বলেন, ‘মোস্তাফিজুর ভাই আমাকে ধইরা নিয়া আইসা তাতের কাজ শেখান। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো, মনও বসত না। কাজ শেখার পর যখন টাকা পাওয়া শুরু করলাম, তখন উৎসাহ বাইড়া গেল। এখন কাজে না এলে ভালো লাগে না।’ একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন টগরবন্দ ইউনিয়নের লাগোয়া নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার বাসিন্দা মো. জিহাদ (১৯)।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের ভাঙ্গা বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. মামুনুর রশিদ জানান, দেশের যেসব জেলায় তাঁতির সংখ্যা বেশি, যেমন নরসিংদী, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও কুষ্টিয়াতে সমিতির মাধ্যমে তাঁতিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। ফরিদপুর অঞ্চলে কোনো প্রশিক্ষণকেন্দ্র নেই। তাই এ এলাকার তাঁতিদের তাঁরা প্রশিক্ষণ দিতে পারেন না। মোস্তাফিজুরকে একটা সমিতি তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

জামদানির নকশা সুচিকর্মে ফুটিয়ে তোলা হয় না, ছাপাও হয় না। এর বুনন এক বিস্ময়কর বয়নকৌশল
জামদানির নকশা সুচিকর্মে ফুটিয়ে তোলা হয় না, ছাপাও হয় না। এর বুনন এক বিস্ময়কর বয়নকৌশল

‘জামদানিতে ফাঁকফোকর নেই’

মোস্তাফিজুরের কারখানায় তৈরি জামদানি শাড়ি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আছে আলফাডাঙ্গা উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা সারমীন ইয়াছমীনের। তিনি ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ওই বছরের ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত আলফাডাঙ্গা ইউএনও হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এই উপপরিচালক বলেন, ‘আমি নারায়ণগঞ্জ থেকেও বেশ কয়েকটি জামদানি শাড়ি কিনেছি। সেগুলোর থেকে মোস্তাফিজুরের শাড়ির গুণগত মান অনেক ভালো।’ তিনি বলেন, জামদানি শাড়িতে অনেক মারপ্যাঁচ আছে, দৈর্ঘ্যে প্রস্থে এক ইঞ্চি শাড়ি ছোট হলেও বিক্রেতার লাভ। তবে মোস্তাফিজুরের শাড়ির দৈর্ঘ্য যেমন বড়, প্রস্থও তেমন বড়। এককথায় বলা যায়, মোস্তাফিজুরের হাতের কাজ অসাধারণ এবং কোনো ফাঁকফোকর নেই।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর ‘রাজন জামদানি হাউস’ নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি মোস্তাফিজুরের জামদানি শাড়ি বিক্রি করে। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক নূর আলম বলেন, ‘মোস্তাফিজুরের জামদানি শাড়ি অরিজিনাল জামদানি। ওর কাজ অসাধারণ। এ কাজে ওর দক্ষতা শতভাগ।’

৩০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থের একটি টিনের ঘরে মোস্তাফিজুর রহমানের জামদানি শাড়ি তৈরির কারখানা। গত সোমবার ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার পানাইল গ্রামে
৩০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থের একটি টিনের ঘরে মোস্তাফিজুর রহমানের জামদানি শাড়ি তৈরির কারখানা। গত সোমবার ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার পানাইল গ্রামে

মোস্তাফিজুরের শাড়ির ক্রেতা আলফাডাঙ্গা উপজেলা সদরের বাসিন্দা দীপ্তি কুণ্ডুও। তিনি বলেন, ‘আমাদের গর্বের বিষয়, আলফাডাঙ্গাতেই উন্নত মানের শাড়ি প্রস্তুত করছেন মোস্তাফিজুর। যে মানের শাড়িতে মোস্তাফিজুর যে টাকা নেন, এ মানের একটি শাড়ি অন্য কোনো দোকানে গিয়ে কিনতে হলে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়। তাই মোস্তাফিজুরের শাড়িই আমাদের ভরসা।’

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিজের যোগ্যতায় তিনি প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন। নিজের পুঁজিতে যতটুকু করে যাওয়া সম্ভব, তাই তিনি করে যাচ্ছেন।

টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান বলেন, মোস্তাফিজুর এলাকার গর্ব। তাঁর তৈরি জামদানি শাড়ি সবার প্রিয় ও পছন্দের। তাঁর প্রত্যাশা, মোস্তাফিজকে ঘিরে এ এলাকায় জামদানি শাড়ি তৈরির একটি কেন্দ্র গড়ে তোলা হোক। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

ফরিদপুরে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিল শিক্ষা কর্মকর্তার লাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:১০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিল শিক্ষা কর্মকর্তার লাশ

ফরিদপুরের ভাঙ্গা পৌর এলাকায় গোপালগঞ্জ উপজেলা সদরের সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ রাজু ইসলাম (৩৬)-এর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ

শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ভাঙ্গা পৌরসভার পূর্ব হাসামদিয়া এলাকার মাতৃকুঞ্জ নামে একটি আবাসিক ভবনের চতুর্থ তলার ভাড়া বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নিহত শেখ রাজু ইসলাম গোপালগঞ্জ উপজেলা সদরে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার মউতলা গ্রামে। তিনি নুরুল ইসলাম শেখের ছেলে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার আতাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হ্যাপি আক্তারের স্বামী। তাদের সংসারে দুই কন্যা সন্তান রয়েছে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুর আনুমানিক ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে রশি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। বিষয়টি বুঝতে পেরে দ্রুত স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে নিচে নামানো হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে।

নিহতের স্ত্রী হ্যাপি আক্তার জানান, দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে তিনি বাসায় ফোন করেন। এ সময় তার মেয়েরা জানায়, তাদের বাবা ঘরের ভেতরে গলায় রশি দিয়েছেন। খবর পেয়ে তিনি দ্রুত বাসায় এসে স্বামীর ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান।

নিহতের জমজ ভাই শেখ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মায়ের ফোন পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে আসেন। বাসায় পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর উপরের তলা থেকে চিৎকার শুনে দৌড়ে গিয়ে ভাইয়ের মরদেহ দেখতে পান। ঘটনাটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।

এদিকে নিহতের ছোট মেয়ে আমেনা আক্তার (প্রায় ৪ বছর) জানায়, কিছুক্ষণ আগে তার বাবা তার পাশে শুয়ে ছিলেন। পরে তাকে পাশে না পেয়ে পাশের কক্ষে গিয়ে বাবাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়।

ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে তিনি জানান।

পুলিশ জানিয়েছে, এটি আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে—তা খতিয়ে দেখতে ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিহতের সহকর্মী ও স্বজনদের সঙ্গেও কথা বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সংবাদ প্রকাশের পর: জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে পদক্ষেপের ঘোষণা দিলেন এমপি বাবুল

সদরপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:২৯ অপরাহ্ণ
সংবাদ প্রকাশের পর: জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে পদক্ষেপের ঘোষণা দিলেন এমপি বাবুল

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাইশরশি জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন ফরিদপুর-৪ (সদরপুর, ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসন) আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। এরই প্রেক্ষিতে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টার দিকে এমপি বাবুল সরেজমিনে জমিদার বাড়িটি পরিদর্শন করেন এবং সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, এই জমিদার বাড়িটি আমাদের এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। এটিকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। ইতোমধ্যে আমরা এটি অধিদপ্তর-এর আওতায় এনে সংরক্ষণের চেষ্টা করছি।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা এই জমিদার বাড়ির বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি গুপ্তধনের আশায় বউঘাট খননের ঘটনাও এলাকায় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

শহিদুল ইসলাম বাবুলের এ ঘোষণায় এলাকাবাসীর মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।

ফরিদপুরে ৫ প্রাণহানির পরও নিরাপত্তাহীন কাফুরা রেলক্রসিং, নেই গেট-গেটম্যান—ঝুঁকিতে মানুষ

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৫০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ৫ প্রাণহানির পরও নিরাপত্তাহীন কাফুরা রেলক্রসিং, নেই গেট-গেটম্যান—ঝুঁকিতে মানুষ

ফরিদপুর সদর উপজেলার গেরদা ইউনিয়নের কাফুরা রেলক্রসিংটি দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই রেলক্রসিংয়ে নেই কোনো লেভেল ক্রসিং গেট, নেই গেটম্যান—ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন পথচারী ও যানবাহন চালকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুবার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি এই কাফুরা রেলক্রসিংয়েই ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় ট্রেন ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ৫ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন, যাদের তাৎক্ষণিকভাবে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকাগামী একটি ট্রেন রেলগেট অতিক্রম করার সময় একটি মাইক্রোবাস হঠাৎ লাইনের ওপর উঠে পড়লে এ সংঘর্ষ ঘটে। ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসটি প্রায় ৫০ গজ দূরে ছিটকে গিয়ে পাশের একটি পুকুরে পড়ে যায়।

দুর্ঘটনার সময় সেখানে কোনো গেট বা গেটম্যান না থাকাই বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে। এরপর স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে কর্তৃপক্ষ একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কাফুরা রেলক্রসিংয়ে এখনো নেই কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ট্রেন আসার সময় সতর্কবার্তা বা ব্যারিয়ার না থাকায় হঠাৎ করেই যানবাহন লাইনে উঠে পড়ছে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ওহিদুল ফকির বলেন, “প্রতিদিনই ভয় নিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। ট্রেন কখন আসবে, কোনো ধারণা থাকে না। দ্রুত এখানে গেটম্যান নিয়োগ জরুরি।”

অটোরিকশা চালক হামিদ শরীফ বলেন, “হঠাৎ ট্রেন চলে এলে দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় অল্পের জন্য বেঁচে যাই।”

এলাকার চা দোকানদার হেলাল বেপারি জানান, “ট্রেন এলে আমরা নিজেরাই রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করি।”

ঝালমুড়ি বিক্রেতা রফিক মোল্যা বলেন, “এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এত মানুষ মারা গেলেও কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই।”

চটপটি বিক্রেতা মো. হায়দার মন্ডল বলেন, “প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে এই রাস্তা দিয়ে। ঝুঁকি থাকলেও যেন কারো নজর নেই—এটা খুবই দুঃখজনক।”

এ বিষয়ে ফরিদপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার প্রহলাদ বিশ্বাস ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, “গেটম্যান নিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন।”

এ ব্যাপারে রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহাবুব হাসান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, এ ব্যাপারে পাকশীতে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনও এর কোনো সমাধান মিলেনি।

রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মোসা. হাসিনা খাতুন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “এটি সম্ভবত অননুমোদিত রেলগেট হওয়ায় গেটম্যান নেই। তবে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি। আমরা এলাকাবাসী ও ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুতই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সোহরাব হোসেন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “জননিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাইতো সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রীঘ্রই সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”