ফরিদপুরের শ্রেষ্ঠ এসআই প্রশান্ত কুমার মন্ডল
আয় একই থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে চরম বিপাকে পড়েছেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার সাধারণ মানুষ। কয়েক মাস আগেও যে বাজার ৫০০ টাকায় মোটামুটি হয়ে যেত, এখন সেই টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় সবজি, মাছ ও মসলার অল্প কিছু জিনিস কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে ক্রেতাদের। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা।
গত শুক্রবার সরকারি ছুটির সুযোগে আলফাডাঙ্গা সদর বাজারে বাজার করতে আসেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহ-ব্যবস্থাপক বেলাল হোসেন। সঙ্গে ছিল মাত্র ৫০০ টাকা। তিনি দুই কেজি আলু, বেগুন, কচুর মুখি, ধুন্দুল, পটল ও একটি লাউ কিনতেই প্রায় পুরো টাকা শেষ হয়ে যায়। এরপর মাছের বাজারে গিয়ে ৫০০ গ্রাম চাষের মাছ কিনে দেখেন বিল ৫০০ টাকারও বেশি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে এক কেজি আলু ফেরত দিয়ে মাছের দাম পরিশোধ করেন। বাড়ি ফিরে বুঝতে পারেন, স্ত্রী কাঁচামরিচ কিনতে বললেও টাকার অভাবে সেটি কেনা হয়নি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে বেলাল বলেন, “আয় তো বাড়েনি, কিন্তু খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আগে ৫০০ টাকায় এক সপ্তাহের প্রয়োজনীয় বাজারের অনেকটাই হয়ে যেত, এখন একদিনের বাজার করতেও টাকা কম পড়ে যাচ্ছে।”
একই ধরনের সংকটের কথা জানান আলফাডাঙ্গা পৌরসভার বাকাইল গ্রামের ভাঙারি ব্যবসায়ী আক্কাস বিশ্বাস। তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরোনো কাগজ, কার্টন, লোহা ও প্লাস্টিক সংগ্রহ করেন। আগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হলেও এখন সেই আয় কমে দাঁড়িয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। কারণ হিসেবে তিনি জানান, ভাঙারি পণ্যের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে যে কার্টনের কেজি ১৬ থেকে ১৮ টাকায় বিক্রি হতো, এখন সেটি মাত্র ৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আয় কমে গেলেও সংসারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আলফাডাঙ্গা সদর বাজার, গোপালপুর, জাটিগ্রাম ও হেলেঞ্চা হাট ঘুরে দেখা যায়, গত ছয় মাসের তুলনায় অধিকাংশ শাকসবজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাজারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি কম থাকায় অন্য জেলা থেকে আসা পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে বাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ সবজি বাইরের জেলা থেকে আসে। পরিবহন ব্যয়, বৃষ্টির কারণে সরবরাহ সংকট এবং মৌসুমি প্রভাবের কারণে দাম বেড়েছে।
বর্তমানে আলফাডাঙ্গা বাজারে আলু ৩০ টাকা, কাঁচামরিচ ১৬০ টাকা, পেঁয়াজ ৩০ টাকা, আদা ২৪০ থেকে ২৮০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, পটল ৭০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, কচুর মুখি ৭০ টাকা এবং ঢ্যাঁড়স ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লাউ ও চালকুমড়া আকারভেদে ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং স্থানীয় পুঁইশাক, কলমিশাক ও লালশাক ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজি বিক্রেতা ফারুক হোসেন মিয়া বলেন, পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। তাই কম দামে বিক্রির সুযোগ নেই। শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করলে দাম কিছুটা কমতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শুধু সবজি নয়, মাছের বাজারেও বেড়েছে দাম। মাছ ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্র জানান, বর্ষা মৌসুম হলেও নদীতে মাছ কম ধরা পড়ছে। দেশীয় মাছের দাম এখন ৮০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। চাষের রুই, কাতলা, সিলভার কার্প ও গ্রাস কার্পের মতো মাছও এখন ৩০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।
আরেক মাছ ব্যবসায়ী পবন দাশ বলেন, স্থানীয়ভাবে মাছের উৎপাদন কম হওয়ায় খুলনা, বাগেরহাট ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে মাছ আনতে হয়। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়ছে।
আলফাডাঙ্গা সদর বাজার সবজি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জুদ্দু মিয়া বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে সবজির দাম কিছুটা বাড়ে। তবে এবার সরবরাহ কম থাকায় দাম আরও বেশি। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজার তদারকি জোরদার এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। বর্তমানে সংসারের বাজেট সামলাতে অনেক পরিবারকেই প্রয়োজনীয় পণ্য কম কিনে কিংবা তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
ফরিদপুরে ইজিবাইক চালক কিশোর মো. নাঈম শেখ (১৫)-কে শ্বাসরোধ করে হত্যা, মরদেহ মাটি চাপা দিয়ে ইজিবাইক ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুই যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাদের ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অপর একটি ধারায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী দুটি সাজা একসঙ্গেই কার্যকর হবে, ফলে তাদের যাবজ্জীবন সাজাই কার্যকর থাকবে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুরে ফরিদপুরের জেলা ও দায়রা জজ (পারিবারিক আপিল আদালতের বিচারক) অশোক কুমার দত্ত এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে পুলিশ পাহারায় তাদের জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, ফরিদপুর সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের লোকমানখার ডাঙ্গী গ্রামের আছমত শেখ (২৩) ও সাগর মোল্লা (৩২)। নিহত নাঈম শেখ একই ইউনিয়নের গোয়ালের টিলা গ্রামের বাসিন্দা মো. সামসু শেখের ছেলে।
মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২১ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে নাঈম তার ইজিবাইক নিয়ে যাত্রী পরিবহনের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। সারাদিন পার হলেও তিনি বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। ফোনটি বন্ধ পাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু হলেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
পরদিন ২২ এপ্রিল ভোরে লোকমানখার ডাঙ্গী এলাকায় চোরাই ইজিবাইকসহ আছমত ও সাগরকে আটক করে পুলিশ। পরে উদ্ধার হওয়া ইজিবাইকটি নাঈমের বলে শনাক্ত হয়।জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা নাঈমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা এবং মরদেহ নিজেদের বাড়ির পাশের একটি স্থানে মাটি চাপা দেওয়ার কথা স্বীকার করে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মাটিচাপা দেওয়া মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় ওইদিন বিকেলে নিহতের বড় ভাই মো. রাশেদ শেখ বাদী হয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় আছমত শেখ, সাগর মোল্লা এবং ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করলে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত এ রায় দেন।
সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) শাহ মো. আজিজুর রহমান বলেন, “আদালতের রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। দুটি সাজা একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় দণ্ডপ্রাপ্তদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই ভোগ করতে হবে। মামলার অপর আসামি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিচার শিশু আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।”
পারফরমেন্স বেজড গ্র্যান্টস ফর সেকেন্ডারি ইনস্টিটিউশনস (PBGSI) স্কিমের আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের উপজেলা/থানা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক পুরস্কারের (UBTA/TBTA) জন্য দেশের ৪৯৫টি উপজেলা ও থানার মোট ৯৯০ জন শিক্ষক নির্বাচিত হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তারা এখনো ঘোষিত পুরস্কার পাননি। এতে নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে গুণগত মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের কর্মদক্ষতাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে PBGSI স্কিমের আওতায় প্রতিবছর উপজেলা ও থানা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচন করা হয়। নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে শিক্ষাদানের মান, শিক্ষার্থীদের ফলাফল, উদ্ভাবনী উদ্যোগ, সহশিক্ষা কার্যক্রমে ভূমিকা, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নে অবদানের ভিত্তিতে শিক্ষক নির্বাচন করা হয়।
নির্বাচনের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের তথ্য যাচাই-বাছাই এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রেরণের নির্দেশনা দেয়। সেই প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু অর্থবছর শেষ হলেও এখনো পুরস্কার বিতরণের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় নির্বাচিত শিক্ষকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ, একই অর্থবছরে PBGSI স্কিমের আওতায় নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণ সম্পন্ন হলেও শ্রেষ্ঠ শিক্ষকরা এখনো ঘোষিত সম্মাননা থেকে বঞ্চিত। এতে তারা নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাচিত শিক্ষক বলেন, “এই স্বীকৃতি শুধু একটি পুরস্কার নয়; এটি একজন শিক্ষকের পেশাগত সম্মান, প্রেরণা ও কাজের মূল্যায়নের প্রতীক। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও পুরস্কার না পাওয়ায় আমরা হতাশ। দ্রুত বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত।”
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সময়মতো এমন স্বীকৃতি প্রদান করলে শিক্ষকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মান উন্নয়নে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়। বিপরীতে অযৌক্তিক বিলম্ব শিক্ষকদের মনোবলকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নির্বাচিত শিক্ষকরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঘোষিত পুরস্কার দ্রুত প্রদান করা হবে, যাতে শিক্ষকদের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায় এবং দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে তাদের উৎসাহ আরও বৃদ্ধি পায়।
আপনার মতামত লিখুন
Array