খুঁজুন
, ,

উপমহাদেশের দোতারার কিংবদন্তি কানাইলাল শীলকে ভুলে যাচ্ছে দেশ, অস্তিত্ব সংকটে জন্মভিটা

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ৪:১২ অপরাহ্ণ
উপমহাদেশের দোতারার কিংবদন্তি কানাইলাল শীলকে ভুলে যাচ্ছে দেশ, অস্তিত্ব সংকটে জন্মভিটা

বাংলার লোকসংগীতের ইতিহাসে দোতারার সুরের কথা উঠলেই যে কজন শিল্পীর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের অন্যতম উপমহাদেশের প্রখ্যাত দোতারা বাদক, লোকশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার কানাইলাল শীল। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, লোকসংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের মতো কিংবদন্তিদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি বাংলা লোকসংগীতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

অথচ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তাঁর জন্মভিটা আজও অবহেলিত। স্মৃতিচিহ্নগুলো অরক্ষিত, নেই কোনো স্মৃতি জাদুঘর, সংগীতচর্চার কেন্দ্র কিংবা পর্যটন-উপযোগী কোনো উদ্যোগ।

সরেজমিনে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লস্করপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে নিস্তব্ধতা। বাড়ির পাশে একটি জরাজীর্ণ সিমেন্টের স্মৃতিফলক, যার গায়ে ধুলাবালি ও ময়লা জমে রয়েছে। সেখানে কানাই লাল শীলের জন্ম-মৃত্যুসহ সংক্ষিপ্ত পরিচয় লেখা আছে। যে তমাল গাছের নিচে বসে তিনি একসময় দোতারার সুরে মানুষকে মোহিত করতেন, সেই স্মৃতিচিহ্নও আর নেই। ঘরের ভেতরে তাঁর একটি ছবি এবং তাঁকে নিয়ে লেখা কয়েকটি বই পাওয়া গেলেও সেগুলোও অযত্নে পড়ে রয়েছে। যেকোনো সময় মূল্যবান এসব স্মারক নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

জন্ম, শৈশব ও সংগীতে হাতেখড়ি:

কানাইলাল শীলের জন্ম ১৮৯৫ সালের ১ ডিসেম্বর, ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করপুর গ্রামে। তাঁর পিতা আনন্দচন্দ্র শীল এবং মাতা সৌদামিনী শীল। মাত্র আড়াই বছর বয়সে পিতাকে হারান তিনি। এরপর মা ও কাকিমার স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হয়ে ওঠেন।

সংগীতের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই। মাত্র আট বছর বয়সে ওস্তাদ বসন্ত কুমার শীলের কাছে বেহালায় হাতেখড়ি হয়। পরে এগারো বছর বয়সে ওস্তাদ মতিলালের কাছে বেহালার পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

দোতারার টানে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা:

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় দরবেশ দাণ্ড শাহের মাজারে দোতারা বাদনের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কিংবদন্তি দোতারা বাদক তরবন সরকারের সুরে মুগ্ধ হন কানাই লাল শীল। পরে তাঁরই শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

গ্রামবাংলার কবিগান, যাত্রাপালা, গাজীর গান, কীর্তনসহ বিভিন্ন ধারার লোকসংগীতে তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন এবং অল্প সময়েই সুনাম অর্জন করেন।

জসীমউদ্দীন, নজরুল ও আব্বাসউদ্দীনের সান্নিধ্যে:

ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে একটি যাত্রানুষ্ঠানে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। জসীমউদ্দীন তাঁর অসাধারণ প্রতিভা উপলব্ধি করে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যান। সেখানে লোকসংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।

আব্বাসউদ্দীনের অনুপ্রেরণায় কানাইলাল শীল লোকগান লেখা শুরু করেন এবং গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হন। এই সময় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নজরুলের গানের সঙ্গে নিয়মিত দোতারা বাজাতেন তিনি।

পরবর্তীতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর কলকাতা কেন্দ্রে নিয়মিত দোতারাবাদক হিসেবে যোগ দেন। দেশভাগের পর ১৯৪৯ সালে রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঢাকা বেতারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা:

ঢাকা বেতারে যোগ দেওয়ার পর পল্লীগীতি ও ভাওয়াইয়া গানে তাঁর দোতারার সুর শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। তিনি শুধু দোতারা বাদকই ছিলেন না, ছিলেন একজন সফল গীতিকার ও সুরকারও।

‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান ‘আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে’, ‘আমায় ঘরছাড়া করিলি রে, সুখ বসন্ত সুখের কালে’ সহ অসংখ্য গান তিনি নিজেই রচনা ও সুর করেছেন।

তাঁর লেখা ও সুর করা গান গেয়েছেন শচীন দেব বর্মন, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আব্দুল আলীম, ফেরদৌসী রহমানসহ বাংলা সংগীতের বহু কিংবদন্তি শিল্পী।

একুশে পদকে সম্মানিত:

১৯৭৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন কানাই লাল শীল। পরে বাংলা লোকসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৮৭ সালে (মরণোত্তর) একুশে পদকে ভূষিত করে।

কানাইলাল শীলের পরিবার:

কানাইলাল শীলের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে।

বড় ছেলে কুমোত কান্ত শীল বাংলাদেশ বেতারের যন্ত্রশিল্পী ছিলেন। তিনি ১৯৮৬ সালে মারা যান।

মেজ ছেলে আশুতোষ শীল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দোতারা বাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ৩ এপ্রিল ২০২৪ সালে মারা যান।

ছোট ছেলে অবিনাশ শীল বাংলাদেশ বেতারের ঢাকা কেন্দ্রের যন্ত্রশিল্পী ছিলেন। তিনি ৬ ডিসেম্বর ২০০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে বকুল রানী মারা গেছেন। মেজ মেয়ে ফুলমালা শীল বর্তমানে জীবিত আছেন। তাঁর বিয়ে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বহুগ্রামে। ছোট মেয়ে গৌরী রানী শীলের বিয়ে যশোর সদর উপজেলার বারিন্দ্রীপাড়ায় হয়েছিল। তিনি প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর আগে মারা যান।

বর্তমানে লস্করপুরের বাড়িতে বসবাস করছেন বড় ছেলে কুমোত কান্ত শীলের ছেলে বাদল চন্দ্র শীল।

নাতির ঘরে আজও টিকে আছে স্মৃতি:

বাদল চন্দ্র শীল ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেন। চাকরিজীবনে পুলিশ সাংস্কৃতিক পরিষদের যন্ত্রশিল্পী হিসেবেও কাজ করেন। ২০১৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে ৯০ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত পৈতৃক বাড়িতে স্ত্রী মাধুরী শীল, দুই মেয়ে তমা ও তনু শীল এবং ছেলে অপূর্ব শীলকে নিয়ে বসবাস করছেন।

বাদল চন্দ্র শীল বলেন, “চার-পাঁচ বছর আগে তৎকালীন ইউএনওকে দাদার বাড়ির বিষয়ে জানিয়েছিলাম। তিনি আসবেন বলেছিলেন, আসেননি। পরে আরেক ইউএনওও আসতে চেয়েছিলেন, তিনিও আসেননি। এভাবেই শুধু আশ্বাস পেয়েছি। মাঝেমধ্যে ভক্তরা আসেন, কিন্তু এখানে এসে দেখানোর মতো কিছুই পান না।”

তিনি বলেন, “এখানে একটি সংগীতচর্চা কেন্দ্র প্রয়োজন। হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশিসহ কিছু বাদ্যযন্ত্র থাকলে এলাকার শিল্পী ও শিক্ষার্থীরা চর্চা করতে পারবে। স্মৃতিস্তম্ভটি সংরক্ষণ করা দরকার। পাশাপাশি একটি লাইব্রেরি ও স্মৃতি সংরক্ষণাগার হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবে।”

তিনি আরও জানান, প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর কানাই লাল শীলের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর বাড়িতে কাঙালি ভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। কিন্তু গত দুই বছর আর্থিক সংকটের কারণে সেটিও বন্ধ রয়েছে।

স্ত্রীর আক্ষেপ:

বাদল চন্দ্র শীলের স্ত্রী মাধুরী শীল বলেন, “কেউ কখনো আমাদের খোঁজ নেয়নি। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগ নেই। প্রশাসনও শুধু আশ্বাস দিয়েছে। আপনারা লিখে কী করতে পারবেন—এটাই এখন আমাদের প্রশ্ন।”

১৯৯৪ সালে নিজ গ্রামে পুনঃসমাধি:

পরিবার সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুর পর ঢাকার পোস্তখোলায় কানাই লাল শীলকে দাফন করা হয়েছিল। পরে ১৯৯৪ সালে ঢাকার শিল্পীরা তাঁর দেহাবশেষ এনে লস্করপুরের নিজ বাড়িতে পুনঃসমাধিস্থ করেন। বর্তমানে সেখানে একটি সিমেন্টের স্মৃতিফলক রয়েছে।

ছাত্রের প্রতিষ্ঠিত শিল্পগোষ্ঠী:

জানা গেছে, সাবেক পুলিশ সুপার এম. খালেক ছিলেন কানাই লাল শীলের ছাত্র। তিনি ‘কানাইলাল শীল শিল্পগোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি নিজেও গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। ২০২৫ সালে তিনি মারা যান। বর্তমানে এই শিল্পগোষ্ঠী বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়মিত পল্লীগীতি পরিবেশন করে।

গবেষকদের মত:

ফরিদপুরের লেখক ও গবেষক মফিজ ইমাম মিলন বলেন, “কানাইলাল শীলের সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আমি ভারতেও দেখেছি, তাঁকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে স্থায়ী উদ্যোগ নেই। এটি দুঃখজনক। সরকার চাইলে তাঁর গ্রামের বাড়িকে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।”

সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি:

নগরকান্দা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি এহসানুল হক মিয়া বলেন,”কানাইলাল শীল শুধু ফরিদপুরের নয়, সমগ্র বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। দ্রুত উদ্যোগ না নিলে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেক স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে যাবে।”

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, “যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মায় না। তাই গুণীজনদের যথাযথ সম্মান দিতে হবে। সরকার ও প্রশাসন দ্রুত তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেবে বলে আশা করি।”

ফরিদপুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হাসানউজ্জামান বলেন, “কানাইলাল শীলের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে নতুন প্রজন্ম বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন,”শুধু স্মরণসভা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। গুণী মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণে স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কানাই লাল শীলের বাড়িটি সংরক্ষণ করা হলে এটি দেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠতে পারে।”

নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ শাহিনুজ্জামান শাহিন বলেন, “কানাইলাল শীল শুধু নগরকান্দার নয়, পুরো বাংলাদেশের গর্ব। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে রাজনীতি নয়, সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।”

প্রশাসনের আশ্বাস:

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “কানাইলাল শীলের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি পরিদর্শন করে সংরক্ষণের সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।”

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “কানাইলাল শীল শুধু বাংলাদেশের নয়, উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান শিল্পী। তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে খুব শিগগিরই আমরা তাঁর বাড়ি পরিদর্শনে যাব। সেখানে কী কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।”

উপমহাদেশের লোকসংগীতকে সমৃদ্ধ করা এই কিংবদন্তি শিল্পীর জীবন, সৃষ্টি ও অবদান আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু তাঁর জন্মভিটা যদি অযত্নে হারিয়ে যায়, তবে হারিয়ে যাবে বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসের এক মূল্যবান অধ্যায়ও। তাই সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের প্রত্যাশা—সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজের সচেতন মানুষ সম্মিলিত উদ্যোগে একুশে পদকপ্রাপ্ত এই গুণী শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত করবেন।

ফরিদপুরে মাদ্রাসার শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে বৃদ্ধের ৭ বছরের কারাদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:২৬ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে মাদ্রাসার শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে বৃদ্ধের ৭ বছরের কারাদণ্ড

ফরিদপুরের মধুখালীতে মাদ্রাসার আবাসিক ১১ বছর বয়সী এক শিশুছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মো. সাহেদ আলী (৭৭) নামে এক বৃদ্ধকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। রায়ে জরিমানার অর্থ আদায় করে ভুক্তভোগী ওই শিশুকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

​বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শামীমা পারভীন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাকে পুলিশ পাহারায় জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

​মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৮ জুন রাত ১টার দিকে মাদ্রাসার আবাসিক ছাত্রীদের কক্ষে ঢুকে ঘুমন্ত শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন সাহেদ আলী। তিনি ওই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও এক শিক্ষকের বাবা। এ সময় শিশুটির চিৎকারে তিনি স্থান ত্যাগ করেন।

​ঘটনার কয়েক দিন পর শিশুটি তার মাকে বিষয়টি জানালে, ৭ জুলাই শিশুটির মা বাদী হয়ে সাহেদ আলীকে একমাত্র আসামি করে মধুখালী থানায় একটি মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) নাজিম উদ্দীন ফকির।

​আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া বলেন, “দরিদ্র পরিবারের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে শিশুটির সঙ্গে আসামি যে অপরাধ করেছেন, তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। এ রায়ে আমরা সন্তোষ প্রকাশ করছি। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না—এ রায়ে সেই বার্তাই ফুটে উঠেছে।”

আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাব নির্বাচনে সভাপতি আচ্চু, সম্পাদক তামিম

মো. ইকবাল হোসেন, আলফাডাঙ্গা:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:৪৮ অপরাহ্ণ
আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাব নির্বাচনে সভাপতি আচ্চু, সম্পাদক তামিম

Oplus_131072

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবের দ্বি-বার্ষিক কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনে সভাপতি পদে সৈয়দ আমিনুর রহমান আচ্চু এবং সাধারণ সম্পাদক পদে তামিম আহমেদ মিলন নির্বাচিত হয়েছেন।

​বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোট গণনা শেষে ফল ঘোষণা করেন উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার ও নির্বাচনের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আশরাফুর রহমান।

​ঘোষিত ফলাফলে জানা যায়, ২১ জন ভোটারের মধ্যে ১৮ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। সভাপতি পদে সৈয়দ আমিনুর রহমান আচ্চু ৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. সেকেন্দার শেখ পেয়েছেন ৮ ভোট (১৮টি ভোটের মধ্যে ১৭টি বৈধ)।

​সহ-সভাপতি পদে ১টি ভোটে তাজমিনউর রহমান তুহিন নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আজিজুর রহমান দুলাল পেয়েছেন ৭ ভোট।

​সাধারণ সম্পাদক পদে তামিম আহমেদ মিলন ১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী গোলাম আজম মনি পেয়েছেন ৫ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ তিনটি পদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন তামিম আহমেদ মিলন। বাকি পদগুলোতে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

​নির্বাচন শেষে আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সদ্য সাবেক সভাপতি এনায়েত হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন সন্তোষ প্রকাশ করেন।

​নবনির্বাচিত সভাপতি সৈয়দ আমিনুর রহমান আচ্চু ও সাধারণ সম্পাদক তামিম আহমেদ মিলন প্রেসক্লাবের উন্নয়ন, সাংবাদিকদের পেশাগত মানোন্নয়ন এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা রক্ষায় সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

​প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আশরাফুর রহমান জানান, সুশৃঙ্খল ও সুষ্ঠু পরিবেশের মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

ফরিদপুরে সাড়ে ৩ কোটি টাকার সড়ক নির্মাণ ৪ বছরেও শেষ হয়নি, দুর্ভোগে এলাকাবাসী

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:১০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে সাড়ে ৩ কোটি টাকার সড়ক নির্মাণ ৪ বছরেও শেষ হয়নি, দুর্ভোগে এলাকাবাসী

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মাবেষ্টিত দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নে জাইকার অর্থায়নে নির্মিতব্য একটি এইচবিবি (হেরিংবোন বন্ড) সড়কের কাজ সাড়ে চার বছরেও শেষ হয়নি। প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের সামান্য কিছু অংশ করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল তুলে নিয়েছে প্রায় অর্ধেক টাকা। দীর্ঘসূত্রতায় চরম ভোগান্তিতে পড়া স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

​দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। কাজটি পায় ‘এম এস মোল্যা কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ইউনিয়নের নন্দলালপুর ঘাট থেকে ওয়াহেদ মোল্যার কান্দি (কালা মিয়া শিকদারের দোকান) পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার (৪,৭১২ মিটার) দীর্ঘ সড়কটি নির্মাণে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

​উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, নির্ধারিত মেয়াদের দীর্ঘ সময় পার হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ৭০০ মিটার কাজ সম্পন্ন করেছে। অথচ এরই মধ্যে তারা তুলে নিয়েছে ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। বাকি কাজ ফেলে রাখায় থমকে আছে পুরো প্রকল্পের অগ্রগতি।

​পদ্মাবেষ্টিত এই ইউনিয়নটি যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত দিক থেকে এমনিতেই পিছিয়ে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় মানুষের চলাচল ও পণ্য পরিবহনে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্থানীয়দের আশা ছিল, সড়কটি নির্মিত হলে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে এবং কৃষিপণ্য পরিবহন ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হবে। কিন্তু কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় সেই আশা ম্লান হয়ে গেছে।

​বিশ্বনাথপুর আকন গ্রামের বাসিন্দা আমিন শেখ বলেন, ‘সড়কটির কাজ শুরু হওয়ায় আমরা অনেক আশাবাদী হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আমাদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যার অবসান হবে। কিন্তু সাড়ে চার বছর পার হলেও কাজ শেষ হয়নি। সামান্য কিছু কাজ করে ফেলে রাখা হয়েছে। বর্ষার সময় আমাদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না।’

​দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘সড়কটি এই ইউনিয়নের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কাজটি দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত থাকায় সাধারণ মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

​এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এস মোল্যা কনস্ট্রাকশনের মালিক মো. কামরুজ্জামান টিটুর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

​তৎকালীন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবু এহসান মিয়া বলেন, ‘আমার দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল। প্রকল্পের অগ্রগতি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দেখে বিস্তারিত বলা যাবে।’

​বর্তমান উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নুরুনাহার বেগম জানান, ‘প্রকল্পটির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। কাজের অগ্রগতি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধ এবং বাকি কাজের বিষয়ে নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সড়কটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।’