খুঁজুন
, ,

ফরিদপুরে ফুটপাত দখলে পথচারীদের দুর্ভোগ, ব্যাহত স্বাভাবিক চলাচল

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫, ২:২২ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ফুটপাত দখলে পথচারীদের দুর্ভোগ, ব্যাহত স্বাভাবিক চলাচল

ফরিদপুর পৌর এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ফুটপাত দখল করে দোকানপাট ও ভাসমান ব্যবসা বসানোর কারণে পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নির্ধারিত ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে।

শহরের জনতা ব্যাংক মোড়, হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজারের সামনের সড়ক, থানা মোড়, গোয়ালচামট সড়কসংলগ্ন এলাকায় দেখা গেছে, ফুটপাতের অধিকাংশ অংশ দখল করে অস্থায়ী দোকান, চা-স্টল ও ফলের দোকান বসানো হয়েছে। কোথাও কোথাও স্থায়ী দোকান মালিকরাও দোকানের সামনের ফুটপাত পুরোপুরি দখল করে রেখেছেন। ফলে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

রহিমা বেগম নামে এক পথচারী ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’কে বলেন, “ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনো জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে গাড়ি চলাচলের রাস্তায় নামতে হয়। এতে সব সময় দুর্ঘটনার ভয় থাকে।” আরেকজন জানান, সন্ধ্যার পর অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

জনতা ব্যাংকের মোড়ের সালাম নামের ভাসমান এক শীতের পোশাক বিক্রেতা ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’কে বলেন, ‘কারো অনুমতি না নিয়েই এখানে বসেছি। এখানে বসার জন্য কাউকে কোনো ভাড়া দিতে হয়না। পৌরসভা কিংবা জেলা প্রশাসনের অনুমতিরও দরকার হয়না’

তবে রাজবাড়ির খানখানাপুর এলাকা থেকে আসা মো. শাহিন নামের এক দোকানদার ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’কে বলেন, ‘স্থায়ী দোকানের সামনের মালিকদের প্রতিদিন চাঁদার নামে ৫’শ টাকা বকশিস দিতে হয়। এছাড়া দোকান না খুললেও মাসে ১৫ হাজার টাকা গুনতে হয়।’

এছাড়া আরেক দোকানদার অনিক মিয়া বলেন, ‘ভাড়া কিংবা অনুমতির বিষয়টি দোকান মালিক জানে। আমি তার কর্মচারী।’

পৌরসভার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ‘অভিযান পরিচালনার পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও পরে আবার ফুটপাত দখল হয়ে যায়।’

এ ব্যাপারে ফরিদপুরের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সভাপতি আবরাব নাদিম ইতু ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘কে বলেন, ‘প্রশাসন দুই দিন পর পর বলে থাকেন তারা ব্যবস্থা নিবে। কিন্তু তাদের বলার মধ্যেই কথাগুলো সীমাবদ্ধ থাকে। এতে ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ মানুষদের।’

এ ব্যাপারে ফরিদপুর পৌরসভার প্রশাসক মো. সোহরাব হোসেন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘কে বলেন, ‘ফরিদপুর পৌরসভা থেকে অনুমতি নিতে একটা প্রসিডিউর মেইনটেইন করতে হয়। সেটা তারা করেনি ও অনুমতি নেইনি। আমরা অবৈধ ভাসমান দোকানগুলোর বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালাচ্ছি। শাস্তিও দেওয়া হচ্ছে। শহরের যানজট নিরসনে শিগগিরই নতুন করে উচ্ছেদ অভিযান জোরদার করা হবে এবং অবৈধভাবে ফুটপাত দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। তবে কিছু ব্যবসায়ী বারবার নির্দেশনা অমান্য করছেন।”

সচেতন মহলের মতে, ফুটপাত পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তারা মনে করেন, নিয়মিত মনিটরিং ও স্থায়ী সমাধান ছাড়া এ সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না।

ফরিদপুরে অবৈধভাবে খাল থেকে বালু উত্তোলন, ব্যবসায়ীকে জরিমানা

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৬:২২ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে অবৈধভাবে খাল থেকে বালু উত্তোলন, ব্যবসায়ীকে জরিমানা

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ও তুজারপুর ইউনিয়নে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে বন্ধে একজনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকালে ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ইউনিয়নের সুলিনা গ্রামে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ভাঙ্গা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সাদরুল আলম সিয়াম এ অভিযান পরিচালনা করেন।

অভিযান চলাকালে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মো. মিরাজ হাওলাদার নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তিনি পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার পাখিমারা গ্রামের হারুন হাওলাদারের ছেলে। পরে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযুক্ত মিরাজকে “বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০”-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয় ও জরিমানার অর্থ তৎক্ষনাৎ আদায়পূর্বক সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থানের বিষয়টি জানানো হয়।

ভাঙ্গা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদরুল আলম সিয়াম জানান, অনুমোদন ও আইনগত বিধিবিধান উপেক্ষা করে বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নদী, খাল ও আশপাশের জমির ক্ষতি হতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ফরিদপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গুতে গৃহবধূর মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৪২ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গুতে গৃহবধূর মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে নাসরিন সুলতানা (৩০) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। টানা চার দিন ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করার পর শুক্রবার (২১ আগস্ট) দুপুর ১টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

​নিহত নাসরিন সুলতানা ভাঙ্গা পৌরসভার চৌধুরীকান্দা সদরদী এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখের স্ত্রী।

​স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ আগস্ট প্রচণ্ড জ্বর ও তীব্র শরীর ব্যথা নিয়ে নাসরিন প্রথমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে যান। সেখানে ডাক্তারদের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করানো হলে তার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত হয়। শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ওই দিনই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়।

​পরের দিনগুলোতে নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হলেও তার জ্বর ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ দ্রুত কমতে শুরু করে। শুক্রবার দুপুরের দিকে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

​নিহতের স্বজনরা আক্ষেপ করে জানান, প্রাথমিক অবস্থায় কেবল সাধারণ মৌসুমী জ্বর মনে করা হলেও রক্ত পরীক্ষার পর ডেঙ্গুর বিষয়টি স্পষ্ট হয়। দ্রুততম সময়ে হাসপাতালে নেওয়া সত্ত্বেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। গৃহবধূর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

​এদিকে খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ভাঙ্গা পৌরসভাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় অধিবাসীরা অভিযোগ করছেন, সঠিক সময়ে মশা নিধন ও এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়ায় দিন দিন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

​এ বিষয়ে ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, “গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নাসরিন সুলতানা নামের ওই নারীর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।”

​তিনি আরও জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে হাসপাতালগুলোতে আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হচ্ছে। তবে কেবল চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রোধে সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখার জন্য সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

‘সেই দুরন্ত শৈশবের দিনগুলি’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ
‘সেই দুরন্ত শৈশবের দিনগুলি’

মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় থাকে, যেগুলো পেরিয়ে যাওয়ার পরও কখনো সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যায় না। বয়স বাড়ে, চুলে পাক ধরে, কাঁধে দায়িত্ব জমে, জীবনের হিসাব-নিকাশ জটিল হয়ে ওঠে—তবুও হঠাৎ কোনো বৃষ্টিভেজা দুপুর, কাঁচা আমের টক গন্ধ কিংবা দূরের কোনো মাঠে শিশুদের হৈচৈ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় বহু বছর আগের সেই দুরন্ত দিনগুলোতে। তখন মনে হয়, আহা! যদি আর একবার ফিরে পাওয়া যেত সেই শৈশব!

আমাদের শৈশব ছিল না মোবাইলের পর্দায় বন্দি। ছিল না সারাদিনের ব্যস্ততার অজুহাত। আমাদের পৃথিবী ছিল বিশাল—যদিও সেই পৃথিবীটা ছিল একটি ছোট্ট গ্রাম, কয়েকটি মাটির রাস্তা, সবুজ ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়, পুকুর আর বিকেলের খেলার মাঠ নিয়ে।

সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙত। কখনো মা রাগ করে বলতেন, “আর কত ঘুমাবি? স্কুলে যাবি না?” চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানা থেকে উঠতাম। তাড়াহুড়ো করে মুখ ধুয়ে, কখনো অর্ধেক ভাত খেয়ে, বই-খাতা বগলে নিয়ে ছুটতাম স্কুলের দিকে। পথে দেখা হতো বন্ধুদের সঙ্গে। তারপর শুরু হতো দৌড় প্রতিযোগিতা—কে আগে স্কুলে পৌঁছাতে পারে!

কিন্তু স্কুলে যাওয়ার পথটা কখনোই শুধু স্কুলে যাওয়ার পথ ছিল না। রাস্তার পাশের গাছ থেকে কাঁচা আম পাড়ার পরিকল্পনা, কার পুকুরে আজ মাছ ধরতে নামা যাবে, বিকেলে কোথায় ক্রিকেট খেলা হবে—সব সিদ্ধান্ত হয়ে যেত সেই পথেই। কোনোদিন শিক্ষক দেখলে ভয়ে দৌড়ে ক্লাসে ঢুকতাম, আবার কোনোদিন বৃষ্টির কারণে স্কুল ছুটি হলে আনন্দে মনে হতো, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ আজ আমাদের হাতে এসে ধরা দিয়েছে।

বর্ষার দিনগুলো ছিল আরও অন্যরকম। আকাশ কালো হয়ে এলেই মন নেচে উঠত। বৃষ্টি নামলেই বই-খাতা ফেলে ছুটে যেতাম উঠানে। মা যতই বকুন, “বৃষ্টিতে ভিজিস না, জ্বর হবে”—আমাদের কে শোনে কার কথা! টিনের চাল থেকে ঝরে পড়া পানির নিচে দাঁড়িয়ে গোসল করা, কাদার মধ্যে ফুটবল খেলা, রাস্তার জমে থাকা পানিতে কাগজের নৌকা ভাসানো—এসবের মধ্যে যে আনন্দ ছিল, আজকের দামী বিনোদনেও তা খুঁজে পাওয়া যায় না।

শীতের সকালেও ছিল অন্যরকম উন্মাদনা। কুয়াশা ভেদ করে স্কুলে যাওয়া, খেজুরের রস খাওয়া, মাঠে শিশিরভেজা ঘাসের ওপর খালি পায়ে দৌড়ানো—সবকিছুই ছিল এক অদ্ভুত সুখে ভরা। কখনো কারও বাড়ির গাছ থেকে বরই পেড়ে পালিয়েছি, আবার ধরা পড়ে কান মলে ক্ষমাও চেয়েছি। সেই সময় অপরাধও ছিল নিষ্পাপ। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনি খেয়ে একটু কেঁদেছি, তারপর আবার ভাত খেয়ে সব ভুলে গেছি।

বিকেল ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় সময়। স্কুল থেকে ফিরে কোনোমতে বইখাতা ছুড়ে রেখে মাঠের দিকে ছুটতাম। কেউ ফুটবল নিয়ে আসত, কেউ ক্রিকেটের ব্যাট। বল না থাকলে মোজা গুটিয়ে বল বানানো হতো। ব্যাট না থাকলে গাছের ডালই যথেষ্ট ছিল। খেলার নিয়ম নিয়ে ঝগড়া হতো, কেউ আউট মানতে চাইত না, কেউ রাগ করে বাড়ি চলে যেত। কিন্তু একটু পরেই আবার তাকে ডাকতে যেতাম—“আয় রে, তুই না খেললে খেলা জমে না।”

সন্ধ্যা নামলে বাড়ি ফেরার সময় হতো। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত, পাখিরা গাছে ফিরত, আর মায়েদের ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত—“কোথায় গেলি? বাড়ি আয়!” তবুও আমরা আরও পাঁচ মিনিট খেলার জন্য অনুরোধ করতাম। সেই পাঁচ মিনিট কখনো শেষ হতো না।

রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে আনন্দ যেন আরও বেড়ে যেত। উঠানে বসে গল্প, ভূতের ভয়, দাদী-নানীর মুখে রাজা-রানীর গল্প—সবকিছু মিলে অন্য এক পৃথিবী। কখনো জোনাকি পোকা ধরে হাতের মুঠোয় রাখতাম। তারপর আবার ছেড়ে দিতাম অন্ধকারে। জোনাকির ছোট্ট আলো দেখে মনে হতো, রাতের আকাশের তারাগুলো বুঝি মাটিতে নেমে এসেছে।

আজ অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। সেই গ্রামের পথ হয়তো বদলে গেছে। কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে, খেলার মাঠে উঠেছে বাড়ি, পুকুর ভরাট হয়েছে। সেই বন্ধুরা কেউ চাকরি নিয়ে শহরে, কেউ বিদেশে, কেউ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা না হলে মন খারাপ হতো, আজ তাদের সঙ্গে দেখা হয় বছরের পর বছর পর।

কখনো পুরোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে আমরা হাসতে হাসতে বলি, “মনে আছে, সেদিন তুই গাছে উঠে আটকে গিয়েছিলি?” কিংবা “মনে আছে, বৃষ্টির মধ্যে খেলতে গিয়ে কাদায় পড়ে কী অবস্থা হয়েছিল?”

তারপর হঠাৎ করেই হাসির আড়ালে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে।

কারণ আমরা দুজনেই জানি—সেই দিনগুলো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।

শৈশব আসলে জীবনের এমন এক ঋতু, যেখানে হারানোর ভয় ছিল না, ভবিষ্যতের চিন্তা ছিল না, পকেটে টাকা না থাকলেও আনন্দের অভাব ছিল না। একটি বিকেল, কয়েকজন বন্ধু আর একটু খোলা মাঠ—এই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ।

আজ আমরা বড় হয়েছি। হাতে স্মার্টফোন, সামনে অসংখ্য সুযোগ, জীবনে অনেক দায়িত্ব। তবুও কখনো কখনো মন চায় সবকিছু ফেলে আবার সেই মাটির রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটতে। বৃষ্টিতে ভিজতে। বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করতে। মায়ের বকুনি খেতে। সন্ধ্যা না হওয়া পর্যন্ত মাঠে খেলতে।

কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। সে কাউকে ফিরে যেতে দেয় না।

তবুও সেই দুরন্ত শৈশব আমাদের ভেতরে কোথাও রয়ে গেছে। পুরোনো কোনো গানের সুরে, বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে, কাঁচা আমের গন্ধে কিংবা গ্রামের পথের ধুলোর মধ্যে সে হঠাৎ জেগে ওঠে।

আর তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে।

মনে হয়, দূরে কোথাও ছোট্ট একটি ছেলে এখনও দৌড়ে যাচ্ছে—খালি পায়ে, ধুলো উড়িয়ে, বন্ধুদের ডাকতে ডাকতে।

সেই ছেলেটি হয়তো আর কেউ নয়।

সেই ছেলেটি—আমি।

আর তার পেছনে পড়ে আছে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে নির্ভার, সবচেয়ে দুরন্ত সময়–সেই শৈশব।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।