খুঁজুন
সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন, ১৪৩২

ফরিদপুরে পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী পালিত

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:৪২ পিএম
ফরিদপুরে পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী পালিত

“তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়—”
গ্রামবাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, জীবনসংগ্রাম আর চিরচেনা আবহকে যিনি সাহিত্যে অমর করে তুলেছিলেন, সেই পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে ফরিদপুরে।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকাল থেকে ফরিদপুর শহরতলীর কুমার নদীর তীরে অম্বিকাপুরে কবির সমাধিস্থল ঘিরে ছিল উৎসবমুখর ও শ্রদ্ধাবিহ্বল পরিবেশ। জেলা প্রশাসন, জসীমউদ্দীন ফাউন্ডেশন, প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় এই কালজয়ী কবিকে।

ফুলেল শ্রদ্ধা, মিলাদ ও আলোচনা সভা:

সকাল সাড়ে ১০টায় কবির সমাধিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির সূচনা হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর জসীমউদ্দীন ফাউন্ডেশন, ফরিদপুর প্রেসক্লাব, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়।

পরে কবির আত্মার মাগফিরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দোয়া শেষে কবির জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা।

বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি ও বক্তব্য:

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুস্মিতা সাহা, পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রফেসর এম এ সামাদ, ফরিদপুর প্রেসক্লাব সভাপতি কবিরুল ইসলাম সিদ্দীকি, সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন পিয়াল, জেলা কালচারাল অফিসার সাইফুল হাসান মিলনসহ ফরিদপুরের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

বক্তারা বলেন, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন বাংলা সাহিত্যে গ্রামবাংলার প্রাণকে ভাষা দিয়েছেন। তাঁর কবিতা, গান ও গল্পে ফুটে উঠেছে কৃষক, জেলে, রাখাল, মাঝি ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। তিনি কেবল কবি নন, তিনি গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।

জেলা প্রশাসক বলেন, “জসীমউদ্দীনের সাহিত্য আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। নতুন প্রজন্মকে তাঁর সাহিত্য পড়ার সুযোগ করে দিতে হলে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে তাঁকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।”

জন্ম ও শিক্ষাজীবন:

পল্লী কবি জসীমউদ্দীন জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর শহরতলীর কৈজুরী ইউনিয়নের তাম্বুলখানা গ্রামে, নানার বাড়িতে। তাঁর পিতার নাম আনসার উদ্দিন মোল্লা, যিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। মায়ের নাম আমিনা খাতুন, যিনি রাঙাছুট নামেও পরিচিত ছিলেন।

শৈশব থেকেই গ্রামীণ পরিবেশ, লোকসংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপন কবির মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি ফরিদপুর ওয়েলফেয়ার স্কুল ও পরে ফরিদপুর জেলা স্কুলে (বর্তমানে ফরিদপুর জিলা স্কুল) পড়াশোনা করেন। ১৯২১ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ে ভর্তি হন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৯ সালে বিএ এবং ১৯৩১ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনে বাংলা লোকসাহিত্য ও পল্লীজীবন নিয়ে গবেষণার প্রবণতা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যকর্মে গভীর ছাপ ফেলেছে।

দাম্পত্য জীবন ও পরিবার:

জসীমউদ্দীন ১৯৩৯ সালে মমতাজ বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে তিন পুত্র সন্তান—ড. জামাল আনোয়ার, খুরশিদ আনোয়ার ও আনোয়ার হাসু। পারিবারিক জীবনে কবি ছিলেন সাদাসিধে ও গ্রামঘেঁষা মানুষ।

সাহিত্যকর্ম ও অবদান:

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের সাহিত্যকর্ম মূলত গ্রামবাংলার মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাঁর লেখায় প্রেম, বিরহ, দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও মানবিক বোধ একাকার হয়ে গেছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ও সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে—
নকশী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, এক পয়সার বাঁশি, রাখালী, বালুচর, মাঠের রাখাল, জেলে নৌকা প্রভৃতি।

‘নকশী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বাংলা সাহিত্যে গ্রামবাংলার করুণ প্রেমকাহিনির অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। তাঁর অনেক কবিতা ও গান পরবর্তীতে লোকসংগীতের অংশ হয়ে যায়, যা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার:

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের অবসান ঘটে ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তাঁকে ফরিদপুর শহরতলীর অম্বিকাপুরে সমাধিস্থ করা হয়।
আজও তাঁর সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। গবেষকরা মনে করেন, জসীমউদ্দীন না থাকলে গ্রামবাংলার মানুষের জীবন ও অনুভূতির এমন নিখুঁত সাহিত্যিক দলিল হয়তো আমরা পেতাম না।

নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান:

জন্মবার্ষিকীর আলোচনায় বক্তারা নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান—জসীমউদ্দীনের সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে গ্রামবাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধকে জানার ও ধারণ করার জন্য।

দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ফরিদপুরে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে স্মরণ করা হয় পল্লী কবি জসীমউদ্দীনকে—যিনি গ্রামবাংলার মানুষের হৃদয়ের কবি হয়ে আজও অমর।

রমজানের শিক্ষা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা: সালথায় জামায়াতের ইফতার মাহফিল

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
রমজানের শিক্ষা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা: সালথায় জামায়াতের ইফতার মাহফিল

পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সালথা উপজেলা শাখার উদ্যোগে ইফতার মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।

সোমবার (৯ মার্চ) বিকেলে সালথা উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্থানীয় মুসল্লি, আলেম-ওলামা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। রমজানের তাৎপর্য ও নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা এবং মিলনমেলার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়।

উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মো. তরিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক মাওলানা আবুল ফজল মুরাদ।

আলোচনা সভায় প্রধান ও বিশেষ অতিথিরা মাহে রমজানের শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, রমজান কেবল রোজা পালনের মাসই নয়, এটি আত্মসংযম, ধৈর্য, ত্যাগ ও নৈতিকতার অনুশীলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। রমজানের শিক্ষা ব্যক্তি জীবনকে শুদ্ধ করার পাশাপাশি সমাজে ন্যায়, ইনসাফ ও সহমর্মিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

বক্তারা আরও বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- ফরিদপুর জেলা জামায়াতের অফিস সেক্রেটারি মাওলানা মিজানুর রহমান, নগরকান্দা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা সোহরাব হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বকুল মিয়া, নগরকান্দা উপজেলা জামায়াতের সুরা সদস্য ও তালমা ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মো. এনায়েত হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাবেক কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মাওলানা মাহবুব হোসেন, ঢাকা মহানগরীর মুহাম্মদপুর থানা জামায়াতের সুরা সদস্য ও সাবেক ছাত্রনেতা মুহাম্মদ সাইফুর রহমান হিটু।

এ ছাড়া উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি চৌধুরী মাহবুব আলী সিদ্দিকী নসরু, সালথা প্রেসক্লাবের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভা শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পরে উপস্থিত সকলের অংশগ্রহণে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৯:৪৪ পিএম
১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করেছে সরকার। এ বিষয়ে সোমবার (৯ মার্চ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক উপকমিশনার (পশ্চিম) কোহিনূর মিয়ার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হবে। পাশাপাশি তিনি বিধি অনুযায়ী সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দুটি বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। এ কারণে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তকরণের গুরুদণ্ডও দেওয়া হয়। পরে তিনি ফৌজদারী মামলা দুটির অভিযোগ থেকে আদালতের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণ হয়ে খালাস পান।

এছাড়া তার গুরুদণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন রাষ্ট্রপতি মঞ্জুর করায় আরোপিত চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশটি বাতিল করা হয়। তাই কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলায় ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে তার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হলো এবং তিনি বিধি মোতাবেক সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

 

 

বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও লাবলু মিয়া, সালথা:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৮:৫৯ পিএম
বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি। নেই কোনো ঘর, নেই আধুনিক সেলুনের ঝাঁ চকচকে সাজসজ্জা। তবু এই পুকুরপাড়েই প্রতিদিনের মতো বসে মানুষের চুল-দাড়ি কাটেন ৮৭ বছর বয়সী অকিল শীল। হাতে পুরোনো কাঁচি আর ক্ষুর—এই সামান্য সরঞ্জাম নিয়েই তিনি টানা ৬৬ বছর ধরে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামেও এখন গড়ে উঠেছে অসংখ্য সেলুন। উন্নত চেয়ার, আয়না, বৈদ্যুতিক ট্রিমার আর সাজানো দোকান—সবই আছে সেখানে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারের এই পুকুরপাড়ে বসা বৃদ্ধ নাপিতের কাছে এখনও ভিড় করেন অনেকেই। কারণ তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বছরের স্মৃতি, বিশ্বাস আর গ্রামীণ জীবনের এক সরল অধ্যায়।

শৈশবেই পেশায় যুক্ত:

অকিল শীলের বাড়ি পাশের নগরকান্দা উপজেলার সদর গ্রামের চৌমুখা এলাকায়। তাঁর পিতা হরিবদন শীল ছিলেন পেশায় নাপিত। ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে বসে তিনি এই কাজ শেখেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাই কৈশোরেই জীবিকার তাগিদে পেশাটিকে বেছে নিতে হয় তাকে।

প্রথমদিকে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন তিনি। পরে ধীরে ধীরে নিজেই কাজ শুরু করেন। প্রায় ৬৬ বছর আগে মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে বসেই তিনি নিজের কর্মজীবনের যাত্রা শুরু করেন। সেই শুরু থেকে আজও একই জায়গায় বসেই কাজ করে যাচ্ছেন অকিল শীল।

হাটের দিনেই জমে ওঠে সেলুন:

মাঝারদিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। সাধারণত হাটের দিন সকাল থেকেই পুকুরপাড়ে চলে আসেন অকিল শীল। সঙ্গে থাকে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি, পুরোনো কাঁচি, ক্ষুর আর কয়েকটি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

পুকুরপাড়ে পিঁড়ি পেতে বসেই শুরু হয় তাঁর দিনের কাজ। গ্রামের মানুষজন একে একে এসে বসেন তাঁর সামনে। কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন, কেউ আবার সিরিয়াল ধরে বসে থাকেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহে কোনো ঘাটতি নেই। মনোযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে কাঁচি চালিয়ে চুল কাটছেন তিনি। মাঝে মাঝে ক্ষুর দিয়ে দাড়িও ছেঁটে দেন।

এই পুকুরপাড়ের ছোট্ট জায়গাটিই যেন তাঁর সেলুন, আবার কর্মজীবনের স্মৃতিবহ স্থান।

গ্রাহকদের কাছে প্রিয় ‘অকিল দা’:

স্থানীয় অনেকেই এখনও আধুনিক সেলুন ছেড়ে অকিল শীলের কাছেই চুল কাটতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ তাঁদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বৃদ্ধ নাপিতের সঙ্গে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মাতুব্বর বলেন, “আমি সেলুনে চুল কাটাই না। ছোটবেলা থেকে অকিল দার কাছেই চুল কাটাই। এখন বয়স হয়েছে, তবু তাঁর হাতের কাঁচির ওপর ভরসা আছে।”

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “ওনার কাছে ধনী-গরিব সবাই চুল কাটান। কেউ তাকে অবহেলা করে না। বরং অনেকেই গল্প করতে করতে চুল কাটান। ওনার কাছে চুল কাটাতে অন্যরকম একটা আনন্দ আছে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, অকিল শীল শুধু একজন নাপিত নন, তিনি যেন বাজারের একটি জীবন্ত ইতিহাস।

সামান্য আয়েই চলে সংসার:

অকিল শীল জানান, বর্তমানে তিনি প্রতি জনের চুল কাটার জন্য ৫০ টাকা নেন। হাটের দিনে তাঁর কাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক আসেন। সেই হিসেবে প্রতিদিন খুব বেশি আয় হয় না।

তবুও এই সামান্য আয়ের ওপরই ভর করে তিনি নিজের সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। তখন বাজারে কোনো সেলুন ছিল না। পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালিয়েছি। এখন অনেক সেলুন হয়েছে, তবুও পুরোনো গ্রাহকেরা আসে।”

বয়সের কারণে কাজ করা কঠিন হলেও তিনি এখনো থামতে চান না।

অকিল শীল বলেন, “বয়স তো অনেক হয়েছে। শরীরও আগের মতো শক্তি পায় না। কিন্তু কাজ না করলে মন ভালো লাগে না। তাই যতদিন পারি কাজ করেই যেতে চাই।”

পরিবারের কেউ নেননি পেশা:

অকিল শীলের পাঁচ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তবে তাঁদের কেউই বাবার পেশাকে অনুসরণ করেননি। সবাই ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি কখনো জোর করিনি। তারা যার যার মতো কাজ করছে। আমি আমার কাজ নিয়েই খুশি।”

তবে তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ কর্মযাত্রা এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।

গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক প্রতীক:

স্থানীয়দের মতে, মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড় মানেই অকিল শীল। বহু বছর ধরে তিনি এই জায়গাটিকে নিজের কর্মস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

একসময় গ্রামে এভাবেই খোলা আকাশের নিচে বসে নাপিতেরা মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন। আধুনিকতার ঢেউয়ে সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারে এখনও সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রেখেছেন অকিল শীল।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখছি উনি এখানে বসে চুল কাটছেন। বাজারের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, দোকানপাট বেড়েছে, কিন্তু উনার জায়গা বদলায়নি।”

কাঁচির টুংটাং শব্দে লেখা জীবনের গল্প:

পুকুরপাড়ে বসে কাঁচির টুংটাং শব্দ তুলতে তুলতে যেন নিজের জীবনের গল্পই লিখে চলেছেন অকিল শীল।

গ্রামীণ জীবনের সরলতা, পরিশ্রম আর আত্মমর্যাদার এক অনন্য উদাহরণ তিনি। বয়সের ভার, আধুনিকতার চাপ—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।

হাটের দিনগুলোতে এখনো মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে দেখা যায় সেই পরিচিত দৃশ্য—একটি ছোট পিঁড়ি, হাতে কাঁচি ও ক্ষুর, আর সামনে বসা গ্রাহক।

সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও, অকিল শীল যেন এখনো ধরে রেখেছেন সেই পুরোনো দিনের গল্প। তাঁর কাঁচির টুংটাং শব্দেই যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে গ্রামীণ বাংলার এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।