ফরিদপুর-১ আসনে বিএনপি প্রার্থীর হলফনামা: সম্পদের পাহাড়, ব্যবসা ও ঋণে রহস্য
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরিদপুর-১ (মধুখালী–বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা) আসনে বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থী খন্দোকার নাসিরুল ইসলামের দাখিল করা হলফনামা ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পদ, আয়-ব্যয়, দায়-দেনা ও মামলার তথ্য উঠে এলেও ব্যবসার প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ না থাকায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল।
হলফনামা অনুযায়ী, খন্দোকার নাসিরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন ১৫ নভেম্বর ১৯৫৮ সালে। তাঁর পিতা খন্দোকার ফজলুল করীম এবং মাতা বেগম আনোয়ারা করীম। স্ত্রী লায়লা আরজুমান বানু। তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর গ্রাম। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে তিনি বি.এস.সি ডিগ্রিধারী। নিজের ও স্ত্রীর পেশা হিসেবে উভয়ের ক্ষেত্রেই ‘ব্যবসা’ উল্লেখ করা হয়েছে।
আয় ও আয়ের উৎস:
হলফনামায় প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রার্থীর বার্ষিক আয়ের উৎস তিনটি খাতে দেখানো হয়েছে। কৃষিখাত থেকে আয় ৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি থেকে ভাড়া বাবদ আয় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা। তবে কোন ধরনের ব্যবসা, কোথায়, কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই আয়—সে বিষয়ে কোনো তথ্য সংযুক্ত করা হয়নি।
অস্থাবর সম্পদ:
প্রার্থীর অস্থাবর সম্পদের তালিকায় নগদ অর্থ রয়েছে ৭ লাখ ৮০ হাজার ৮২৭ টাকা। ব্যাংকে জমা অর্থ দেখানো হয়েছে ৯১ হাজার ৯৪৫ টাকা। বন্ড ও ঋণপত্রে বিনিয়োগ রয়েছে ৮ লাখ টাকা। স্বর্ণালংকার হিসেবে ১৮ ভরি উল্লেখ করা হয়েছে, যা উপহার হিসেবে প্রাপ্ত বলে দাবি করা হয়েছে। আসবাবপত্রও উপহার হিসেবে পাওয়া বলে উল্লেখ রয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্রের মূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা।
স্থাবর সম্পদ:
স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে তাঁর নামে কৃষি জমি রয়েছে মোট ৫৮০ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং অকৃষি জমি ২২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এছাড়া বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ জমির একাংশে ২ হাজার ৪২০ বর্গফুট আয়তনের একটি দ্বিতল ভবন রয়েছে, যা পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রীর নামে কৃষি জমি দেখানো হয়েছে ৩০০ শতাংশ।
দায় ও ঋণের হিসাব:
হলফনামায় দায়ের অংশটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিজের দায় হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন ৫ লাখ টাকা—হাত লোন ও ধার হিসেবে। তবে স্ত্রীর দায় দেখানো হয়েছে বিপুল অঙ্কের—১০ কোটি ৭৭ লাখ ৫১ হাজার টাকা।
ব্যাংক ঋণের বিবরণীতে দেখা যায়, ঢাকা ব্যাংক থেকে যৌথভাবে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৭ কোটি ৫৫ লাখ ৫৭ হাজার ১২৮ টাকা। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে তাঁর স্ত্রীর নামে ঋণ রয়েছে ১০ কোটি ৭৭ লাখ ৫১ হাজার ৮৫ টাকা। এছাড়া ঢাকা ব্যাংক থেকেই আরও ১৬ কোটি ৯৭ লাখ ১৯ হাজার ২৪১ টাকা ঋণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা ডিরেক্টর হওয়ার সুবাধে নেওয়া হয়েছে বলে হলফনামায় লেখা আছে। তবে সেই প্রতিষ্ঠানটির নাম বা কার্যক্রম সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মামলা সংক্রান্ত তথ্য:
খন্দোকার নাসিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মোট ১০টি মামলার তথ্য হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলা বিচারাধীন এবং আটটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে বা চূড়ান্ত রিপোর্ট (এফআরটি) দাখিল হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন:
হলফনামায় ব্যবসা থেকে আয়ের কথা বলা হলেও নিজের ও স্ত্রীর ব্যবসার ধরন, প্রতিষ্ঠানের নাম, শেয়ার বা মালিকানা কাঠামো কোথাও উল্লেখ নেই। একইভাবে বিপুল অঙ্কের ব্যাংক ঋণ কোন কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রম কী—সে বিষয়েও তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ফলে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে প্রার্থীর আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তাঁদের মতে, একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর আর্থিক অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানা ভোটারদের অধিকার। হলফনামা আইনগত নথি হওয়ায় এখানে অস্পষ্টতা থাকলে তা নির্বাচন কমিশনের নজরে আনা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশন কী অবস্থান নেয় এবং প্রার্থী পক্ষ থেকে আরও ব্যাখ্যা আসে কি না—সেদিকেই এখন দৃষ্টি রাজনৈতিক মহলের।

আপনার মতামত লিখুন
Array