খুঁজুন
বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ১১ চৈত্র, ১৪৩২

‎‘দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত এলাকা গড়তে চাই’ : শামা ওবায়েদ

ফরিদপুর ও সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:১০ এএম
‎‘দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত এলাকা গড়তে চাই’ : শামা ওবায়েদ

ফরিদপুর-২ (সালথা–নগরকান্দা) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম রিংকু বলেছেন, ধানের শীষ হচ্ছে উন্নয়নের প্রতীক। এই প্রতীকে জয়ী হলে সালথা–নগরকান্দা এলাকায় শিল্পায়ন ও ব্যাপক কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

‎শনিবার (০৭ ফেব্রুয়ারি) বিকাল সাড়ে ৫ টার দিকে সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দী গ্রামে নুরুদ্দীন মাতুব্বরের বাড়িতে আয়োজিত নির্বাচনী প্রচারণা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

‎শামা ওবায়েদ ইসলাম রিংকু বলেন, “আপনাদের বোন হিসেবে আমি ওয়াদা করছি—রাস্তা হবে, ব্রিজ ও কালভার্ট হবে, হাসপাতাল হবে। আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে এবং এই অঞ্চলে শিল্পকারখানা স্থাপন করা হবে, যাতে আমার ভাই-বোনেরা এখানেই চাকরি পায়।”

‎ভোটের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রাতে ১২টার পর গ্রামে যেসব লোক ঢোকে, তারা সাধারণত ভালো উদ্দেশ্যে আসে না। তাই ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রাম পাহারা দিতে হবে। ১১ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত—রেজাল্ট শিট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত—ধানের শীষের একটি ভোটও কবজের মতো করে রক্ষা করতে হবে।”

‎তিনি আরও বলেন, “আমি সংসদ সদস্য হতে পারলে এলাকার জনগণই হবে উন্নয়নের প্রধান শক্তি। এলাকার মানুষই সমস্যার সমাধান করবে। জনগণই সালথা–নগরকান্দা পরিচালনা করবে। আমরা চাই দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত সালথা–নগরকান্দা।”

‎গট্টি ইউপি সদস্য নুরুদ্দীন মাতুব্বরের সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ডা. এইচ এম শামসুদ্দিনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মোদাররেস আলী ইছা, উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. আছাদ মাতুব্বর, উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার খায়রুল বাসার আজাদ, সাবেক গট্টি ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হোসেন তারা মিয়া, রেজাউর রহমান চয়ন মিয়া, ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান লাভলু, গট্টি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি বিল্লাল মাতুব্বর, বিএনপি নেতা নূর মোহাম্মদ নুরু, আব্দুর রব, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন, যুবদল নেতা তৈয়বুর রহমান মাসুদ, মিরান হুসাইনসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

ডেকে নিয়ে গুলি! বোয়ালমারীতে ভাই হত্যায় সাবেক এমপি প্রার্থী আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ১২:০০ পিএম
ডেকে নিয়ে গুলি! বোয়ালমারীতে ভাই হত্যায় সাবেক এমপি প্রার্থী আটক

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় জমি-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে ছোট ভাইকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে সাবেক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী প্রফেসর ডা. গোলাম কবীরের বিরুদ্ধে।

বুধবার (২৫ মার্চ) সকালে উপজেলার চতুল ইউনিয়নের ফায়ার সার্ভিসের পেছনে রেলগেট এলাকায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এতে এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

নিহত মিন্টু (৫২) অভিযুক্ত গোলাম কবিরের আপন ছোট ভাই বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় সূত্র। জানা যায়, পারিবারিক জমি নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। একাধিকবার স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা হলেও বিরোধের সমাধান হয়নি।

স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার দিন সকালে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মিন্টুকে ঘটনাস্থলে ডেকে নেন ডা. গোলাম কবির। সেখানে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তাকে লক্ষ্য করে একাধিক রাউন্ড গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মিন্টুর মৃত্যু হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

ঘটনার পরপরই ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযুক্ত গোলাম কবিরকে আটক করে গণধোলাই দেয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। এ সময় উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তের ব্যবহৃত গাড়ি ভাঙচুর করে ক্ষোভ প্রকাশ করে।

বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেইন জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অভিযুক্তকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনাটির পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জমি-সংক্রান্ত বিরোধকেই হত্যার মূল কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।

এদিকে এ নির্মম হত্যাকাণ্ডে এলাকাবাসীর মধ্যে শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। দ্রুত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

‘পাঁজর থেকে সৃষ্টি’: ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মে হাওয়ার ভূমিকা কীভাবে বর্ণিত হয়েছে?

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ৮:৩৫ এএম
‘পাঁজর থেকে সৃষ্টি’: ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মে হাওয়ার ভূমিকা কীভাবে বর্ণিত হয়েছে?

খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ ‘বাইবেল (ইঞ্জিল)’ ও ‘তোরাহ’-তে ‘ইডেনের উদ্যান’ থেকে বেরিয়ে আসার ঘটনায় ইভ বা হাওয়াকে মূল চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

কারণ এই দুই পবিত্র গ্রন্থ অনুযায়ী, হাওয়াই নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার জন্য নবী আদমকে বলেছিলেন।

কিন্তু ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কোরানের বর্ণনা ভিন্ন। কোরান অনুযায়ী, ‘ইবলিস’ অর্থাৎ শয়তান দুজনকেই ধীরে ধীরে প্রলুব্ধ করেছিল, এরপর তারা দুজনেই গাছের ফলের স্বাদ গ্রহণ করে।

এর ফলে ‘তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে যায় এবং তারা বাগানের পাতা দিয়ে নিজেদের দেহ ঢাকতে শুরু করে’।

আল্লাহর শিক্ষা অনুযায়ী দুজনই মাফ চেয়েছিলেন এবং দু’জনই ক্ষমা লাভ করেন, এবং দুজনকেই ভ্রমণের আদেশ দেওয়া হয়।

হযরত আদম ও হযরত হাওয়াকে পৃথিবীতে পাঠানোর আগে যেখানে রাখা হয়েছিল সেই স্থানটির কথা উল্লেখ করতে কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল তার বাল-ই-জিব্রাইল বইয়ের একটি কবিতায় ‘বাগ-ই-বেহেশত’ (বেহেশতের বাগান) শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

একই কবিতায় তিনি সেই স্থান ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ বোঝাতে ‘হাকাম-ই-সফর’ (যাত্রার আদেশ) শব্দটি ব্যবহার করেছেন:

“আমাকে বাগ-ই-বেহেশত ছেড়ে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, যাত্রা এতো দীর্ঘ কেন? এখন আমার জন্য অপেক্ষা করো।”

কোরানের সূরা আল-আ’রাফে এই ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে ধর্মীয় চিন্তাবিদ জাভেদ আহমদ গামিদি তার তাফসিরে লিখেছেন, এখানে যে গাছের কথা বলা হয়েছে, সেই গাছ বোঝাতে, ‘আল-শাজারাহ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

সূরা ত্বা-হার একটি আয়াতে সেই গাছটিকে ‘শাজারাতুল খুলদ’ বলা হয়েছে।

‘এ থেকে স্পষ্ট যে এখানে আল-শাজারাহ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘শাজারাতুল খুলদ’ শব্দটির অর্থ এবং এই গাছের ফল খাওয়ার যে প্রভাবগুলো পরে বর্ণনা করা হয়েছে, তা থেকে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে এখানে মূলত সেই উর্বর গাছের (শাজারা-ই-তানাসুল) কথাই বলা হয়েছে, যার ফল খাওয়ার কারণেই মানুষ এই দুনিয়ায় নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।

তবে আজও পৃথিবীতে মানুষের জন্য যদি সবচেয়ে বড় কোনো পরীক্ষা থেকে থাকে, সেটি এই গাছই। অর্থাৎ যৌন আকর্ষণ ও ভোগ, যার সঙ্গে আদম ও হাওয়া তখনো পরিচিত হননি।”

তবে এ বিষয়ে সাম্প্রতিক বহু নতুন গবেষণার উদ্দেশ্য হলো মানুষের সৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত এই ঘটনাকে নতুন করে ব্যাখ্যা করা, যাতে হজরত হাওয়ার ভূমিকা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ও গভীর ধারণা পাওয়া যায়।

১৮শ শতকে ব্রিটিশ নান জোয়ানা সাউথকোট ইভ অর্থাৎ হজরত হাওয়ার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।

মানবজাতির উৎপত্তির কাহিনি সম্পর্কে নিজের ব্যাখ্যায় তিনি বলেছিলেন, “ইভ মানবজাতির কাছে জ্ঞান পৌঁছে দিয়েছিলেন, আর এই কারণেই তাকে ইডেন উদ্যান থেকে বের করে দেওয়া হয়, যাকে স্বর্গ হিসেবে ধরা হয়।”

জাভেদ আহমদ গামিদির তাফসির অনুযায়ী, এটি সম্ভবত এই পৃথিবীরই কোনো একটি বাগান ছিল, যাকে আদম ও হাওয়ার আবাসস্থল ঘোষণা করা হয়েছিল।

তিনি লিখেছেন, এখানে মূলত ‘ইহবিতু’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ ‘এতে নেমে যাও বা অবতরণ করো’। এই অর্থ সূরা আল-বাকারা’র ৬১ নম্বর আয়াতের ‘ইহবিতু মিসরান’ শব্দের সাথেও মিলে যায়।

অর্থাৎ “হে আদম, হাওয়া ও ইবলিস, তোমরা সবাই এই বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পৃথিবীতে নেমে যাও।”

ব্রিটিশ নান জোয়ানা সাউথকোটের মতে, “এখন ইভকে সেই ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে যিনি শয়তানকে পরাজিত করেছিলেন এবং মানবতাকে মুক্ত করেছিলেন। ইভ অ্যাডামকে প্রলুব্ধ করেননি।”

‘হাওয়া আদমকে প্ররোচিত করেননি’

আমেরিকার গামিদি সেন্টার অব ইসলামিক লার্নিং–এর গবেষক নাঈম আহমদ বালুচ বিবিসিকে জানান, কোরান পড়ে বোঝা যায় যে আদম ও হাওয়া দুজনকেই প্ররোচিত করেছিল ‘শয়তান’।

তিনি বলেন, “বাইবেলের (খ্রিস্টানদের পবিত্র গ্রন্থ) বিপরীতে কোরানে এমন কোনো ইঙ্গিত বা আয়াত নেই, যেখান থেকে বোঝা যায় যে হজরত আদম হজরত হাওয়ার কোনো কথার কারণে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করতে প্ররোচিত হয়েছিলেন”।

বাইবেলের কিছু গবেষকও স্বীকার করেন যে অ্য্যাডামকে ইভের প্রলুব্ধ করার ঘটনাটি স্বাভাবিক।

এই ঘটনার ব্যাখ্যায় নান জোয়ানা সাউথকোটও একই কথা বলেন। তার মতে, “সব অনিষ্টের মূল উৎস হলো সাপ, যা শয়তানের প্রতীক, ইভের নয়।”

১৮৬৯ সালে ব্রিটিশ চিন্তাবিদ হ্যারিয়েট ল ‘বাগ-ই-বেহেশত’-এ হাওয়ার ভূমিকা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

হ্যারিয়েট ল ইভকে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নারীবাদের একটি প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।

হ্যারিয়েট ল বলেন, “ইভ ছিলেন ইতিহাসের প্রথম নারীবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ, যিনি সে সময় নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন। এ কারণেই বাইবেলে বর্ণিত ইভকে বিশ্বের অনেক নারী আজও সম্মানের চোখে দেখেন।”

নারীবাদের পথিকৃৎ, পবিত্র গ্রন্থের অনুবাদক এবং সমকালীন শিক্ষাবিদদের মতে, পৃথিবীর প্রথম নারী হজরত হাওয়াকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

ব্রাজিলের পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত অধ্যাপক মারিয়া ক্লারা বেনজামার বলেন, “আজ ইভকে নতুনভাবে দেখা হচ্ছে।”

তিনি ইভকে এই পৃথিবীর মতো বলে অভিহিত করেছেন, যেখান থেকে সব ধরনের জীবনের জন্ম হয়েছে।

নান ও নারীবাদী দার্শনিক ইউভোন গেবহার্ট বলেন, মানুষের উৎপত্তির ইতিহাসের নানা ঘটনায় ইভকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এর মধ্যে কিছু ব্যাখ্যায় তাকে দুর্বল, নিজের কামনা-বাসনার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ঈশ্বরের আদেশ অমান্যকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতত্ত্ববিদ ফাবিওলা রোডিন ১৯৯৫ সালে রিও ডি জেনেইরোর ফেডারেল ইউনিভার্সিটিতে উপস্থাপিত তার মাস্টার্স থিসিস ‘দ্য ফেমিনিজম অব হোলিনেস’-এ যুক্তি দেন যে, “নারীবাদী ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে ইভ ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা গুরুত্বপূর্ণ মেরি।”

রোডিন উল্লেখ করেন, এই গুরুত্বের একটি কারণ হলো যে কাজটির দায় ইভের ওপর চাপানো হয়েছে, সেটিকেই পরবর্তীতে সব নারীর ওপর আরোপ করা হয়েছে।

তবে রোডিন স্বীকার করেন যে, “অ্যাডাম ও ইভকে ঘিরে থাকা উপকথা ও বর্ণনাগুলোর ব্যাখ্যাকে নতুন করে উপস্থাপন করা একটি জটিল ও চ্যালেঞ্জিং কাজ।”

ফাবিওলা রোডিন তার মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য নারীবাদী দার্শনিক ইউভোন গেবহার্টের লেখালেখি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন।

ইউভোন গেবহার্টের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইভ ও মেরির মধ্যে এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায় এবং তাদেরকে “নারীত্বের দুই প্রতীক” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

রোডিন বলেন, “যদিও সাধারণভাবে ইভকে পাপী নারীর প্রতীক এবং মেরিকে পবিত্র নারীর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, ইউভোন গেবহার্ট এমন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন, যা এই প্রচলিত মূল্যায়নগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা ইভকে নারীত্বের শক্তির ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখি।”

তার মতে, মানুষের কাছে ইভের কাজকে অস্বস্তিকর হিসেবে দেখানো হয়, কারণ তা মানুষের দুর্বলতা, লোভকে প্রতিরোধ করার ব্যর্থতা এবং মানুষের ভেতরে থাকা এক রহস্যময় শক্তিকে প্রকাশ করে।”

তিনি বলেন, “ইভের কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই দুর্বলতা ও রহস্য ইতিহাসজুড়ে সব নারীর ওপর আরোপ করা হয়েছে… প্রতিটি নারীকে একেকজন ইভ হিসেবে দেখা হয়, যিনি মানবজাতির পতন, দুর্বলতা, আকাঙ্ক্ষা, লোভ ও পাপের কারণ।”

অন্যদিকে অধ্যাপক মারিয়া ক্লারা বেনজামার জোর দিয়ে বলেন, “এটি ইভের কাহিনির কেবল একটি অংশ মাত্র। তার চরিত্রে এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু রয়েছে।”

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, “বাইবেলও আসলে এই ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।”

গবেষক নাঈম আহমদ বালুচের মতে, “কোরানের ইঙ্গিত থেকে বোঝা যায়, আদম ও হাওয়া যে বাগানে অবস্থান করেছিলেন, সেটি জান্নাত ছিল না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো জান্নাতে শয়তান প্রবেশ করতে পারে না, কোরানের আয়াতে এ কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “কোরান থেকেই জানা যায় যে, মানুষকে খলিফা হিসেবে পৃথিবীতে নিয়োগ করাই ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। হজরত আদম ও হজরত হাওয়াকে তাদের ভুলের জন্য ক্ষমা করার পরই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল, শাস্তি হিসেবে নয়।”

তোরাহর প্রথম গ্রন্থ জেনেসিস-এ লেখা আছে, “ওই ব্যক্তি তার স্ত্রীকে হাওয়া বলে ডাকতেন, কারণ তিনিই ছিলেন সকল জীবের মা।”

তিনি এই শব্দটির পক্ষে ভাষাগত প্রমাণও তুলে ধরেন যে, হিব্রু ভাষায় ‘হাওয়া’ শব্দের অর্থ ‘জীবন্ত’ অথবা ‘জীবনের উৎস’।

ইউভোন গেবহার্ট বলেন, “বিংশ শতকের পর থেকে আমরা পুরাণ ও উপকথাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে অধ্যয়ন করতে শুরু করেছি। এসব কাহিনির উদ্দেশ্য মানব অস্তিত্বের বহু রহস্য ব্যাখ্যা করা।”

তার মতে, “অন্যভাবে বললে, প্রত্যেক মানুষই অ্যাডাম, ইভ এবং প্রলুব্ধকারী সাপের প্রতিনিধিত্ব করে। এগুলো মানুষের স্বাধীনতার অনুসন্ধান এবং সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সীমা অতিক্রম করার প্রতীকও।”

তিনি বলেন, “অর্থাৎ আমরা শক্তি ও দুর্বলতা, ভয় ও কৌশল, প্রতিরোধ এবং নিজেকে বোঝার জন্য নিরন্তর অনুসন্ধানের এক সমন্বয়।”

গেবহার্টের ভাষায়, “আজ অ্যাডাম ও ইভকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে, এই ধারণার ভিত্তিতে যে আমরা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি।”

তিনি যুক্তি দেন যে, মানবজাতির উচিত “বিদ্রোহ ও বীরত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিজেদের সম্পর্কে একটি সম্মিলিত উপলব্ধিতে পৌঁছাতে দ্বৈততা কাটিয়ে ওঠা।”

সহজভাবে বললে মানুষের উচিত নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব দূর করে, বিদ্রোহ ও সাহসের সীমা ছাড়িয়ে নিজেকে ভালোভাবে বোঝা।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “ইভকে নায়িকা হিসেবে উপস্থাপন করা বা অ্যাডামকে দুর্বল কিংবা অন্য কোনো একতরফা তকমা লাগানো অত্যন্ত ভাসাভাসা সরলীকৃত দৃষ্টিভঙ্গি; এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি করে।”

ধর্মতত্ত্ববিদ হোলি মোরিস তার বই ‘দ্য বাইবেল অ্যান্ড ফেমিনিজম’-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সামনে এগোতে হলে আমাদের প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক ব্যাখ্যাগুলো ভেঙে দিতে হবে, যাতে প্রকৃত অর্থ উন্মোচন করা যায় এবং মূল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব হয়।

মধ্যযুগের শেষ দিকে ইতালীয় দার্শনিক ও কবি ক্রিস্তিনা দে পিজানো (১৩৬৩–১৪৩০) গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন যে, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির উৎকর্ষ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে নারীদের বাদ দেওয়া যায় না।

এ কারণে তিনি হজরত হাওয়ার কাহিনি উল্লেখ করে যুক্তি দেন যে, নারীরাও পুরুষদের মতোই ‘পরিপূর্ণ’ বা ‘নিখুঁত’। শুধু তাই নয়, তিনি ধর্মীয় যুক্তির মাধ্যমে বলেন যে, নারীদের অবমাননা করা মানে ঈশ্বরকে অবমাননা করা।

শ্যাভেজ ডিয়াজ বলেন, প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে কেবল রাজাদেরই ‘ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে দেখা হতো এবং অন্য মানুষদের তাদের সেবক হিসেবে গণ্য করা হতো।

সেই প্রেক্ষাপটে এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি বিপ্লবী ভাবনার প্রকাশ, যেখানে সব মানুষকেই ‘ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

আদম ও হাওয়ার সৃষ্টি

মানবসৃষ্টির বিষয়ে তোরাহর দ্বিতীয় অধ্যায়ে হজরত আদমকে প্রথম সৃষ্ট মানুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শব্দগতভাবে ‘আদম’ নামের অর্থ হলো ‘মাটি থেকে আহরিত’, এবং এটি সমগ্র মানবজাতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

গবেষক নাঈম বালুচ বলেন, সূরা মারিয়ামের ৬৭ নম্বর আয়াত থেকে তিনি বোঝেন যে, পৃথিবী সৃষ্টি হয়ে বসবাসের উপযোগী হওয়ার পরই আল্লাহ এতে মানুষ সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন।

তার মতে, “আর সূরা আলে ইমরানের ৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যখন বলেন যে আদম ও হাওয়াকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, তখন আমি এই ‘মাটি’ বলতে ধুলাবালি (ডাস্ট) বুঝি না; বরং এটিকে ‘পার্থিব উপাদান’ (আর্থলি ম্যাটেরিয়াল) হিসেবে দেখি। সে সময় মানুষ জানত না মাটির ভেতরে কী কী উপাদান রয়েছে। তাই এখানে মাটি বলতে শুধু মাটি নয়, এর মধ্যে পৃথিবীর সব খনিজ উপাদান ও উপকরণ অন্তর্ভুক্ত।”

পিজানো বলেন, “অ্যাডামকে একা দেখে ঈশ্বর তার জন্য একজন সঙ্গী সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন। ঈশ্বর অ্যাডামকে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন করেন, তার একটি পাঁজর নেন এবং সেখান থেকে নারীকে সৃষ্টি করেন।”

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় বিষয় হলো, বাইবেলের অধিকাংশ অনুবাদে হিব্রু শব্দ ‘ৎসেলা’ (Tsela)-কে ‘পাঁজর’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে।

“শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অনুবাদই এমন একটি ব্যাখ্যার ভিত্তি তৈরি করেছে, যার ফলে মনে করা হয়েছে যে নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি হীনমন্যতায় ভোগেন।”

তিনি এই অংশটির বিকল্প অনুবাদ হিসেবে প্রস্তাব করেন—

“এরপর তিনি (ঈশ্বর) তার (হজরত আদমের) একটি পাঁজর নিয়ে তা মাংস দিয়ে ঢেকে দিলেন। পুরুষের দেহ থেকে নেওয়া সেই অংশ ব্যবহার করেই ঈশ্বর একজন নারীকে সৃষ্টি করলেন।”

গবেষক নাঈম বালুচ বলেন, কোরানে হজরত হাওয়ার নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে হজরত আদমের সঙ্গে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসে তার নাম হাওয়া হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

ধর্মীয় আলেম পীর জিয়াউল হক নকশবন্দির মতে, বিখ্যাত মুফাসসির ইমাম তাবারি ও হাফেজ ইবন কাসির আল্লাহ বাণীর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে, হজরত আদম (আ.) এর পাঁজর থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

একটি হাদিসে হজরত হাওয়ার সৃষ্টির বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“নারীকে পুরুষের পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হলো তার ওপরের দিক। তুমি যদি সেটিকে সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙে ফেলবে; আর যদি তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও, সে বাঁকাই থাকবে। তাই নারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো।”

নাঈম বালুচের মতে, এই হাদিসটি রূপক অর্থে বোঝায় যে নারীর প্রকৃতি কোমলতা ও সূক্ষ্মতার ওপর ভিত্তি করে গঠিত, এবং তার সঙ্গে ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে আচরণ করা উচিত।

নকশবন্দি বলেন, “ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী হজরত হাওয়া মানবজাতির মা, আর সব মানুষই তার ও হজরত আদমের সন্তান”।

হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসে হজরত হাওয়ার নাম সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মানবজাতির মা, এবং তার জীবন থেকে আমরা শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচা ও আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা পাই।”

হাওয়া ও আদম, একে অপরের সঙ্গী ও প্রশান্তির উৎস

হিব্রু পাঠ অনুযায়ী নারী হলো পুরুষের সঙ্গী।

শ্যাভেজ ডিয়াজ বলেন, “সাধারণভাবে মনে করা হয় এটি একটি ঈশ্বরীয় গুণ, অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের একমাত্র সাহায্যকারী, এবং তাকে ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে না। আর এটি নারীর কাজ হিসেবে বিবেচিত।”

সহজভাবে বললে মানুষ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বাঁচতে পারে না, আর নারীর কাজ হলো মানুষকে সাহায্য করা বা তার পাশে থাকা।

অনুবাদকরা আরেকটি স্থানের দিকে ইঙ্গিত দেন, যেখানে হিব্রু শব্দ কেনেকতো ‘kenekto’ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ হলো নারীকে পুরুষের জন্য উপযুক্ত সঙ্গী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি ‘বিপরীত’, ‘সামনে’, ‘পিছনে’, ‘নিকটে’ এই সব অর্থ বহন করতে পারে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, “অর্থাৎ নারীকে এমন হতে হবে যে, তিনি আপনার সামনে আপনার সমকক্ষ থাকবেন।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, হিব্রু পাঠ কখনো নারীদের ওপর পুরুষদের আধিপত্য বা পুরুষদের তুলনায় নারীর নিকৃষ্টতা বা অধীনতার স্বীকৃতি দেয় না।

গবেষক নাঈম বালুচ সূরা আর-রুমের ২১ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন যে, আল্লাহ বলেছেন:

“আর তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হলো, যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গী তৈরি করেছেন যাতে তোমরা তাদের মধ্যে প্রশান্তি পেতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রতিষ্ঠা করেছেন। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি চিন্তাশীল মানুষদের জন্য নিদর্শন।”

মধ্যযুগের দার্শনিক ক্রিস্তিনা ডি পিসানো বলেন, এটি বলা ভুল যে পুরুষ বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ অ্যাডামকে ইভের আগে সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুরুষ সৃষ্টির পর নারী সৃষ্টির করে ঈশ্বর তার সৃষ্টিশীল ক্ষমতা আরো প্রসারিত করেছে।

শ্যাভেজ ডিয়াজ জোর দিয়ে বলেন, “বাইবেল একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ। বাইবেল এবং এর অন্যান্য অংশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো মানুষকে জীবনের অর্থ, নিজেদের মধ্যে, ঈশ্বরের সঙ্গে, অন্যদের সঙ্গে এবং সৃষ্টির সঙ্গে পুরুষ ও নারীর ভূমিকা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করে।”

তিনি বলেন, “ইভ একটি প্রাচীন চরিত্র, যার মধ্যে বহু দিক এবং বিভিন্ন অর্থ নিহিত আছে। তার কাহিনি বোঝার জন্য মানুষকে জীবনের মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি সম্পর্কে চিন্তা করতে উৎসাহিত করা এবং চ্যালেঞ্জ করা গুরুত্বপূর্ণ।”

সূত্র : বিবিসি

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ কেন, কী বলছে সরকার?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ৮:২৩ এএম
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ কেন, কী বলছে সরকার?

বাংলাদেশে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি দেশের স্থানীয় সরকার প্রশাসনে এক ধরণের স্থবিরতা তৈরি করেছে।

আর এ কারণেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকার দেশের দায়িত্ব গ্রহণের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নজর সবার।

কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়ার বিষয়ে সরকারের আগ্রহ কতটা?

এ নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি সরকারের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ অনেকের মধ্যে এক ধরণের সন্দেহও তৈরি করেছে।

বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদগুলোতে প্রশাসক হিসেবে দলীয় নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার পর নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংসদের বিরোধী দলগুলো।

তারা বলছে, ঢালাওভাবে দলের নেতাকর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনের আগেই স্থানীয় প্রশাসন নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকারি দল।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইস্যুতেই ঈদের পর দেশের রাজনীতির মাঠ সরব থাকবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তাদের অনেকেই বলছেন, আপাতত প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন সচল করার বিকল্প ছিল না।

কিন্তু দলের নেতাদেরকে যেভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে খুব একটা ভালো বার্তা দেয়নি সরকার।

এদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে সরকার তিনমাস সময় নিতে চায় বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি এই নির্বাচন আয়োজনে সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন জরুরি?

জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই এক ধরনের অচলবস্থা চলছে দেশের স্থানীয় সরকার প্রশাসনে। আন্দোলনের মুখে সাবেক সরকার প্রধান শেখ হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে স্থানীয় প্রশাসন।

সে সময় সিটি কর্পোরেশন কিংবা জেলা পরিষদে দায়িত্বে থাকা প্রতিনিধিদের কেউ হামলার শিকার হন, কেউ গ্রেফতার হন, আবার অনেকে আত্মগোপনে চলে যান।

যার ফলে স্থানীয় সরকার প্রশাসনে তৈরি হয় শূণ্যতা।

পরে স্থানীয় সরকার প্রশাসন আবারও সচল করার লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এছাড়া দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে কোথাও সরকারি কর্মকর্তা আবার কোথাও প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেন।

এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের ওই উদ্যােগ কতটা কাজে এসেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

দেড় বছর ধরে চলা ওই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা এবং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট স্থানীয় প্রশাসনে অচলবস্থা তৈরি করেছে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ফলে এখন সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা উচিৎ বলে মনে করেন তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যাবে, যদি দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যবস্থা তারা করতে না পারে।”

এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রশাসনে এখন পর্যন্ত যে নিয়োগগুলো সরকার দিয়েছে, সেটি এরই মধ্যে নানা সমালোচনা তৈরি করেছে বলেও মনে করেন মি. আহমদ।

তিনি বলছেন, “স্থানীয় সরকারে দলীয়করণটা জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের ওপর এর একটা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হতে পারে।”

এছাড়া নির্বাচনের পর স্থানীয় প্রশাসনে সরকার যেভাবে দলীয় নেতাদেরকে নিয়োগ দিয়েছেন সেটি নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম অবশ্য বলছেন, প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া অবৈধ কিছু নয়, নির্বাচিত রাজনৈতিক দল তার মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

“কিন্তু মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধি আর কারো মনোনীত ব্যাক্তি – এক বিষয় নয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মানুষের ওপর একটা দায়বদ্ধতা থাকে, যেটি অনেক ক্ষেত্রে একজন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকের নাও থাকতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মি. আলীম বলছেন, “আমরা একধরণের পরিবর্তনের আশা করছি জুলাই মুভমেন্টের পর থেকে। আশা করবো যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে সরকার অতীতের মতো হস্তক্ষেপ করবে না।”

বিরোধীদের সন্দেহ

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই যেসব বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে তার মধ্যে অন্যতম স্থানীয় সরকার নির্বাচন।

বিশেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে সংসদের বিরোধী দলগুলো।

সরকারের পক্ষ থেকেও এ নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঈদের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হবে বলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ।

কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এক ধরণের সন্দেহ তৈরি করেছে।

কয়েকদিন আগেই দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার, যেখানে নিয়োগপ্রাপ্তদের সবাই বিএনপির দলীয় রাজনীতিতে জড়িত।

এ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে পৃথক বিবৃতি দিয়েছে সংসদের বিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি।

তারা বলছে, সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ভোট ছাড়াই দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে বিএনপি।

এই পদক্ষেপকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ‘নিজেদের সুবিধা মতো’ আয়োজনের চেষ্টা হিসেবেও দেখছে বিরোধী দলগুলো।

সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “স্থানীয় প্রশাসনে যেভাবে দলীয় ব্যক্তিদের বসানো হচ্ছে, তাতে সরকারের ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।”

এর মধ্য দিয়ে সরকার মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে, নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করছে বলেও মনে করেন তিনি।

“সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন কম সময়ের মধ্যে দিয়ে দেবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. তাহের।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচনের দাবি আদায়ে বিরোধী দলগুলো প্রয়োজনে মাঠের কর্মসূচি দেবে বলেও জানান তিনি।

সরকার কী বলছে

বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, নির্বাচনের আগে স্থানীয় প্রশাসনকে সচল রাখতেই প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এক্ষেত্রে, সরকারের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

“নানা ভুল ধারণা নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। পরবর্তীতে আর কোনো প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে না, সবগুলোতেই নির্বাচন হবে,” বলেন মি. আলমগীর।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে আয়োজন করতে চায় সরকার? এমন প্রশ্নে জবাবে মন্ত্রী বলেছেন, “নির্বাচন আয়োজনে তিনমাস সময় নেবে সরকার।”

তিনি বলেন, “নির্বাচন ছাড়া হবে না, নির্বাচন অবশ্যই করা হবে। তবে এ মুহূর্তে করার কোনো পরিকল্পনা নাই, আমরা একটু সময় নিতে চাই। তবে, বড়জোর তিনমাস সময় নিতে পারি আমরা।”

নির্বাচনের পরিকল্পনা নিয়ে মি. আলমগীর বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ দিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় সরকার। এরপর ধারাবাহিকভাবে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন আয়োজন করা হবে।

“ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে হবে। এরপর উপজেলা ও পৌরসভা। জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ওগুলোতে নির্বাচন একটু পরে হবে,” বলেন তিনি।

সূত্র : বিবিসি বাংলা