খুঁজুন
শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ২৬ বৈশাখ, ১৪৩৩

ভাঙ্গায় বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল চালক নিহত

ভাঙ্গা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ আগস্ট, ২০২৫, ১০:২৭ অপরাহ্ণ
ভাঙ্গায় বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল চালক নিহত

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের এক্সপ্রেসওয়ে মডেল মসজিদে সামনে বাসের ধাক্কায় বিল্লাল খাঁন (৩৫) নামের এক মোটরসাইকেল চালক নিহত হয়েছেন। এসময় আহত হয়েছে আরো ২ আরোহী।

বুধবার (০৬ জুলাই) দুপুর ১টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতের বাড়ি ভাঙ্গা উপজেলার তুজারপুর ইউনিয়নের জান্দি গ্রামে। সে ওই গ্রামের দেলোয়ার খানেঁর পুত্র ।

আহত হয়েছেন হাফিজুর রহমান (৩২) ও মাহবুব মিয়া (২৫) নামের দুই যুবক।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, দ্রুতগামী স্টার ডিলাক্স নামের একটি পরিবহন পিছন থেকে একটি মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। এতে মোটরসাইকেলটি বাসের সামনে নিচে চলে যায়। এতে ঘটনাস্থলে মোটরসাইকেলের চালক নিহত ও দুই জন গুরুতর আহত হয়। আহত দুই জনকে ভাঙ্গা থেকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মামুন জানান, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা স্টার ডিলাক্স নামের একটি বাস ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে মডেল মসজিদের সামনে পৌঁছালে তিন হোন্ডা আরোহীকে চাঁপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই একজন হোন্ডা চালক ও দুই আরোহী আহত হয়েছেন। আহতদেরকে ভাঙ্গা থেকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাসটি জব্দ করা হয়েছে। বাসের চালক পালিয়ে গেছেন। আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এছাড়া বুধবার সকালে ভাঙ্গা উপজেলার সলিলদিয়া নামক স্থানে ঢাকাগামী একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হাইওয়ে এক্সপ্রেসওয়ে উপর উল্টে যায়। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সে থাকা ড্রাইভার সহ তিনজন গুরুতর আহত হয়।

সালথায় সংঘর্ষ ঠেকাতে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, আটক ১০

সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ৫:৪৬ অপরাহ্ণ
সালথায় সংঘর্ষ ঠেকাতে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, আটক ১০

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়নে চলমান দাঙ্গা, সংঘর্ষ ও বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। 

শনিবার (০৯ মে) বিকেলে আটক ব্যক্তিদের ফরিদপুর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গট্টি ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দী, বালিয়া গট্টি, মেম্বার গট্টি, কসবা গট্টি, দোহার গট্টি ও মীরের গট্টি এলাকায় কয়েকদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুক্রবার (০৮ মে) সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায় সালথা থানা পুলিশ।

আটককৃতরা হলেন- উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দী গ্রামের নুরু খানের ছেলে আজিজুল খান (২২), মৃত শেখ সাহিদের ছেলে আব্দুল হক (৫৫), মৃত জলিল মাতুব্বরের ছেলে রহমান মাতুব্বর ওরফে রব্বান মাতুব্বর (৩০), বালিয়া গট্টি এলাকার পাচু শেখের ছেলে রিয়াজ শেখ (২৫), লাবলু মোল্যার ছেলে জাহিদ মোল্যা (৪০), দোহার গট্টি এলাকার আরশেদ মাতুব্বরের ছেলে লাবলু মাতুব্বর (৩৫), লুৎফর মিয়ার ছেলে টুকু মিয়া (৪০), কাঠিয়ার গট্টি এলাকার সোহরাব শরীফের ছেলে ইশারত শরীফ (৩৩), বাদশা মাতুব্বরের ছেলে সুমন মাতুব্বর (২২) এবং মীরের গট্টি এলাকার সামচু শেখের ছেলে সোহেল শেখ (২৪)।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গট্টি ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দী গ্রামের ইউপি সদস্য নুরু মাতুব্বর ও বালিয়া গট্টি গ্রামের জাহিদ মাতুব্বরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। তারা দুজনই এলাকায় প্রভাবশালী গ্রাম্য মোড়ল হিসেবে পরিচিত।

স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তাদের সমর্থকদের মধ্যে অন্তত ১০টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজন স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। সহিংসতায় দুই শতাধিক বসতবাড়ি ভাঙচুর এবং কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান বলেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে হামলা, পাল্টা হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শনিবার (০৯ মে) বিকেলে আটক ১০ জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

 

ফরিদপুরে রক্তভর্তি সিরিঞ্জ ঠেকিয়ে ছিনতাই, জনতার হাতে আটক ‘তুফান’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ৪:১৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে রক্তভর্তি সিরিঞ্জ ঠেকিয়ে ছিনতাই, জনতার হাতে আটক ‘তুফান’

ফরিদপুর শহরে রক্তভর্তি সিরিঞ্জ ঠেকিয়ে মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগে মো. তুফান (৩৫) নামে এক মাদকসেবিকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে স্থানীয় জনতা।

শনিবার (৯ মে) দুপুর ১২টার দিকে শহরের আলীপুর ব্রিজ এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় হাতেনাতে তাকে আটক করা হয়। পরে উত্তেজিত জনতা তাকে গণধোলাই দিয়ে কোতয়ালী থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।

আটক তুফান শহরের আলীপুর এলাকার মুজিবরের ছেলে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি শহরের বিভিন্ন এলাকায় রক্তভর্তি সিরিঞ্জ নিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে টাকা-পয়সা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতেন। বিশেষ করে নির্জন সড়ক ও সন্ধ্যার পর চলাচলকারী পথচারীদের টার্গেট করতেন তিনি।

এর আগে শুক্রবার (৮ মে) রাতে স্থানীয় সাংবাদিক শ্রাবণ হাসানের কাছ থেকেও সিরিঞ্জ ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে তুফানের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেকেই তাকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও পথচারী জানান, তুফান প্রায়ই সিরিঞ্জে রক্ত ভরে মানুষের শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাতেন। এতে আতঙ্কে অনেকেই টাকা দিয়ে দিতেন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদকসেবন ও ছিনতাইয়ের একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।

ফরিদপুর কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান বলেন, “জনতার হাতে আটক তুফানকে থানায় আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সাংবাদিকতার চার দশক : পান্না বালার সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
সাংবাদিকতার চার দশক : পান্না বালার সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প

ফরিদপুরের সাংবাদিকতা অঙ্গনে যে কজন মানুষ সততা, পেশাদারিত্ব ও ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তায় আলাদা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তাদের অন্যতম প্রবীর কান্তি বালা—যাকে সবাই বেশি চেনেন পান্না বালা নামে। কয়েক দশকের নিরলস সাংবাদিকতা জীবনে তিনি কেবল একজন সংবাদকর্মী হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি, বরং হয়ে উঠেছেন সাংবাদিকতার এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন, সাহসী অবস্থান এবং মানবিক ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি ফরিদপুরের সাংবাদিক সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত এক নাম।

১৯৬৪ সালের ৮ জানুয়ারি এক বনেদি ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন পান্না বালা। তাঁর বাবা গৌর চন্দ্র বালা ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাবেক যুক্তফ্রন্ট সরকারের বন ও খাদ্যমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম রচয়িতা। সমাজ ও রাজনীতিতে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। অন্যদিকে মা অঞ্জলী বালা একজন সমাজসেবী ও শিশু সংগঠক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী শিশু সংগঠন ‘ফুলকি’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই পান্না বালা বেড়ে উঠেছেন সংস্কৃতি, শিক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধের পরিবেশে।

পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। তাঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও সফল। বড় ভাই বিপ্লব বালা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। সংস্কৃতি ও নাট্যাঙ্গনে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয় ভাই প্রণব বালা পেশায় চিকিৎসক এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। তৃতীয় বোন তন্দ্রা বালা অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। ছোট বোন দিপ্তী বালা একজন চিকিৎসক, যিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে রয়েছেন। এমন উচ্চশিক্ষিত ও প্রগতিশীল পরিবারে বেড়ে ওঠা পান্না বালার চিন্তা-চেতনা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন মনোযোগী ও মেধাবী। ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। কলেজজীবনেই তাঁর সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি বুঝতে পারেন, সংবাদপত্র কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজ পরিবর্তনেরও শক্তিশালী হাতিয়ার। সেই উপলব্ধি থেকেই ১৯৮২ সালে ফরিদপুর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘আল মুয়াজ্জিন’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা করেন তিনি। তখন তিনি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র।

এরপর ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করতে থাকেন। স্থানীয় দৈনিক গণসংহতি, সাপ্তাহিক প্রগতির দিন, দৈনিক ভোরের রানারসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেন। মাঠে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ, মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প তুলে ধরা, সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি—এসবের মধ্য দিয়ে তিনি অর্জন করেন দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ফরিদপুরের প্রায় সব স্থানীয় পত্রিকাতেই তাঁর লেখা কলাম ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখার ভাষা ছিল সহজ, প্রাঞ্জল ও বাস্তবমুখী। সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, দুর্নীতি, অনিয়ম, উন্নয়ন ও সামাজিক সমস্যাগুলো তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তুলে ধরতেন।

দীর্ঘ সাংবাদিকতা অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর ফরিদপুর প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন পান্না বালা। এটি ছিল তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। জাতীয় দৈনিকে কাজ করার মাধ্যমে তাঁর দায়িত্ব ও পরিধি আরও বেড়ে যায়। মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের কারণে তিনি অল্প সময়েই পাঠক ও সহকর্মীদের আস্থা অর্জন করেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে পেশাগত দক্ষতা ও সততার স্বীকৃতি হিসেবে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ পদে পদোন্নতি দেয়।

পান্না বালার সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব। তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী কিংবা প্রভাবশালী মহলের মুখপাত্র হয়ে সংবাদ পরিবেশন করেননি। পক্ষপাতহীন অবস্থান বজায় রেখে তিনি সব পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে অন্যায়, দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার দেখলে নির্ভীকভাবে সমালোচনাও করেছেন। সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি কখনো আপস করেননি। অর্থ, প্রভাব কিংবা পেশিশক্তির কাছে মাথানত না করার দৃঢ় মানসিকতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

ফরিদপুরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই তাঁকে সম্মানের চোখে দেখেন। কারণ তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে সংবাদকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা মানে দায়িত্ববোধ, জবাবদিহিতা ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকার। তিনি বিশ্বাস করেন, সাংবাদিক যদি সত্যের পথে অবিচল না থাকেন, তাহলে সমাজে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে।

তাঁর সহকর্মীরা বলেন, পান্না বালা শুধু একজন সাংবাদিক নন, তিনি নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তরুণ সাংবাদিকদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও সহযোগিতার মনোভাব প্রশংসনীয়। অনেক তরুণ সাংবাদিক তাঁর কাছ থেকে সংবাদ লেখার কৌশল, তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব এবং পেশাগত নৈতিকতা সম্পর্কে শিখেছেন। তিনি নিয়মিত নবীনদের পরামর্শ দেন, ভুল ধরিয়ে দেন এবং ভালো কাজের জন্য উৎসাহিত করেন। ফলে ফরিদপুরের সাংবাদিক সমাজে তিনি একজন অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।

জেলার প্রতিটি উপজেলার সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কোনো সাংবাদিক সমস্যায় পড়লে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। সাংবাদিক সংগঠনের অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা কিংবা পেশাগত যেকোনো আয়োজনে তাঁকে প্রায়ই দেখা যায়। এসব অনুষ্ঠানে তিনি সাংবাদিকতার নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করেন। বয়স বাড়লেও তাঁর কর্মস্পৃহা ও প্রাণচাঞ্চল্য একটুও কমেনি।

সত্য কথা বলার কারণে জীবনে নানা প্রতিকূলতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও সাহসী সংবাদ প্রকাশের কারণে একাধিকবার প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েছেন। হামলা, হুমকি ও চাপের শিকারও হয়েছেন। কিন্তু কখনো কলম থামিয়ে দেননি। বরং আরও দৃঢ়ভাবে সত্য প্রকাশের কাজ চালিয়ে গেছেন। তাঁর মতে, একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সততা ও সাহস। এই দুটি গুণ হারিয়ে গেলে সাংবাদিকতা কেবল পেশা হয়ে দাঁড়ায়, সমাজের জন্য আর কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।

ব্যক্তিজীবনেও তিনি অত্যন্ত সাদামাটা ও বিনয়ী। বনেদি পরিবারের সন্তান হয়েও কখনো অহংকার তাঁকে স্পর্শ করেনি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। তাঁর সঙ্গে কথা বললে বোঝার উপায় নেই যে তিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্রের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। সবসময় হাসিমুখে কথা বলেন, আন্তরিক আচরণ করেন এবং মানুষের কথা মন দিয়ে শোনেন। তবে ভুল তথ্য, মিথ্যাচার কিংবা অন্যায় দেখলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করেন। এই স্পষ্টবাদী মনোভাবই তাঁকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

পান্না বালা মনে করেন, সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের পক্ষে কথা বলা। তাঁর ভাষায়, “সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সৎ সাহস থাকতে হবে। জনগণের অধিকার, কষ্ট আর বঞ্চনার কথা তুলে ধরতে হবে। ক্ষমতাসীনদের ভুলত্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়াই সাংবাদিকতার দায়িত্ব। কারো পক্ষ নিয়ে তোষামোদ করা সাংবাদিকতা নয়।”

তিনি আরও বিশ্বাস করেন, গণমাধ্যম সমাজের আয়না। সেই আয়নায় যদি বিকৃতি দেখা যায়, তাহলে পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সাংবাদিকদের সততা, নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সময়ে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে তথ্যের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে গুজব ও অপতথ্যের ঝুঁকিও। এ পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।

দীর্ঘ চার দশকের সাংবাদিকতা জীবনে পান্না বালা শুধু সংবাদ পরিবেশন করেননি; তিনি সমাজকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। মানুষের কান্না, বেদনা, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার গল্প তিনি তুলে ধরেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। তাঁর সংবাদে যেমন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তেমনি ছিল মানবিকতার স্পর্শ। এ কারণেই তিনি পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য এবং সহকর্মীদের কাছে অনুপ্রেরণার নাম।

ফরিদপুরের সাংবাদিকতা অঙ্গনে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। নতুন প্রজন্ম যখন সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও আদর্শ নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়, তখন পান্না বালার মতো ব্যক্তিত্বরা পথ দেখান। তিনি প্রমাণ করেছেন, সততা ও পেশাদারিত্ব ধরে রেখেও দীর্ঘদিন সম্মানের সঙ্গে সাংবাদিকতা করা সম্ভব।

সময়ের পরিক্রমায় প্রযুক্তি বদলেছে, সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি পান্না বালার আদর্শ। এখনও তিনি একই নিষ্ঠা, সততা ও সাহস নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সংবাদপত্রের পাতা, ল্যাপটপের কিবোর্ড আর মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতা যেন তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। সাংবাদিকতা তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, এটি এক ধরনের দায়বদ্ধতা, এক ধরনের জীবনদর্শন।

ফরিদপুরের মানুষ তাই তাঁকে শুধু একজন সাংবাদিক হিসেবে নয়, একজন সৎ, সাহসী ও মানবিক মানুষ হিসেবেও মূল্যায়ন করেন। তাঁর মতো সাংবাদিকরা থাকেন বলেই গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা এই মানুষটির জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

লেখক: হারুন-অর-রশীদ, সংবাদকর্মী, ফরিদপুর