খুঁজুন
, ,

ঈদ ভ্রমণে যে সতর্কতা না মানলে আনন্দ হতে পারে বিঘ্নিত?

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬, ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ
ঈদ ভ্রমণে যে সতর্কতা না মানলে আনন্দ হতে পারে বিঘ্নিত?

এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের প্রধান উৎসব আর আনন্দের দিন হচ্ছে ঈদুল ফিতর। আর এ সময়টাতে নাড়ির টানে পরিবারের সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য দলে দলে মানুষের গ্রামের পথে ছুটে চলার প্রবণতা চিরন্তন।

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ, উল্লাস, ফূর্তি আর নতুন সাজে সজ্জিত হওয়া। আমাদের ঈদ-সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ হলো ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতা সবার জন্যই নতুন পোশাক, একটু ভালো খাবারদাবার আর আনন্দ বিনোদন।

ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি, বুকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, ফ্রেমে বন্দি অসংখ্য স্থিরচিত্র, বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়ের বাসায় বাসায় ঘোরাঘুরি, খাওয়াদাওয়া, মজা করা মুসলিমদের জন্য এক মহা আনন্দের। আর এসব ঈদের সংস্কৃতির অংশ। তবে ঈদ ভ্রমণে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সতর্কতা নিয়ে সবাইকে হতে হবে সচেতন। ঈদ ভ্রমণে স্বাস্থ্যঝুঁকির খুঁটিনাটি জানা থাকলে ভ্রমণটি হতে পারে আরও আনন্দময়।

যাত্রাপথে যারা দূরদূরান্তে যান, তাদের রাস্তাঘাটে পোহাতে হয় হাজারো দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনা। তারপরও বাসায় ফেরার আনন্দে মন থাকে মাতোয়ারা। তাই কষ্টগুলো আর বড় হয়ে ওঠে না। এ সময়টাতে অনেককেই ভ্রমণ করতে হয় বাস, ট্রেন অথবা লঞ্চে। রাস্তায় যানজট, ফেরি স্বল্পতা ও পারাপারের সংকট, লঞ্চ-স্টিমারে গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি। প্রচণ্ড ভিড় আর ঠেলাঠেলি করে ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে বাড়ি পৌঁছাতে হয়, আবার ছুটি শেষে কাজে যোগদান করতে হয়। সবাই চায় নির্বিঘ্নে আর নিরাপদে ঘরে ফিরতে। তবে যাওয়া আসার ঝক্কিতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। শিশু ও বয়স্কদের পক্ষে লম্বা যাত্রাপথের ধকল সহ্য করা খুব কঠিন হয় বৈকি। এ সময় আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে শরীর খারাপ হতেই পারে। তাই যাত্রাপথে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। অন্যথায় ঈদের আনন্দ আগেভাগেই মাটি হয়ে যেতে পারে। তাই ঈদ ভ্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়াটা কোনোক্রমেই কাম্য নয়।

পরিকল্পনা : যাত্রা শুরুর আগে সুন্দরভাবে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে রওনা হবেন। একটু সতর্ক হলেই প্রতিরোধযোগ্য অসুখ-বিসুখ সহজে এড়ানো সম্ভব। শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

লাগেজ গোছানো : গোছগাছের ব্যাপারটির সঙ্গে কোথায় যাওয়া হচ্ছে এবং কতদিন থাকতে হবে তা জড়িত। অবশ্যই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ এমনকি ছোট বাচ্চা বা বয়স্কদের জন্য যা যা দরকার, তা সঙ্গে রাখা উচিত। যতটা সম্ভব অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দেওয়া ভালো।

রোজা অবস্থায় ভ্রমণ : রোজা রেখে রওনা হলে নিজের ঘরের তৈরি প্রয়োজনীয় খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয় সঙ্গে রাখুন, যেন ইফতারের সময় বাইরের খাবার খেতে না হয়। বর্তমানে প্রচণ্ড গরম, তাই বেশি বেশি বিশুদ্ধ পানি পান করুন।

পরিধেয় পোশাক : ভ্রমণে যত হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরা যায়, ততই সুবিধা, কারণ বাইরে প্রচণ্ড গরম। ছেলেরা টি-শার্ট পরতে পারেন। তবে নিজের আরামদায়ক হয়, এমন যে কোনো পোশাকই পরতে পারেন। বেশি টাইট জামাকাপড় পরিহার করা উচিত।

যাত্রাপথে পরনের জুতা : জুতার ব্যাপারে অবশ্যই খেয়াল রাখুন। বিশেষ করে, নারীরা ভ্রমণের সময় হাইহিল জুতা এড়িয়ে চলুন। ভ্রমণক্ষেত্রে কমফোর্টেবল জুতা বা স্যান্ডেল হাঁটার জন্য আরামদায়ক।

যানবাহনে সতর্কতা : জানালা দিয়ে মাথা বা হাত বের করে রাখবেন না। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে বাস, ট্রেন বা লঞ্চে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন। বাস বা ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করা খুবই বিপজ্জনক, তাই ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন।

ফাস্টএইড বক্স ও প্রয়োজনীয় ওষুধ : ভ্রমণের প্যাকিং করার আগে অবশ্যই ফাস্টএইড বক্স নিয়ে নিন। ভ্রমণকালে যে কোনো সময় ছোটখাটো অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনার কাটা-ছেঁড়ায় প্রাথমিক সহায়তা হবে। বিশেষ করে যারা পাহাড়-পর্বত বা ট্র্যাকিং ট্রিপ দিতে পছন্দ করেন, তাদের ক্ষেত্রে অধিক কাজে দেবে। কারণ ট্র্যাকিং করার সময় কাটা-ছেঁড়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। ফাস্টএইড বক্সের সঙ্গে নিয়ে নিন প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। জ্বর-ঠান্ডা, মাথাব্যথা ইত্যাদি সমস্যা হওয়াটা স্বাভাবিক। এছাড়া বমি, পেট খারাপের ওষুধ এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে অ্যান্টিবায়োটিক সঙ্গে রাখা জরুরি।

যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন : যারা বিভিন্ন রোগে ভোগেন, যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, বাতরোগ, অ্যাজমা বা অ্যালার্জি, তারা অবশ্যই ঈদ ভ্রমণে প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নিতে ভুলবেন না। অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের রোগীরা সঙ্গে রাখুন ইনহেলার। ডায়াবেটিস রোগীরা ইনসুলিন বা ট্যাবলেট সঙ্গে রাখবেন এবং লজেন্স, সুগার কিউব সঙ্গে নেবেন। প্লেনে ভ্রমণ করলে ঘন ঘন পা ম্যাসাজ করতে হবে, না হলে পায়ে রক্ত জমাট বেঁধে ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস হতে পারে। তারা পায়ে রক্তজমা প্রতিরোধকারী মোজা পরতে পারেন। যাদের ওজন বেশি তারাও এটা পরতে পারেন।

খাবার নিয়ে সতর্কতা : ভ্রমণে যাওয়ার পূর্বে অবশ্যই অতিরিক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। নিজের ঘরের তৈরি খাবার এবং প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানি সঙ্গে রাখবেন। বাইরের খাবা, শরবত বা পানীয় পরিহার করবেন। অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার বা পানীয় পান করবেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশুদ্ধ পানি পান করুন এবং বাচ্চাদেরও পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাবেন। ভ্রমণে খাদ্য ও পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে।

ভ্রমণের পূর্বে পর্যাপ্ত ঘুম : ভ্রমণের সময় দীর্ঘ দূরত্ব না থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই যানজটের জন্য দীর্ঘক্ষণ রাস্তাতেই কেটে যায়। এমতাবস্থায় শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে শক্তির জোগানের জন্য ভ্রমণের আগে পর্যাপ্ত ঘুম দরকার। এছাড়াও ট্রেনে মোশন সিকনেস থেকে রক্ষা পেতে যানবাহন চলাকালে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রাখা অথবা সম্ভব হলে ঘুমিয়ে নেওয়া ভালো।

গর্ভবতী নারীদের ভ্রমণ : ভ্রমণের সময়ে গর্ভবতী নারীদের রোজা না রাখাই ভালো। কারণ এ সময়ে ঘন ঘন পানি না খেলে শরীরে পানির অভাব দেখা দিতে পারে। বাইরের খাবার একেবারেই খাওয়া উচিত নয় গর্ভবতী নারীদের। বাসা থেকেই শুকনো খাবার নিয়ে আসা উচিত সঙ্গে করে। বাসের একদম পেছনের দিকের সিট কিংবা ট্রেনের একেবারে পেছনের দিকের বগিতে অনেক বেশি ঝাঁকি অনুভূত হয়। তাই গর্ভবতী নারীদের উচিত টিকিট করার সময়ে নিজের অসুবিধার কথা জানিয়ে সামনের দিকের সিট নির্বাচন করা। গর্ভাবস্থায় অনেকক্ষণ এক স্থানে বসে থাকতে থাকতে পায়ে পানি এসে পা ফুলে যেতে পারে। এছাড়াও দীর্ঘক্ষণ একস্থানে বসে থাকলে রক্তচলাচল কমে যায়। তাই সম্ভব হলে যাত্রাবিরতিতে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করে নিন। এতে রক্তচলাচল স্বাভাবিক থাকবে।

শিশুদের নিয়ে বাড়তি সতর্কতা : ট্রেনে, বাসে কিংবা লঞ্চে ভ্রমণের সময়ে শিশুরা সব সময়েই জানালার ধারের সিটটি পছন্দ করে। এ কারণে হঠাৎ করে অতিরিক্ত বাতাসের মুখোমুখি হয়। ফলে শিশুরা অনেকে ঠিক ভ্রমণের পর পরই আক্রান্ত হয় সর্দি-জ্বর কিংবা সাধারণ কাশিতে। এছাড়াও বাইরের পানীয় এবং খাবার খেয়ে বমি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। তাই তারা যাতে যাত্রাপথে বাইরের খাবার না খায়, সে ব্যাপারে সজাগ থাকুন। একেবারে ছোট দুগ্ধপোষ্য শিশু নিয়ে ভ্রমণ না করাই উচিত। প্রয়োজনে বের হতে হলে তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করে নিতে হবে। চলার পথে শিশুকে অবশ্যই ধরে রাখবেন, ট্রেন, বাস বা লঞ্চ থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কিন্তু উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। খেয়াল রাখবেন কোনো বাচ্চা যেন জানালা দিয়ে হাত বাইরে না রাখে। এ বিষয়ে সতর্ক হোন।

বয়স্কদের সতর্কতা : দীর্ঘ ভ্রমণ বয়স্কদের জন্য বেশি কষ্টসাধ্য। বিভিন্ন রোগসহ অনেকেই বাতজ্বর বা আরথ্রাইটিসে ভোগেন। তাদের জন্য বাসে বা ট্রেনে ওঠাও সহজ নয়, সে সময় তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। যাত্রাপথে যেন তারা একই ভঙ্গিতে বেশিক্ষণ বসে না থাকে এবং মাঝেমধ্যে যানবাহনের মধ্যেই যেন কিছুক্ষণ চলাফেরা করেন, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখুন। তা না হলে বাতের ব্যথা বাড়তে পারে, এমনকি পায়ে পানি জমে পা ফুলেও যেতে পারে।

অজ্ঞান পার্টি থেকে সাবধান : যাত্রাপথে মলম পার্টি ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা বেশি থাকে তাই সতর্ক থাকুন। যানবাহনে অপরিচিত কেউ খাদ্য বা পানীয় দিলে খাবেন না। কারণ প্রায়ই শোনা যায়, এ ধরনের খাবার খেয়ে অনেকেই বড় দুর্ঘটনায় পড়েছেন। কাজেই এই বিপদ এড়াতে সচেতন থাকবেন।

জরুরি প্রয়োজনে : পরিচিত ডাক্তার এবং পুলিশের ফোন নাম্বার সঙ্গে রাখুন। অসুস্থ বা কোনো বিপদে পড়লে যেন সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ ও বিপদের সময় পুলিশের সাহায্য নিতে পারেন। পুলিশের সাহায্য নিতে যেকোন জায়গা থেকে ৯৯৯-এ ফোন করবেন।

বাড়তি সতর্কতা : ঈদে ঘরমুখো মানুষ বাড়ি যাওয়ার জন্য খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বাস, ট্রেন ও লঞ্চের ছাদে চড়ে ঝুঁকিপূর্ণ সফর করেন, এতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ-আপদের শিকার হন। অন্য সময়ের চেয়ে ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ বাড়ে। এ জন্য সফরে সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে, কোনোভাবেই অসতর্কভাবে চলাফেরা করা যাবে না। যে কদিন গ্রামে থাকবেন, অযথা অপ্রয়োজনে রোদে এবং অন্য কোথাও বেশি ঘোরাফেরা করবেন না। এ সময় সাপে কামড়ের রোগীরও প্রচুর খবর পাওয়া যায়। বাচ্চাদের দিকে বেশি নজর রাখবেন যেন পুকুর, নদী বা জলাশয়ের পানিতে বাচ্চারা একা একা না নামে।

সবার ভ্রমণ সুন্দর ও নিরাপদ হোক। সর্বোপরি ঈদের ছুটিতে ভ্রমণের প্রস্তুতি, সতর্কতা ও নিরাপত্তা অব্যাহত থাকলে সুন্দর স্মরণীয় এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতার আশা করা যায়।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক

সন্ত্রাসীদের বুলেটে নিহত সেনা সদস্য তিতাস: একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ
সন্ত্রাসীদের বুলেটে নিহত সেনা সদস্য তিতাস: একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল

আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে গিয়ে নতুন করে সংসার সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৮)। চার বছরের দাম্পত্য জীবনে একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর অদম্য স্বপ্ন ছিল তাঁর চোখে। কিন্তু সন্ত্রাসীদের একটি মাত্র বুলেট তাঁর সেই সাজানো স্বপ্নের দুনিয়া নিমিষেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে ঠিকই ফিরছেন তিতাস, তবে তা কোনো আনন্দ নিয়ে নয়—বরং একটি নিথর, প্রাণহীন মরদেহে।

​প্রিয় স্বজনের এমন নির্মম বিদায়ের অপেক্ষায় থাকা তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া ও মা রেখা বেগমের আহাজারিতে লস্করদিয়ার আকাশ-বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠেছে।

​শেষ মায়ের দোয়া ও মর্মান্তিক পরিণতি

​স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার রাতে মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে শেষবারের মতো কথা হয় তিতাসের। পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অংশ নিতে হবে জানিয়ে তিনি মায়ের কাছে দোয়া চান। কে জানত, এটাই হবে মায়ের সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ কথোপকথন! বৃহস্পতিবার রাতেই তিতাসের মৃত্যুর সংবাদ এসে সব ওলটপালট করে দেয়।

​নিহত তিতাস শেখ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল শেখের ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। সেনাপরিবারের সন্তান তিতাসের বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তিতাস ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।

​স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া ও মা রেখা বেগম। পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতি এবং তিতাসের এমন করুণ মৃত্যু যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসীও।

​রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শোক প্রকাশ

​সেনা সদস্য তিতাস শেখের এই মর্মান্তিক ও অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

​এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে এবং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিতাস শেখ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর এই মহান আত্মত্যাগ জাতি সবসময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

​প্রতিমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, দেশসেবায় নিয়োজিত থেকে সেনা সদস্য তিতাসের এই আত্মত্যাগ অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও তাঁর সাহসিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেশবাসীর হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ফরিদপুরের পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করলেন ইউএনও, সরঞ্জাম পুড়িয়ে ধ্বংস

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৪০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করলেন ইউএনও, সরঞ্জাম পুড়িয়ে ধ্বংস

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে পদ্মা নদীর মধ্যে নির্মিত ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করেছে উপজেলা প্রশাসন।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলহাস হোসেন সৌরভ অভিযান চালিয়ে এসব বাঁধ উচ্ছেদ করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে আনসার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পদ্মা নদীর চর শালিপুর ও সিট মির্জাপুরের খাঁ এলাকার পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এতে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ জেলেরা মাছ শিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে পদ্মা নদীতে এই অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করে আসছিলো। এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী জেলেরা অবৈধ বাঁধ অপসারণের দাবিতে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম খাঁন বাবুলের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুলহাস হোসেন সৌরভকে তদন্ত করে এই অবৈধ বাঁধের বিষয় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত উচ্ছেদ করার নির্দেশ দেন। সংসদ সদস্যের নির্দেশনার পর আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করে। এতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় জেলেরা।

স্থানীয় জেলেরা বলেন, ভবিষ্যতে যেন কেউ আবার পদ্মা নদীতে অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করে মাছের অবাধ বিচরণ ও সাধারণ জেলেদের জীবিকার পথে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, প্রবাহমান জলাশয়ে আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়া মৎস্য আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব বাঁধ মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও চলাচল ব্যাহত করার পাশাপাশি জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। বাঁধ উচ্ছেদে জব্দকৃত সকল অবৈধ কারেন্ট জাল এবং চায়না দুয়ারী নদীর পারে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
নদী ও জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষায় জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

টেকনাফে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনা সদস্য তিতাসের ফরিদপুরের বাড়িতে শোকের মাতম

হাসান মাতুব্বর (শ্রাবণ), ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১:৪৬ অপরাহ্ণ
টেকনাফে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনা সদস্য তিতাসের ফরিদপুরের বাড়িতে শোকের মাতম

কক্সবাজারের ​টেকনাফে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনা সদস্য তিতাস শেখের (২৮) বাড়িতে এখন শোকের মাতম। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের এই তরুণ সেনাসদস্যের আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবার ও এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। শুক্রবার (০৬ নভেম্বর) সকালে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে তিতাস শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এ দৃশ্য।

​পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিতাস শেখের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক বন্ধন রয়েছে। তাঁর বাবা আফজাল শেখ একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য এবং ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিতাস ছিলেন সবার বড়। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন ২০১৭ সালে। সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে তিনি টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের কোনো সন্তান ছিল না। আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিতাস, কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল।

​আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযানকালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে তিতাস শেখের বুকের বাঁ পাশে গুলি লাগে। পরে তাঁকে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে এবং অবস্থার অবনতি হলে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত আটটা আটচল্লিশ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

​নিহত সেনাসদস্যের মা রেখা বেগম জানান, গত বুধবার রাতে ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। তখন তিতাস তাঁকে বলেছিলেন, ‘আগামীকাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ কিন্তু ছেলের সেই কথাই যে শেষ কথা হবে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। আর ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক বাবা আফজাল শেখের চোখ বেয়ে ঝরছে অবিরাম অশ্রু।

​নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেলিকপ্টারযোগে শুক্রবার বিকেলে তিতাসের মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদানসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

​ছেলের এমন বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগে পরিবারটি গর্বিত হলেও তাঁর এই চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না শোকে বিহ্বল স্বজনেরা।