খুঁজুন
, ,

ফরিদপুর মেডিকেলে ১৪ কোটি টাকার ক্যান্সার মেশিন অকেজো, ভোগান্তিতে পাঁচ জেলার রোগী

হারুন-অর-রশীদ ও আবরাব নাদিম ইতু, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬, ১২:১৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর মেডিকেলে ১৪ কোটি টাকার ক্যান্সার মেশিন অকেজো, ভোগান্তিতে পাঁচ জেলার রোগী

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য আনা প্রায় ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ২০১৭ সালে বিপুল ব্যয়ে এসব যন্ত্রপাতি হাসপাতালটিতে আনা হলেও এখন পর্যন্ত তা চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং একই সঙ্গে ক্যান্সার চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের লাখো মানুষ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যান্সার রোগীদের আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি ক্যান্সার পরীক্ষাগার ও রেডিয়েশন থেরাপি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৭ সালে এখানে আনা হয় অত্যাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর (LINAC) মেশিনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম।

কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল এবং পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় দীর্ঘ সময় পার হলেও এই ক্যান্সার ইউনিটটি চালু করা যায়নি। ফলে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দামি এই যন্ত্রপাতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এসব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লিনিয়ার এক্সিলারেটর কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ:

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, লিনিয়ার এক্সিলারেটর (LINAC) আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। এটি মূলত রেডিয়েশন থেরাপি দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়, যার মাধ্যমে উচ্চশক্তির রশ্মি ক্যান্সার কোষের ওপর প্রয়োগ করে সেগুলো ধ্বংস করা হয় বা তাদের বৃদ্ধি কমিয়ে আনা হয়।

এই মেশিনের মাধ্যমে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে ক্যান্সার আক্রান্ত স্থানে রেডিয়েশন প্রয়োগ করা সম্ভব হয়। ফলে আশপাশের সুস্থ কোষ তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব উন্নত হাসপাতালেই ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই মেশিনটি চালু করা গেলে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জসহ অন্তত পাঁচ জেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হতেন। এতে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার চাপও অনেকটা কমে আসত।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুই দফা চিঠি, তবুও অগ্রগতি নেই:

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যান্সার ইউনিটটি চালু করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একাধিকবার আবেদন জানিয়েছে।

২০২৫ সালের ২২ মে এবং একই বছরের ২৬ নভেম্বর দুই দফায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হয়। সেই চিঠিতে প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামো এবং বাজেট বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

কিন্তু এতদিন পার হলেও এই বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালের পরিচালকের বক্তব্য:

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. হুমায়ূন কবির ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “ক্যান্সার ইউনিটটি চালু করার জন্য আমরা দুই দফা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। জনবল এবং প্রয়োজনীয় বাজেট না থাকায় আমরা এই ইউনিটটি চালু করতে পারছি না।”

তিনি আরও বলেন,“স্বাস্থ্য বিভাগে চিঠি দেওয়ার পর তারা বিষয়টি দেখার জন্য জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটকে অবহিত করেছে। কিন্তু সেখান থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রপাতিগুলো বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা:

হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন ব্যবহার না করলে সেগুলো কার্যক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে লিনিয়ার এক্সিলারেটরের মতো সংবেদনশীল যন্ত্র অনেকদিন বন্ধ অবস্থায় থাকলে এর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাদের মতে, যদি দ্রুত ইউনিটটি চালু করা না যায়, তাহলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা এই মেশিনটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যেতে পারে। তখন সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ কার্যত অপচয়ে পরিণত হবে।

ক্যান্সার রোগীদের ভোগান্তি:

ক্যান্সার রোগীদের জন্য চিকিৎসা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। ফরিদপুর অঞ্চলের অধিকাংশ রোগীকেই বর্তমানে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হয়। এতে সময়, অর্থ এবং শারীরিক কষ্ট—সবকিছুরই চাপ বেড়ে যায়।

স্থানীয়দের মতে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার ইউনিট চালু হলে হাজার হাজার রোগী স্থানীয়ভাবেই চিকিৎসা পেতেন।

ভুক্তভোগীর বক্তব্য:

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার বাসিন্দা সারমিন বেগম, যিনি কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারে ভুগছেন, তিনি ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “আমার চিকিৎসার জন্য প্রায়ই ঢাকায় যেতে হয়। এতে অনেক টাকা খরচ হয়। যদি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা চালু থাকত, তাহলে আমাদের মতো রোগীদের এত কষ্ট করতে হতো না। শুনেছি এখানে মেশিন আছে, কিন্তু চালু করা হয়নি—এটা খুবই দুঃখজনক।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা করানো খুব কঠিন। যদি এখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে অনেক রোগীর উপকার হতো।”

স্বজনদের হতাশা:

ফরিদপুর সদরের বাসিন্দা ছুরাপ কাজী নামের এক ক্যান্সার রোগীর স্বজন বলেন, “আমার ভাইয়ের ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে ঢাকায় নিতে হয়েছে। প্রতি মাসে কয়েকবার যেতে হয়। যাতায়াত, থাকার খরচ—সব মিলিয়ে অনেক টাকা লাগে। অথচ ফরিদপুরেই যদি এই মেশিন চালু থাকত, তাহলে আমাদের এত দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে মেশিন এনে যদি বছরের পর বছর বাক্সে বন্ধ করে রাখে, তাহলে সাধারণ মানুষের উপকার কীভাবে হবে? দ্রুত এই ইউনিট চালু করা দরকার।”

স্থানীয়দের দাবি:

ফরিদপুরের সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে এই প্রকল্পটি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যাবে। তারা দ্রুত ক্যান্সার ইউনিটটি চালুর জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

স্থানীয়দের মতে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে ক্যান্সার চিকিৎসা চালু করা গেলে শুধু ফরিদপুর নয়, আশপাশের কয়েকটি জেলার মানুষও উপকৃত হবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত:

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র এখনও সীমিত।

তাদের মতে, জেলা পর্যায়ের বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে ধীরে ধীরে ক্যান্সার ইউনিট চালু করা হলে রোগীদের ঢাকামুখী চাপ কমবে এবং চিকিৎসা আরও সহজলভ্য হবে।

দ্রুত পদক্ষেপের দাবি:

সব মিলিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোটি টাকার অত্যাধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় মানুষ ও রোগীদের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল, বাজেট এবং অবকাঠামো নিশ্চিত করে ক্যান্সার ইউনিটটি চালু করা হোক, যাতে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের মানুষ আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা পেতে পারে এবং সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগও সঠিকভাবে কাজে লাগে।

ফরিদপুরের মধুখালীতে গাঁজাসহ আটক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ১:৩৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের মধুখালীতে গাঁজাসহ আটক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ গ্রেপ্তার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। মৃত যুবকের নাম মো. ইমতিয়াজ আহমেদ প্রান্ত (২৮)। তিনি মধুখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোন্দারদিয়া এলাকার মৃত ইসকেন্দার হায়দারের ছেলে।

জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তথ্যমতে, শনিবার (২০ জুন) দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে মধুখালী পৌরসভার গোন্দারদিয়া এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় মাদক বিক্রির অভিযোগে প্রান্তকে আটক করা হয়। অভিযানের সময় তার কাছ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন জানান, আটকের ঘণ্টা খানেক পর প্রান্ত হঠাৎ শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দ্রুত তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার (২১ জুন) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শিকদার আফ্রিদি রিজভী বলেন, হাসপাতালে আনার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ও সিটিস্কানে দেখা যায়, প্রান্ত ব্রেনস্ট্রোকের শিকার হয়েছেন। তার মাথায় বড় ধরনের রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার শরীরে কোনো ধরনের আঘাতের চিহ্ন বা নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

এ ঘটনায় ফরিদপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলার পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযানের সময় প্রান্তকে গাঁজাসহ আটক করা হয়। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, তিনি ব্রেনস্ট্রোকজনিত কারণে মারা গেছেন। তারপরও মৃত্যুর ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।”

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রান্তের বিরুদ্ধে মধুখালী থানায় পূর্বেও মাদক-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। তার মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান শেষ হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জেলায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও আবু নাসের হোসাইন, সালথা:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। প্রচলিত ধান, পাট, গম কিংবা সবজি চাষের গণ্ডি পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ শুরু হয়েছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায়। উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের যদুনন্দী গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির ৮ বিঘা জমিতে আনারসের বাগান গড়ে তুলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফরিদপুর অঞ্চলে এ ধরনের বৃহৎ পরিসরের আনারস চাষ আগে দেখা যায়নি। ফলে মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিকল্প ও লাভজনক ফলচাষের পথ উন্মুক্ত হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যদুনন্দী গ্রামের দুটি পৃথক প্লটে বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে হাজার হাজার আনারসের চারা। পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত বাগানজুড়ে চলছে নিয়মিত পরিচর্যা। দূর থেকে দেখলে সবুজের সমারোহে ভরা বাগানটি যে কারও দৃষ্টি কাড়ে। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কৃষকরা বাগান পরিদর্শনে আসছেন এবং আনারস চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

জানা গেছে, মিলন ফকির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও কৃষিপণ্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই দুই বছর আগে তিনি বাড়ির ছাদে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আনারস গাছ লাগান। আশাতীত ফলন ও সফলতা তাকে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি পরিকল্পিতভাবে আনারস চাষের জন্য জমি নির্বাচন করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন।

চলতি বছরে তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের প্রায় ৮০ হাজার আনারসের চারা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে ৮ বিঘা জমিতে এসব চারা রোপণ করা হয়। বর্তমানে বাগানের গাছগুলো সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে এবং আগামী বছর থেকে ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির বলেন, “প্রথমে শখের বসে বাড়ির ছাদে কয়েকটি আনারস গাছ লাগিয়েছিলাম। গাছে ভালো ফল আসার পর আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তখন মনে হলো, বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই এবার বড় পরিসরে চাষ শুরু করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, সেচ ব্যবস্থা, সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামী বছর ফল সংগ্রহ করা যাবে। তখন প্রায় ৮০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

মিলন ফকির জানান, শুধু ফল বিক্রিই নয়, ভবিষ্যতে আনারসের উন্নত জাতের চারা উৎপাদন ও বিক্রিরও পরিকল্পনা রয়েছে তার। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত আয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরাও সহজে মানসম্পন্ন চারা সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, “আমার এই উদ্যোগ সফল হলে এলাকার অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ পেলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করবো।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সালথা এলাকায় এর আগে কখনো এভাবে বাণিজ্যিক আকারে আনারস চাষ হতে দেখা যায়নি। ফলে বাগানটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “আমরা সাধারণত ধান, পাট ও সবজি চাষ করি। আনারস চাষের কথা কখনো ভাবিনি। মিলন ফকিরের বাগান দেখে মনে হচ্ছে এটি লাভজনক হতে পারে। ফলন ভালো হলে আমরাও এ ধরনের ফলচাষে আগ্রহী হবো।”

আরেক কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাগানটি দেখতে খুব সুন্দর। প্রতিদিন অনেক মানুষ দেখতে আসছে। সফল হলে এটি এলাকার কৃষকদের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত হবে।”

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনারস একটি লাভজনক ফল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে আনারসের চাষ হয়। বর্তমানে বাজারে আনারসের চাহিদা বাড়ছে এবং ফলটি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হজম সহায়ক উপাদান। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে আনারসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “সালথা উপজেলায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে কৃষিতে বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাভজনক ফল ও ফসলের আবাদ বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আয় বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. রইচ উদ্দিন বলেন, “ফরিদপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমাদের জেলায় সাধারণত ধান, পাট, গম ও বিভিন্ন সবজি চাষের প্রচলন বেশি থাকলেও কৃষিতে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নতুন নতুন ফল ও ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন। মিলন ফকিরের মতো উদ্যোক্তারা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা বাগানের অবস্থা সন্তোষজনক দেখেছি এবং কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। যদি ফলন ও বাজারজাতকরণ সফল হয়, তাহলে ফরিদপুরের অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। এতে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, জলবায়ু ও মাটির উপযোগিতা বিবেচনায় ফরিদপুর অঞ্চলেও আনারস চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে মিলন ফকিরের এই সাহসী পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তার স্বপ্ন সফল হলে শুধু একজন উদ্যোক্তার আর্থিক উন্নয়নই নয়, বরং ফরিদপুরে আনারস চাষের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন সম্ভাবনা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত হবে আয়ের নতুন দিগন্ত।

কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ
কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

সুস্থ থাকতে ফলের কোনো বিকল্প নেই। তবে যখন প্রশ্ন আসে রক্তে শর্করার বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের, তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান যে কোন ফলটি বেছে নেবেন। বিশেষ করে জনপ্রিয় দুটি ফল কমলা এবং কলার মধ্যে কোনটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বা যারা চিনি নিয়ে সচেতন তাদের জন্য বেশি উপকারী, তা নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের।

যদিও উভয় ফলেই প্রাকৃতিক চিনি থাকে, কিন্তু পুষ্টিগত গঠন এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের (জিআই) পার্থক্যের কারণে শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রায় এদের প্রভাব ভিন্ন হয়।

আজকের ফিচারে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজে দেখব, আপনার শরীরের জন্য এই দুটি ফলের মধ্যে কোনটি বেশি নিরাপদ এবং কীভাবে খেলে আপনার শর্করা থাকবে নিয়ন্ত্রণে।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সে কে এগিয়ে?

রক্তে শর্করার ব্যবস্থাপনায় কমলার পাল্লা কিছুটা ভারী বলে মনে করা হয়। কারণ কমলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাত্র ৩৫, যা বেশ কম। অন্যদিকে, একটি পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাধারণত ৪৮ এর কাছাকাছি থাকে। যেহেতু কমলার জিআই কম, তাই এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কলার তুলনায় ধীরে বৃদ্ধি করে।

পুষ্টির তুলনা: একনজরে

একটি মাঝারি আকারের কলা (১১৮ গ্রাম) এবং একটি মাঝারি কমলার (১৩১ গ্রাম) পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

ক্যালরি: কলায় থাকে ১০৫ ক্যালরি, যেখানে কমলায় থাকে মাত্র ৬১.৬ ক্যালরি।

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা: কলায় শর্করার পরিমাণ ২৬.৯ গ্রাম, অন্যদিকে কমলায় তা ১৫.৫ গ্রাম।

ভিটামিন সি: কমলায় প্রায় ৬৯ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে (দৈনিক চাহিদার ৭৭%), যা কলার (১০.৩ মিলিগ্রাম) তুলনায় অনেক বেশি। শর্করার পরিমাণ কম এবং ভিটামিন সি-এর আধিক্যের কারণে কমলা রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষায় কিছুটা বেশি সুবিধাজনক।

কলার গুণাগুণ: পাকা নাকি আধাপাকা?

কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে এর পরিপক্কতা বা কতটা পেকেছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কম পাকা বা কিছুটা সবুজ কলায় ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ নামক এক ধরণের কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা সহজে হজম হয় না এবং রক্তে শর্করার শোষণকে ধীর করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরণের স্টার্চ ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। তবে কলা যত বেশি পাকে, তার জিআই তত বাড়তে থাকে এবং তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দিতে পারে।

কমলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য

কমলায় থাকা সাইট্রাস পেকটিন নামক দ্রবণীয় ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং খাবারের পর রক্তে শর্করার শোষণ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা হেস্পেরিডিন এবং নারিঞ্জিনের মতো ফ্ল্যাভোনয়েডগুলি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রেখে ফল খাওয়ার কিছু কৌশল

আপনি কলা বা কমলা যা-ই পছন্দ করুন না কেন, রক্তে শর্করার প্রভাব কমাতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:

১. আস্ত ফল খান, রস নয়: ফলের রস করলে এর প্রয়োজনীয় ফাইবার নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দেয়। তাই সব সময় আস্ত ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।

২. প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সাথে খান: ফলের সাথে কিছু বাদাম, গ্রিক ইয়োগার্ট বা পনির মিশিয়ে খেলে হজম ধীর হয় এবং সুগার স্পাইক বা শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমে।

৩. পরিমিত মাত্রা: ফল যত উপকারীই হোক না কেন, পরিমাণে বেশি খেলে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই সব সময় পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করুন।

৪. কলা কিনুন কিছুটা কাঁচা: ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে খুব বেশি পাকা কলার চেয়ে কিছুটা কম পাকা বা শক্ত কলা বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষকথা

কমলা এবং কলা উভয়ই স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হতে পারে। তবে যাদের রক্তে শর্করার সমস্যা আছে, তাদের জন্য কম শর্করার কারণে কমলা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়াও সম্পূর্ণ নিরাপদ।

তথ্যসূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ