‘ভারী থলে ও পথের পাহাড়’
বিকেলের শেষ আলো পাহাড়ের ঢালে এসে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা লালচে হয়ে নিচে নামছে। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটছিল রাশেদ। পায়ের নিচে পাতাগুলো মড়মড় করে উঠছিল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল ছিল না।
তার মনটা আজকাল এমনিতেই ভারী।
জীবনের বয়স মাত্র ছাব্বিশ। অথচ মাঝে মাঝে তার মনে হয়, এই বয়সেই যেন অনেকগুলো বছর বয়ে ফেলেছে সে। একসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল! নিজের একটা ব্যবসা করবে, ভালোভাবে দাঁড়াবে, পরিবারকে স্বচ্ছন্দে রাখবে—সবই ভেবেছিল।
কিন্তু কয়েক বছর আগে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু নাবিল ব্যবসার টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল। রাশেদের নিজের জমানো টাকা তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল ধার করা টাকাও। এক মুহূর্তে সব এলোমেলো হয়ে গেল।
টাকা হারানোর কষ্টের চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়েছিল মানুষের কথা।
“ব্যবসা করার আগে একটু বুদ্ধি থাকা দরকার ছিল।”
“বন্ধুকে এত বিশ্বাস করলে এমনই হয়।”
“তোমার দ্বারা এসব হবে না।”
কথাগুলো কেউ হয়তো মুহূর্তের রাগে বলেছিল, কেউ হয়তো মজা করে। কিন্তু রাশেদ সেগুলো ভুলতে পারেনি।
এরপর যতবার নতুন করে কিছু শুরু করতে চেয়েছে, ততবারই পুরোনো ব্যর্থতা তাকে পেছন থেকে টেনে ধরেছে। ধীরে ধীরে সে নিজেকেই বিশ্বাস করা বন্ধ করে দিল।
রাতে ঘুমাতে গেলেই পুরোনো ঘটনাগুলো মনে পড়ত। কখনো বন্ধুর প্রতারণা, কখনো আত্মীয়ের কথা, কখনো নিজের ব্যর্থতা।
“সেদিন যদি এমনটা না হতো…”
“আমি যদি তখন ওকে বিশ্বাস না করতাম…”
“আরেকটু সুযোগ পেলে হয়তো…”
এই ‘যদি’ আর ‘হয়তো’র ভেতরেই কেটে যাচ্ছিল তার দিন।
শেষ পর্যন্ত একদিন গ্রামের এক বৃদ্ধের কথা মনে পড়ল—সুলেমান শেখ।
পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট একটা ঘরে একা থাকেন তিনি। বয়স অনেক। জীবনে কম কষ্ট পাননি। তবু মানুষটার মধ্যে অদ্ভুত এক শান্তি আছে। গ্রামের কেউ বিপদে পড়লে তার কাছে যায়। তিনি বেশি কথা বলেন না, কিন্তু তার দু-একটি কথাই অনেক সময় মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে।
আজ বিকেলে রাশেদ তাই তার কাছে এসেছে।
সুলেমান শেখ রাশেদের কথা মন দিয়ে শুনলেন। কোথাও বাধা দিলেন না। সব কথা শেষ হলে কিছুক্ষণ চুপ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ঘরের এক কোণ থেকে একটা খালি চটের থলে এনে রাশেদের হাতে দিলেন।
—আমার সঙ্গে চলো।
রাশেদ কিছুটা অবাক হলো।
—কোথায়?
—চললেই দেখবে।
বৃদ্ধ সামনে হাঁটতে শুরু করলেন। রাশেদও পেছনে পেছনে চলল।
কিছুদূর গিয়ে তারা পাহাড়ি টিলার গোড়ায় এসে দাঁড়াল।
সুলেমান শেখ মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আজ চূড়ায় উঠব।
রাশেদ পাহাড়ের দিকে তাকাল। পথটা বেশ খাড়া।
বৃদ্ধ বললেন,
—পথে যত পাথর দেখবে, সব কুড়িয়ে এই থলেতে ভরবে।
রাশেদ অবাক হয়ে বলল,
—সব পাথর?
—হ্যাঁ। যত পারো।
রাশেদ কিছু বুঝতে না পেরে থলেটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল।
পথের শুরুতেই একটা লালচে পাথর চোখে পড়ল। সেটা হাতে নিতেই তার মনে পড়ে গেল এক আত্মীয়ের কথা—
“তোমার দ্বারা কিছু হবে না।”
সে পাথরটা থলেতে রেখে দিল।
আরও কিছুদূর গিয়ে একটা কালো পাথর পেল। সেটি হাতে নিতেই মনে পড়ল নাবিলের কথা। সেই বিশ্বাসঘাতকতার রাত।
পাথরটাও থলেতে গেল।
তারপর আরও পাথর।
কোনো পাথরের সঙ্গে জড়িয়ে গেল অপমানের স্মৃতি, কোনোটা ব্যর্থতার, কোনোটা হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের। রাশেদের মনে হচ্ছিল, সে যেন পথ থেকে পাথর নয়, নিজের জীবনের পুরোনো ঘটনাগুলোই তুলে তুলে থলেতে ভরছে।
পাহাড় যত ওপরে উঠছিল, থলেটা তত ভারী হচ্ছিল।
একসময় রাশেদের কাঁধে ব্যথা শুরু হলো। চটের ফিতেটা চামড়ায় ঘষা খেয়ে জ্বালা করছিল। হাঁপাতে হাঁপাতে সে একসময় থেমে গেল।
—আমি আর পারছি না।
সুলেমান শেখও থামলেন।
—কী হলো?
রাশেদ থলেটা মাটিতে নামিয়ে বলল,
—এটা অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে। এত পাথর নিয়ে আর ওঠা যাচ্ছে না।
বৃদ্ধ থলেটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
—কী, খুব ভারী হয়ে গেছে?
—আর বলবেন না! কাঁধে ব্যথা হয়ে গেছে।
—তাহলে নামিয়ে রাখছ না কেন?
রাশেদ অবাক হয়ে তাকাল।
—আপনিই তো তুলতে বলেছিলেন!
সুলেমান শেখ হেসে বললেন,
—বলেছিলাম। তাই বলে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে নাকি?
রাশেদ চুপ করে গেল।
বৃদ্ধ থলেটার দিকে ইশারা করলেন।
—আচ্ছা বলো তো, এই পাথরগুলো কি তোমার কোনো কাজে লাগবে?
—না। শুধু কষ্টই হচ্ছে।
—তাহলে ফেলে দাও। পথ চলতে গেলে সবকিছু সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হয় না।
কথাটা শুনে রাশেদ স্থির হয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ বললেন,
—জীবনেও এমন হয়, বাবা। কেউ একটা কথা বলে কষ্ট দিল, কোথাও ব্যর্থ হলে, কেউ ঠকাল—আমরা সেসব ভুলতে পারি না। বারবার মনে করি। তারপর নিজের মনটাই ভারী করে ফেলি।
রাশেদ মাথা নিচু করে শুনছিল।
—যা হয়েছে, তা তো আর বদলাতে পারবে না। তবে সেখান থেকে কিছু শিখে সামনে যেতে পারবে। পুরোনো কথা মনে পড়তেই পারে। কিন্তু প্রতিদিন সেগুলোকে কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটার দরকার কী?
বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।
রাশেদ ধীরে ধীরে থলেটা কাঁধ থেকে নামাল।
একবার মুখ খুলে ভেতরের পাথরগুলোর দিকে তাকাল।
এতগুলো পাথর—এতগুলো স্মৃতি!
কত বছর ধরে সে এগুলো বুকের ভেতর বয়ে বেড়াচ্ছে!
সে থলেটা উল্টে দিল।
পাথরগুলো একে একে গড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। কোনোটা ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেল, কোনোটা আরও নিচে গিয়ে থেমে রইল।
রাশেদ অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল।
তার বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরি হলো। কিন্তু সেই শূন্যতার মধ্যে ভয় ছিল না। বরং ছিল স্বস্তি।
সে গভীর করে শ্বাস নিল।
সুলেমান শেখ উঠে দাঁড়ালেন।
—চলো।
রাশেদও উঠে দাঁড়াল।
পাহাড়ের চূড়া তখনও অনেকটা দূরে। পথও আগের মতোই খাড়া, পাথুরে আর দুর্গম। কিন্তু রাশেদের কাছে এবার পথটাকে অন্যরকম লাগছিল।
কিছুদূর উঠে সে একবার পেছনে তাকাল।
নিচে পড়ে থাকা পাথরগুলো আর আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না।
তার মনে হলো—মানুষের জীবনের সব বোঝা বাইরের কেউ কাঁধে তুলে দেয় না। কিছু বোঝা সে নিজেই কুড়িয়ে নেয়। তারপর অভ্যাসের বশে সেগুলো বয়ে বেড়ায়।
পাহাড়ের চূড়ার কাছে পৌঁছাতেই বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে এল। দূরের গ্রাম, গাছপালা আর আঁকাবাঁকা পথগুলো ওপর থেকে ছোট হয়ে দেখা গেল।
রাশেদ থেমে দাঁড়াল।
তার জীবনের সমস্যা আজও শেষ হয়নি। হারানো টাকা ফিরে আসেনি। যে মানুষ তাকে ঠকিয়েছে, সে ক্ষমাও চায়নি। পুরোনো কথাগুলোও পৃথিবী থেকে মুছে যায়নি।
কিন্তু আজ একটা জিনিস বদলে গেছে।
রাশেদ আর সেগুলোকে নিজের সঙ্গে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে না।
সে সামনে তাকাল।
পাহাড়ের ওপারে বিশাল আকাশ।
রাশেদ ধীরে ধীরে চূড়ার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
এবার তার কাঁধে কোনো থলে নেই।
শুধু সামনে খোলা পথ।

আপনার মতামত লিখুন
Array