ফরিদপুর নিখোঁজের তিনদিন পর আখক্ষেতে মিলল নির্মাণশ্রমিকের মরদেহ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে দাফন করা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার দাবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন ফরিদপুরের এক আওয়ামী লীগ নেতা। ঘটনাটি ঘিরে জেলাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া, ক্ষোভ ও বিতর্ক।
রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-দপ্তর বিষয়ক সম্পাদক মতিউর রহমান শিপলু তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট দেন। পোস্টে তিনি ওসমান হাদির দাফনস্থল নিয়ে আপত্তি তুলে মরদেহ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। শিপলু আলফাডাঙ্গা উপজেলার সদর ইউনিয়নের বারইপাড়া গ্রামের মৃত মুন্নু মিয়ার ছেলে।
পোস্টটি প্রকাশের পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা এর তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। অনেকেই এটিকে ‘অসংবেদনশীল’ ও ‘অশোভন’ মন্তব্য হিসেবে আখ্যা দেন। সমালোচনার মুখে পড়ে পোস্ট দেওয়ার মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় সেটি মুছে ফেলেন ওই আওয়ামী লীগ নেতা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মতিউর রহমান শিপলু বলেন, “আমি ওসমান হাদিকে নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। পরে বুঝতে পেরেছি এটি করা ঠিক হয়নি। তাই পোস্টটি ডিলিট করে দিয়েছি। এ বিষয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না।” তার এই স্বীকারোক্তির পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা থামেনি।
অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। ফরিদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক কাজী রিয়াজ বলেন, “ওসমান হাদি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি আদর্শের প্রতীক। দেশের স্বার্থে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে। জাতীয় কবির সমাধির পাশে তাকে দাফন করা হয়েছে সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে। এমন একজন দেশপ্রেমিকের মরদেহ সরানোর দাবি চরম ধৃষ্টতা ও অশ্রদ্ধার পরিচয়।”
তিনি আরও বলেন, “এই ধরনের মন্তব্য কেবল ব্যক্তি নয়, জাতির চেতনার ওপর আঘাত হানে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্য থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।”
গত ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে দাফন করা হয়। রাজনৈতিক সচেতনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি তরুণদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।
বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শহিদদের অধিকার রক্ষা, গণতান্ত্রিক চেতনা জাগ্রত করা এবং বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে ওসমান হাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে তার সহকর্মীরা দাবি করেন। তার মৃত্যু এবং দাফনকে কেন্দ্র করে তখনও নানা মহলে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য একটি মন্তব্যও দ্রুত ভাইরাল হয়ে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে মতিউর রহমান শিপলুর পোস্ট তারই একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে দেখলেও অনেকেই প্রকাশ্যে এমন মন্তব্যকে ‘দলীয় ভাবমূর্তির পরিপন্থী’ বলে মনে করছেন।
ঘটনাটি নতুন করে রাজনৈতিক শালীনতা, মত প্রকাশের সীমা এবং জাতীয় ব্যক্তিত্বদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি সামনে এনে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে মন্তব্য করার আগে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, যাতে সমাজে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন ও উত্তেজনা তৈরি না হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ফরিদপুরের রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দলীয় প্রভাব এবং ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয়ে এবারের নির্বাচনে যে ফলাফল এসেছে, তা শুধু বিজয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; বরং রাজনীতির ভেতরের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চারটি সংসদীয় আসনে মোট ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন তিনজন। শেষ পর্যন্ত বিজয়ের হাসি ফুটেছে দুই নারী প্রার্থীর মুখে—ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম (রিংকু) এবং ফরিদপুর-৩ আসনে চৌধুরী নায়াব আহমেদ ইউসুফ।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ফলাফল প্রমাণ করেছে—রাজনীতিতে উত্তরাধিকার একটি ভিত্তি তৈরি করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় নির্ধারণ করে জনগণের আস্থা, মাঠপর্যায়ের সংযোগ এবং সাংগঠনিক দক্ষতা।
ফরিদপুর-২: ঐতিহ্য থেকে নেতৃত্বে উত্তরণ:
সালথা-নগরকান্দা আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ ভোট পেয়ে প্রায় ৩২ হাজারের বেশি ব্যবধানে বিজয়ী হন। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই আসনে তাঁর জয়কে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার সফল প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
প্রয়াত বিএনপি মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুর রহমানের কন্যা হিসেবে তাঁর পরিচিতি থাকলেও, নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি নিজেকে একজন স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, “উত্তরাধিকার কোনো সুবিধা নয়, এটি দায়িত্ব। মানুষের আস্থা অর্জনই আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।”
নির্বাচনের আগে ও পরে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি গ্রামীণ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। বিশেষ করে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার ও আধুনিক সংরক্ষণাগার স্থাপন, নারীদের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
তিনি আরও বলেন, “রাজনীতি আমার কাছে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি দায়িত্বপূর্ণ পথ।” তাঁর এই বার্তাই গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া তৈরি করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ফরিদপুর-৩: শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নের অঙ্গীকার:
ফরিদপুর সদর আসনে চৌধুরী নায়াব আহমেদ ইউসুফ ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। এই আসনটি ঐতিহ্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তাঁর জয়কে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা “আস্থা পুনরুদ্ধারের বিজয়” হিসেবে উল্লেখ করছেন।
সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের কন্যা হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি থাকলেও, তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কার্যক্রম ও মহিলা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। ফলে এবারের নির্বাচনে তিনি শুধু পারিবারিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করেননি; বরং নিজের সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জন করেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, তাঁর প্রধান লক্ষ্য ফরিদপুর শহরকে একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও নিরাপদ নগরীতে রূপান্তর করা। এর মধ্যে রয়েছে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শহরের অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
নায়াব ইউসুফ বলেন, “মানুষ এখন শুধু অতীতের স্মৃতির ওপর নির্ভর করে না, তারা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখে সিদ্ধান্ত নেয়। আমি সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে চাই।”
নারী নেতৃত্ব: প্রতীক থেকে বাস্তব শক্তিতে:
ফরিদপুরের চারটি আসনে তিনজন নারী প্রার্থী অংশ নিলেও দুইজনের বিজয় স্থানীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। একসময় যেখানে নারী প্রার্থিতা ছিল ব্যতিক্রম, এখন তা নির্বাচনী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে পারিবারিক রাজনৈতিক পটভূমি একটি প্রাথমিক স্বীকৃতি তৈরি করে। তবে শেষ পর্যন্ত বিজয় নির্ভর করে মাঠপর্যায়ের যোগাযোগ, ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমের ওপর। এবারের নির্বাচনে সেই বাস্তবতাই প্রতিফলিত হয়েছে।
দুই নারী নেত্রীর রাজনৈতিক বক্তব্যে একটি সাধারণ বিষয় স্পষ্ট—তাঁরা রাজনীতিকে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হিসেবে নয়, বরং দায়িত্ব ও সেবার ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরছেন। শামা ওবায়েদ ইসলাম যেখানে গ্রামীণ অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছেন, সেখানে নায়াব ইউসুফ শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা বলছেন।
বৃহত্তর রাজনৈতিক চিত্র:
ফরিদপুরের চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপি এবং একটি আসনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। ফলে জেলার রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে রাজনৈতিক দলীয় হিসাবের বাইরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে নারী নেতৃত্বের উত্থান।
এই পরিবর্তনকে অনেকেই জাতীয় রাজনীতির একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, যেখানে নারী অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং নেতৃত্বের জায়গায় তাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান হচ্ছে।
সামনে চ্যালেঞ্জ:
নির্বাচনে বিজয় যেমন রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেয়, তেমনি বাড়িয়ে দেয় জনগণের প্রত্যাশাও। শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং চৌধুরী নায়াব ইউসুফ—দুজনের কাছেই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং দলমত নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা, এই দুই নারী নেতা তাঁদের প্রতিশ্রুত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফরিদপুরের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবেন। এখন দেখার বিষয়, জনগণের দেওয়া এই আস্থা কত দ্রুত বাস্তব উন্নয়নে রূপ নেয়।
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ফরিদপুরে শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং নেতৃত্বের ধরণ, রাজনৈতিক ভাষ্য এবং জনগণের প্রত্যাশার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে—যেখানে নারী নেতৃত্ব ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক ৭ শীর্ষনেতা। তাদের মধ্যে পাঁচজন ছিলেন ছাত্রদলের সভাপতি, অন্য দুজন দায়িত্ব পালন করেছেন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। বিজয়ী সাত নেতার মধ্যে পাঁচজন এবার প্রথমবার সংসদ যাচ্ছেন, বাকি দুজনের মধ্যে একজন তৃতীয়বার এবং অন্যজন দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে।
ফজলুল হক মিলন
এবারের নির্বাচনে বিজয়ী ছাত্রদলের সাবেক শীর্ষনেতার মধ্যে রয়েছেন ১৯৯৩-৯৬ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ফজলুল হক মিলন। তিনি গাজীপুর-৫ আসন থেকে (কালীগঞ্জ ও সিটি করপোরেশন আংশিক) ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৯ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী খায়রুল আহসান পেয়েছেন ৭৮ হাজার ১২৩ ভোট।এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনেও ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে এ আসন (তৎকালীন গাজীপুর-৩) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ফজলুল হক মিলন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে স্মরণীয় ভূমিকা পালনকারী এই নেতা বর্তমানে গাজীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। এর আগে জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিদের মধ্যে এবারের নির্বাচনে বিজয়ী তালিকার আরেক নাম শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। ১৯৯৬-৯৮ সাল মেয়াদে ছাত্রদলের নেতৃত্ব দেওয়া এ্যানি লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসন থেকে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৬৫ ভোট পেয়ে এবার তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর রেজাউল করিম পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৭৯ ভোট।এর আগে ২০০১ ও ২০০৮ সালেও লক্ষ্মীপুর সদর আসন থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এ্যানি। ছাত্রদলের দাপুটে এই নেতা বিএনপির রাজনীতিতেও বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তিনি বর্তমানে দলের যুগ্ম মহাসচিব। এর আগে বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এ্যানি। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য সচিব, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সমন্বয়ক ও লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়কের মতো দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। এবারের মন্ত্রিসভায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে।
আজিজুল বারী হেলাল
ছাত্রদলের রাজনীতিতে আরেক আলোচিত নাম আজিজুল বারী হেলাল। বিএনপির তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক তিনি। ২০০৩-০৪ সাল মেয়াদে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি সংগঠনটির সভাপতি ছিলেন।এবার খুলনা-৪ আসন (রূপসা-তেরখাদা-দিঘলিয়া) থেকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন হেলাল। ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ১৬২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিসের এসএম সাখাওয়াত হোসাইন পেয়েছেন ১ লাখ ৯ হাজার ৫৩০ ভোট। ছাত্ররাজনীতিতে দক্ষতার প্রমাণ দেওয়া আজিজুল বারী হেলাল কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু
টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসন থেকে এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। জামায়াতের প্রার্থী আহছান হাবিব মাসুকে ৫০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ২০০৯-১২ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন তিনি। পরে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।এবারের নির্বাচনে একটি মাত্র পরিবারের দুজন সদস্য একই জেলার দুটি আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সেই গর্বিত পরিবারের একজন হলেন টুকু। এবারের নির্বাচনে তার বড়ভাই বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম পিনটুও টাঙ্গাইল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১ লাখ ৩৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াত প্রার্থীকে হারিয়ে তিনি তৃতীয়বারের মতো টাঙ্গাইল-২ আসন (গোপালপুর-ভূয়াপুর) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির এর আগের সরকারে শিক্ষা উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পর টানা ১৭ বছর কারাবন্দি ছিলেন তিনি। এই সময়ে পিন্টুর আসনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তার ছোটভাই টুকু। এবার মন্ত্রিসভায় দুই ভাইয়ের মধ্যে কেউ একজন থাকবেন বলে বিশ্বাস তাদের অনুসারীদের।
রাজীব আহসান
বরিশাল-৪ আসন (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-কাজিরহাট) থেকে এবার বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ১ লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন রাজিব আহসান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৬৮৪ ভোট।২০১৫-১৯ মেয়াদে ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন রাজিব। এখন তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক। বিগত সরকারের আমলে সারা দেশে তার বিরুদ্ধে ৩১২টি মামলা হয়। এর মধ্যে চার মামলায় তাকে সাড়ে আট বছরের সাজাও দেন আদালত।
আমিরুল ইসলাম খান আলিম
সিরাজগঞ্জ-৫ (চৌহালী-বেলকুচি-এনায়েতপুর) আসনে এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিম। ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৯৭ ভোট পেয়েছেন তিনি।তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আলী আলম পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৮ ভোট। ২০০৯-১২ মেয়াদে সুলতান টুকুর সময়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আমিরুল ইসলাম আলিম। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন।
হাবিবুর রশিদ হাবিব
২০১২ সালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা হাবিবুর রশিদ হাবিব এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকা-৯ আসন (খিলগাঁও, সবুজবাগ, মুগদা) থেকে।১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট পেয়ে আলোচিত দুই প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ও এনসিপির জাভেদ রাসিনকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন হাবিব। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এই আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ায় ক্লিন ইমেজের হাবিব তারেক রহমান মন্ত্রিসভায় জায়গা পাবেন বলে শোনা যাচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন
Array