খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

হাশরের মাঠে আরশের ছায়া পাবেন যারা

মুফতি সাইফুল ইসলাম
প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
হাশরের মাঠে আরশের ছায়া পাবেন যারা

হাশরের ময়দান যখন থাকবে লোকে লোকারণ্য। লোকদের দাঁড়ানোর জায়গা হবে অতি সঙ্কীর্ণ। সেখানে চল্লিশ হাজার বছর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। দশ হাজার বছরে বিচার করা হবে।

তারা এর মধ্যে কোনো কথা বলতে পারবে না। (তাফসীরে ইবনু কাসির ১৮/৮৩) সেদিন সূর্য থাকবে মাত্র এক মাইল উপরে। ওর তাপ এত তীব্র ও প্রকট হবে যে, মাথার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে, যেমন প্রচণ্ড তাপের কারণে চুলার উপর রাখা হাঁড়ির পানি ফুটতে থাকে। সেই দিন সকল মানুষ নগ্নপায়ে, নগ্নদেহে খাতনাবিহীন অবস্থায় সমবেত হবে।
সেই দিন হবে অন্ধকারাচ্ছন্ন, নানা বিপদ-বিভীষিকাময় আপদে পরিপূর্ণ। এমন মহাবিপদসঙ্কুল দিবসে সূর্যের তীব্র ও প্রখর তাপ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ ছায়া খুঁজবে কিন্তু কোনোই লাভ হবে না। তবে মহান আল্লাহ মাত্র সাত শ্রেণীর মানুষকে তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। নিচের হাদিসে সেই সাত শ্রেনির বিবরণ পেশ করা হয়েছে- 

 عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَوْ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ إِمَامٌ عَادِلٌ وَشَابٌّ نَشَأَ بِعِبَادَةِ اللَّهِ وَرَجُلٌ كَانَ قَلْبُهُ مُعَلَّقًا بِالْمَسْجِدِ إِذَا خَرَجَ مِنْهُ حَتَّى يَعُودَ إِلَيْهِ وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ فَاجْتَمَعَا عَلَى ذَلِكَ وَتَفَرَّقَا وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ حَسَبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ ‏”‏ ‏.‏

আবূ হুরাইরা (রাঃ) অথবা আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আল্লা (কিয়ামত দিবসে) সাত প্রকারের লোককে তার (আরশের) ছায়াতলে আশ্রয় প্রদান করবেন, যেদিন তার (আরশের) ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়াই (আশ্রয়) অবশিষ্ট থাকবে না।

(তারা হলো) 

(১) ন্যায়পরায়ণ শাসক,

(২) যে যুবক আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদাতের মধ্যে বড় হয়েছে,

(৩) যে ব্যক্তি মাসজিদ হতে বেরিয়ে গেলেও তার অন্তর এর সাথে সম্পৃক্ত থাকে, যে পর্যন্ত না সে আবার সেখানে ফিরে আসে,

(৪) এমন দু’ব্যক্তি যারা আল্লাহ্ তা’আলার জন্য পরস্পর ভালোবাসা স্থাপন করেছে, এই সম্পর্কেই একত্র থাকে এবং বিচ্ছিন্ন হয়,

(৫) যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহ্ তা’আলাকে স্মরণ করেছে এবং তার দুচোখ বেয়ে পানি পড়েছে,

(৬) এমন ব্যক্তি যাকে কোন অভিজাত পরিবারের সুন্দরী রূপসী নারী (অশ্লীল কাজে) আহববান করেছে কিন্তু সে তাকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেছেঃ আমি আল্লাহ্ তা’আলাকে ভয় করি এবং

(৭) এমন ব্যক্তি যে এত গোপনে দান-খাইরাত করেছে যে, তার বাম হাতও জানতে পারেনি যে, তার ডান হাত কি দান করেছে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৯১)

হাদিসের ব্যাখ্যা

এই হাদিসে কিয়ামতের দিনের এক বিশেষ মুহর্তে  সাত শ্রেণির মানুষের আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ করার কথা বলা হয়েছে। কিয়ামতের দিনকার পরিবেশ এমন ভয়াবহ হবে যে, মানুষের জন্য ছায়া, নিরাপত্তা ও প্রশান্তি হবে সবচেয়ে মূল্যবান অবলম্বন। সে দিনের প্রখরতা, দুশ্চিন্তা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং বিচারভীতির মধ্যে আল্লাহ তাআলা এই সাত শ্রেণির মানুষকে বিশেষ অনুগ্রহে আচ্ছাদিত করবেন। সেই সাত শ্রেণি হচ্ছে-

১. ন্যায়পরায়ণ শাসক

ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা শুধু শাসকের দায়িত্বই নয়; বরং তার ইমানদারিরও পরিচায়ক।

ক্ষমতা মানুষকে সহজেই অত্যাচার ও স্বার্থপরতার দিকে টেনে নেয়; তাই ক্ষমতার আসনে থেকেও ন্যায়পরায়ণ থাকা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত প্রিয়। এখানে শাসক বলে শুধুমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান বুঝানো হয়নি । বরং যেকোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, যেমন শিক্ষক, জমিদার, নেতাসহ সকলেই যদি অন্যায না করে ন্যায় অনুসরণ করেন তাহলে তিনি এই মর্যাদায় অংশীদার হতে পারেন। 

২. যে যুবক আল্লাহর ইবাদতে বড় হয়েছে

যৌবন হলো শক্তি ও প্রবৃত্তির সময়। এ বয়সে মানুষ সহজেই পাপের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই যে যুবক এই প্রলোভনের সময়ে, শক্তি ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর আনুগত্যে জীবন গড়ে তোলে; সে আল্লাহর বিশেষ প্রেমের অধিকারী। তার ইবাদত ও আনুগত্যের মূল্য আল্লাহর নিকট অনেক বেশি।

৩. যার হৃদয় মসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত

এখানে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যার অন্তর মসজিদের প্রতি এমন আকর্ষণ অনুভব করে যে বাইরে থাকলেও সে মসজিদে ফেরার অপেক্ষা করে। এটি কেবল নামাজ পড়া নয়; বরং মসজিদকে জীবনের কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করা; আল্লাহর ঘরকে ভালোবাসা, সেখানে শান্তি পাওয়া এবং ঈমানের পরিবেশে নিজেকে সঁপে দেওয়ার মানসিকতার কথা বুঝানো হয়েছে।

৪. দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর জন্য পরস্পর ভালোবাসে

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বন্ধুত্ব স্থাপন করা এক বিশেষ ইমানীয় সম্পর্ক। এ ভালোবাসা স্বার্থ, বংশ, উপকার কিংবা লোভের উপর নির্ভর করে না। তারা একত্র হয় আল্লাহর জন্য, বিচ্ছিন্নও হয় আল্লাহর জন্য। এ ধরনের মানসিকতা মাহন আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়। তাই তাদের এই আল্লাহর জন্য পারস্পরিক মহব্বত আখিরাতে অসাধারণ মর্যাদার কারণ হবে।

৫. যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে চোখের পানি ফেলে

এটি আন্তরিকতার সর্বোচ্চ প্রকাশ। গোপন অবস্থায়, নির্জনে, মানুষের দৃষ্টি ও প্রশংসার বাইরে আল্লাহকে স্মরণ করলে যে কান্না আসে; তা হৃদয়ের পরিশুদ্ধতার নিদর্শন। এ কান্নার মূল্য আল্লাহর কাছে অনেক বেশি। এটি সেই ভয়, প্রেম ও বিনয় যা কেবল সত্যিকারের মু’মিনের হৃদয়ে জন্মায়। সে জন্য এর প্রতিদান হিসেবে সে হাশরের ভয়াবহ সময়ে আরশের নিছে আশ্রয় পাবে।

৬. যে ব্যক্তি পাপের আহ্বান সত্ত্বেও আল্লাহ-ভীতিতে নিজেকে সংযত রাখে

এ শ্রেণির ব্যক্তির পরীক্ষা অত্যন্ত কঠিন। প্রলোভন যখন সম্মানী, রূপসী, উচ্চবংশীয় কারও মাধ্যমে আসে এবং সুযোগ যখন পুরোপুরি হাতের মুঠোয়; ইচ্ছে করলেই কোনো বাধঅ ছাড়া নিচের কামনা-বাসনা চরিতার্ত্র করা যায়। সেই মুহুর্তে ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’  বলে তা থেকে বিরত থাকা খুব বড় ইবাদত। যা নফস, প্রবৃত্তি, সামাজিক লোভ; সবকিছুকে পরাভূত করার নাম। এটি খূব কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব। তার বিনিময়ে তার জন্য মিলবে এই মহাপ্রাপ্তি।

৭. যে ব্যক্তি এত গোপনে দান করে যে তার বাম হাতও জানতে পারে না ডান হাত কী দান করেছে

এটি দানের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা। তোষামুদ, প্রচার, ছবি তোলা, মানুষের প্রশংসা; এসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যে ব্যক্তি গোপনে দান করে, সে সেই ইখলাস অর্জন করে যা আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়। তার দান অন্যের দৃষ্টির জন্য নয়; শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।

হাদিসটি মানবজীবনের সাতটি আদর্শ চরিত্র তুলে ধরে; ন্যায়, আনুগত্য, মসজিদের প্রতি ভালোবাসা, নৈতিক বন্ধুত্ব, আন্তরিকতা, পাপ থেকে দূরে থাকা এবং গোপন দান। হাশরের ময়দানের ভয়াবহতার সময়ে এ চরিত্রগুলো মানুষকে আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান দেবে; যা মানবতার সর্বোচ্চ সম্মানগুলোর একটি।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

saofpas352@gmail.com

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা