খুঁজুন
শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭ ফাল্গুন, ১৪৩২

ভাঙ্গায় সাংবাদিককে কুপিয়ে জখম, হামলাকারীকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:০০ পিএম
ভাঙ্গায় সাংবাদিককে কুপিয়ে জখম, হামলাকারীকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় কর্মরত দৈনিক কালবেলা–এর প্রতিনিধি ও ভাঙ্গা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল্লাহ শামীমের (৪৭) ওপর সন্ত্রাসী হামলার মূল হোতাকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে উপজেলার ঈদগাহ মসজিদ সংলগ্ন সড়কে স্থানীয় সাংবাদিকেরা ও সচেতন সমাজ এ মানববন্ধনের আয়োজন করেন।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সাংবাদিকের ওপর এ ধরনের ন্যাক্কারজনক হামলা স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর আঘাতের শামিল। অবিলম্বে হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।

বক্তারা হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা।

কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন দৈনিক ইনকিলাবের ভাঙ্গা প্রতিনিধি ওবায়দুল আলম সম্রাট। এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশের আঞ্চলিক সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক রাজশাহীর আলো পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক আজিবুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাঈদ মুন্সী। এছাড়াও প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকবৃন্দ মানববন্ধনে অংশ নেন।

আহত কালবেলার সাংবাদিক সাইফুল্লাহ শামীম বলেন, সাবেক আওয়ামী লীগের এমপি নিক্সন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত তামিম দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে। তার প্রভাব খাটিয়ে তামিম এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এলাকায় জমি কেনাবেচা বা বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে তার চাঁদা না দিয়ে কেউ কাজ করতে পারত না বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি আরও জানান, ২৪-এর গণঅবস্থানের পর তামিম কিছুদিন এলাকা থেকে আত্মগোপনে থাকলেও ২৬-এর নির্বাচনের পর পুনরায় প্রকাশ্যে এসে চাঁদাবাজি শুরু করে। এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করায় তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন সাইফুল্লাহ শামীম। তবে এখনো পর্যন্ত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

মানববন্ধন শেষ ভাঙ্গা (থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ওসির নিকট হামলাকারীকে অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবিতে পুলিশ সুপার বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল আলিম জানান, সাংবাদিক সাইফুল্লাহ শামীমের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত রামিম মুন্সির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য , গত বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে ভাঙ্গা পৌরসভাধীন কাপুরিয়া সদরদী এলাকার হেলিপ্যাড সংলগ্ন গাজীরভিটা মসজিদের সামনে তামিম মুন্সির দেশীয় অস্ত্রের দ্বারা আক্রমণের শিকার হন সাংবাদিক সাইফুল্লাহ শামীম।

সালথায় গরু চুরি করতে এসে ধরা, ট্রাক ফেলে পালাল চোর—আগুনে পুড়ল গাড়ি

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:১২ পিএম
সালথায় গরু চুরি করতে এসে ধরা, ট্রাক ফেলে পালাল চোর—আগুনে পুড়ল গাড়ি

ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় গরু চুরি করতে এসে স্থানীয়দের ধাওয়া খেয়ে ট্রাক ফেলে পালিয়েছে চোরের দল। পরে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ট্রাকটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) ভোররাতের দিকে উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের সাড়ুকদিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাত আনুমানিক ১টা ৪৫ মিনিটে সাড়ুকদিয়া গ্রামের বাসিন্দা রণ গোপাল (৫৫) এর গোয়ালঘরে ঢুকে অজ্ঞাতনামা চোরেরা গরু চুরির চেষ্টা চালায়। এ সময় গৃহকর্তা বিষয়টি টের পেয়ে চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন দ্রুত এগিয়ে আসে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝতে পেরে চোরেরা গরু ফেলে দ্রুত পালিয়ে যায়।

তবে চোরেরা পালানোর সময় চুরির কাজে ব্যবহৃত একটি ট্রাক ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে যায়। ট্রাকটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ড-১৪-০৪১৯ বলে জানা গেছে। পরে ঘটনাস্থলে জড়ো হওয়া শত শত উত্তেজিত জনতা ট্রাকটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রাকটি আগুনে পুড়ে যায়।

খবর পেয়ে সালথা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। চুরি চেষ্টার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় সম্প্রতি গরু চুরির ঘটনা বেড়েছে। এতে করে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তারা দ্রুত চোর চক্রকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

ফরিদপুরে নিষিদ্ধ আ.লীগ কার্যালয়ে যুবলীগের জাতীয় পতাকা উত্তোলন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:১৮ পিএম
ফরিদপুরে নিষিদ্ধ আ.লীগ কার্যালয়ে যুবলীগের জাতীয় পতাকা উত্তোলন

ফরিদপুর শহরের থানা মোড় এলাকায় অবস্থিত জেলা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা ও যুবলীগের দলীয় পতাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে জেলা যুবলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী এ কর্মসূচি পালন করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভোরের দিকে দলীয় নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে জাতীয় পতাকার পাশাপাশি সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় সেখানে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন- কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফরিদপুর শহর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসিবুর রহমান ফারহান, জেলা যুবলীগের সদস্য হিমেল মাহাফুজ, নিষিদ্ধ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি কাওসার আকন্দ এবং ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও যুবলীগ নেতা দেবাশীষ নয়নসহ আরও কয়েকজন নেতাকর্মী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পতাকা উত্তোলনের সময় নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। তারা দলীয় স্লোগানও দেন এবং সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তবে এ ধরনের কর্মসূচি ঘিরে সাধারণ মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক সক্রিয়তার অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে নিষিদ্ধ কার্যক্রমের পরও এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

“গ্রামের সেই দিনগুলি আজও মনে পড়ে”

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:১৮ এএম
“গ্রামের সেই দিনগুলি আজও মনে পড়ে”

শহরের এই কংক্রিটের দেয়ালঘেরা জীবনে বসে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি যেন নিজের ভেতরের একটা বড় অংশ হারিয়ে ফেলেছি। চারপাশে গাড়ির শব্দ, ব্যস্ত মানুষের ভিড়, সময়ের পেছনে দৌড়—সবকিছুই আছে, কিন্তু নেই সেই শান্তি, নেই সেই মায়া। আর ঠিক তখনই মনটা ফিরে যায় সেই ছোট্ট গ্রামটায়, যেখানে কেটেছিল আমার শৈশবের সোনালি দিনগুলো।

আমাদের গ্রামটা ছিল রাস্তার পাড় ঘেঁষে। বাড়ির সামনে বিশাল একটা মাঠ, তার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু কাঁচা রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে হাঁটলেই চোখে পড়ত সবুজ ধানের ক্ষেত, যেখানে হাওয়ায় ঢেউ খেলত সোনালি শীষ। বিকেলের আলো পড়লে পুরো মাঠটা যেন সোনার মতো ঝলমল করত। আমি আর আমার বন্ধুরা তখন ছুটে যেতাম সেই মাঠে, খালি পায়ে দৌড়াতাম, কখনো লুকোচুরি খেলতাম, কখনো ঘুড়ি ওড়াতাম।

আমাদের বাড়িটা ছিল মাটির, ছনের ছাউনি দেওয়া। উঠোনে একটা বড় আমগাছ ছিল। গরমের দুপুরে সেই গাছের ছায়ায় বসে মা আম কেটে দিতেন। আমরা ভাইবোনেরা গোল হয়ে বসে খেতাম, আর হাসতাম। মা মাঝে মাঝে বকতেন, “ধীরে খা, গলায় আটকে যাবে!” কিন্তু আমরা কি আর শুনতাম? সেই টক-মিষ্টি আমের স্বাদ যেন আজও জিভে লেগে আছে।

বাবা ছিলেন খুব সহজ-সরল মানুষ। সকালে উঠে জমিতে কাজ করতে যেতেন। আমিও মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে যেতাম। কাঁদায় পা ডুবিয়ে হাঁটা, গরুর গাড়িতে চড়া—এসব ছিল আমার কাছে একরকম অ্যাডভেঞ্চার। বাবা কাজ করতে করতে গল্প করতেন, “দেখিস, বড় হয়ে তুই অনেক বড় মানুষ হবি।” তখন বুঝতাম না ‘বড় মানুষ’ মানে কী, শুধু বাবার চোখের স্বপ্নটা দেখতাম।

বর্ষাকাল এলে গ্রামটা যেন এক অন্য রূপ নিত। চারদিকে পানি, কচুরিপানায় ভরা খাল, আর মাঝে মাঝে বৃষ্টি। আমরা তখন নৌকা বানাতাম—কাগজের, কখনো কলাগাছের ডাঁটা দিয়ে। সেই নৌকা ভাসিয়ে দিতাম পানিতে, আর দৌড়ে দৌড়ে দেখতাম কার নৌকা কত দূর যায়। বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরলে মা রেগে যেতেন, কিন্তু পরে গরম ভাত আর ডাল দিয়ে খাওয়াতেন। সেই ভাতের স্বাদ যেন পৃথিবীর সব খাবারের চেয়েও বেশি ছিল।

শীতের সকালগুলো ছিল আরও মধুর। কুয়াশা ঢাকা মাঠ, দূরে গরুর ঘণ্টার শব্দ, আর মাটির চুলায় ধোঁয়া উঠছে। মা তখন পিঠা বানাতেন—চিতই, ভাপা, পাটিসাপটা। আমরা সবাই আগুনের পাশে বসে গরম পিঠা খেতাম। ঠান্ডা বাতাস আর গরম পিঠার সেই মিলন যেন এক অপূর্ব আনন্দ এনে দিত।

স্কুলের দিনগুলোও কম স্মরণীয় ছিল না। আমাদের স্কুলটা ছিল টিনের ছাউনি দেওয়া, চারদিকে গাছপালা। ক্লাসে বসে মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতাম—পাখির ডাক, বাতাসে দুলতে থাকা গাছের পাতা—সবকিছুই মন টানত। শিক্ষকরা ছিলেন কঠোর, কিন্তু ভালোবাসায় ভরা। তারা শুধু পড়াশোনা নয়, জীবনটাকেও শেখাতেন।

আমার সবচেয়ে প্রিয় সময় ছিল বিকেল। তখন সূর্যটা ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ত, আর আকাশ লালচে হয়ে উঠত। আমরা সবাই মাঠে জড়ো হতাম। কেউ ফুটবল খেলত, কেউ ক্রিকেট, কেউবা শুধু গল্প করত। সেই হাসি, সেই চিৎকার—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত আনন্দ ছিল।

আর ছিল গ্রামের মানুষের আন্তরিকতা। কেউ অসুস্থ হলে সবাই ছুটে যেত, কারো বাড়িতে আনন্দ হলে পুরো গ্রাম মিলে উৎসব করত। ঈদের সময় সবাই নতুন কাপড় পরে একে অপরের বাড়ি যেতাম। সেমাই, পায়েস, নানা রকম খাবার—সবকিছু ভাগাভাগি করে খেতাম। তখন মনে হতো, আমরা সবাই একটা বড় পরিবারের অংশ।

কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না। পড়াশোনার জন্য একসময় আমাকে শহরে চলে আসতে হলো। প্রথমদিকে খুব কষ্ট হতো। রাতে ঘুমোতে গেলে গ্রামের কথা মনে পড়ত, মায়ের মুখ, বাবার হাসি, বন্ধুদের সাথে কাটানো সময়—সবকিছু চোখের সামনে ভেসে উঠত। শহরের এই ব্যস্ততা, এই যান্ত্রিক জীবন আমার কাছে অপরিচিত লাগত।

ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম, কিন্তু মনের ভেতরের সেই শূন্যতা আর ভরাট হলো না। মাঝে মাঝে ছুটিতে গ্রামে যাই। কিন্তু এখন আর আগের মতো লাগে না। অনেক কিছু বদলে গেছে। সেই মাঠে এখন আধা-পাকা বাড়ি উঠেছে, কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে, অনেক পুরনো মানুষ আর নেই।

আমাদের সেই আমগাছটাও আর নেই—ঝড়ে ভেঙে গেছে। উঠোনটা এখন ছোট হয়ে গেছে, চারপাশে নতুন দেয়াল উঠেছে। বন্ধুরাও সবাই ছড়িয়ে গেছে—কেউ শহরে, কেউ বিদেশে।

তবুও যখন গ্রামের পথে হাঁটি, তখন মনে হয়—এখানেই তো আমার শিকড়। এই মাটির সঙ্গেই আমার সম্পর্ক। বাতাসে এখনো যেন শৈশবের গন্ধ পাই। দূরে কোথাও কারো হাঁকডাক, গরুর ঘণ্টার শব্দ, কিংবা সন্ধ্যার আজানের ধ্বনি—সবকিছু আমাকে আবার সেই ছোট্ট ছেলেটায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

একদিন বিকেলে নদীর পাড়ে গিয়ে বসেছিলাম। সূর্যটা ধীরে ধীরে ডুবছিল, ঠিক যেমনটা দেখতাম ছোটবেলায়। সেই দৃশ্যটা দেখে চোখে পানি চলে এসেছিল। মনে হচ্ছিল, সময়টা যদি আবার ফিরে পাওয়া যেত! যদি আবার সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারতাম!

কিন্তু জীবন তো সামনে এগিয়ে চলে। অতীত শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে। তবুও সেই স্মৃতিগুলোই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, আমাদের শক্তি দেয়।

আজ যখন শহরের ব্যস্ততার মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখন চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই—সবুজ মাঠ, নদীর পাড়, মাটির ঘর, মায়ের ডাক, বাবার হাসি। মনে হয়, আমি আবার ফিরে গেছি সেই গ্রামে, সেই দিনগুলোর মাঝে।

হয়তো আর কোনোদিন সেই দিনগুলো ফিরে আসবে না। কিন্তু আমার হৃদয়ের গভীরে তারা চিরকাল বেঁচে থাকবে।
কারণ সত্যিই—গ্রামের সেই দিনগুলি আজও মনে পড়ে।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর