খুঁজুন
, ,

ফরিদপুর মেডিকেলে ১৪ কোটি টাকার ক্যান্সার মেশিন অকেজো, ভোগান্তিতে পাঁচ জেলার রোগী

হারুন-অর-রশীদ ও আবরাব নাদিম ইতু, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬, ১২:১৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর মেডিকেলে ১৪ কোটি টাকার ক্যান্সার মেশিন অকেজো, ভোগান্তিতে পাঁচ জেলার রোগী

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য আনা প্রায় ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ২০১৭ সালে বিপুল ব্যয়ে এসব যন্ত্রপাতি হাসপাতালটিতে আনা হলেও এখন পর্যন্ত তা চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং একই সঙ্গে ক্যান্সার চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের লাখো মানুষ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যান্সার রোগীদের আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি ক্যান্সার পরীক্ষাগার ও রেডিয়েশন থেরাপি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৭ সালে এখানে আনা হয় অত্যাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর (LINAC) মেশিনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম।

কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল এবং পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় দীর্ঘ সময় পার হলেও এই ক্যান্সার ইউনিটটি চালু করা যায়নি। ফলে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দামি এই যন্ত্রপাতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এসব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লিনিয়ার এক্সিলারেটর কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ:

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, লিনিয়ার এক্সিলারেটর (LINAC) আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। এটি মূলত রেডিয়েশন থেরাপি দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়, যার মাধ্যমে উচ্চশক্তির রশ্মি ক্যান্সার কোষের ওপর প্রয়োগ করে সেগুলো ধ্বংস করা হয় বা তাদের বৃদ্ধি কমিয়ে আনা হয়।

এই মেশিনের মাধ্যমে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে ক্যান্সার আক্রান্ত স্থানে রেডিয়েশন প্রয়োগ করা সম্ভব হয়। ফলে আশপাশের সুস্থ কোষ তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব উন্নত হাসপাতালেই ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই মেশিনটি চালু করা গেলে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জসহ অন্তত পাঁচ জেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হতেন। এতে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার চাপও অনেকটা কমে আসত।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুই দফা চিঠি, তবুও অগ্রগতি নেই:

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যান্সার ইউনিটটি চালু করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একাধিকবার আবেদন জানিয়েছে।

২০২৫ সালের ২২ মে এবং একই বছরের ২৬ নভেম্বর দুই দফায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হয়। সেই চিঠিতে প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামো এবং বাজেট বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

কিন্তু এতদিন পার হলেও এই বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালের পরিচালকের বক্তব্য:

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. হুমায়ূন কবির ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “ক্যান্সার ইউনিটটি চালু করার জন্য আমরা দুই দফা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। জনবল এবং প্রয়োজনীয় বাজেট না থাকায় আমরা এই ইউনিটটি চালু করতে পারছি না।”

তিনি আরও বলেন,“স্বাস্থ্য বিভাগে চিঠি দেওয়ার পর তারা বিষয়টি দেখার জন্য জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটকে অবহিত করেছে। কিন্তু সেখান থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রপাতিগুলো বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা:

হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন ব্যবহার না করলে সেগুলো কার্যক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে লিনিয়ার এক্সিলারেটরের মতো সংবেদনশীল যন্ত্র অনেকদিন বন্ধ অবস্থায় থাকলে এর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাদের মতে, যদি দ্রুত ইউনিটটি চালু করা না যায়, তাহলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা এই মেশিনটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যেতে পারে। তখন সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ কার্যত অপচয়ে পরিণত হবে।

ক্যান্সার রোগীদের ভোগান্তি:

ক্যান্সার রোগীদের জন্য চিকিৎসা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। ফরিদপুর অঞ্চলের অধিকাংশ রোগীকেই বর্তমানে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হয়। এতে সময়, অর্থ এবং শারীরিক কষ্ট—সবকিছুরই চাপ বেড়ে যায়।

স্থানীয়দের মতে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার ইউনিট চালু হলে হাজার হাজার রোগী স্থানীয়ভাবেই চিকিৎসা পেতেন।

ভুক্তভোগীর বক্তব্য:

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার বাসিন্দা সারমিন বেগম, যিনি কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারে ভুগছেন, তিনি ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “আমার চিকিৎসার জন্য প্রায়ই ঢাকায় যেতে হয়। এতে অনেক টাকা খরচ হয়। যদি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা চালু থাকত, তাহলে আমাদের মতো রোগীদের এত কষ্ট করতে হতো না। শুনেছি এখানে মেশিন আছে, কিন্তু চালু করা হয়নি—এটা খুবই দুঃখজনক।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা করানো খুব কঠিন। যদি এখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে অনেক রোগীর উপকার হতো।”

স্বজনদের হতাশা:

ফরিদপুর সদরের বাসিন্দা ছুরাপ কাজী নামের এক ক্যান্সার রোগীর স্বজন বলেন, “আমার ভাইয়ের ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে ঢাকায় নিতে হয়েছে। প্রতি মাসে কয়েকবার যেতে হয়। যাতায়াত, থাকার খরচ—সব মিলিয়ে অনেক টাকা লাগে। অথচ ফরিদপুরেই যদি এই মেশিন চালু থাকত, তাহলে আমাদের এত দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে মেশিন এনে যদি বছরের পর বছর বাক্সে বন্ধ করে রাখে, তাহলে সাধারণ মানুষের উপকার কীভাবে হবে? দ্রুত এই ইউনিট চালু করা দরকার।”

স্থানীয়দের দাবি:

ফরিদপুরের সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে এই প্রকল্পটি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যাবে। তারা দ্রুত ক্যান্সার ইউনিটটি চালুর জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

স্থানীয়দের মতে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে ক্যান্সার চিকিৎসা চালু করা গেলে শুধু ফরিদপুর নয়, আশপাশের কয়েকটি জেলার মানুষও উপকৃত হবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত:

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র এখনও সীমিত।

তাদের মতে, জেলা পর্যায়ের বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে ধীরে ধীরে ক্যান্সার ইউনিট চালু করা হলে রোগীদের ঢাকামুখী চাপ কমবে এবং চিকিৎসা আরও সহজলভ্য হবে।

দ্রুত পদক্ষেপের দাবি:

সব মিলিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোটি টাকার অত্যাধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় মানুষ ও রোগীদের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল, বাজেট এবং অবকাঠামো নিশ্চিত করে ক্যান্সার ইউনিটটি চালু করা হোক, যাতে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের মানুষ আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা পেতে পারে এবং সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগও সঠিকভাবে কাজে লাগে।

টেকনাফে গুলিতে নিহত তিতাসের জানাজা সম্পন্ন, ফরিদপুরে নানীর কবরের পাশে দাফন

নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৫৫ অপরাহ্ণ
টেকনাফে গুলিতে নিহত তিতাসের জানাজা সম্পন্ন, ফরিদপুরে নানীর কবরের পাশে দাফন

‘কাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ মুঠোফোনে মাকে বলা ছেলের শেষ কথাগুলো এখন বারবার মনে পড়ছে রেখা বেগমের। অভিযানে যাওয়ার আগে মায়ের কাছে দোয়া চেয়েছিলেন সেনাসদস্য তিতাস শেখ (২৮)। তবে সেই অভিযান থেকে আর ফেরা হয়নি তাঁর। 

কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত তিতাসের মরদেহ আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল ৪.৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ফরিদপুরের নগরকান্দায় আনা হয়। সন্ধ্যায় লস্করদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বাদ মাগরিব জানাজা শেষে গ্রামের স্থানীয় গোরস্থানে নানীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

তিতাসের মরদেহ বহনকারী সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারটি শুক্রবার বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে নগরকান্দা সরকারি মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে অবতরণ করে। সেখানে পদ্মা সেনানিবাসের ১৫ আর-ই রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের মেজর সোহেলের নেতৃত্বে সেনাসদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে। মরদেহ পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়িতে ভিড় করেন। এ সময় মা রেখা বেগম, বাবা আফজাল শেখ ও স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারসহ স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

শুক্রবার (০৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় লস্করদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বাদ মাগরিব তিতাসের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে সেখানে উপস্থিত হয়ে নিহতের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এ সময় তিতাসের ইউনিটের কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন সাজিদসহ সেনাবাহিনীর সদস্য, পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।

জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় লস্করদিয়া স্থানীয় গোরস্থানে। সেখানে নানীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর ক্যাপ্টেন সাজিদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তিতাসের কবরে সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করেন। এ সময় কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে সেনাসদস্যরা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি আকাশের দিকে ছোড়েন। এভাবেই রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হয় টেকনাফে দায়িত্ব পালনকালে নিহত এই সেনাসদস্য তিতাস শেখকে।

তিতাসের মৃত্যুর পর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর মা রেখা বেগম। গত বুধবার রাতে মুঠোফোনে মাকে অভিযানে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিতাস। বলেছিলেন, ‘আগামীকাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ ছেলের এমন কথায় দোয়া করেছিলেন মা। কিন্তু সেটিই যে তাঁদের শেষ কথা হবে, তা বুঝতে পারেননি তিনি। বৃহস্পতিবার রাতে ছেলের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকে কান্নায় থামছে না তাঁর।

অন্যদিকে স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়ার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তিতাসের। তাঁদের সংসারে কোনো সন্তান এখনো আসেনি। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। সেই অপেক্ষায় ছিলেন সুমাইয়া। কিন্তু ডিসেম্বর আসার আগেই স্বামীকে হারাতে হলো। আর সন্তান হারানোর শোকে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা আফজাল শেখ।

তিতাসের পরিবারে সেনাবাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। বাবার পথ অনুসরণ করে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত। পরিবারের তিন সদস্যের সেনাবাহিনীতে যুক্ত থাকার মধ্যে তিতাসের এমন মৃত্যুতে স্বজনদের শোকের পাশাপাশি এলাকায়ও শোকের মাতম তৈরি হয়েছে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলি তিতাসের বুকের বাঁ পাশের ওপরের অংশে লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিতাস সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য ছিলেন। তিনি টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁর মরদেহ রামু সিএমএইচে রাখা হয়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার হেলিকপ্টারে করে নিজ এলাকায় পাঠানো হয় তাঁকে।

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার বিকেলে হেলিকপ্টারে করে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দায় পৌঁছায়। পরে গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার পর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় গোরস্থানে নানীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

সন্ত্রাসীদের বুলেটে নিহত সেনা সদস্য তিতাস: একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ
সন্ত্রাসীদের বুলেটে নিহত সেনা সদস্য তিতাস: একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল

আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে গিয়ে নতুন করে সংসার সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৮)। চার বছরের দাম্পত্য জীবনে একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর অদম্য স্বপ্ন ছিল তাঁর চোখে। কিন্তু সন্ত্রাসীদের একটি মাত্র বুলেট তাঁর সেই সাজানো স্বপ্নের দুনিয়া নিমিষেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে ঠিকই ফিরছেন তিতাস, তবে তা কোনো আনন্দ নিয়ে নয়—বরং একটি নিথর, প্রাণহীন মরদেহে।

​প্রিয় স্বজনের এমন নির্মম বিদায়ের অপেক্ষায় থাকা তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া ও মা রেখা বেগমের আহাজারিতে লস্করদিয়ার আকাশ-বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠেছে।

​শেষ মায়ের দোয়া ও মর্মান্তিক পরিণতি

​স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার রাতে মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে শেষবারের মতো কথা হয় তিতাসের। পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অংশ নিতে হবে জানিয়ে তিনি মায়ের কাছে দোয়া চান। কে জানত, এটাই হবে মায়ের সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ কথোপকথন! বৃহস্পতিবার রাতেই তিতাসের মৃত্যুর সংবাদ এসে সব ওলটপালট করে দেয়।

​নিহত তিতাস শেখ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল শেখের ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। সেনাপরিবারের সন্তান তিতাসের বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তিতাস ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।

​স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া ও মা রেখা বেগম। পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতি এবং তিতাসের এমন করুণ মৃত্যু যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসীও।

​রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শোক প্রকাশ

​সেনা সদস্য তিতাস শেখের এই মর্মান্তিক ও অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

​এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে এবং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিতাস শেখ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর এই মহান আত্মত্যাগ জাতি সবসময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

​প্রতিমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, দেশসেবায় নিয়োজিত থেকে সেনা সদস্য তিতাসের এই আত্মত্যাগ অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও তাঁর সাহসিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেশবাসীর হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ফরিদপুরের পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করলেন ইউএনও, সরঞ্জাম পুড়িয়ে ধ্বংস

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৪০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করলেন ইউএনও, সরঞ্জাম পুড়িয়ে ধ্বংস

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে পদ্মা নদীর মধ্যে নির্মিত ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করেছে উপজেলা প্রশাসন।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলহাস হোসেন সৌরভ অভিযান চালিয়ে এসব বাঁধ উচ্ছেদ করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে আনসার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পদ্মা নদীর চর শালিপুর ও সিট মির্জাপুরের খাঁ এলাকার পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এতে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ জেলেরা মাছ শিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে পদ্মা নদীতে এই অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করে আসছিলো। এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী জেলেরা অবৈধ বাঁধ অপসারণের দাবিতে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম খাঁন বাবুলের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুলহাস হোসেন সৌরভকে তদন্ত করে এই অবৈধ বাঁধের বিষয় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত উচ্ছেদ করার নির্দেশ দেন। সংসদ সদস্যের নির্দেশনার পর আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করে। এতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় জেলেরা।

স্থানীয় জেলেরা বলেন, ভবিষ্যতে যেন কেউ আবার পদ্মা নদীতে অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করে মাছের অবাধ বিচরণ ও সাধারণ জেলেদের জীবিকার পথে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, প্রবাহমান জলাশয়ে আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়া মৎস্য আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব বাঁধ মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও চলাচল ব্যাহত করার পাশাপাশি জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। বাঁধ উচ্ছেদে জব্দকৃত সকল অবৈধ কারেন্ট জাল এবং চায়না দুয়ারী নদীর পারে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
নদী ও জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষায় জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।