খুঁজুন
, ,

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগ স্থবির, ব্যবসায় মন্দা, খাদে অর্থনীতি

গৌতম ঘোষ, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ১২:৫৮ অপরাহ্ণ
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগ স্থবির, ব্যবসায় মন্দা, খাদে অর্থনীতি

দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা ও বেকারত্ব দূর করতে নতুন বিনিয়োগের বিকল্প নেই। সে কারণে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিনিয়োগ বাড়াতে জোর দিয়েছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢেলে সাজানোসহ দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীর নিয়ে বিনিয়োগ সামিট করা হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ সাফল্য আসেনি।  

 

কেন সাফল্য এলো না তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থায়ন সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদের হারের জন্য নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। ফলে দেশের অর্থনীতি এখন এক বহুমুখী সংকটে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

দেশের অর্থনীতি চরম সংকটে থাকার কারণে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থায়নও ব্যাহত হচ্ছে। অর্থ উপদেষ্টার বক্তবেও তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সোমবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থায়ন। সবাই বলছে, স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। কিন্তু সরকারের কাছে টাকা কোথায়?’

ব্যবসা ও অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক ও রাজপথের স্থিতিশীলতা আনতে একটা নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজন। যতক্ষণ পর্যন্ত একটা নির্বাচিত সরকার না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের বিরুদ্ধে কাজ করবে। একই সঙ্গে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে ব্যাংকের ইন্টারেস্ট হার দ্রুত কমাতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যাবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ অনুকূল করা যায়। পাশাপাশি সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা সংযোগ তৈরিসহ সরকারের অগ্রাধিকার খাতে অর্থনীতি ও বিনিয়োগ আনতে হবে।

জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি এলসি ২৫ শতাংশের বেশি কমে গেছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে সাড়ে ৬ শতাংশের নিচে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনক হারে কমে ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। চলতি বছরের জুন শেষে এ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান বলছে, বিনিয়োগ স্থবিরতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার এবং খেলাপি ঋণের চাপ—এই চারটি প্রধান কারণেই ঋণ প্রবৃদ্ধিতে টানা ধস চলছে। গত বছরের জুলাইয়ে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ, তা কমতে কমতে জুনে এসে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৪ শতাংশে। এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একবার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমেছিল। করোনার কঠিন সময়েও এ হার সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে নামেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা হয়েছে মাত্র ১৭৪ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২৫ দশমিক ৪১ শতাংশ কম। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১৯৮ কোটি ৫১ লাখ ডলারের, যা ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর আগের বছরেও (২০২৩-২৪) এই খাতে এলসি খোলা কমেছিল ২৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এছাড়া শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি খোলা কমেছে ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি কমেছে ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। যদিও শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলা সামান্য কমলেও নিষ্পত্তি বেড়েছে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলোর বেশিরভাগই নিম্নমুখী। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে, যা নতুন বিনিয়োগের স্থবিরতাকে স্পষ্ট করে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতেও ধস নেমেছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। একদিকে যেমন অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, অন্যদিকে সম্ভাবনাময় অনেক নতুন উদ্যোগ অর্থের অভাবে আটকে আছে। ফলে আগামী ছয় মাসে বেসরকারি বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আশা করছেন না ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা।

এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের বিনিয়োগ চাঙ্গা না হওয়ার নানা করণ রয়েছে। তারমধ্যে ডুয়িং বিজনেস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সামগ্রিকভাবে আমরা বিনিয়োগ পরিবেশের বড় কোনো পরিবর্তন করতে পারিনি। ফলে নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। যদিও ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের একটা তারিখ ঘোষিত হয়েছে।

তিনি বলেন, যারা বিনিয়োগ করবেন তারা দীর্ঘ ও মধ্য মেয়াদি একটা নিশ্চিত পরিবেশ চাইবেন। সে বিষয়টা বিনিয়োগকারীদের মনে কাজ করছে। তবে সরকার যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন, ওয়ানস্টপ সার্ভিস, অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করার চেষ্টা করছে, এটার ফলে আমার ধারনা বিনিয়োগে কিছুটা চাঞ্চল্য আসবে। সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন হয়ছে। সেটাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। বিনিয়োগ না হওযার ফলে আমাদের নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে না। যেটা ছিলো গণঅভ্যুত্থানের বড় দাবি।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের অনেক লোকজন আয়ের উৎস কম থাকায় দারিদ্র সীমার নিচে পড়ে যাচ্ছে। শিক্ষিতদের মধ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। তো সব কিছু মিলিয়ে আমাদের বিনিয়োগকে চাঙ্গা করতে হবে। সেখানে যতক্ষণ পর্যন্ত একটা নির্বাচিত সরকার না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের বিরুদ্ধে কাজ করবে।

তিনি বলেন, আমরা যদি মূল্যস্ফীতি কমাতে পারি তাহলে ব্যাংকের ইন্টারেস্ট হার কমাতে পারবো৷ তখন বেসরকারি খাত উৎসাহিত হবে বিনিয়োগে। একই সঙ্গে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যাবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ অনুকূল করা যায়। পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে একটা নির্বাচিত সরকার এসে পরিবেশটাকে স্বস্তির জায়গা নিয়ে যাবে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিনিয়োগে মন্দা বাংলাদেশে অনেক দিন ধরে চলছে। এর কারণ হলো আমাদের কাঠামোগত সমস্যা। ব্যবসা বা বিনিয়োগ করতে গেলে হয়রানির শিকার হতে হয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গত এক বছর ধরে রাজপথের অস্থিরতা। ভবিষ্যতে কী হবে! রাজপথের অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দুইটাই মিলে গেছে। সে পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় থাকে, আরেকটু দেখি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় কি না। ফলে ব্যবসায়ীরা অনিশ্চিয়তায় রয়েছে। আগামীতে কী হবে রাজনৈতিক পর্যায়ে সেটা পর্যবেক্ষণ করছে ব্যবসায়ী। যদিও বলা হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে। সেটা নিয়েও জনমনে সংশয় আছে। তাই অনিশ্চিয়তা যে কেটে গেছে সেটা বলা যাবে না।

তিনি বলেন, সরকার অনেক উদ্যোগ নিয়েছে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিনিয়োগ সামিট, এক ছাতায় সব কিছু নিয়ে আসা বা ওয়ানস্টপ সার্ভিস করার উদ্যোগ তো অনেক দিন ধরেই চলছে। নতুন বিডা সেটাকে বেগবান করেছে। তবে অনিশ্চয়তা না কাটলে কোনো লাভ নেই। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট রয়েছে। সেটার নিশ্চয়তা দেওয়া মুশকিল। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে সমস্যা রয়েছে। কিছু কাজ চলছে কিন্তু পরিপূর্ণ পায়নি। মূল কথা হলো, একদিকে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অন্য দিকে কাঠামোগত সমস্যা আছে। সেগুলোর কিছু কিছু হয়েছে, কিছু কিছু আগামীতে হবে। সবগুলো বিষয় যদি এক সাথে না মেলে তাহলে ফলাফল পাবো না। সংস্কার এগিয়ে গেলেও অনিশ্চয়তা থেকে যাবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, বিনিয়োগে খরার প্রথম কারণ হলো; বর্তমান সরকার যে সংকোচনমূলক মূদ্রানীতি চালু করেছে। সে কারণে অনেক ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করছে না। কারণ এই নীতির ফলে উচ্চ সুদের হার। যেটা ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে বাধা দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের ফলে অনেক ব্যবসায়ী ভয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। এ পর্যন্ত বিজিএমইএ ১৬০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। অনেকে চাপের মুখে আছে। ফলে শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ স্থিতিশীল হচ্ছে না।

তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা সংযোগ থাকতে হয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের যোগযোগ কম। সরকারের অগ্রাধিকার খাতগুলোর মধ্যে ব্যবসা বা অর্থনীতি নেই। সংস্কারকে প্রাধান্য দিয়েই কাজ করছে। এজন্য এতো বড় বিনিয়োগ সম্মেলন হলেও বিনিয়োগ আসছে না। কারণ ব্যবসায়ীদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তারপর নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কায় আছে যে পরবর্তী সরকারের পদক্ষেপ বা পলিসি কী হবে।

এছড়া ২০২৬ সালে আমরা এলডিসি বা গ্রাজুয়েশন উত্তরণে যাব। সেখানে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবসায়ীরা এই উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দিতে বলেছে। কিন্তু সরকার সে কথা শুনছে না। সেটা নিয়ে ব্যবসায়ীরা দ্বিধায় আছে। ফলে সার্বিক বিবেচনায় বিনিয়োগে মন্দা দেখা দিয়েছে।

এজন্য সরকারকে ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করতে হবে। প্রয়োজনে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে একটি কমিটি করতে হবে, যারা প্রতি মাসে ব্যবসায়ীদের নিয়ে বসবে। সরকারের অগ্রাধিকার খাতে অর্থনীতি ও বিনিয়োগকে আনতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে হবে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাহলে ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হবে।

অর্থনীতিবিদ ও ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবু আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো বর্তমান সরকার কতোদিনের সরকার সেটা বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগ করবে না। সাধারণত বিনিয়োগকারীরা নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। বর্তমান সরকার অনেক ক্ষেত্রে ভালো করেছে রিজার্ভ বৃদ্ধি করেছে, ফরেন এক্সচেঞ্জ রেট কমিয়েছে, রপ্তানি বাড়ছে। তবে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। কারণ ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি। যেটা সরকার কমাচ্ছে না। এটা করতে পারলে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবে।

তিনি বলেন, সরকারের আয়ের উৎস হলো রাজস্ব। সেখান থেকে যেটা আয় হয় সেটা বেতন ভাতা দিতেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এর বাইরে সরকার দাতা সংস্থা থেকে কিছু পায়। এখন তারাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে যে নির্বাচনের পর যদি রাজনৈতিক সরকার আসে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে তারা বিনিয়োগের চিন্তা করবে। ফলে আমরা আশা করছি, রাজনৈতিক সরকার এলে বিনিয়োগ বাড়বে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে সুদের হার কমাতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে হবে।

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আবার অস্থির হয়ে উঠছে। নির্বাচনের রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কায় উৎকণ্ঠায় রয়েছে ব্যবসী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসা পর্যন্ত উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আস্থা পাচ্ছেন না। প্রস্তুতি নিয়েও অনেকে বিনিয়োগ করছেন না।

এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশে ব্যবসা-বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য। যে কোনো বিনিয়োগকারী, দেশি হোক বা বিদেশি- আগে নিরাপদ ও পূর্বানুমেয় পরিবেশ খোঁজ করেন।

তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে সব মহলের উচিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করে একটি সহনশীল ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। এছাড়া শিল্প-বিনিয়োগের অনেক বাধা এখনো দূর হয়নি। এসব বাধার মধ্যেও অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিয়েছেন। অনেকে বিনিয়োগ নিবন্ধনও করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় সব স্থবির হয়ে আছে।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ও রাইজিং ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহমুদ হাসান খান বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে আস্থা পান না। দেশি বিনিয়োগকারীরা দেশের পরিস্থিতি ভালোভাবে জানেন। তারা অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। দেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে না এলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহী হন না। নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া কেউ বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চান না। তাই বিনিয়োগ বাড়াতে হলে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ জরুরি।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক সচিব মো. হাফিজুর রহমান বলেছেন, অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন বিনিয়োগকারীদের দ্বিধায় ফেলেছিল এবং বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তবে নির্বাচন ঘোষণার ফলে সেই অনিশ্চয়তা কিছুটা কেটেছে। বিশ্ব অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—এ সময় দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ধরে রাখা জরুরি। ব্যবসায়ীসমাজ সব সময় চায়, একটি নির্বাচিত সরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থিতিশীলতার মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিক। তাই এফবিসিসিআই মনে করে, এই নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারেরও সুযোগ। অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ব্যবসাবান্ধব পরিবেশকে সুসংহত করবে।

বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত দেশে বিনিয়োগে স্বস্তি ফিরবে না। অন্তত নির্বাচনের তারিখ জানা থাকলেও উদ্যোক্তাদের জন্য কিছুটা সুবিধা হয়। নির্বাচনের তারিখ জানা না থাকলে অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করবেন না।

উল্লেখ্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন ধরেই দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) মন্দাভাব চলছিল। গত বছরের শেষ ছয় মাসে তা ৭১ শতাংশ কমে যায়। তবে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) এফডিআই আসার হার বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে মোট ১৫৮ কোটি ডলারের এফডিআই আসে। এর মধ্যে ৭১ কোটি ডলার আবার ফেরত নিয়ে গিয়েছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।

ঘুম আসছে না? অনিদ্রা দূর করতে জেনে নিন ৭ কার্যকর উপায়

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ
ঘুম আসছে না? অনিদ্রা দূর করতে জেনে নিন ৭ কার্যকর উপায়

সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতে বিছানায় গেলেও অনেকের চোখে ঘুম আসে না। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা এপাশ-ওপাশ করেন, আবার কারও মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। এমন সমস্যা এক-দুদিন হলে চিন্তার কারণ না হলেও দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা হতে পারে অনিদ্রা (ইনসমনিয়া)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ও মস্তিষ্ক ঠিকভাবে বিশ্রাম নিতে পারে না। ফলে পরদিন ক্লান্তি, কাজে অমনোযোগ, খিটখিটে মেজাজ, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এমনকি দীর্ঘমেয়াদে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

অনেকেই এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ঘুমের ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ঘুমের ওষুধ সেবন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে প্রাকৃতিকভাবেই অনিদ্রা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন হয় অনিদ্রা?

অনিদ্রার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা

বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন)

আশপাশের অতিরিক্ত শব্দ

অস্বস্তিকর বিছানা বা ঘুমের পরিবেশ

মদ্যপানের অভ্যাস

অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইন গ্রহণ

রাতের শিফটে কাজ করার অভ্যাস

অনিদ্রা দূর করতে যা করবেন

১. নিয়মিত মেডিটেশন করুন

মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন মানসিক চাপ কমাতে এবং মনকে শান্ত রাখতে কার্যকর। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট মেডিটেশন করলে ঘুমের মান উন্নত হতে পারে।

২. ল্যাভেন্ডার অয়েলের ব্যবহার

ল্যাভেন্ডার অয়েল দীর্ঘদিন ধরে অ্যারোমাথেরাপিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি মানসিক প্রশান্তি এনে ঘুমে সহায়তা করতে পারে। বালিশে সামান্য স্প্রে করা বা ঘাড় ও কাঁধে অল্প পরিমাণে ম্যাসাজ করেও ব্যবহার করা যায়।

৩. নির্দিষ্ট সময় ঘুমানোর অভ্যাস

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের ‘বডি ক্লক’ বা সার্কাডিয়ান রিদমকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এতে ধীরে ধীরে ঘুমের সমস্যা কমতে পারে।

৪. ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খান

ম্যাগনেসিয়াম পেশি শিথিল করতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। ডার্ক চকলেট, বাদাম, অ্যাভোকাডোসহ ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত কোমল পানীয় ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা ভালো।

৫. মেলাটোনিন বাড়ায় এমন খাবার

মেলাটোনিন হলো ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। ডিম, দুধ, মাছ, কলা, মাশরুম, বাদাম ও আখরোটের মতো খাবার শরীরে মেলাটোনিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি ঘুমানোর আগে মোবাইল বা অন্যান্য স্ক্রিনের ব্যবহার কমানোও জরুরি।

৬. নিয়মিত শরীরচর্চা

প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট ব্যায়াম করলে ঘুমের মান উন্নত হতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ব্যায়াম না করে অন্তত তিন ঘণ্টা আগে শরীরচর্চা শেষ করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

৭. ৪-৭-৮ শ্বাস-প্রশ্বাস পদ্ধতি

অনিদ্রা কমাতে ‘৪-৭-৮’ শ্বাস-প্রশ্বাস কৌশল বেশ জনপ্রিয়। এ পদ্ধতিতে চার সেকেন্ড শ্বাস নিতে হবে, সাত সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখতে হবে এবং আট সেকেন্ড ধরে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে হবে। কয়েকবার অনুশীলন করলে শরীর ও স্নায়ু শিথিল হতে পারে।

আরও কিছু অভ্যাস বদলাতে হবে

ঘুমানোর আগে এক গ্লাস হালকা গরম দুধ পান করা উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি রাতে অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার, ভারী খাবার ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং ঘুমানোর পরিবেশ শান্ত ও আরামদায়ক রাখলে ভালো ঘুমের সম্ভাবনা বাড়ে।

তবে জীবনযাপনের পরিবর্তনের পরও যদি দীর্ঘদিন অনিদ্রা, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকে, তাহলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, অনিদ্রা অনেক সময় অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।

সূত্র : কালবেলা

সরকারি হচ্ছে ফরিদপুরের নগরকান্দার আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪১ অপরাহ্ণ
সরকারি হচ্ছে ফরিদপুরের নগরকান্দার আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগে নতুন অগ্রগতি এসেছে। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ ও সদস্য সচিব (মাননীয় সংসদ সদস্যগণের প্রতিশ্রুত ও প্রত্যাশিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সমন্বয় সেল) মো. উজ্জল হোসেন স্বাক্ষরিত ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখের এক চিঠিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে আধা-সরকারি (ডিও) পত্রের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়টির জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গৃহীত কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, নারী শিক্ষার প্রসার এবং পিছিয়ে পড়া জনপদের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ১৯৮৮ সালে নগরকান্দায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়টি এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ইউএনও রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনা এসেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করবে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে শিক্ষক সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন এবং দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারের মেয়েদের জন্য উন্নত শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ উদ্যোগে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনা হবে।

ফরিদপুরে এক সপ্তাহ ধরে থানায় আটক হাতি, আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পুলিশ

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে এক সপ্তাহ ধরে থানায় আটক হাতি, আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পুলিশ

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় সড়কে হাতি নিয়ে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে ইজিবাইক দুর্ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যুর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও জব্দ করা হাতিটি এখনো সদরপুর থানা প্রাঙ্গণেই রয়েছে। হাতিটির মালিকানা ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হাতিটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, নাকি বন বিভাগের জিম্মায় হস্তান্তর করা হবে -তা নির্ধারণ হবে।

থানা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাতিটি সদরপুর থানা চত্বরে বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। হাতিটির দেখভাল ও পরিচর্যার জন্য মালিক পক্ষ থেকে দুইজন মাহুতকে থানায় পাঠানো হয়েছে। তারাই নিয়মিত হাতিটিকে গোসল করানো, খাওয়ানো ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে প্রতিদিন একটি হাতির জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন হয়। কলাগাছ, ঘাসসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার সংগ্রহ করতে প্রতিনিয়ত বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশ ও মাহুতদের। থানা প্রাঙ্গণে হাতির জন্য স্থায়ীভাবে খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় খাদ্যসংকটও দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও হাতির মালিকের সহযোগিতায় খাবারের ব্যবস্থা করা হলেও তা সবসময় পর্যাপ্ত হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

থানায় অবস্থানকালে হাতিটি প্রায়ই মাহুতদের সঙ্গে থানা চত্বরে হেঁটে বেড়ায়। বিশাল আকৃতির প্রাণীটিকে দেখতে প্রতিদিন উৎসুক মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও পরিবার-পরিজন নিয়ে থানায় এসে হাতিটিকে দেখছেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন অপ্রত্যাশিত এক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। তবে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।

সদরপুর থানার পলিশ উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোকলেসুর রহমান জানান, আদালতের নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত হাতিটি থানার হেফাজতেই থাকবে। আদালত যদি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, তাহলে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তা হস্তান্তর করা হবে। আর বন বিভাগের জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশ এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ বলেন, হাতিটি বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, পুলিশ সেটিই বাস্তবায়ন করবে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ জুলাই দুপুরে সদরপুর উপজেলার আটরশি এলাকায় হাতি নিয়ে সড়কে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে মায়ের সঙ্গে থাকা ১০ মাস বয়সী আরিশা জান্নাত গুরুতর আহত হয়। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা হাতির মাহুত বকুল মিয়াকে গণপিটুনি দেয় এবং হাতিটিকে আটক করে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাহুতকে আটক এবং হাতিটিকে জব্দ করে সদরপুর থানায় নিয়ে আসে। এরপর থেকে হাতিটি থানার হেফাজতেই রয়েছে।