খুঁজুন
, ,

গণভোট ও সংবিধান সংস্কার বিতর্ক কতদূর যাবে?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:১৭ পূর্বাহ্ণ
গণভোট ও সংবিধান সংস্কার বিতর্ক কতদূর যাবে?

বাংলাদেশে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা গণভোট অধ্যাদেশ সরকারি দল বিএনপি সংসদে উত্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দলটি বলেছে, গণভোট হয়ে যাওয়ায় অধ্যাদেশটি আর সংসদে তোলার প্রয়োজন নেই।

যদিও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের তোলা একটি প্রস্তাবের ওপর সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে আজ মঙ্গলবার বিরোধী দলীয় সদস্যরা বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যে সংস্কার দরকার তা সংবিধান সংশোধন করে হবে না। বরং তাদের মতে, এজন্য দরকার হবে সংবিধান সংস্কার।

ওই আলোচনায় সরকারি দল বিএনপির সদস্যরা বলেছেন, ‘জাতীয় জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ রাষ্ট্রপতি জারি করলেও সেই এখতিয়ারই তার ছিল না। রাষ্ট্রপতির ওই আদেশ বৈধ আইন নয় বলে বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

“এ আদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল। এটি অবৈধ আদেশ। তবে আমরা জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ ও বাক্য ধারণ করি। আমরাই গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছিলাম জুলাই সনদের ভিত্তিতে,” সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেছেন মি. আহমদ।

তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গণভোটের অধ্যাদেশকে “জাতীয় প্রতারণার দলিল” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এর আগে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের সময় বিএনপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। যদিও জামায়াত জোটের সদস্যরা সেই শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপির অনাগ্রহে সংবিধান সংস্কার পরিষদ আর হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে কাজ করার বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার রাখেনি বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তাদের মতে, এটি ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি করবে।

যদিও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ইতোমধ্যেই জাতীয় সংসদে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য যে জুলাই সনদ হয়েছে সেটি তারা বাস্তবায়ন করবে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৭ই অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

একই বছরের ১৩ই নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

পরে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না তা যাচাইয়ে ২৫শে নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়।

তার ভিত্তিতে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে।

বিএনপির বিরোধিতা ও অনিহা

সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনপি কেন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ভোট চাইছে না- জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর নেতাকর্মীরা এমন প্রচারণাও চালান। এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি জনসভায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

কিন্তু দলটি আগে থেকেই বলে আসছিল যে ঐকমত্য কমিশনের সভায় যেসব বিষয়ে দলগুলো একমত হয়নি বা যেগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট এসেছে সেগুলো দলগুলো তাদের মতো করে নির্বাচনী ইশতেহারে দেবে এবং ভোটারদের রায় পেলে তারা সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করবে।

“বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছে, যা সংস্কার প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত,” রোববার সংসদে বলেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি তখন এও বলেছেন যে, “সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে এবং এ কমিটি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন জমা দিতে পারে”।

তবে সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান তার প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান বিষয়ে আলোচনার জন্য সংসদের কার্যক্রম স্থগিত রাখার আহ্বান জানান।

লিখিত বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, “গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ায় জনগণ এই বাস্তবায়ন আদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়ায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আইনগতভাবে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ-উভয় হিসেবেই শপথ নিতে বাধ্য”।

সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রসঙ্গে সেদিন বলেছেন যে, এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হলেও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধন করে না, “সংবিধানের যেকোনো পরিবর্তন সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে যথাযথ আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায়ই করতে হবে”।

এখন কী হবে

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো চলতি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই সংসদে উত্থাপন করা হয়। নিয়মানুযায়ী, উত্থাপনের পরবর্তী ৩০ দিন, অর্থাৎ আগামী ১২ই এপ্রিলের মধ্যে এসব অধ্যাদেশের যেগুলো সংসদে অনুমোদিত হবে না সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে যাবে।

সংসদে উত্থাপনের পর এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। ওই কমিটির সভাতেই সরকারি দল জানিয়ে দিয়েছে যে, গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হচ্ছে না।

এছাড়া মানবাধিকার কমিশন, বিচারপতি নিয়োগ, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশসহ কয়েকটি অধ্যাদেশে পরিবর্তন আনার কথা বলেছে বিএনপি। যদিও বিএনপির এমন অবস্থানের বিরুদ্ধে আপত্তি করে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে জামায়াত।

জামায়াত জোটে থাকা এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন সংসদে সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপি যাই করুক না কেন, তারা মনে করেন “গণভোট বৈধ এবং আইনগতভাবে তার বৈধতা কখনোই বাতিল করা যাবে না”।

বিএনপির কয়েকজন নেতা ধারণা দিয়েছেন যে, গণভোট এবং সেই ভোটের রায় বৈধ কিংবা অবৈধ- সেই আলোচনায় তারা যেতে আগ্রহী নয়। বরং তাদের লক্ষ্য হলো, যেসব বিষয়ে দলগুলো একমত হয়েছিল এবং বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে যা বলেছিল তার ভিত্তিতে সামনে সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা।

গণভোট অধ্যাদেশটি যখন জারি হয় তখন সেখানে বলা হয়েছিল, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কয়েকটি প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে গণভোটের বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত এ অধ্যাদেশ।

সে কারণে অনেকের মধ্যে এই প্রশ্ন আসছে যে, গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদিত না হলে এর অধীনে হওয়া গণভোট এবং সেই ভোটের ফল বাতিল হয়ে যাবে কি না।

অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছেন যে, “গণভোট আয়োজনে একটি অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। গণভোট হয়েছে। এই অধ্যাদেশের ব্যবহার হয়েছে। এর কোনো বিরোধিতা নেই। এই অধ্যাদেশকে সংসদে ধারণ করে ভবিষ্যতে ব্যবহার করার আর কিছু নেই”।

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, ভোটের ফল সরকারি দল বাস্তবায়ন না করলে সেটি এমনিই অকার্যকর হয়ে যায় এবং সে কারণে অধ্যাদেশ অনুমোদিত না হলে ভোটের ফল কী হলো তার কোনো গুরুত্ব থাকে না।

আবার অনেকে মনে করেন, সরকারের একটি আইন বা অধ্যাদেশের আওতায় এর মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাওয়া কোনো রায় বা জনমতের বৈধতা অকার্যকর হয়ে যায় না। ফলে সরকার বাস্তবায়ন না করলেও এর একটি আইনি ভিত্তি থেকেই যাবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলছেন, বিএনপি জাতীয় সনদের স্বাক্ষর করেছে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে।

“বিএনপি এখন মনে করছে দুটি নির্বাচনের একটির মূল্য নেই। সেজন্য তারা সংবিধান সংশোধনের কথা বলছে। কিন্তু এটা সংশোধনের অযোগ্য। সংস্কার মানে সংশোধনী না। সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে এটি বড় সংকটের জন্ম দেবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। আর সংবিধান সংস্কারে ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন করে তাতে ভোটারদের সামনে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ -তে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল।

ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, গণভোটে মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার মাধ্যমে।

“গণভোট সংবিধানের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এখন যা হচ্ছে সেটি হলো জনরায় উপেক্ষা করা। এর ফলে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে এবং এর মাধ্যমে আমরা মানুষের আত্মত্যাগ অস্বীকার করছি, যা গ্রহণযোগ্য নয়,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ফরিদপুরে ১১ দলীয় জোটের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ৩:০৭ অপরাহ্ণ
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ফরিদপুরে ১১ দলীয় জোটের বিক্ষোভ

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদ দ্রুত কার্যকরের দাবিতে ফরিদপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ১১ দলীয় ঐক্য জোট। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক দলের নেতারা অংশ নেন। তারা দাবি করেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

শনিবার (৪ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জনতা ব্যাংক মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ।

সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্য জোটের ফরিদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক মাওলানা মো. বদরুদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং দলীয় মুখপাত্র মুফতি আবু নাসির আইয়ুবী ও অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের যৌথ সঞ্চালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য প্রফেসর আবদুত তাওয়াব।

এ সময় আরও বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ফরিদপুর জেলা সভাপতি মাওলানা আমজাদ হোসাইন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ফরিদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক ডা. বায়েজিদ আহমাদ শাহেদ, খেলাফত আন্দোলন ফরিদপুর জেলা সভাপতি মাওলানা মিজানুর রহমান, এলডিপি সভাপতি মো. কামরুল ইসলামসহ ১১ দলীয় ঐক্য জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

বক্তারা বলেন, গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের মতামত এবং জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।

নেতারা আরও বলেন, দাবি বাস্তবায়নে গড়িমসি করা হলে সারাদেশে আরও বৃহত্তর ও কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। গণতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও তারা ঘোষণা দেন।

সমাবেশে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ১১ দলীয় ঐক্য জোটের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচি চলাকালে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় ছিল এবং বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন দাবিসংবলিত স্লোগান দেন।

ভাঙ্গায় গুলিতে যুবক নিহত: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে মামলা, কমিটি বিলুপ্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১:২৯ অপরাহ্ণ
ভাঙ্গায় গুলিতে যুবক নিহত: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে মামলা, কমিটি বিলুপ্ত

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে গুলিতে সুমন শেখ নামে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিবকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ মামলার একদিন পরই ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল।

শনিবার (৪ জুলাই) সকালে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান হত্যা মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

জানা যায়, গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পূর্বশত্রুতার জেরে ভাঙ্গা পৌরসভার হাসামদিয়া ও কাপুড়িয়া সদরদী মহল্লার বাসিন্দাদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হন কাপুড়িয়া সদরদী গ্রামের মিলন শেখের ছেলে সুমন শেখ (২৩)। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নিহতের বাবা মিলন শেখ গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ভাঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছে ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব ও পূর্ব হাসামদিয়া মহল্লার বাসিন্দা সজীব মাতুব্বরকে (২৮)।

পুলিশ জানায়, মামলার পর থেকে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মামলার প্রধান আসামি সজীব মাতুব্বর এখনও পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, ঘটনার পর শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে নিহত সুমন শেখের বাড়িতে যান ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন) আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল। তিনি নিহতের কবর জিয়ারত করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান।

সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সংসদ সদস্য বলেন, “মামলা তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। এই মামলায় কেউ কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। যারা অভিযুক্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আজই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দলীয় সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।”

সংসদ সদস্যের ওই বক্তব্যের প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যেই জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোজাম্মেল হোসেন ও সদস্যসচিব শাহরিয়ার শিথিল স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “অনিবার্য কারণবশত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল, ভাঙ্গা উপজেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটি ৩ জুলাই থেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো।”

কমিটি বিলুপ্তির বিষয়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব শাহরিয়ার শিথিল বলেন, ভাঙ্গা উপজেলা কমিটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। সর্বশেষ কমিটির এক শীর্ষ নেতা হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি হওয়ায় এবং মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সুপারিশে উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব যেন তদন্তে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব সজীব মাতুব্বরের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তিনি পলাতক থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

ডিম ছাড়ার মৌসুমেও সালথায় চায়না দুয়ারির দাপট, হুমকিতে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
ডিম ছাড়ার মৌসুমেও সালথায় চায়না দুয়ারির দাপট, হুমকিতে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বিভিন্ন খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি (চায়না জাল) দিয়ে অবাধে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। আষাঢ় মাসজুড়ে যখন দেশীয় প্রজাতির অধিকাংশ মাছ ডিম ছাড়ে ও বংশবিস্তার করে, ঠিক সেই সময় নির্বিচারে মাছ ধরায় জলজ জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় মাছের উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

শুক্রবার (৩ জুলাই) উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় খাল, বিল, নালা ও নদীর বিভিন্ন স্থানে চায়না দুয়ারি বসিয়ে দিন-রাত মাছ ধরা হচ্ছে। এসব ফাঁদে শুধু বড় মাছই নয়, রেণু, পোনা এবং ডিমওয়ালা মাছও আটকা পড়ছে। ফলে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এভাবে নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর অভিযান না থাকায় অসাধু জেলেরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এতে একদিকে যেমন দেশীয় মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের বাসিন্দা মজিবুর মাতুব্বর বলেন, “আগে বর্ষাকালে খাল-বিলে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারির কারণে ছোট-বড় সব মাছ ধরা পড়ে যাচ্ছে। মাছ ডিম দেওয়ার আগেই ধরে ফেলায় আগের মতো মাছ আর পাওয়া যায় না। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান চালানো প্রয়োজন।”

একই উপজেলার বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন বলেন, “চায়না দুয়ারি একবার বসালে পানির ভেতরের প্রায় সব ধরনের মাছ আটকা পড়ে। এতে ছোট মাছও রক্ষা পায় না। কয়েকজনের লাভের জন্য পুরো এলাকার মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। বিষয়টি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চায়না দুয়ারি বা সূক্ষ্ম ফাঁসের অবৈধ জাল ব্যবহারের ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব জাল ব্যবহার দেশীয় প্রজাতির মাছের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। এ কারণে সরকার বিভিন্ন সময় এ ধরনের অবৈধ উপকরণ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

এ বিষয়ে সালথা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তরুণ বসু ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “চায়না দুয়ারি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং যেখানে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেখানে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। অবৈধভাবে মাছ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর। নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে স্থানীয়দেরও সচেতন হয়ে প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাই।”