ভোরের শিশিরকণায় শীতের বার্তা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষনা করেছেন ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম রিংকু। বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে তৈরি করা ইশতেহারে ১৯টি বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (০৫ জানুয়ারি) বিকেলে নগরকান্দা উপজেলার লস্কারদিয়া ইউনিয়নের লস্কারদিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন শামা ওবায়েদ।
লিখিত ইশতেহার ঘোষণা করে শামা ওবায়েদ বলেন, সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার জন্য সম্পূর্ণ পরিকল্পনাভিত্তিক দুটি পৃথক মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন ও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। উভয় উপজেলার প্রতিটি গ্রামকে ধাপে ধাপে আদর্শ গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলা হবে। গ্রামগুলোতে পরিকল্পিত বসতি, নিরাপদ সড়ক, ড্রেনেজ, সবুজায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। প্রতিটি বাজার এলাকায় পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে ৫০ ভাগের বেশি বেকার মহিলা ও যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, বিদ্যমান অপরিকল্পিত ৪০ টি বাজারকে পুনঃনকশা করে একটি টেকসই ও আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে তোলা হবে। পাটনির্ভর কুটির শিল্প সম্প্রসারণের ভিত্তিতে গ্রামীণ নারী ও যুবকদের প্রশিক্ষণ প্রদানপূর্বক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। পারিবারিক কুটির শিল্পকে প্রণোদনার মাধ্যমে উৎসাহিত করে ঘরে ঘরে কুটির শিল্প স্থাপন করা হবে। মসজিদ-মাদ্রাসা, সকল মন্দিরের ও সংস্থার আধুনিকায়নে কাজ করা হবে। ইলেকট্রনিক ভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে। তরুণ সমাজের জন্য সহজ শর্তে ঋণের মাধ্যমে ২০ হাজার কম্পিউটার বিতরণ করা হবে।
শামা ওবায়েদ বলেন, প্রযুক্তি নির্ভর ও রপ্তানি ভিত্তিক কলকারখানা স্থাপন করা হবে এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। স্থানীয় কৃষকদের বিনামূল্যে সমযোপযোগী আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সহায়তা এবং গবেষণালব্ধ সর্বাধুনিক জ্ঞানের প্রযোগের মাধ্যমে উৎকর্ষ সাধনের লক্ষে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। খামারিদের জন্য আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করা হবে। কৃষকের উৎপাদিত ফসল সংরক্ষন ও বিপনন সু-ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, সালথার ৩৫০ কিমি ও নগরকান্দার ৫৩৮ কিমি সড়ক পুনঃসংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হবে। পাশাপাশি সালথার ৫৪ কিলোমিটার এবং নগরকান্দার ৩৩৯ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকাকরণ করা হবে। এছাড়াও নতুনভাবে দুই উপজেলায় মোট ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ও ভরাট হয়ে যাওয়া কুমার নদী সংলগ্ন সকল উপনদী, খাল, বিল, তথা প্রাকৃতিক জলাশয় পুনরুদ্ধার করে পুনঃখননের মাধ্যমে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। পারিবারিক বাগান, সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণ এবং প্রকল্পভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাকৃতিক বনায়ন গড়ে তুলে পরিবেশের তাপমাত্রা হ্রাস করা হবে। একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সবুজায়ন নিশ্চিত করা হবে।
শামা ওবায়েদ বলেন, গ্রাম, শহর ও নগর এলাকায় সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পরিচালনার মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা হবে। বাজার ভিত্তিক পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হবে। দুই উপজেলায় বিদ্যমান ৩১০ টি স্কুল, ১ টি কলেজ ও ২৪ টি মাদ্রাসা আধুনিকায়ন করা হবে এবং নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা হবে। যার মাধ্যমে প্রতিটি ঘরে সুশিক্ষিত পরিবার নিশ্চিত করা হবে। পর্যাপ্ত সুবিধাদি ও স্বাস্থ্যসেবা সহ শিশু বান্ধব বিদ্যালয়, যুগোপযোগী আইসিটি ভিত্তিক শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা হবে।
প্রতিটি ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক শক্তিশালী করন, বর্ধিত জনসংখ্যার অনুপাতে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রযোজনীয় নার্সিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আনুপাতিক হারে নার্স প্র্যাকটিশনার নিযোগ করা হবে। উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ক্লিনিক স্থাপন ও বিদ্যমান ক্লিনিকের সক্ষমতা বৃদ্ধি পূর্বক মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠির জন্য বিশেষ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করা হবে। যুব সমাজের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে খেলার মাঠ, ক্রীড়া সুবিধা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা হবে। ছাত্র সমাজ ও যুব সমাজের জন্য এলাকার বিভিন্ন উপযুক্ত জায়গায় খেলার মাঠ তৈরী করা হবে।
শামা ওবায়েদ আরো বলেন, নারী সমাজের শিক্ষা, নিরাপত্তা, এবং তাদের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিরশনে প্রয়াশে দুই উপজেলায় দুটি সেল গঠন করা হবে। সেলটি নারী আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মীদের দ্বারা গঠিত হবে। নগরকান্দা ও সালথায় প্রবাসীদের সমস্যা গুলো সার্বিক ভাবে দেখার প্রতিশ্রুতি। প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ছেলে-মেয়েদের জন্য লাইব্রেরী ব্যবস্থা করা হবে। শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ ও সোলার বিদ্যুৎ সংযোগ। উপজেলা ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন) আসনে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের নতুন বার্তা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মিজানুর রহমান মোল্লা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে ১১ দলীয় ইসলামী জোটের প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মাওলানা সরোয়ার হোসেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দিয়েছেন।
খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মিজানুর রহমান মোল্লা রিকশা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচনী মাঠ ছাড়ার ঘোষণা দেন। বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা মিজানুর রহমান মোল্লা বলেন, “সারাদেশে ১১ দলীয় ইসলামী জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু ফরিদপুর-৪ আসনে শুরুতে উন্মুক্ত থাকায় জোটভুক্ত দুই দলের দুইজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। এতে জোটের বিজয় ও ইসলামের পক্ষে ফলাফল অনিশ্চিত হয়ে পড়ছিল। সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা সরোয়ার হোসেনকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তিনি আরও জানান, দলের আমির আল্লামা মামুনুল হকের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং দলীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। “আমি প্রায় দুই বছর ধরে ফরিদপুর-৪ আসনের তিনটি থানায় গণসংযোগ ও নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছি। শেষ পর্যন্ত জোটের সম্মান ও ইসলামী ঐক্যের স্বার্থে এই ত্যাগ স্বীকার করেছি। ইনশাআল্লাহ, এখন এই আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীই বিজয়ী হবেন,”—যোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা সরোয়ার হোসেন খেলাফত মজলিসের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, “ফরিদপুর-৪ আসনে ১১ দলীয় জোটের দুইজন প্রার্থী ছিলেন। আমার জোটের ছোট ভাই মাওলানা মিজানুর রহমান মোল্লা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে আমাকে সমর্থন জানিয়েছেন। এটি ইসলামী ঐক্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখন আমাদের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।”
তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত হলে ন্যায়, ইনসাফ ও ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন। এই ঐক্যের ফলে ফরিদপুর-৪ আসনে নির্বাচনী সমীকরণ নতুনভাবে সাজানো হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
গ্রাম বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শীতের আবহকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ফরিদপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব গঙ্গাবর্দীতে অবস্থিত ব্র্যাক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয়েছে দিনব্যাপী পিঠা উৎসব। ব্যতিক্রমধর্মী এই আয়োজনে বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। রঙিন ব্যানার, সাজানো স্টল আর শিশুদের কোলাহলে পুরো এলাকা যেন পরিণত হয় এক গ্রামীণ মেলায়। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বাড়ি থেকে হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা নিয়ে আসে। ভাপা পিঠা, পাটিসাপটা, চিতই, দুধ চিতই, পুলি, নকশি পিঠাসহ নানা স্বাদের পিঠায় ভরে ওঠে স্টলগুলো। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পিঠার দাম নির্ধারণ করা হয় ৫ টাকা থেকে ৫০ টাকার মধ্যে।
সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলা এ উৎসবে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় এলাকাবাসীর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে এসে পিঠার স্বাদ গ্রহণ করেন এবং শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেন।
অভিভাবকরা জানান, এমন আয়োজন শিশুদের শিকড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে এবং বইয়ের বাইরের বাস্তব শিক্ষা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে শিশুদের আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দক্ষতা বাড়াতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
উৎসবে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জানায়, পড়াশোনার পাশাপাশি এমন আনন্দঘন আয়োজন তাদের মানসিক প্রশান্তি দেয়। কেউ কেউ নিজ হাতে পিঠা তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে আয়-ব্যয়ের ধারণা পেয়েছে, যা ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে তাদের আগ্রহ বাড়াবে বলে মনে করে তারা।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর সদরের উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. ইকবাল হাসান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির ম্যানেজার (ফিল্ড অপারেশন) প্রসেনজিৎ বিশ্বাস এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. লিটন ইসলাম।
অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন, শিক্ষার্থীদের মাঝে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চায় এ ধরনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে এমন কার্যক্রম আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বহুমাত্রিক বিকাশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
দিনব্যাপী এই পিঠা উৎসব বিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে পরিণত করে এক আনন্দঘন মিলনমেলায়, যেখানে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সুন্দর সমন্বয় নতুন প্রজন্মের মনে গেঁথে দেয় গ্রাম বাংলার চিরচেনা স্বাদ ও অনুভূতি।
আপনার মতামত লিখুন
Array