খুঁজুন
মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬, ১৭ চৈত্র, ১৪৩২

প্রস্রাবের পর শুধু টিস্যু ব্যবহার করলে নামাজ শুদ্ধ হবে কি? জানুন সত্যটা

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬, ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ
প্রস্রাবের পর শুধু টিস্যু ব্যবহার করলে নামাজ শুদ্ধ হবে কি? জানুন সত্যটা

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তাঁর ইবাদতের জন্য। আর ইবাদতের শ্রেষ্ঠতম রূপ হলো নামাজ। প্রত্যেক মুসলমানের ওপর এই নামাজ ফরজ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা আমার স্মরণোদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম করো।’ (সুরা ত্বহা : ১৪)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তুমি সূর্য হেলার সময় থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ কায়েম কর এবং ফজরের নামাজ (কায়েম কর)। নিশ্চয়ই ফজরের নামাজে সমাবেশ ঘটে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল : ৭৮)

রাব্বুল আলামিন আরও বলছেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে’ (সুরা আনকাবুত : ৪৫)। অর্থাৎ, প্রকৃত নামাজি সব ধরনের অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা থেকে নিজেকে দূরে রাখেন।

নামাজের কথা সামনে আসতেই অনেকে জানতে চান, ‘কেউ যদি প্রসাব করার পর শুধু টিস্যু বা মাটির ঢিলা ব্যবহার করে শুকিয়ে নেয়, পানি ব্যবহার না করে, তারপর অজু করে নামাজ পড়ে, তবে কি তার নামাজ হবে না? পানি ব্যবহার না করার কারণে সে কি নাপাক থেকে যাবে?’

এ প্রসঙ্গে ফরিদপুর প্রতিদিনের পাঠকদের জন্য উত্তর দিয়েছেন রাজধানীর জামিয়া ইকরার ফাজিল মুফতি ইয়াহইয়া শহিদ। তিনি বলেন, ‘প্রস্রাব করে ভালোভাবে টিস্যু ব্যবহার করলেই পবিত্রতা অর্জিত হয়। টিস্যু ব্যবহারের পর পানি ব্যবহার করা জরুরি নয়। পানি থাকার পরও কেউ যদি শুধু টিস্যু ব্যবহার করে, পানি ব্যবহার না করে, তাহলেও তার অজু ও নামাজ শুদ্ধ হবে।’

‘তবে, প্রস্রাবের পর টিস্যু ব্যবহারের পাশাপাশি সুযোগ থাকলে পানিও ব্যবহার করা উত্তম। কারণ এতে ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করা হয়। আল্লাহ তায়ালা অধিক পবিত্রতা পছন্দ করেন।’

সূত্র- কিতাবুল আছার, ইমাম মুহাম্মা : বর্ণনা ১৪৬, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ : বর্ণনা ৩৯৭৮-৩৯৮৪, বাদায়েউস সানায়ে : ১/১০৪, আলবাহরুর রায়েক : ১/২২৮, ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/৪৮, রদ্দুল মুহতার : ১/৩৩৮

জ্বালানি তেল নিয়ে সক্রিয় নানামুখী সিন্ডিকেট, বাড়ছে শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬, ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ
জ্বালানি তেল নিয়ে সক্রিয় নানামুখী সিন্ডিকেট, বাড়ছে শঙ্কা

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আকস্মিক ইরানে হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানিখাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী যুদ্ধের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় এই অস্থিরতা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। আর এই পরিস্থিতিতেই জ্বালানি তেল নিয়ে সক্রিয় হয়েছে বিভিন্নমুখী সিন্ডিকেট।

এর মধ্যে আছে অতি মুনাফালোভী ও সরকারকে অস্থিতিশীল করার ছুতো খুঁজতে থাকা সিন্ডিকেট। আছে চোরাকারবারি চক্রও।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদন ও সূত্র মতে, জাহাজ, ডিপো, পেট্রোল পাম্প, গাড়ির ট্যাংক থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই সক্রিয় ছোট-বড় চোরাকারবারিরা।

অবৈধ মজুতদাররা দ্বিগুণ দামেও বিক্রি করছে জ্বালানি তেল। শুধু যে চোরাই তেল দেশের বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে তা নয়, বিদেশেও পাচার হচ্ছে।
অন্যদিকে, পেট্রোল পাম্প মালিকদের একটা বড় অংশ পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের সমর্থক এবং সুবিধাভোগী। তারা কৃত্রিম জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি করে পরিবহনসহ বিভিন্ন সেক্টরে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা অব্যাহত রেখেছে, যাতে সরকারে অস্থিরতা তৈরি করা যায়।

এ অবস্থায় গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে পদক্ষেপ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিনই জব্দ হচ্ছে অবৈধভাবে মজুত করা তেল আর কালোবাজারে বিক্রির জন্য করা হচ্ছে জরিমানা। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা থাকলেও তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃত্রিম সংকট তৈরিতে সক্রিয় রাজনৈতিক চক্র:

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেট্রোল পাম্প মালিকদের একটা বড় অংশ বিগত সরকারের সমর্থক ও সুবিধাভোগী। মূলত তারাই কৃত্রিম জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি করে পরিবহনসহ বিভিন্ন সেক্টরে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা অব্যাহত রেখেছে।

জ্বালানি সংকট নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রিপোর্টে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে মূলত দুটি সিন্ডিকেট কাজ করেছে। প্রথমটি হচ্ছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক সিন্ডিকেট। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের বহির্নোঙর হলো এই সিন্ডিকেটের মূল আখড়া। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ঢাকার সরবরাহ ও বিতরণ সিন্ডিকেট। ঢাকার সিন্ডিকেটটি মূলত তেল পৌঁছানোর পর খুচরা বাজার ও ডিলার পর্যায়ে কারসাজি করে।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে ট্যাংক লরিগুলো থেকে তেল চুরি করা হয়। অনেক সময় ডিপোতে তেল লোড করার সময় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিটি লরিতে ১৫০-২০০ লিটার বাড়তি তেল দেওয়া হয়, যা পরে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। এছাড়া ডিপোগুলো থেকে তেল উত্তোলনের পর পাম্প মালিকরা তেলের দাম বাড়ার অপেক্ষায় মজুত করে রাখেন। বিশেষ করে তেলের দাম বাড়ার গুঞ্জন উঠলে রাজধানীসহ দেশের অনেক পাম্পে হঠাৎ ‘সাপ্লাই নেই’ বলে সংকট তৈরি করা হয়।

এ প্রসঙ্গে বিডিআরের সাবেক সিইও মেজর (অব.) ইমরান বলেন, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকারের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এছাড়া সীমান্তে নজরদারিও জোরদার করা উচিত। এরই মধ্যে কুষ্টিয়া অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্তে তেল পাচারের খবর পাওয়া গেছে, বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় পরিবহনকারী লরি থেকে তেল বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেইসঙ্গে অবৈধ মজুতের প্রমাণও মিলেছে। ২৭ মার্চ (শুক্রবার) সকালে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩০টি ড্রামে মজুত করা আনুমানিক ৬ হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করেছে জেলা প্রশাসন। ওইদিন মধ্যরাতে জামালপুরে ১৫টি ড্রামে জব্দ করা হয় ৩ হাজার লিটার পেট্রোল। ঠিক এর আগের দিন ২৬ মার্চ শেরপুর শহরের একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবনের নিচতলায় ২৫ হাজার লিটার তেলের ট্যাংকের সন্ধান পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে মেসার্স ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স ফিলিং স্টেশনে ২ হাজার ৩৬৮ লিটার পেট্রোল, তিন হাজার ৭৬০ লিটার ডিজেল এবং তিন হাজার ৬৫৫ লিটার অকটেন মজুত থাকার পরও বন্ধ রাখা হয়েছিল তেল বিক্রি; অন্যদিকে ২৮ মার্চ রাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর একটি পাম্পের রিজার্ভারে প্রায় ৬ হাজার লিটার অকটেনের মজুত পাওয়া যায়। তারাও বন্ধ রেখেছিল তেল বিক্রি।

এ প্রসঙ্গে পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ডিলারস্ ডিস্ট্রিবিউটারস এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, যারা ন্যাশনাল ক্রাইসিসের সময় এ ধরনের গর্হিত কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারে, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমার মনে হয় এখানে স্ট্রেট স্যাবোটাজ আছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে।

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংগঠনের আরেক নেতা বলেন, অনেক পাম্প মালিক রয়েছেন, যারা বিগত সরকারের মনোনয়নে বিভিন্ন পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন। এখন তারা ভোল পাল্টে নীতিকথা বলছেন। এ বিষয়গুলো সরকারের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশ্লেষক ড. শামসুল আলম বলেন, জাহাজ থেকে ডিপো কিংবা ডিপো থেকে পাম্প ও খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ক্ষেত্রবিশেষে লাইসেন্স বাতিলের মতো দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী পদক্ষেপও নিতে হবে। এক্ষেত্রে যেসব সরকারি কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা পাচ্ছেন, তারা কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারেন– সে বিষয়েও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে বলে মনে করেন এই জ্বালানি বিশ্লেষক।

এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, কারসাজি ঠেকাতে তারা এরই মধ্যে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থার প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চোরাই তেলের মূল কারবার চলে নদী ও সাগরে:

সূত্র জানায়, চোরাই তেলের মূল কারবার চলে নদী ও সাগরে। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত বড় বড় জাহাজ থেকে অবৈধভাবে তেল নামানো হয়। এসব তেল উপকূলে ড্রাম, ট্যাংক এমনকি নৌযানে লুকিয়ে রেখে গোপনে বিক্রি করা হয়। এ কাজটি অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। সরকারি পর্যায়ে আমদানি করা তেল চুরিতে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে ‘সিস্টেম লস’। জাহাজ থেকে ডিপোর ট্যাংক বা পরিশোধন কারখানায় ঢোকানোর সময় থেকে বাজারজাত করা পর্যন্ত ঢাল হিসেবে থেকে যায় ‘সিস্টেম লস’। এ ঢাল ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার তেল সরিয়ে নেওয়া হয়।

চোরাই তেলের কারবার নিয়ে বিভিন্ন সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কালো টাকা, পেশিশক্তি, বশ করা কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তি– এসবের সঙ্গে জড়িত। সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে কখনো কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হস্তক্ষেপও করতে দেখা যায়। ২০২৫ সালের মে মাসে কর্ণফুলী নদীর তীরে চোরাই তেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুটি গ্রুপের সংঘর্ষ হয়েছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিপিং ব্যবসায়ী বলেন, একটি বিদেশি বড় জাহাজে কয়েক মাসের খাবার ও জ্বালানি মজুত থাকে। ট্রিপ শেষে ক্যাপ্টেন যদি দেখেন প্রচুর জ্বালানি তেল ও খাবার রয়ে গেছে, তখন তিনি বিশ্বস্ততা অর্জন করেছে এমন লোকজনকে খুশি হয়ে এসব দিয়ে দেন। এর বিনিময়ে পণ্য, গিফট বা ডলার নিয়ে থাকেন। এভাবে কিছু জ্বালানি তেল দেশে ঢোকে, যা চোরাই তেল হিসেবে গণ্য হচ্ছে। যদিও কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও থানা পুলিশের নজরদারি বেড়েছে।

জ্বালানি তেলের আরেকটি উৎস জাহাজভাঙা শিল্প। বিদেশ থেকে আনা বড় বড় জাহাজগুলো যখন কাটা হয়, তার আগে অব্যবহৃত জ্বালানি তেল এবং পোড়া তেল আলাদাভাবে বিক্রি করা হয়। অব্যবহৃত জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল বিভিন্ন কারখানায় চলে যায় হাতবদলের মাধ্যমে।

এ প্রসঙ্গে জাহাজভাঙা শিল্পের একজন উদ্যোক্তা জানান, একটি জাহাজ বিচিং করার জন্য অনেক প্রক্রিয়া শেষ করে বিদেশ থেকে চালিয়ে বাংলাদেশের জলসীমায় আনা হয়। এসময় কাস্টমসের কর্মকর্তারা ওই জাহাজে কী পরিমাণ অব্যবহৃত তেল মজুত আছে তা পরিমাপ করে ট্যাক্স ও ভ্যাট আরোপ করেন। এক্ষেত্রে জাহাজটি যেহেতু ভরা জোয়ারের জন্য ৭ দিন থেকে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়, তাই প্রতিদিন ৩-৪ টন জ্বালানি খরচ হয়। ট্যাক্স ও ভ্যাট আরোপের সময় তেলের পরিমাপ ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পরিমাণ হিসাব করে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। জাহাজ শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে আনার পর মবিল, লুব অয়েল, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও পোড়া তেল– এসব ভাগ করে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

সরকারি এক প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, ইপিজেড এবং কর্ণফুলী এলাকায় সক্রিয় দুটি বড় তেল সিন্ডিকেটের কথা উঠে এসেছে, যারা পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের ‘ম্যানেজ’ করে বিদেশি জাহাজ থেকে তেল চুরি করে।

সাগর, নদী, জাহাজ ও ডিপোর বাইরে আরেকটি চক্র আছে তেলের লরির মাধ্যমে চুরি করে। বিশেষ করে ডিপোতে তেল লোড করার সময় ডিপোর কর্মীর সঙ্গে যোগসাজশ করে ১৫০-২০০ লিটার বাড়তি তেল নেওয়া হয়, যা যাত্রাপথে নির্দিষ্ট ভাসমান তেলের দোকানে কম দামে নগদে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এর বাইরে দূরপাল্লার গাড়ি থেকেও অব্যবহৃত জ্বালানি চালক-হেলপাররা এসব দোকানে বিক্রি করে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভাটিয়ারী, সীতাকুণ্ডসহ দেশের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে এ ধরনের ভাসমান তেলের দোকানের ছড়াছড়ি রয়েছে। ইদানীং খোদ পেট্রোল পাম্প মালিকরাই জ্বালানি সংকট তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা ও বেশি মুনাফার জন্য অবৈধভাবে তেল মজুত করছে, যা প্রশাসনের অভিযানে ধরাও পড়ছে।

গত শনিবার (২৮ মার্চ) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্টগার্ড আউটপোস্ট পতেঙ্গা থানাধীন কর্ণফুলী চ্যানেলের ১৪ নম্বর ঘাট সংলগ্ন এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশে বহন করা প্রায় ৪৮ লাখ টাকার ১ হাজার ৬০০ লিটার ডিজেল, ৩ হাজার ৩০০ কেজি আলকাতরা ও ৪টি ডিজেল ইঞ্জিনসহ ৭ পাচারকারীকে আটক করে। গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম জেলার পতেঙ্গা এলাকার কমিশনার ঘাটায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩০টি ড্রামে অবৈধভাবে মজুত করা আনুমানিক ৬ হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, সমুদ্রগামী জাহাজ ও তেল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনের সময় একটি অসাধু চক্র অবৈধভাবে জ্বালানি তেল অপসারণ করে তা বিভিন্ন স্থানীয় বিক্রেতার কাছে সরবরাহ করে থাকে। জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং অবৈধ মজুত প্রতিরোধের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে সব তেল ডিপো, পেট্রোল পাম্প ও সংশ্লিষ্ট তেল কারবারিরা প্রশাসনের কঠোর নজরদারির আওতায় রয়েছে। এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, নিঃসন্দেহে চোরাই তেল একটি বড় সমস্যা। অননুমোদিত, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় এসব তেল সংগ্রহ, মজুত ও বিক্রি হচ্ছে। বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি এবং মানুষ হতাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। পাশাপাশি চোরাই তেল খাতে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে, যা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ২০২৬ সালে এসেও যদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিপিসি, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ইআরএল, ডিপো, ফিলিং স্টেশন ও ডিলারসহ সব প্রতিষ্ঠান অটোমেশনের আওতায় না থাকে সেটি দুর্ভাগ্যের। যেখানে ম্যানুয়াল পদ্ধতি থাকবে, সেখানেই কারচুপির মহোৎসব হবে– এটা স্বাভাবিক।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হিসেবে জ্বালানি পরিবহনে ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন দ্রুত পুরোপুরি কার্যকর করলে ট্যাংক লরি ও অয়েল ট্যাংকারে (জাহাজ) জ্বালানি পরিবহনের খরচ, সময়, ঝুঁকি ও সিস্টেম লস সাশ্রয় হবে। তেলবাহী সব ট্যাংক লরিতে জিপিএস ট্র্যাকিং এবং ডিজিটাল লক বসানো উচিত। পাম্পগুলোতে একই মানের ‘অয়েল ডিসপেনসিং মেশিন’ ব্যবহার এবং এর কী-বোর্ড ভেতরে রাখা, যাতে কারচুপি করা না যায়। বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত।

চোরাই তেলের সিন্ডিকেট সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, প্রথম টার্গেট আমাদের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট। এটা বৈশ্বিক বিষয়, এটা উপেক্ষা করার বিষয় না। ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল পৌঁছে দেওয়া আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

অটোমেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিপিসির সব কার্যক্রম শতভাগ অটোমেশনে আসেনি। এটা শতভাগ অটোমেশন হলে তথ্য এক ক্লিকে পাওয়া যাবে।

বাংলানিউজ 

সচিবালয় থেকে সংসদ, আলোচনায় জ্বালানি সংকট

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬, ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ
সচিবালয় থেকে সংসদ, আলোচনায় জ্বালানি সংকট

দেশে জ্বালানি ঘাটতি নেই, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে—সরকারের এমন আশ্বাসের মধ্যেই পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, সংসদে বিরোধী দলীয় এমপির তেল না পাওয়ার অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ মজুতের ঘটনা; সব মিলিয়ে জ্বালানি ইস্যু এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

সোমবার (৩০ মার্চ) সচিবালয়ে এক সভা শেষে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। কৃষিখাতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল মজুত রয়েছে।

এছাড়া চলতি সপ্তাহেই আরও ৫৪ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন ডিজেল দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এপ্রিল মাসে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আরও ১ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন তেল আমদানি হওয়ার আশা করা হচ্ছে। রাশিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
সোমবার জাতীয় সংসদে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তিনি নিজেই পাম্প ঘুরে গাড়ির জন্য তেল পাননি।

তার এ বক্তব্যকে সমর্থন করে আরেক সংসদ সদস্য জানান, অনেক এলাকায় পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না, যদিও বোতলে করে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির ঘটনা ঘটছে।
এ দিন সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশে প্রকৃত কোনো জ্বালানি সংকট নেই; বরং অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুত প্রবণতার কারণে কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, দেশের মোট ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল, যার সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। অন্যদিকে পেট্রোল ও অকটেনের ব্যবহার তুলনামূলক কম হলেও হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছু স্থানে চাপ তৈরি হয়েছে।

মন্ত্রী আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাবের কথাও উল্লেখ করে বলেন, সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি বাড়ানো হচ্ছে।

সিন্ডিকেটের কারসাজির অভিযোগ:

জ্বালানি সংকটের পেছনে সংগঠিত সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য দুটি সক্রিয় চক্র কাজ করছে; একটি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক, অন্যটি ঢাকাকেন্দ্রিক সরবরাহ ও বিতরণ সিন্ডিকেট।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে তেল পরিবহনের সময় ট্যাংক লরি থেকে তেল চুরি, ডিপো পর্যায়ে কারসাজি এবং খুচরা পর্যায়ে মজুত করে সরবরাহ বন্ধ রাখার মাধ্যমে বাজারে অস্বাভাবিক সংকট তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে দাম বাড়ার গুঞ্জন ছড়ালেই অনেক পাম্পে ‘সাপ্লাই নেই’ দেখিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযান ও জব্দের ঘটনা:

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ধরতে সারা দেশে অভিযান চালাচ্ছে সরকার। ৩ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৬৪ জেলায় মোট ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে অবৈধভাবে মজুত করা ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।

সোমবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন দেশব্যাপী অভিযান চালিয়েছে। রাজধানীর গুলশান, খিলখেত ও ভাটারা এলাকায় যৌথ অভিযানে প্রায় ১২০০ লিটার ডিজেল ও পেট্রোল জব্দ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ ঘটনায় সাতজনকে আটক করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম, জামালপুর, শেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার লিটার জ্বালানি অবৈধভাবে মজুত অবস্থায় জব্দের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও পাম্পে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও বিক্রি বন্ধ রাখার প্রমাণও মিলেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে ইতোমধ্যে তিন হাজারের বেশি অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি উদ্ধার, মামলা, জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস থাকলেও অবৈধ মজুত, সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং কৃত্রিম চাহিদা—এসব বাস্তবতায় দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি এখন জটিল রূপ নিয়েছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে সার সংকটের শঙ্কা কতটা?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬, ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ
ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে সার সংকটের শঙ্কা কতটা?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন সংকটে পড়ে কিনা এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও সারের সরবরাহ নিয়ে গোটা বিশ্বের মতো চিন্তায় বাংলাদেশের কৃষকরাও।

চাহিদা মতো জ্বালানি তেল না পেয়ে বোরো মৌসুমে সেচ নিয়ে অনেক কৃষক যেমন সমস্যায় পড়েছেন, তেমনি আসন্ন আমন মৌসুমের জন্য সারের সরবরাহ নিয়েও চিন্তা বাড়ছে।

মূলত সারের মোট চাহিদার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব এবং কাতার থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ।

এছাড়া দেশের কারখানাগুলোতে যে সার উৎপাদন হয় সেখানেও বড় ভরসা আমদানিকৃত গ্যাস।

কিন্তু উপসাগরীয় এলাকায় চলমান যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ এখন পুরোটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

যদিও সরকারের দাবি, সার নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। এই মুহূর্তে দেশে যে পরিমাণ সার মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে অন্তত এক বছর পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়া যাবে।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে যাতে কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি ও সার সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

তিনি বলছেন, আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন ও মিশরের মতো বিকল্প দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ করছে সরকার।

এদিকে, সরকারিভাবে সার মজুদ এবং সরবরাহের বিষয়ে আশ্বস্ত করা হলেও দেশের বিভিন্ন জেলায় মাঠ পর্যায়ে ভিন্ন পরিস্থিতিরও খবর পাওয়া গেছে।

দেশের কোনো কোনো এলাকায় ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের বাড়তি দাম রাখছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি কিংবা সারের সংকট তৈরি হতে পারে।

কিন্তু “বাংলাদেশে কোনো একটা সংকট তৈরি হওয়ার আগেই একটা কৃত্রিম সংকট আমরা তৈরি করে ফেলি, এটা মূল সমস্যা,” বলেন তিনি।

বাধাগ্রস্ত সার উৎপাদন

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনের লম্বা লাইন সেই বাস্তবতায় তুলে ধরে।

সরকারের পক্ষ থেকেও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কথাও জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনা।

যা সার উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ দেশের সার কারখানাগুলো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি’র ওপর বড় মাত্রায় নির্ভরশীল।

ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে গ্যাস সাশ্রয় করতে মার্চের শুরু থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ রেখেছে সরকার।

উৎপাদন বন্ধ বেসরকারি কাফকো সার কারখানায়ও। যা চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে দেশের কৃষিখাতের জন্য।

যদিও কারখানাগুলো শিগগিরই উৎপাদনে ফিরবে বলে দাবি কৃষিমন্ত্রীর। তিনি বলছেন, সারের মজুদ পর্যাপ্ত থাকায় জ্বালানি রেশনিংয়ের অংশ হিসেবে সার কারখানাগুলো আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।

“বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, উনি বলেছেন এরই মধ্যে চালু করে দেবেন। অন্তত ঘোড়াশালও যদি চালু করে দেয় তাহলেও আমরা প্রতিদিন ২৮শ টনের ওপর পেয়ে যাব,” বলেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কেবল মজুদ দিয়ে দীর্ঘ সময় সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলেই মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

তাই চীন, মিশর বা রাশিয়ার মতো বিকল্প বাজার থেকে দ্রুত সার আমদানি নিশ্চিত করা এবং বন্ধ থাকা দেশিয় কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের ফসলি মৌসুম অনুযায়ী এখন সারের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় আপাতত তেমন সমস্যা হবে না বলেই মনে করেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম।

তিনি বলছেন, “এই মৌসুমে ধান এখন শেষের দিকে আছে, সেখানে খুব একটা সারের প্রয়োজন নেই। কিছু জায়গায় লেইট প্লানটেশন হয়েছে সেখানে কিছু সার হয়তো লাগবে।”

কিন্তু বিকল্প উৎস থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করা ঠিক হবে না বলেই মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, “আমরা যেহেতু বিকল্প উৎসের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছি, সেক্ষেত্রে দামও কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।”

এছাড়া অন্যান্য খাতে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ মি. ইসলামের। “কৃষি তো এককভাবে চলে না, একটা সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার,” বলেন তিনি।

মজুদ আছে কতটা?

কৃষি নির্ভর দেশ হয়েও সারের চাহিদার প্রায় সবটাই বিদেশ থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ।

দেশের সরকারি পাঁচটি ও বেসরকারি একটি কারখানায় কিছু সার উৎপাদিত হলেও বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে।

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লক্ষ টন সারের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট চাহিদার প্রায় সাড়ে ২৬ লক্ষ টনই লাগে ইউরিয়া সার। যার কেবল ১০ লক্ষ টন দেশে উৎপাদন হয়।

অর্থাৎ কৃষিতে প্রয়োজনীয় সারের বড় অংশই আমদানি করতে হয়।

আর এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি সারের আমদানি এবং চাহিদা পূরণ নিয়ে বাংলাদেশকে শঙ্কায় ফেলেছে।

যদিও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলছেন, পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকায় এই মুহূর্তে সংকটের কোনো শঙ্কা নেই।

“আমদানিকৃত সার এখনও যতটা মজুদ আমাদের কাছে আছে, তাতে আরও মোটামুটি এক বছর চালিয়ে নেওয়া যাবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরিয়া চার লাখ ৯৩ হাজার টন, টিএসপি তিন লাখ ৮২ হাজার টন, ডিএপি পাঁচ লাখ নয় হাজার টন এবং এমওপি মজুদ রয়েছে তিন লাখ ৪২ হাজার টন।

মন্ত্রী বলছেন, এখন বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে। ফলে আগামী কয়েক মাস নতুন করে বিপুল পরিমাণ সারের প্রয়োজন পড়বে না।

এছাড়া বর্ষা শেষে আমন মৌসুমেও ইউরিয়ার চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। মূলত আগামী বছরের বোরো মৌসুমকে লক্ষ্য করেই এখন থেকে আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

“কাতার, সৌদি আরব থেকে আমরা মূলত ইউরিয়া আমদানি করতাম। এই মুহূর্তে কোনো ক্রাইসিস নাই, তবে এটা যেহেতু চলমান প্রক্রিয়া তাই আমরা বিকল্প উৎস খুঁজছি,” বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা

বৈশ্বিক জ্বালানির পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং সারের তিন ভাগের এক ভাগ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়েই সরবরাহ করা হয়।

যে পথটি গত প্রায় এক মাস ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান। যার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা সিআরইউ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। টনপ্রতি যে সারের দাম ছিল ৪৯০ ডলার, তা এখন ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম আরও বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করবে।

এরই মধ্যে সার সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় কৃষি উৎপাদন নিয়ে সংকটে পড়েছে ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের সভাপতি টম ব্র্যাডশ বলেছেন, বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা কৃষি ব্যবসাগুলোকে “প্রচণ্ড চাপের” মধ্যে ফেলছে।

তিনি বলেন, “জ্বালানি ও সারের বর্ধিত ব্যয়ভার বহন করতে এরই মধ্যে বাড়তি চাপে পড়েছেন শস্য, পশুপালন এবং দুগ্ধ খামারিরা।”

এদিকে, কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু সারের দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় বড় আঘাত হানতে পারে।

তাদের অনুমান অনুযায়ী, এর ফলে বিশ্বব্যাপী গমের দাম চার দশমিক দুই শতাংশ এবং ফল-সবজির দাম পাঁচ দশমিক দুই শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

তবে, বৈশ্বিক এই সংকটে রাশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের মোট সার রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে রাশিয়া থেকে।

মধ্যপ্রাচ্যের উৎসগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাশিয়া এখন বিশ্ববাজারে সারের বড় যোগানদাতা হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করতে পারে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র : বিবিসি বাংলা