খুঁজুন
বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২১ মাঘ, ১৪৩২

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ও বেশি ভোট পড়েছে যে নির্বাচনগুলোতে?

মরিয়ম সুলতানা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৮:০৫ এএম
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ও বেশি ভোট পড়েছে যে নির্বাচনগুলোতে?

নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিকে শুধু সংখ্যার একটি হিসাব নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা, তাদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলন বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২টি সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে কখনো দেখা গেছে রেকর্ডসংখ্যক ভোটার উপস্থিতি, আবার কখনো উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

এসব নির্বাচনের কোনোটিকে তুলনামূলকভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলা হয়। আবার ইতিহাসে কোনো কোনোটিকে চিহ্নিত করা হয় একতরফা ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি বেশিরভাগ সময়ই অস্থিতিশীল থাকলেও এই সময়ে মোট পাঁচটি নির্বাচন হয়। এর মাঝে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে তকমা পেয়েছে কেবল একটি।

এরপরে ১৯৯৬ থেকে ২০২৪ সালের মাঝে বাংলাদেশে আরও সাতটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেগুলোর মাঝে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে গণ্য করা হয় তিনটিকে।

এদিকে, চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

এই প্রতিবেদনে ১৯৭৩ থেকে সর্বশেষ ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন চিত্র এবং তার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু ভোটার সংখ্যা দিয়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হয় না।

আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত তিন নির্বাচন

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৪)

বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন ছিল ২০২৪ সালের সাতই জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ‘স্বল্প ভোটের নির্বাচন’ খ্যাত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

অনিয়মের অভিযোগে তখন নয়টি আসনের ২১ কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছিলো। আর, আওয়ামী লীগের একজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করেছিলো নির্বাচন কমিশন।

অবশিষ্ট ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন পেয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় পায়।

দ্বাদশ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১১ কোটি ৯৫ লাখ এক হাজার ৫৮৫ জন। তাদের মধ্যে চার কোটি ৯৯ লাখ ৫৫ হাজার ৪৪৫ জন ভোট দিয়েছেন বলে জানিয়েছিলো নির্বাচন কমিশন।

তবে এই সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে।

কারণ, নির্বাচনের দিন বেলা ৩টা পর্যন্ত সারা দেশে ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দিয়েছিলো নির্বাচন কমিশন। পরে বিকাল ৫টায় তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান, ৪১ দশমিক আট শতাংশ ভোট পড়েছে।

পরিসংখ্যান নিয়ে যাদের সন্দেহ আছে, তাদের উদ্দেশ্যে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল তখন বলেছিলেন, “যদি মনে করেন এটাকে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে সেটাকে চ্যালেঞ্জ করে…আমাদের অসততা – যদি মনে করেন – সেটা পরীক্ষা করে… দেখতে পারেন”।

ওই নির্বাচনে ৪৪টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে অংশ নিয়েছিলো আওয়ামী লীগসহ ২৮টি রাজনৈতিক দল। বিএনপিসহ ১৬টি নিবন্ধিত দল এই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিলো।

বিএনপি তখন ওই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে দাবি করেছিলো। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মঈন খান বলেছিলেন, “সরকার ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে।”

সেবার বড় সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে না আসায় দুঃখ বা হতাশা প্রকাশ করে নির্বাচনে হওয়া অনিয়মগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন

উল্লেখ্য, এই নির্বাচনকে ‘ডামি’ প্রার্থীর নির্বাচন হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। বলা হয়ে থাকে, এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক দেখানোর জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই প্রার্থী হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৮)

২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপিসহ মোট ৩৯টি দল অংশ নিলেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে এই নির্বাচন তখন বিতর্কিত হয়ে পড়ে।

‘রাতের ভোট’ আখ্যা পাওয়া সেই সংসদ নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেই অর্থাৎ, ২৯শে ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর থেকেই খবর আসতে থাকে, সারাদেশের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র দখলে নিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ভোটের দিন ৩০শে ডিসেম্বর সকালে অনেক স্থানে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছিলেন বিবিসি বাংলার সংবাদদাতারা।

ওই নির্বাচনের খবর প্রচারে আগে থেকেই দেশের গণমাধ্যমগুলোকে নানা বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে। যে কারণে নানা অনিয়ম, কারচুপি বা জালিয়াতির খবর পেয়েও তা প্রচার করতে পারেনি বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো।

অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচন বলা হলেও এর ফলাফল ছিল একতরফা। নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মাঝে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট পেয়েছিলো ২৮৮টি আসন। অপরদিকে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র সাতটি। বাকি তিনটি আসন পায় অন্যান্যরা।

বাংলাদেশের একটি এনজিও সুশাসনের জন্য নাগরিক – সুজনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নির্বাচন শুধু অংশগ্রহণমূলকই ছিল না, বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রার্থীও ছিল এই নির্বাচনে। এছাড়া, ভোট পড়ার হার বিবেচনায়ও এই নির্বাচন রেকর্ড গড়েছিলো।

সুজনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৯ জন। ভোট দিয়েছেন আট কোটি ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৯১১ জন। শতকরা হারে যা ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ।

নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ছিল মোট ৪০ হাজার ১৫৫টি। এর মাঝে ১০৩টি সংসদীয় আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে ভোট পড়ার হার ছিল শতভাগ।

পরিসংখ্যান বলছে, ভোট পড়ার দিক থেকে ১৯৯১ সালের পর অনুষ্ঠিত ছয়টি (১৯৯৬ সালের নির্বাচন বাদে) নির্বাচনের মাঝে এটিতেই সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পড়েছিলো।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৪)

এটি ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হওয়া প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

সে সময় নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছিল ৪০টি। এর মধ্যে মাত্র ১২টি দল ভোটে পাঁচই জানুয়ারির সেই ‘একতরফা’ নির্বাচনে অংশ নেয়।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে আওয়ামী লীগ। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে।

নির্বাচন বয়কটের প্রেক্ষাপটে অর্ধেকের বেশি আসনে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।

বিরোধী দলবিহীন ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিল। নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৪৭টি আসনে এবং নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, তাতে ভোট পড়েছিলো এক কোটি ৭১ লাখ ২৯ হাজার।

ওই নির্বাচনে ভোটার ছিল নয় কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৭ জন। আর ১৪৭টি নির্বাচনি এলাকায় ভোট পড়ার হার ছিল ৪০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

এদিকে, সুজনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স বা ফেমা এবং হিউম্যান রাইটস কমিশনের মতে ওই নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ১০ শতাংশের মতো। যদিও নির্বাচন কমিশন এই দাবি নাকচ করেছিলো।

১৯৯১ থেকে ২০০৮, ‘গ্রহণযোগ্য’ চার নির্বাচন

বলা হয়ে থাকে, এ যাবৎকালে বাংলাদেশে যতগুলো সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, তার মাঝে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য ছিল ১৯৯১, ১৯৯৬ (দ্বিতীয়), ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন।

তবে সাবেক নির্বাচন কমিশনার জেসমিন টুলী মনে করেন, ‘গ্রহণযোগ্য’ কথাটি আপেক্ষিক।

“কারণ ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সবাই ভালো নির্বাচন বললেও বিএনপি বলে যে এখানে কারচুপি হয়েছে। আবার ২০০১ এর নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রশ্ন আছে।”

২০০৮: ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচন ও আ’লীগের ফিরে আসা

২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। এতে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ নিবন্ধিত ৩৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়।

কিন্তু ভোটে আওয়ামী লীগ এককভাবে জয় লাভ করে ২৩০টি আসনে। জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য জোট শরিকসহ তাদের সর্বমোট আসন দাঁড়ায় ২৬২টি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়া ২০০৮ সালের নির্বাচনটি ছিল সর্বশেষ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

সেবার ভোটার ছিল আট কোটি ৮৭ হাজার তিন জন। ভোট পড়ে ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।

২০০১: বিএনপি’র সর্বশেষ জয়

২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেবার ৫৪টি দলের অংশগ্রহণে দেশজুড়ে ৩০০ আসনে ভোটগ্রহণ হয়।

সেই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল সাত কোটি ৪৯ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬৪ জন। দেশের ২৯ হাজার ৯৭৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোট পড়েছিল ৭৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিলো। দলটি ২০০৬ সালের ২৭শে অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল।

এরপর সংঘাতময় এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে সেনাবাহিনী। দেশে জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় সেনাসমর্থিত একটি নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

এর প্রায় দুই বছর পর ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৯৬: একই বছরে দুই নির্বাচন

ওই বছর দুইবার সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সপ্তম সংসদ নির্বাচন বেশিরভাগ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য বলেই বিবেচিত।

তবে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় অধিকাংশ বিরোধী দল সেটি বয়কট করে। কারণ তারা নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইছিলো।

কিন্তু সেই দাবি উপেক্ষা করে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হয় এবং ২৭৮টি আসনে জিতে সরকার গঠন করে বিএনপি। যদিও সেই সংসদ মাত্র ১২দিন স্থায়ী ছিল।

সেবার মোট ভোটার ছিল পাঁচ কোটি ৬১ লাখ ৪৯ হাজার ১৮২ জন। দেশজুড়ে থাকা ২১ হাজার ১০৬টি ভোটকেন্দ্রে ভোট পড়ে ২৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

পরে আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাশ করে। সেই সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা।

পরে মাত্র চার মাসের কম সময়ের মধ্যে ওই বছরের ১২ই জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যাতে সর্বমোট ৮১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছিলো।

বলা হয়, আসন সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে জোরালো লড়াই হয়েছিলো ওই নির্বাচনে। নির্বাচনে অন্তত ৮২টি দলের ৫৮৬ জন ও স্বতন্ত্র ২৮৪ জন প্রার্থীসহ ৮৭০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৪৬টি আসন এবং বিএনপি ১১৬টি আসন। জাতীয় পার্টি সেবার ৩২টি আসনে জয় লাভ করেছিলো।

সরকার গঠন করার জন্য কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে ২১ বছর পরে ক্ষমতার মঞ্চে ফিরে আসে আওয়ামী লীগ।

ওই নির্বাচনে পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ ১৬ হাজার ৯৩৫ জন ভোটার। সারাদেশে কেন্দ্র ছিল ২৫ হাজার ৯৫২টি। ভোট পড়ার হার ছিল ৭৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

১৯৯১: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন ছিল সেটি। যদিও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন সংবিধানের অংশ ছিল না, কিন্তু সবগুলো রাজনৈতিক দলের সম্মতির ভিত্তিতে সেটি করা হয়েছিল।

১৯৯১ সালে নির্বাচনের আগে প্রচারের সময় দুই প্রধান রাজনৈতিক দল পরস্পরের প্রতি খুব বেশি আক্রমণাত্মক ছিল না। তৎকালীন সংবাদপত্র পর্যালোচনা করে এ ধারণা পাওয়া যায়।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে সাত দলীয় জোট এবং বামপন্থি পাঁচ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়। তারা এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিল।

১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়।

নির্বাচনের আগের দিন রেডিও-টিভিতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহমদ বলেন, এবারের নির্বাচন নিরপেক্ষ হতে বাধ্য।

নির্বাচনের দিন বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোটকেন্দ্রে হাজির হন। প্রায় সাড়ে ছয় কোটি ভোটারের মধ্যে ৫৫ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়ে। নির্বাচনে কোথাও কোনো ধরনের সহিংসতা দেখা যায়নি।

সেই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জিতে জামায়াতে ইসলামী’র সাথে জোট বেঁধে সরকার গঠন করে। তখন আওয়ামী লীগ পেয়েছিলো ৮৮টি আসন, জাতীয় পার্টি ৩৫টি।

আর এই জয়ের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।

ফিরে দেখা প্রথম চার নির্বাচন

চতুর্থ সংসদ নির্বাচন: এরশাদের পতন

বাংলাদেশের চতুর্থ সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তেসরা মার্চ ১৯৮৮ সালে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে বিএনপি, অধিকাংশ বড় দলই ওই নির্বাচন বর্জন করেছিলো। মাত্র ৯টি দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলো।

নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৫৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আর ভোটার ছিল প্রায় পাঁচ লাখের কাছাকাছি সংখ্যক।

সেই নির্বাচনে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি জয় লাভ করে। কিন্তু মাত্র দুই বছর সাত মাসের মাথায় চতুর্থ সংসদ ভেঙে পড়ে।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং বামপন্থি দলগুলোর, অর্থাৎ জোটের গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ছয়ই ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।

সেজন্যই ওই দিনটিকে আওয়ামী লীগ ‘গণতন্ত্র মুক্তি দিবস’, বিএনপি ‘গণতন্ত্র দিবস’ এবং এরশাদের জাতীয় পার্টি ‘সংবিধান সংরক্ষণ দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এই দিনকে ‘স্বৈরাচার পতন দিবস’ হিসেবেও পালন করে থাকে।

তৃতীয় সংসদ নির্বাচন: এরশাদ শাসনামলের শুরু

১৯৮৬ সালের ১০ই জুলাই বাংলাদেশের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এই নির্বাচনের পেছনে লম্বা ইতিহাস আছে। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন।

এই ঘটনার এক বছরেরও কম সময়ের মাথায়, ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তিনি নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার।

আব্দুস সাত্তারকে পদত্যাগে বাধ্য করে এরশাদ নিজেই ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন।

এরপর ১৯৮৬ সালের পহেলা জানুয়ারি তিনি ‘জাতীয় পার্টি’ নামে দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ছয় মাসের মাথায় তিনি নির্বাচনের আয়োজন করেন, যাতে জাতীয় পার্টি জয়লাভ করে।

ওই সময় মোট ভোটার ছিল প্রায় চার লাখ ৮০ হাজার এবং ভোট পড়ে ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলো ২৮টি দল। কিন্তু এই তৃতীয় সংসদ টিকে থাকে মাত্র ১৭ মাস।

দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন: বিএনপি’র জন্ম

১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য দিয়েই সংসদীয় রাজনীতিতে একটি নতুন দলের শক্ত অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং বহুদলীয় রাজনীতির সূচনা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদল ঘটে।

ওই বছরের সাতই নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান হন ও ১৯৭৬ সালের ২৯শে নভেম্বর বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন।

পরে ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এরপর ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ নামে রাজনৈতিক দল গঠন করে বহুদলীয় রাজনীতির সূচনা করেন।

এই সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করে এবং ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। তখন বাংলাদেশের মোট ভোটার ছিল তিন কোটি ৮৬ লাখ ৩৭ হাজার ৬৬৪ জন। আর ভোট পড়েছিলো ৪৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। নির্বাচনে ২৯টি দল অংশ নিয়েছিলো তখন।

প্রথম সংসদ নির্বাচন: শেখ মুজিবকে হত্যা

১৯৭৩ সালের সাতই মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এই নির্বাচনটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ১৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয় এবং আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

তখন দেশে ভোটার ছিল সাড়ে তিন কোটিরও বেশি এবং তাদের ৫৫ শতাংশ ভোট দিয়েছিলো।

ওই নির্বাচনে কারচুপি ও ব্যালট ছিনতাইয়ের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও ওই নির্বাচনটির সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।

তবে প্রথম জাতীয় সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র দুই বছর ছয় মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

এর ধারাবাহিকতায় ওই বছরের ছয়ই নভেম্বর সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়, যার মাধ্যমে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে এক দীর্ঘ বিরতি শুরু হয়।

এখানে উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ পরিচালিত হয়েছিলো অস্থায়ী সরকার দিয়ে এবং নির্বাচনের আগে পর্যন্ত দেশে তখন অস্থায়ী সংসদ ছিল।

১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠন করেন।

ভোটার উপস্থিতিই কি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য বানায়?

নির্বাচন কমিশন ১২টি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির যে হিসাব প্রকাশ করেছে সে অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে বলে দেখা যায়।

সেবার পাঁচ কোটি ৬১ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে ২৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ ভোট পড়ে।

আর সবচেয়ে বেশি, ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়ে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। যদিও বাংলাদেশের ইতিহাসের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর মাঝে অন্যতম হলো ওই নির্বাচন।

“তাই, ভোটার উপস্থিতি বেশি হওয়া মানেই এটা না যে সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য। আমাদের দেখতে হবে যে উপস্থিতি স্বতঃস্ফূর্ত কি না। যেমন, ২০১৮ সালে ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক। কিন্তু সেই নির্বাচন নিয়ে তো অনেক প্রশ্ন আছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল আলীম।

তার মতে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও বড় একটা বিষয়।

“আমরা যদি আগে থেকেই জানি যে কে জয়ী হতে যাচ্ছে, তাহলে তো হলো না। আমরা সেই নির্বাচনকে বলি মিনিংলেস (অর্থহীন) নির্বাচন। যেমন, ২০১৪ সালে আমরা জানতাম যে কে জিততে যাচ্ছে। আর, নির্বাচন মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর। সুতরাং, নির্বাচনে দলগুলোর সমান অংশগ্রহণও এখানে জরুরি। অর্থাৎ, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হতে হবে,” যোগ করেন তিনি।

এসময় তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনকে “বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “ওই নির্বাচনে ডামি প্রার্থী ছিল অনেক। মানে, একই দলের একাধিক প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছিলো। এটা অন্য নির্বাচনের চেয়ে আলাদা। এসব কারণেই ভোটার উপস্থিতি কম ছিল।”

আব্দুল আলীম বলছিলেন, নির্বাচন যখন অংশগ্রহণমূলক হয় না, তখন ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হয় না। পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর ভোটারদের আস্থা থাকাও এখানে জরুরি।

এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিনগুলোতে নির্বাচনের মাঠকে শতভাগ সমতল রাখা উচিত। আর কোনো অভিযোগ উঠলে সেটিকে উড়িয়ে না দিয়ে নির্বাচন কমিশনের উচিত সেটিকে যাচাই করে দেখা।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সম্পর্কে যা জানা জরুরি: ছড়ায় কীভাবে, লক্ষণ ও প্রতিকার?

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:০১ এএম
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সম্পর্কে যা জানা জরুরি: ছড়ায় কীভাবে, লক্ষণ ও প্রতিকার?

হেপাটাইটিস বি একটি মারাত্মক কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য লিভারজনিত ভাইরাস সংক্রমণ। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (HBV) থেকে এ রোগ হয়, যা স্বল্পমেয়াদি (একিউট) কিংবা দীর্ঘস্থায়ী (ক্রনিক) আকার ধারণ করতে পারে। উপসর্গ অনেক সময় দেরিতে প্রকাশ পাওয়ায় একে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘নীরব ঘাতক’ও বলা হয়। বাংলাদেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক বেশি।

চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ জীবনের কোনো এক সময়ে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় ৩০ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ নিয়ে বসবাস করছেন। প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এ রোগের জটিলতায়।

কীভাবে ছড়ায় হেপাটাইটিস বি

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত ও শরীরের অন্যান্য তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। যেমন—

সংক্রমিত রক্তের সংস্পর্শ

একই সুচ বা সিরিঞ্জ একাধিকবার ব্যবহার (বিশেষ করে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে)

অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক

প্রসবের সময় মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমণ

অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন (বর্তমানে অনেক কম)

ট্যাটু, বডি পিয়ার্সিং বা অনিরাপদ চিকিৎসা ও সার্জিক্যাল যন্ত্র ব্যবহার

টুথব্রাশ, রেজারসহ ব্যক্তিগত সামগ্রী ভাগাভাগি

অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান

স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরাও সংক্রমিত রক্তের সংস্পর্শে এলে ঝুঁকিতে থাকেন।

হেপাটাইটিস বি-এর লক্ষণ

অনেক ক্ষেত্রেই সংক্রমণের পর প্রথম ১–৪ মাস কোনো লক্ষণ বোঝা যায় না। শিশুদের ক্ষেত্রে উপসর্গ একেবারেই নাও থাকতে পারে। তবে সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা

জ্বর

ক্ষুধামান্দ্য

বমি বমি ভাব বা বমি

পেটে ব্যথা

গাঢ় রঙের প্রস্রাব

সন্ধি বা অস্থিসন্ধিতে ব্যথা

ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)

রোগ গুরুতর হলে লিভার বিকল হলে মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়

হেপাটাইটিস বি সনাক্ত করতে চিকিৎসকেরা কয়েকটি পরীক্ষার পরামর্শ দেন—

রক্ত পরীক্ষা (HBsAg, অ্যান্টিবডি)

লিভার ফাংশন টেস্ট

পিসিআর টেস্ট (ভাইরাসের পরিমাণ নির্ণয়)

আল্ট্রাসাউন্ড

প্রয়োজনে লিভার বায়োপসি

দ্রুত রোগ সনাক্ত হলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

চিকিৎসা কীভাবে হয়

একিউট হেপাটাইটিস বি:

অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের প্রয়োজন হয় না। বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণই যথেষ্ট।

ক্রনিক হেপাটাইটিস বি:

অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ প্রয়োজন হয়। মুখে খাওয়ার ও ইনজেকশন—দুই ধরনের চিকিৎসাই রয়েছে। মুখে খাওয়ার ওষুধ সাধারণত দীর্ঘদিন বা আজীবন চালিয়ে যেতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করলে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধ ভাইরাস পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলক কম।

চিকিৎসার পর সুস্থ থাকতে করণীয়

চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা

পুষ্টিকর ও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য গ্রহণ

পর্যাপ্ত পানি পান

অ্যালকোহল পরিহার

নিয়মিত হালকা ব্যায়াম

পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম

উপসর্গ বাড়লে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া

হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়

হেপাটাইটিস বি একটি নিরাপদ ও কার্যকর টিকার মাধ্যমে প্রায় ১০০ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য।

বাংলাদেশে ২০০৩–২০০৫ সাল থেকে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় শিশুদের জন্মের পর বিনামূল্যে এ টিকা দেওয়া হচ্ছে। পূর্ণবয়স্করাও যেকোনো বয়সে ০, ১ ও ৬ মাসে মোট ৩ ডোজ টিকা নিয়ে সুরক্ষা পেতে পারেন।

তবে টিকা নেওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হয়—আগে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন কি না বা শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না। একবার সংক্রমিত হলে টিকা আর কার্যকর নয়।

সম্ভাব্য জটিলতা

দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগ

সিরোসিস

লিভার ক্যান্সার

লিভার ফেইলিওর

অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া

বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস বি ভয়ংকর হলেও সময়মতো সচেতনতা, টিকা ও চিকিৎসার মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিয়মিত পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি মানাই এ রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

সূত্র : যুগান্তর

ভোটের পর নতুন সরকারের সামনে যেসব বড় চ্যালেঞ্জ?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:২৬ এএম
ভোটের পর নতুন সরকারের সামনে যেসব বড় চ্যালেঞ্জ?

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ এগিয়ে আসার সাথে সাথে আলোচনায় আসতে শুরু করেছে যে ভোট পরবর্তী নতুন সরকারের জন্য কোন কোন বিষয়গুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

ব্রাসেলস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ তাদের এক নিবন্ধে নতুন সরকারের জন্য অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করছে, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘আওয়ামী লীগকে ঘিরে রাজনৈতিক সমঝোতার মতো জটিল বিষয়’।

অবশ্য সংস্থাটি এটিও বলছে যে, নির্বাচিত সরকার হওয়ার কারণে সমস্যা সমাধানে কাজ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা নিতে পারবে।

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর মব সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন কারণে আইনশৃঙ্খলার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণটা এবং এটি করতে যে রাষ্ট্র বা সরকারের সক্ষমতা আছে প্রাথমিকভাবে সেটি প্রমাণ করাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ ইস্যু ছাড়াও ভারতের সাথে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক চাপ সামলিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নেওয়াটাই নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

ক্রাইসিস গ্রুপের দিক থেকেও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জগুলোর তালিকায় এসব ইস্যু ঠাঁই পেয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনে দৃশ্যত মূল প্রতিযোগিতা হচ্ছে বিএনপি জোট ও জামায়াতে ইসলামীর জোটের মধ্যে এবং দুই জোটই ক্ষমতায় যাওয়ার আশা করছে।

২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। দলটির কার্যক্রম অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ করেছে।

যেসব চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে ক্রাইসিস গ্রুপ

ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালট্যান্ট টোমাস কিনের একটি নিবন্ধ সোমবার প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এতে ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গত দেড় বছরে বাংলাদেশে সামগ্রিক চলমান ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে।

এই নিবন্ধেই তিনি বাংলাদেশের নতুন সরকারকে সম্ভাব্য যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে তার একটি ধারণা দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বেশ কয়েকটি কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এই ভোট বাংলাদেশকে শুধু সাংবিধানিক কাঠামোতেই ফেরাবে না, বরং ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো সত্যিকার জনরায়ের ভিত্তিতে একটি সরকারকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে।

“দুর্বল প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ধীরগতির অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবসহ একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জ নতুন প্রশাসনকে মোকাবেলা করতে হবে। তাকে সামলাতে হবে ভারতের সাথে সম্পর্কের ইস্যুসহ যুক্তরাষ্ট্র চীন প্রতিযোগিতার প্রভাব ও রোহিঙ্গা ইস্যুসহ জটিল পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক,” ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে।

টোমাস কিন লিখেছেন, হাসিনার পতনের পর হিযবুত-তাহরিরের মতো উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং এদের মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ আছে।

তার মতে, নির্বাচনের পরে নতুন সরকারকে রাজনৈতিক সমঝোতার জটিল ইস্যুও মোকাবেলা করতে হবে, কারণ ইতিহাস ও শক্ত ভোট ভিত্তির কারণে আওয়ামী লীগকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা সম্ভব নয়।

“২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে দলের কর্মকাণ্ডের কারণে নতুন নেতৃত্বের অধীনে হলেও আওয়ামী লীগকে আবার নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আওয়ামী লীগের কোনোভাবে প্রত্যাবর্তনের শর্ত নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে উঠলে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঝুঁকি কমবে”।

টোমাস কিন লিখেছেন, তিনি মনে করেন এটি করতে হলে আওয়ামী লীগকে আগে সহিংসতার জন্য অনুশোচনা করতে হবে, যা করতে শেখ হাসিনা এখনো অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন।

তবে এক্ষেত্রে সমঝোতায় পৌঁছাতে ভারত ও অন্য বিদেশি প্রভাবশালী সরকারগুলো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তার মতে, দেশের তরুণদের আশা পূরণে ব্যর্থতার কারণে আগামী বছরগুলোতে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি আসতে পারে।

এগুলোই প্রধান চ্যালেঞ্জ?

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, নতুন প্রশাসনের সামনে আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একই সাথে দেশ শাসন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে পুরনো সংস্কৃতির পরিবর্তন করে ভিন্নতাটা তুলে ধরে জনমনে আস্থা অর্জন করাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

“কর্তৃত্ববাদ পরবর্তী সময়ে মবসহ আইন শৃঙ্খলার যে অবস্থা তৈরি হয়েছে সেই বিবেচনায় আইন শৃঙ্খলা ঠিক করা এবং রাষ্ট্র ও সরকার যে সেটি করতে সক্ষম সেই আস্থা জনমনে ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ তাদের থাকবে,” বলেছেন তিনি।

ক্রাইসিস গ্রুপের নিবন্ধেও বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা খাতে সংস্কার প্রায় অগ্রগতি পায়নি এবং পুলিশ বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ফেরেনি।

এছাড়া পুলিশের দুর্বল অবস্থানের কারণে মব সন্ত্রাস, বিশেষ করে দল বেঁধে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা বেড়েছে। র‌্যাব, ডিজিএফআইয়ের মতো সংস্থাগুলোতে সংস্কার হয়নি বলে ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, দেশটির অন্তত তিনটি মানবাধিকার সংগঠন ২০২৫ সালের অর্থাৎ গত এক বছরের যে মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, মব ভায়োলেন্স বা সন্ত্রাস বছর জুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

এসব সংগঠন বলছে, ২০২৫ সাল জুড়ে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশজুড়ে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক ভিন্ন আদর্শের মানুষ এবং মাজার, দরগা ও বাউলদের ওপর হামলা, নিপীড়নের ঘটনা ক্রমাগত বাড়লেও এর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায়নি। এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেও মবের মতো ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।

এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা না নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং ভয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। ঢাকায় দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনাতেও সরকারের দিক থেকে কার্যকর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থানা, পুলিশ, সচিবালয়সহ কোথাও কোন চেইন অব কমান্ড নেই।

“এ বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তিটাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন জায়গায় কিছু ব্যক্তি দানব হয়ে ওঠেছে এবং তারা যা খুশী করছে। দেখার বিষয় হবে পরবর্তী সরকার কিভাবে এটি মোকাবেলা করে,” বলেছেন মি. রহমান।

এবার সংসদ নির্বাচনের সাথে গণভোটও হবে সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্যে। ফলে নির্বাচনে যারাই জিতবেন তারা রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, সংসদে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রপরিচালনা- এই তিন ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন।

কিন্তু এক্ষেত্রে অতীতের সরকার ও রাজনীতির যে সংস্কৃতি সেটির পরিবর্তে জনপ্রত্যাশা পূরণে কতটা ভিন্নতা তারা দেখাতে পারেন সেটিও নতুন সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন ডঃ ইফতেখারুজ্জামান।

তবে ক্রাইসিস গ্রুপের নিবন্ধে আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমঝোতার যে চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে ডঃ ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নতুন সরকারকে প্রতিবেশী ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আওয়ামী লীগের নিজের পদক্ষেপের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হবে।

ইতোমধ্যেই ঢাকায় বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার জানাজার দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকায় আসা এবং পরে ভারতের লোকসভায় মিসেস জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশকে – ভারত সরকারের দিক থেকে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করার আগ্রহের একটি ইঙ্গিত বলেও মনে করছেন অনেকে।

“আওয়ামী লীগের ইস্যুটি দলটির নিজের ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। পাশাপাশি বড় প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের বিষয়টিও নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে,” বলছিলেন ডঃ ইফতেখারুজ্জামান।

অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চ্যালেঞ্জ যেমন নিতে হবে, তেমনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রভাবশালী কিছু দেশ যেভাবে চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে নতুন সরকারকে সেটিও সামলাতে হবে।

“স্থবির ব্যবসা বাণিজ্যকে সচল করা এবং পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়া শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চ্যালেঞ্জও নতুন সরকারকে নিতে হবে,” বলছিলেন মি. রহমান।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

চর্বি খেলেই কি হৃদরোগ? জানুন সত্যটা

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:৫০ এএম
চর্বি খেলেই কি হৃদরোগ? জানুন সত্যটা

খাবারে চর্বি বা ফ্যাটের নাম শুনলেই অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকে মনে করেন, ফ্যাট খেলেই হৃদরোগ হবে বা ওজন বেড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। সব ফ্যাট একরকম নয়।

কিছু ফ্যাট শরীরের জন্য ক্ষতিকর হলেও কিছু ফ্যাট আবার হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই ফ্যাট পুরোপুরি বাদ না দিয়ে কোন ফ্যাট খাবেন আর কোনটি এড়িয়ে চলবেন, সেটাই জানা বেশি জরুরি।

শরীরের জন্য ফ্যাট কেন দরকার

ফ্যাট শরীরের একটি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। এটি শরীরে শক্তি জোগায়, ভিটামিন এ, ডি, ই ও কে শোষণে সাহায্য করে এবং কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি ত্বক ও চুল ভালো রাখতেও ফ্যাট দরকার। তবে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ফ্যাট খেলে ওজন বাড়ে, যা হৃদরোগসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

কোন ফ্যাটগুলো কম খাওয়া উচিত

সব ফ্যাট সমান নয়। কিছু ফ্যাট নিয়মিত বেশি খেলে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে।

স্যাচুরেটেড ফ্যাট

এই ধরনের ফ্যাট সাধারণত প্রাণিজ খাবারে বেশি পাওয়া যায়। যেমন

– গরু বা খাসির চর্বিযুক্ত মাংস

– মুরগির চামড়া

– পুরো দুধ, মাখন, পনির, আইসক্রিম

– নারিকেল তেল ও পাম তেল

স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি খেলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বাড়তে পারে। এতে ধমনিতে চর্বি জমে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই এই ফ্যাট একেবারে বাদ না দিলেও সীমিত রাখা ভালো।

ট্রান্স ফ্যাট

ট্রান্স ফ্যাটকে সবচেয়ে ক্ষতিকর ফ্যাট বলা হয়। এটি সাধারণত প্রক্রিয়াজাত ও ভাজা খাবারে থাকে। যেমন

– ফাস্ট ফুড

– ডিপ ফ্রাই খাবার

– বিস্কুট, কেক, পেস্ট্রি

– কিছু মার্জারিন

এই ফ্যাট খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ায় এবং ভালো কোলেস্টেরল কমিয়ে দেয়। ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই ট্রান্স ফ্যাট যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে ভালো।

কোন ফ্যাটগুলো হৃদযন্ত্রের জন্য ভালো

সব ফ্যাট খারাপ নয়। কিছু ফ্যাট নিয়মিত ও পরিমিত খেলে হৃদযন্ত্র ভালো থাকে।

মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট

এই ফ্যাট রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। হৃদরোগের ঝুঁকিও কমায়। পাওয়া যায়

– অলিভ অয়েল

– চিনাবাদাম তেল

– বাদাম

– অ্যাভোকাডো

পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট

এই ফ্যাট শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না, তাই খাবার থেকেই নিতে হয়। এর মধ্যে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদযন্ত্রের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।

ওমেগা থ্রি পাওয়া যায়

– সামুদ্রিক মাছ যেমন সারডিন, স্যামন

– আখরোট

– চিয়া বীজ ও তিসি

ওমেগা সিক্স ফ্যাটও শরীরের জন্য দরকার, তবে সেটিও পরিমিত মাত্রায় খেতে হবে।

পরিমাণের দিকে নজর দিন

ভালো ফ্যাট হলেও বেশি খেলে সমস্যা হতে পারে। কারণ ফ্যাটে ক্যালরি বেশি। তাই রান্নায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করে সেদ্ধ, ভাপানো বা হালকা রান্না করা খাবার বেছে নেওয়া ভালো। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল ও মাছের পরিমাণ বাড়ালে হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখা সহজ হয়।

ফ্যাট মানেই ক্ষতিকর এই ধারণা ঠিক নয়। কোন ফ্যাট ভালো আর কোনটি খারাপ, তা জানা থাকলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। ট্রান্স ফ্যাট এড়িয়ে চলা, স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম খাওয়া এবং ভালো ফ্যাট পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলেই হৃদযন্ত্র ভালো থাকবে।

সচেতন খাবার নির্বাচনই সুস্থ জীবনের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।

সূত্র : Health Line