খুঁজুন
সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬, ৯ চৈত্র, ১৪৩২

আনসারে হঠাৎ অস্থিরতা : বৈষম্যে ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা কর্মচারীরা!

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:২২ পিএম
আনসারে হঠাৎ অস্থিরতা : বৈষম্যে ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা কর্মচারীরা!

দেশের অন্যতম বৃহৎ শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী–এর উপজেলা পর্যায়ে নীরবে বাড়ছে অসন্তোষ। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, বছরের পর বছর তারা একই পদে থেকে কাজ করলেও বেতন-গ্রেড ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে ৩০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূর-দূরান্তে হয়রানিমূলক বদলির কারণে মনোবল ভেঙ্গে গেছে বাহিনীর তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠক উপজেলা প্রশিক্ষক-প্রশিক্ষিকাসহ কর্মকর্তাদের, যা আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আনসার বাহিনীর অংশগ্রহণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

সূত্র জানায়, উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কার্যালয়ে রাজস্বখাতভুক্ত পদ রয়েছে মাত্র তিনটি—উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা, উপজেলা প্রশিক্ষক এবং উপজেলা প্রশিক্ষিকা। অথচ প্রশিক্ষক-প্রশিক্ষিকাদের বেতন গ্রেড এখনো ১৫তম গ্রেডে রয়ে গেছে, যা ১৯৭৮ সালের পুরনো কাঠামো অনুসারে নির্ধারিত। সম্প্রতি হয়রানিমূলক বদলির প্রেক্ষিতে ফুসে উঠেছেন উপজেলা পর্যায়ে কর্মরতরা। যেকোনো মুহূর্তে বাহিনীতে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

একজন উপজেলা প্রশিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কাঁধে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টরের সমমানের র‍্যাঙ্ক থাকলেও বেতনে বিশাল ফারাক। এমনকি একই বাহিনীর ব্যাটালিয়ন আনসারদের সুবেদার পদ ইতিমধ্যেই ১৩তম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে, অথচ থানা/উপজেলা প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষিকারা রয়ে গেছেন ১৫তম গ্রেডে। ফলে বৈষম্যের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। স্বল্প বেতনে এমনিতেই সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছি, তর উপর ৩০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরে হয়রানিমূলক বদলির মাধ্যমে আমাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়া হচ্ছে ।”

বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ের কর্মরতদের দাবি হলো:-

– উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা পদটিকে ৯ম গ্রেডে উন্নীতকরণ

– উপজেলা প্রশিক্ষক পদটিকে ১৫তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীতকরণ

– উপজেলা প্রশিক্ষক পদ থেকে শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা পদ পূরণ

-এবং হয়রানিমূলক বদলি বন্ধকরণসহ ইতিপূর্বে যেসকল হয়রানিমূলক বদলি করা হয়েছে, সেগুলো বাতিল করণ

তাদের মতে, এটি বাস্তবায়ন হলে বাহিনীর শৃঙ্খলা, মনোবল ও চেইন অব কমান্ড আরও সুসংহত হবে।

অন্যদিকে, বর্তমানে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা পদে আংশিক (৫০%) পদোন্নতির সুযোগ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেকেই মনে করছেন, এই বৈষম্য দূর না হলে নির্বাচনের আগমুহূর্তে বাহিনীর মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কর্মবিরতিতে যেতে পারেন যা বড় ধরনের প্রশাসনিক সংকট তৈরি করতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপজেলা কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, “আমরা মাঠে কাজ করছি, ঝুঁকি নিচ্ছি, দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু পদোন্নতি ও বেতন কাঠামোতে সুবিচার পাচ্ছি না। র‌্যাব-এ প্রেষণে একই র‌্যাঙ্কে নিয়োজিত হলেও বেতন বৈষম্যের শিকার হতে হয়। অথচ একই মন্ত্রনালয়ের আওতাধীন বাহিনীতে অন্য ইউনিটে কম দায়িত্বে কর্মরতরা উচ্চ গ্রেড পাচ্ছে।”

প্রসঙ্গত, উপজেলা পর্যায়ের অন্যান্য দপ্তরের প্রধানরা ৯ম গ্রেডে উন্নীত হলেও উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তারা এখনও ১০ম গ্রেডে আছেন। ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, এই পদও ৯ম গ্রেডে উন্নীত করা উচিত।
জানা গেছে, বৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত প্রস্তাব ইতিমধ্যে কয়েকবার সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে, তবে বাহিনীর কিছু উর্ধতন কর্মকর্তার চরম অবহেলা ও গাফিলতির কারণে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা আশাবাদী বাহিনীর বর্তমান মহাপরিচালক পরিবর্তন-সংস্কারমুখী পদক্ষেপ নিয়ে এই বৈষম্যের অবসান ঘটাবেন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক আনসার সদস্য মোতায়েনের মূল দায়িত্বে থাকবেন উপজেলা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষিকারা। তাদের দাবি, এই তিনটি দাবি (বেতন গ্রেড উন্নীতকরণ, শতভাগ পদোন্নতি, হয়রানিমূলক বদলি বাতিলকরণ) দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে মাঠ পর্যায়ের মনোবল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়বে, যা বাহিনীর চেইন অব কমান্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্মৃতির টানে প্রাণের মিলন—ফরিদপুর জেলা স্কুলে ঈদ পুনর্মিলনীতে আনন্দের ঢেউ

প্রবীর কান্তি বালা, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬, ১২:৪২ পিএম
স্মৃতির টানে প্রাণের মিলন—ফরিদপুর জেলা স্কুলে ঈদ পুনর্মিলনীতে আনন্দের ঢেউ

“স্মৃতির টানে প্রিয় প্রাঙ্গণে”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ফরিদপুর জেলা স্কুল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো বর্ণাঢ্য ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান।

রবিবার (২২ মার্চ) বিকেল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজন প্রাণের উচ্ছ্বাস, বন্ধুত্বের বন্ধন আর স্মৃতির আবেগে মুখরিত করে তোলে পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।

দীর্ঘদিন পর এক ছাদের নিচে মিলিত হন বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। একে অপরকে জড়িয়ে ধরা, পুরনো দিনের গল্প, শিক্ষক-সহপাঠীদের স্মৃতিচারণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক আবেগঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশ।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় বিকেল ৩টায় ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধনের মাধ্যমে। ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ১২টি ব্যাচের অংশগ্রহণে ১২টি দল লিগ পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। আগামী ২৫ মার্চ টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত হকি খেলোয়াড়, সাবেক অধিনায়ক ও কোচ মাহাবুব হারুন, যিনি তার বক্তব্যে খেলাধুলার মাধ্যমে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বন্ধন আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানান।

বিকেল ৫টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে “অনুরণন” নামে বই আকৃতির একটি দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্যের উদ্বোধন করা হয়। করিম গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই ভাস্কর্য উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র শহীদুল হাসান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “এই ভাস্কর্য শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি আমাদের শিকড় ও শিক্ষাজীবনের প্রতীক।”

সন্ধ্যায় ১৮৫ বছরপূর্তি উপলক্ষে গত ডিসেম্বর মাসে সফলভাবে আয়োজিত পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বিভিন্ন ব্যাচ প্রধানদের সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। আয়োজকরা জানান, এই সম্মাননা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও জোরদার করবে।

ঈদ পুনর্মিলনীকে ঘিরে গত ১৮ মার্চ শুরু হওয়া ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল ফলও ঘোষণা করা হয়। প্রতিযোগিতায় ১৬টি ব্যাচ অংশ নেয়। এতে ১৮ ব্যাচ চ্যাম্পিয়ন এবং ১৭ ব্যাচ রানারআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ম্যান অব দ্য ফাইনাল নির্বাচিত হন ১৮ ব্যাচের রাজ। বিজয়ীদের হাতে ট্রফি তুলে দেন অতিথিরা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পুনর্মিলনী আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান, সদস্য সচিব ওয়াহিদ মিয়া, ঈদ পুনর্মিলনী কমিটির আহ্বায়ক মেহেদী হাসান ও সদস্য সচিব নিয়ামতউল্লাহ। তারা ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

দিনব্যাপী এই আয়োজনের শেষ পর্বে অনুষ্ঠিত হয় মনোমুগ্ধকর কাওয়ালি সংগীত পরিবেশনা। “সুফি” কাওয়ালি দলের পরিবেশনায় দর্শকরা মুগ্ধ হন, যা রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলে।

সব মিলিয়ে, এই ঈদ পুনর্মিলনী শুধু একটি অনুষ্ঠানই নয়—এটি ছিল স্মৃতি, ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের এক অনন্য মিলনমেলা, যা অংশগ্রহণকারীদের মনে দীর্ঘদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

ফরিদপুরে ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬, ৮:১২ এএম
ফরিদপুরে ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার

সংগঠনের গঠনতন্ত্র, নীতিমালা ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ফরিদপুর জেলা ছাত্রদল কোতোয়ালি থানা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক সোহেল মুন্সিকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করেছে।

সোমবার (২৩ মার্চ) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সোহেল মুন্সির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের আদর্শ ও শৃঙ্খলার পরিপন্থী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জেলা ছাত্রদল কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।

ফরিদপুর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সৈয়দ আদনান হোসেন (অনু) ও সাধারণ সম্পাদক তানজিমুল হাসান কায়েসের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক পদ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে চূড়ান্ত বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, এ সিদ্ধান্ত বহিষ্কারের দিন থেকেই কার্যকর বলে গণ্য হবে।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বহিষ্কারের পর থেকে সোহেল মুন্সির কোনো বক্তব্য, কার্যক্রম কিংবা সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার সংক্রান্ত দায়ভার ফরিদপুর জেলা ছাত্রদল বহন করবে না। সংগঠনের শৃঙ্খলা রক্ষা ও ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে এ ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সৈয়দ আদনান হোসেন অনু ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “ছাত্রদল একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠন। এখানে ব্যক্তির চেয়ে সংগঠন বড়। কেউ যদি সংগঠনের শৃঙ্খলা ও নীতিমালা অমান্য করে, তার বিরুদ্ধে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতেও এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে।”

তিনি আরও বলেন, “সংগঠনের ঐক্য, শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় আমরা সবসময় আপসহীন। যারা সংগঠনের নিয়মনীতি মেনে চলবে না, তাদের জন্য ছাত্রদলে কোনো স্থান নেই।”

ফরিদপুর জেলা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক শেখ এনামুল করিম (রেজা) স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা বজায় রেখে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ঈদ ভ্রমণে যে সতর্কতা না মানলে আনন্দ হতে পারে বিঘ্নিত?

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬, ৭:২৪ এএম
ঈদ ভ্রমণে যে সতর্কতা না মানলে আনন্দ হতে পারে বিঘ্নিত?

এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের প্রধান উৎসব আর আনন্দের দিন হচ্ছে ঈদুল ফিতর। আর এ সময়টাতে নাড়ির টানে পরিবারের সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য দলে দলে মানুষের গ্রামের পথে ছুটে চলার প্রবণতা চিরন্তন।

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ, উল্লাস, ফূর্তি আর নতুন সাজে সজ্জিত হওয়া। আমাদের ঈদ-সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ হলো ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতা সবার জন্যই নতুন পোশাক, একটু ভালো খাবারদাবার আর আনন্দ বিনোদন।

ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি, বুকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, ফ্রেমে বন্দি অসংখ্য স্থিরচিত্র, বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়ের বাসায় বাসায় ঘোরাঘুরি, খাওয়াদাওয়া, মজা করা মুসলিমদের জন্য এক মহা আনন্দের। আর এসব ঈদের সংস্কৃতির অংশ। তবে ঈদ ভ্রমণে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সতর্কতা নিয়ে সবাইকে হতে হবে সচেতন। ঈদ ভ্রমণে স্বাস্থ্যঝুঁকির খুঁটিনাটি জানা থাকলে ভ্রমণটি হতে পারে আরও আনন্দময়।

যাত্রাপথে যারা দূরদূরান্তে যান, তাদের রাস্তাঘাটে পোহাতে হয় হাজারো দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনা। তারপরও বাসায় ফেরার আনন্দে মন থাকে মাতোয়ারা। তাই কষ্টগুলো আর বড় হয়ে ওঠে না। এ সময়টাতে অনেককেই ভ্রমণ করতে হয় বাস, ট্রেন অথবা লঞ্চে। রাস্তায় যানজট, ফেরি স্বল্পতা ও পারাপারের সংকট, লঞ্চ-স্টিমারে গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি। প্রচণ্ড ভিড় আর ঠেলাঠেলি করে ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে বাড়ি পৌঁছাতে হয়, আবার ছুটি শেষে কাজে যোগদান করতে হয়। সবাই চায় নির্বিঘ্নে আর নিরাপদে ঘরে ফিরতে। তবে যাওয়া আসার ঝক্কিতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। শিশু ও বয়স্কদের পক্ষে লম্বা যাত্রাপথের ধকল সহ্য করা খুব কঠিন হয় বৈকি। এ সময় আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে শরীর খারাপ হতেই পারে। তাই যাত্রাপথে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। অন্যথায় ঈদের আনন্দ আগেভাগেই মাটি হয়ে যেতে পারে। তাই ঈদ ভ্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়াটা কোনোক্রমেই কাম্য নয়।

পরিকল্পনা : যাত্রা শুরুর আগে সুন্দরভাবে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে রওনা হবেন। একটু সতর্ক হলেই প্রতিরোধযোগ্য অসুখ-বিসুখ সহজে এড়ানো সম্ভব। শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

লাগেজ গোছানো : গোছগাছের ব্যাপারটির সঙ্গে কোথায় যাওয়া হচ্ছে এবং কতদিন থাকতে হবে তা জড়িত। অবশ্যই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ এমনকি ছোট বাচ্চা বা বয়স্কদের জন্য যা যা দরকার, তা সঙ্গে রাখা উচিত। যতটা সম্ভব অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দেওয়া ভালো।

রোজা অবস্থায় ভ্রমণ : রোজা রেখে রওনা হলে নিজের ঘরের তৈরি প্রয়োজনীয় খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয় সঙ্গে রাখুন, যেন ইফতারের সময় বাইরের খাবার খেতে না হয়। বর্তমানে প্রচণ্ড গরম, তাই বেশি বেশি বিশুদ্ধ পানি পান করুন।

পরিধেয় পোশাক : ভ্রমণে যত হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরা যায়, ততই সুবিধা, কারণ বাইরে প্রচণ্ড গরম। ছেলেরা টি-শার্ট পরতে পারেন। তবে নিজের আরামদায়ক হয়, এমন যে কোনো পোশাকই পরতে পারেন। বেশি টাইট জামাকাপড় পরিহার করা উচিত।

যাত্রাপথে পরনের জুতা : জুতার ব্যাপারে অবশ্যই খেয়াল রাখুন। বিশেষ করে, নারীরা ভ্রমণের সময় হাইহিল জুতা এড়িয়ে চলুন। ভ্রমণক্ষেত্রে কমফোর্টেবল জুতা বা স্যান্ডেল হাঁটার জন্য আরামদায়ক।

যানবাহনে সতর্কতা : জানালা দিয়ে মাথা বা হাত বের করে রাখবেন না। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে বাস, ট্রেন বা লঞ্চে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন। বাস বা ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করা খুবই বিপজ্জনক, তাই ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন।

ফাস্টএইড বক্স ও প্রয়োজনীয় ওষুধ : ভ্রমণের প্যাকিং করার আগে অবশ্যই ফাস্টএইড বক্স নিয়ে নিন। ভ্রমণকালে যে কোনো সময় ছোটখাটো অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনার কাটা-ছেঁড়ায় প্রাথমিক সহায়তা হবে। বিশেষ করে যারা পাহাড়-পর্বত বা ট্র্যাকিং ট্রিপ দিতে পছন্দ করেন, তাদের ক্ষেত্রে অধিক কাজে দেবে। কারণ ট্র্যাকিং করার সময় কাটা-ছেঁড়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। ফাস্টএইড বক্সের সঙ্গে নিয়ে নিন প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। জ্বর-ঠান্ডা, মাথাব্যথা ইত্যাদি সমস্যা হওয়াটা স্বাভাবিক। এছাড়া বমি, পেট খারাপের ওষুধ এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে অ্যান্টিবায়োটিক সঙ্গে রাখা জরুরি।

যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন : যারা বিভিন্ন রোগে ভোগেন, যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, বাতরোগ, অ্যাজমা বা অ্যালার্জি, তারা অবশ্যই ঈদ ভ্রমণে প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নিতে ভুলবেন না। অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের রোগীরা সঙ্গে রাখুন ইনহেলার। ডায়াবেটিস রোগীরা ইনসুলিন বা ট্যাবলেট সঙ্গে রাখবেন এবং লজেন্স, সুগার কিউব সঙ্গে নেবেন। প্লেনে ভ্রমণ করলে ঘন ঘন পা ম্যাসাজ করতে হবে, না হলে পায়ে রক্ত জমাট বেঁধে ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস হতে পারে। তারা পায়ে রক্তজমা প্রতিরোধকারী মোজা পরতে পারেন। যাদের ওজন বেশি তারাও এটা পরতে পারেন।

খাবার নিয়ে সতর্কতা : ভ্রমণে যাওয়ার পূর্বে অবশ্যই অতিরিক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। নিজের ঘরের তৈরি খাবার এবং প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানি সঙ্গে রাখবেন। বাইরের খাবা, শরবত বা পানীয় পরিহার করবেন। অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার বা পানীয় পান করবেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশুদ্ধ পানি পান করুন এবং বাচ্চাদেরও পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাবেন। ভ্রমণে খাদ্য ও পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে।

ভ্রমণের পূর্বে পর্যাপ্ত ঘুম : ভ্রমণের সময় দীর্ঘ দূরত্ব না থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই যানজটের জন্য দীর্ঘক্ষণ রাস্তাতেই কেটে যায়। এমতাবস্থায় শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে শক্তির জোগানের জন্য ভ্রমণের আগে পর্যাপ্ত ঘুম দরকার। এছাড়াও ট্রেনে মোশন সিকনেস থেকে রক্ষা পেতে যানবাহন চলাকালে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রাখা অথবা সম্ভব হলে ঘুমিয়ে নেওয়া ভালো।

গর্ভবতী নারীদের ভ্রমণ : ভ্রমণের সময়ে গর্ভবতী নারীদের রোজা না রাখাই ভালো। কারণ এ সময়ে ঘন ঘন পানি না খেলে শরীরে পানির অভাব দেখা দিতে পারে। বাইরের খাবার একেবারেই খাওয়া উচিত নয় গর্ভবতী নারীদের। বাসা থেকেই শুকনো খাবার নিয়ে আসা উচিত সঙ্গে করে। বাসের একদম পেছনের দিকের সিট কিংবা ট্রেনের একেবারে পেছনের দিকের বগিতে অনেক বেশি ঝাঁকি অনুভূত হয়। তাই গর্ভবতী নারীদের উচিত টিকিট করার সময়ে নিজের অসুবিধার কথা জানিয়ে সামনের দিকের সিট নির্বাচন করা। গর্ভাবস্থায় অনেকক্ষণ এক স্থানে বসে থাকতে থাকতে পায়ে পানি এসে পা ফুলে যেতে পারে। এছাড়াও দীর্ঘক্ষণ একস্থানে বসে থাকলে রক্তচলাচল কমে যায়। তাই সম্ভব হলে যাত্রাবিরতিতে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করে নিন। এতে রক্তচলাচল স্বাভাবিক থাকবে।

শিশুদের নিয়ে বাড়তি সতর্কতা : ট্রেনে, বাসে কিংবা লঞ্চে ভ্রমণের সময়ে শিশুরা সব সময়েই জানালার ধারের সিটটি পছন্দ করে। এ কারণে হঠাৎ করে অতিরিক্ত বাতাসের মুখোমুখি হয়। ফলে শিশুরা অনেকে ঠিক ভ্রমণের পর পরই আক্রান্ত হয় সর্দি-জ্বর কিংবা সাধারণ কাশিতে। এছাড়াও বাইরের পানীয় এবং খাবার খেয়ে বমি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। তাই তারা যাতে যাত্রাপথে বাইরের খাবার না খায়, সে ব্যাপারে সজাগ থাকুন। একেবারে ছোট দুগ্ধপোষ্য শিশু নিয়ে ভ্রমণ না করাই উচিত। প্রয়োজনে বের হতে হলে তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করে নিতে হবে। চলার পথে শিশুকে অবশ্যই ধরে রাখবেন, ট্রেন, বাস বা লঞ্চ থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কিন্তু উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। খেয়াল রাখবেন কোনো বাচ্চা যেন জানালা দিয়ে হাত বাইরে না রাখে। এ বিষয়ে সতর্ক হোন।

বয়স্কদের সতর্কতা : দীর্ঘ ভ্রমণ বয়স্কদের জন্য বেশি কষ্টসাধ্য। বিভিন্ন রোগসহ অনেকেই বাতজ্বর বা আরথ্রাইটিসে ভোগেন। তাদের জন্য বাসে বা ট্রেনে ওঠাও সহজ নয়, সে সময় তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। যাত্রাপথে যেন তারা একই ভঙ্গিতে বেশিক্ষণ বসে না থাকে এবং মাঝেমধ্যে যানবাহনের মধ্যেই যেন কিছুক্ষণ চলাফেরা করেন, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখুন। তা না হলে বাতের ব্যথা বাড়তে পারে, এমনকি পায়ে পানি জমে পা ফুলেও যেতে পারে।

অজ্ঞান পার্টি থেকে সাবধান : যাত্রাপথে মলম পার্টি ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা বেশি থাকে তাই সতর্ক থাকুন। যানবাহনে অপরিচিত কেউ খাদ্য বা পানীয় দিলে খাবেন না। কারণ প্রায়ই শোনা যায়, এ ধরনের খাবার খেয়ে অনেকেই বড় দুর্ঘটনায় পড়েছেন। কাজেই এই বিপদ এড়াতে সচেতন থাকবেন।

জরুরি প্রয়োজনে : পরিচিত ডাক্তার এবং পুলিশের ফোন নাম্বার সঙ্গে রাখুন। অসুস্থ বা কোনো বিপদে পড়লে যেন সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ ও বিপদের সময় পুলিশের সাহায্য নিতে পারেন। পুলিশের সাহায্য নিতে যেকোন জায়গা থেকে ৯৯৯-এ ফোন করবেন।

বাড়তি সতর্কতা : ঈদে ঘরমুখো মানুষ বাড়ি যাওয়ার জন্য খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বাস, ট্রেন ও লঞ্চের ছাদে চড়ে ঝুঁকিপূর্ণ সফর করেন, এতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ-আপদের শিকার হন। অন্য সময়ের চেয়ে ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ বাড়ে। এ জন্য সফরে সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে, কোনোভাবেই অসতর্কভাবে চলাফেরা করা যাবে না। যে কদিন গ্রামে থাকবেন, অযথা অপ্রয়োজনে রোদে এবং অন্য কোথাও বেশি ঘোরাফেরা করবেন না। এ সময় সাপে কামড়ের রোগীরও প্রচুর খবর পাওয়া যায়। বাচ্চাদের দিকে বেশি নজর রাখবেন যেন পুকুর, নদী বা জলাশয়ের পানিতে বাচ্চারা একা একা না নামে।

সবার ভ্রমণ সুন্দর ও নিরাপদ হোক। সর্বোপরি ঈদের ছুটিতে ভ্রমণের প্রস্তুতি, সতর্কতা ও নিরাপত্তা অব্যাহত থাকলে সুন্দর স্মরণীয় এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতার আশা করা যায়।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক