খুঁজুন
বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬, ১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

জ্বালানি তেল নিয়ে সক্রিয় নানামুখী সিন্ডিকেট, বাড়ছে শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬, ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ
জ্বালানি তেল নিয়ে সক্রিয় নানামুখী সিন্ডিকেট, বাড়ছে শঙ্কা

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আকস্মিক ইরানে হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানিখাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী যুদ্ধের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় এই অস্থিরতা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। আর এই পরিস্থিতিতেই জ্বালানি তেল নিয়ে সক্রিয় হয়েছে বিভিন্নমুখী সিন্ডিকেট।

এর মধ্যে আছে অতি মুনাফালোভী ও সরকারকে অস্থিতিশীল করার ছুতো খুঁজতে থাকা সিন্ডিকেট। আছে চোরাকারবারি চক্রও।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদন ও সূত্র মতে, জাহাজ, ডিপো, পেট্রোল পাম্প, গাড়ির ট্যাংক থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই সক্রিয় ছোট-বড় চোরাকারবারিরা।

অবৈধ মজুতদাররা দ্বিগুণ দামেও বিক্রি করছে জ্বালানি তেল। শুধু যে চোরাই তেল দেশের বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে তা নয়, বিদেশেও পাচার হচ্ছে।
অন্যদিকে, পেট্রোল পাম্প মালিকদের একটা বড় অংশ পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের সমর্থক এবং সুবিধাভোগী। তারা কৃত্রিম জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি করে পরিবহনসহ বিভিন্ন সেক্টরে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা অব্যাহত রেখেছে, যাতে সরকারে অস্থিরতা তৈরি করা যায়।

এ অবস্থায় গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে পদক্ষেপ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিনই জব্দ হচ্ছে অবৈধভাবে মজুত করা তেল আর কালোবাজারে বিক্রির জন্য করা হচ্ছে জরিমানা। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা থাকলেও তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃত্রিম সংকট তৈরিতে সক্রিয় রাজনৈতিক চক্র:

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেট্রোল পাম্প মালিকদের একটা বড় অংশ বিগত সরকারের সমর্থক ও সুবিধাভোগী। মূলত তারাই কৃত্রিম জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি করে পরিবহনসহ বিভিন্ন সেক্টরে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা অব্যাহত রেখেছে।

জ্বালানি সংকট নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রিপোর্টে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে মূলত দুটি সিন্ডিকেট কাজ করেছে। প্রথমটি হচ্ছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক সিন্ডিকেট। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের বহির্নোঙর হলো এই সিন্ডিকেটের মূল আখড়া। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ঢাকার সরবরাহ ও বিতরণ সিন্ডিকেট। ঢাকার সিন্ডিকেটটি মূলত তেল পৌঁছানোর পর খুচরা বাজার ও ডিলার পর্যায়ে কারসাজি করে।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে ট্যাংক লরিগুলো থেকে তেল চুরি করা হয়। অনেক সময় ডিপোতে তেল লোড করার সময় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিটি লরিতে ১৫০-২০০ লিটার বাড়তি তেল দেওয়া হয়, যা পরে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। এছাড়া ডিপোগুলো থেকে তেল উত্তোলনের পর পাম্প মালিকরা তেলের দাম বাড়ার অপেক্ষায় মজুত করে রাখেন। বিশেষ করে তেলের দাম বাড়ার গুঞ্জন উঠলে রাজধানীসহ দেশের অনেক পাম্পে হঠাৎ ‘সাপ্লাই নেই’ বলে সংকট তৈরি করা হয়।

এ প্রসঙ্গে বিডিআরের সাবেক সিইও মেজর (অব.) ইমরান বলেন, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকারের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এছাড়া সীমান্তে নজরদারিও জোরদার করা উচিত। এরই মধ্যে কুষ্টিয়া অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্তে তেল পাচারের খবর পাওয়া গেছে, বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় পরিবহনকারী লরি থেকে তেল বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেইসঙ্গে অবৈধ মজুতের প্রমাণও মিলেছে। ২৭ মার্চ (শুক্রবার) সকালে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩০টি ড্রামে মজুত করা আনুমানিক ৬ হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করেছে জেলা প্রশাসন। ওইদিন মধ্যরাতে জামালপুরে ১৫টি ড্রামে জব্দ করা হয় ৩ হাজার লিটার পেট্রোল। ঠিক এর আগের দিন ২৬ মার্চ শেরপুর শহরের একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবনের নিচতলায় ২৫ হাজার লিটার তেলের ট্যাংকের সন্ধান পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে মেসার্স ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স ফিলিং স্টেশনে ২ হাজার ৩৬৮ লিটার পেট্রোল, তিন হাজার ৭৬০ লিটার ডিজেল এবং তিন হাজার ৬৫৫ লিটার অকটেন মজুত থাকার পরও বন্ধ রাখা হয়েছিল তেল বিক্রি; অন্যদিকে ২৮ মার্চ রাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর একটি পাম্পের রিজার্ভারে প্রায় ৬ হাজার লিটার অকটেনের মজুত পাওয়া যায়। তারাও বন্ধ রেখেছিল তেল বিক্রি।

এ প্রসঙ্গে পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ডিলারস্ ডিস্ট্রিবিউটারস এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, যারা ন্যাশনাল ক্রাইসিসের সময় এ ধরনের গর্হিত কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারে, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমার মনে হয় এখানে স্ট্রেট স্যাবোটাজ আছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে।

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংগঠনের আরেক নেতা বলেন, অনেক পাম্প মালিক রয়েছেন, যারা বিগত সরকারের মনোনয়নে বিভিন্ন পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন। এখন তারা ভোল পাল্টে নীতিকথা বলছেন। এ বিষয়গুলো সরকারের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশ্লেষক ড. শামসুল আলম বলেন, জাহাজ থেকে ডিপো কিংবা ডিপো থেকে পাম্প ও খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ক্ষেত্রবিশেষে লাইসেন্স বাতিলের মতো দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী পদক্ষেপও নিতে হবে। এক্ষেত্রে যেসব সরকারি কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা পাচ্ছেন, তারা কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারেন– সে বিষয়েও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে বলে মনে করেন এই জ্বালানি বিশ্লেষক।

এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, কারসাজি ঠেকাতে তারা এরই মধ্যে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থার প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চোরাই তেলের মূল কারবার চলে নদী ও সাগরে:

সূত্র জানায়, চোরাই তেলের মূল কারবার চলে নদী ও সাগরে। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত বড় বড় জাহাজ থেকে অবৈধভাবে তেল নামানো হয়। এসব তেল উপকূলে ড্রাম, ট্যাংক এমনকি নৌযানে লুকিয়ে রেখে গোপনে বিক্রি করা হয়। এ কাজটি অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। সরকারি পর্যায়ে আমদানি করা তেল চুরিতে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে ‘সিস্টেম লস’। জাহাজ থেকে ডিপোর ট্যাংক বা পরিশোধন কারখানায় ঢোকানোর সময় থেকে বাজারজাত করা পর্যন্ত ঢাল হিসেবে থেকে যায় ‘সিস্টেম লস’। এ ঢাল ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার তেল সরিয়ে নেওয়া হয়।

চোরাই তেলের কারবার নিয়ে বিভিন্ন সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কালো টাকা, পেশিশক্তি, বশ করা কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তি– এসবের সঙ্গে জড়িত। সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে কখনো কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হস্তক্ষেপও করতে দেখা যায়। ২০২৫ সালের মে মাসে কর্ণফুলী নদীর তীরে চোরাই তেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুটি গ্রুপের সংঘর্ষ হয়েছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিপিং ব্যবসায়ী বলেন, একটি বিদেশি বড় জাহাজে কয়েক মাসের খাবার ও জ্বালানি মজুত থাকে। ট্রিপ শেষে ক্যাপ্টেন যদি দেখেন প্রচুর জ্বালানি তেল ও খাবার রয়ে গেছে, তখন তিনি বিশ্বস্ততা অর্জন করেছে এমন লোকজনকে খুশি হয়ে এসব দিয়ে দেন। এর বিনিময়ে পণ্য, গিফট বা ডলার নিয়ে থাকেন। এভাবে কিছু জ্বালানি তেল দেশে ঢোকে, যা চোরাই তেল হিসেবে গণ্য হচ্ছে। যদিও কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও থানা পুলিশের নজরদারি বেড়েছে।

জ্বালানি তেলের আরেকটি উৎস জাহাজভাঙা শিল্প। বিদেশ থেকে আনা বড় বড় জাহাজগুলো যখন কাটা হয়, তার আগে অব্যবহৃত জ্বালানি তেল এবং পোড়া তেল আলাদাভাবে বিক্রি করা হয়। অব্যবহৃত জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল বিভিন্ন কারখানায় চলে যায় হাতবদলের মাধ্যমে।

এ প্রসঙ্গে জাহাজভাঙা শিল্পের একজন উদ্যোক্তা জানান, একটি জাহাজ বিচিং করার জন্য অনেক প্রক্রিয়া শেষ করে বিদেশ থেকে চালিয়ে বাংলাদেশের জলসীমায় আনা হয়। এসময় কাস্টমসের কর্মকর্তারা ওই জাহাজে কী পরিমাণ অব্যবহৃত তেল মজুত আছে তা পরিমাপ করে ট্যাক্স ও ভ্যাট আরোপ করেন। এক্ষেত্রে জাহাজটি যেহেতু ভরা জোয়ারের জন্য ৭ দিন থেকে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়, তাই প্রতিদিন ৩-৪ টন জ্বালানি খরচ হয়। ট্যাক্স ও ভ্যাট আরোপের সময় তেলের পরিমাপ ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পরিমাণ হিসাব করে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। জাহাজ শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে আনার পর মবিল, লুব অয়েল, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও পোড়া তেল– এসব ভাগ করে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

সরকারি এক প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, ইপিজেড এবং কর্ণফুলী এলাকায় সক্রিয় দুটি বড় তেল সিন্ডিকেটের কথা উঠে এসেছে, যারা পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের ‘ম্যানেজ’ করে বিদেশি জাহাজ থেকে তেল চুরি করে।

সাগর, নদী, জাহাজ ও ডিপোর বাইরে আরেকটি চক্র আছে তেলের লরির মাধ্যমে চুরি করে। বিশেষ করে ডিপোতে তেল লোড করার সময় ডিপোর কর্মীর সঙ্গে যোগসাজশ করে ১৫০-২০০ লিটার বাড়তি তেল নেওয়া হয়, যা যাত্রাপথে নির্দিষ্ট ভাসমান তেলের দোকানে কম দামে নগদে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এর বাইরে দূরপাল্লার গাড়ি থেকেও অব্যবহৃত জ্বালানি চালক-হেলপাররা এসব দোকানে বিক্রি করে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভাটিয়ারী, সীতাকুণ্ডসহ দেশের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে এ ধরনের ভাসমান তেলের দোকানের ছড়াছড়ি রয়েছে। ইদানীং খোদ পেট্রোল পাম্প মালিকরাই জ্বালানি সংকট তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা ও বেশি মুনাফার জন্য অবৈধভাবে তেল মজুত করছে, যা প্রশাসনের অভিযানে ধরাও পড়ছে।

গত শনিবার (২৮ মার্চ) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্টগার্ড আউটপোস্ট পতেঙ্গা থানাধীন কর্ণফুলী চ্যানেলের ১৪ নম্বর ঘাট সংলগ্ন এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশে বহন করা প্রায় ৪৮ লাখ টাকার ১ হাজার ৬০০ লিটার ডিজেল, ৩ হাজার ৩০০ কেজি আলকাতরা ও ৪টি ডিজেল ইঞ্জিনসহ ৭ পাচারকারীকে আটক করে। গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম জেলার পতেঙ্গা এলাকার কমিশনার ঘাটায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩০টি ড্রামে অবৈধভাবে মজুত করা আনুমানিক ৬ হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, সমুদ্রগামী জাহাজ ও তেল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনের সময় একটি অসাধু চক্র অবৈধভাবে জ্বালানি তেল অপসারণ করে তা বিভিন্ন স্থানীয় বিক্রেতার কাছে সরবরাহ করে থাকে। জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং অবৈধ মজুত প্রতিরোধের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে সব তেল ডিপো, পেট্রোল পাম্প ও সংশ্লিষ্ট তেল কারবারিরা প্রশাসনের কঠোর নজরদারির আওতায় রয়েছে। এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, নিঃসন্দেহে চোরাই তেল একটি বড় সমস্যা। অননুমোদিত, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় এসব তেল সংগ্রহ, মজুত ও বিক্রি হচ্ছে। বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি এবং মানুষ হতাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। পাশাপাশি চোরাই তেল খাতে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে, যা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ২০২৬ সালে এসেও যদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিপিসি, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ইআরএল, ডিপো, ফিলিং স্টেশন ও ডিলারসহ সব প্রতিষ্ঠান অটোমেশনের আওতায় না থাকে সেটি দুর্ভাগ্যের। যেখানে ম্যানুয়াল পদ্ধতি থাকবে, সেখানেই কারচুপির মহোৎসব হবে– এটা স্বাভাবিক।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হিসেবে জ্বালানি পরিবহনে ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন দ্রুত পুরোপুরি কার্যকর করলে ট্যাংক লরি ও অয়েল ট্যাংকারে (জাহাজ) জ্বালানি পরিবহনের খরচ, সময়, ঝুঁকি ও সিস্টেম লস সাশ্রয় হবে। তেলবাহী সব ট্যাংক লরিতে জিপিএস ট্র্যাকিং এবং ডিজিটাল লক বসানো উচিত। পাম্পগুলোতে একই মানের ‘অয়েল ডিসপেনসিং মেশিন’ ব্যবহার এবং এর কী-বোর্ড ভেতরে রাখা, যাতে কারচুপি করা না যায়। বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত।

চোরাই তেলের সিন্ডিকেট সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, প্রথম টার্গেট আমাদের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট। এটা বৈশ্বিক বিষয়, এটা উপেক্ষা করার বিষয় না। ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল পৌঁছে দেওয়া আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

অটোমেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিপিসির সব কার্যক্রম শতভাগ অটোমেশনে আসেনি। এটা শতভাগ অটোমেশন হলে তথ্য এক ক্লিকে পাওয়া যাবে।

বাংলানিউজ 

ফরিদপুরে ভাইরাল হওয়া সেই লাইলীর পাশে দাঁড়াল জেলা প্রশাসন, দিলেন আর্থিক সহায়তা 

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ৪:০০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ভাইরাল হওয়া সেই লাইলীর পাশে দাঁড়াল জেলা প্রশাসন, দিলেন আর্থিক সহায়তা 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া লোকসংগীত শিল্পী লাইলী আক্তারের পাশে দাঁড়িয়েছে ফরিদপুর জেলা প্রশাসন। মানবিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ব্যবহার অনুপযোগী বসতবাড়ি পুনর্নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাজহারুল ইসলাম। 

বুধবার (২৭ মে) দুপুরে জেলা প্রশাসকের বাংলোবাড়িতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে লাইলী আক্তারের হাতে আর্থিক সহায়তার টাকা তুলে দেন জেলা প্রশাসক।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মিন্টু বিশ্বাস, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( সার্বিক) সোহরাব হোসাইন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সুস্মিতা সাহাসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ।

জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম বলেন, “লাইলী আক্তার আমাদের জেলার গর্ব। তার কণ্ঠে গ্রামীণ সংস্কৃতির যে আবেগ ও ঐতিহ্য ফুটে উঠেছে, তা ইতোমধ্যে মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। একজন শিল্পীর জীবনমান উন্নয়নে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, লাইলী আক্তারের বসতবাড়িটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও বসবাসের অনুপযোগী। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার বাড়ি পুনর্নির্মাণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

এসময় জেলা প্রশাসক জানান, লাইলীর বিষয়টি সরকারের সংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দুষ্টিগোচর হয়েছে। ঈদের পরে যে কোন সময়ে তার জন্য সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হবে।

সহায়তা পেয়ে আবেগাপ্লুত লাইলী আক্তার জেলা প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমি কখনও ভাবিনি আমার গান এত মানুষের ভালোবাসা পাবে। জেলা প্রশাসন আমার পাশে দাঁড়ানোয় আমি অনেক খুশি।”

এদিকে স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিরা জেলা প্রশাসনের এ মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাদের মতে, এমন উদ্যোগ শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ফরিদপুরে তীব্র ঝড় থেকে বাঁচতে তাবুর নিচে আশ্রয়, শেষ রক্ষা হলো না শ্রমিক নেতার

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ৩:২৬ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে তীব্র ঝড় থেকে বাঁচতে তাবুর নিচে আশ্রয়, শেষ রক্ষা হলো না শ্রমিক নেতার

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় তীব্র ঝড় থেকে বাঁচতে একটি তাবুর নিচে আশ্রয় নিতে গিয়ে গাছচাপায় জিয়াউর রহমান বাঘা (৫০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তিনি শরিয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার পূর্ব মহিষা গ্রামের আমির হোসেন বাঘার ছেলে।

বুধবার (২৭ মে) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলা সদর ইউনিয়নের বাইশরশি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত জিয়াউর রহমান বাঘা জাকের পার্টির সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে জানা গেছে।

নিহতের সঙ্গে থাকা হাজী মো. মনির হোসেন জানান, সকালে তারা দুজন একসঙ্গে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় হঠাৎ ঝড় ও বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে গেলে সড়কের পাশে একটি অস্থায়ী তাবুর নিচে আশ্রয় নেন। একপর্যায়ে প্রবল বাতাসে পাশের একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেঙে তাবুর ওপর পড়ে। এতে জিয়াউর রহমান গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয় পথচারীদের সহায়তায় দ্রুত তাকে বিশ্ব জাকের মঞ্জিল জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন শাহ্ জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ফরিদপুরের ১০ গ্রামে উদযাপিত হচ্ছে ঈদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ফরিদপুরের ১০ গ্রামে উদযাপিত হচ্ছে ঈদ

সারা দেশে বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপিত হলেও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিল রেখে বুধবার (২৭ মে) ঈদুল আযহার নামাজ আদায় করেছেন ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ১০ গ্রামের আংশিক ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা।

দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতির ধারাবাহিকতায় জেলার বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ও রুপাপাত ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মানুষ একদিন আগে রোজা ও দুই ঈদ পালন করে আসছেন। এ উপলক্ষে বুধবার সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে পর্যায়ক্রমে সহস্রাইল দায়রা শরীফ, রাখালতলি ও মাইটকুমরা মসজিদে চারটি জামায়াতে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কাটাগড়, সহস্রাইল, দরিসহস্রাইল, মাইটকুমরা, রাখালতলি, গঙ্গানন্দপুরসহ অন্তত ১০ গ্রামের কিছু মানুষ চট্টগ্রামের মির্জাখিল শরীফের অনুসারী হিসেবে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদ পালন করেন। প্রতিবছরের মতো এবারও এসব এলাকায় ঈদের প্রস্তুতি সম্পন্ন শেষে ঈদ উদযাপন করছেন।

সহস্রাইল দায়রা শরীফে নামাজ শেষে মুসল্লিদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন মসজিদ কমিটি। সেখানে জামায়াতে ইমামতি করেন ধলেরচর দরবার শরীফের পীর সাহেব মুফতি মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান।

আলফাডাঙ্গা সরকারি ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও বোয়ালমারীর কাঁটাগড় গ্রামের বাসিন্দা মো. মাহিদুল হক বলেন, “চট্টগ্রামের মির্জাখিল শরীফ ও সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে বোয়ালমারীর শেখর ও রুপাপাত ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একদিন আগে রোজা ও দুই ঈদ পালন করে আসছেন। এবারও চারটি জামায়াতে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।”

তিনি আরো বলেন, বোয়ালমারীর পাশাপাশি আলফাডাঙ্গা উপজেলার ধলেরচর গ্রামের কিছু মানুষও এ জামায়াতে অংশ নেন।

আলফাডাঙ্গা উপজেলার ধলেরচর গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কার জানান, আগে ধলেরচর মাদ্রাসা ঈদগাহ মাঠে আলাদা জামায়াত হতো। কিন্তু ইমাম অধ্যক্ষ আব্দুর রহমানের মৃত্যুর পর সেখানে আর জামায়াত হচ্ছে না। এখন ধলেরচরের কয়েকজন মুসল্লি সহস্রাইল দায়রা শরীফে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন।

স্থানীয়রা জানান, এ অঞ্চলে সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ঈদ উদযাপনের প্রথা বহু বছরের পুরোনো। সংখ্যায় কম হলেও নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসরণ করেই তারা প্রতি বছর আলাদা দিনে ঈদ পালন করে থাকেন।