খুঁজুন
সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ২৮ বৈশাখ, ১৪৩৩

‘পাঁজর থেকে সৃষ্টি’: ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মে হাওয়ার ভূমিকা কীভাবে বর্ণিত হয়েছে?

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ
‘পাঁজর থেকে সৃষ্টি’: ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মে হাওয়ার ভূমিকা কীভাবে বর্ণিত হয়েছে?

খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ ‘বাইবেল (ইঞ্জিল)’ ও ‘তোরাহ’-তে ‘ইডেনের উদ্যান’ থেকে বেরিয়ে আসার ঘটনায় ইভ বা হাওয়াকে মূল চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

কারণ এই দুই পবিত্র গ্রন্থ অনুযায়ী, হাওয়াই নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার জন্য নবী আদমকে বলেছিলেন।

কিন্তু ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কোরানের বর্ণনা ভিন্ন। কোরান অনুযায়ী, ‘ইবলিস’ অর্থাৎ শয়তান দুজনকেই ধীরে ধীরে প্রলুব্ধ করেছিল, এরপর তারা দুজনেই গাছের ফলের স্বাদ গ্রহণ করে।

এর ফলে ‘তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে যায় এবং তারা বাগানের পাতা দিয়ে নিজেদের দেহ ঢাকতে শুরু করে’।

আল্লাহর শিক্ষা অনুযায়ী দুজনই মাফ চেয়েছিলেন এবং দু’জনই ক্ষমা লাভ করেন, এবং দুজনকেই ভ্রমণের আদেশ দেওয়া হয়।

হযরত আদম ও হযরত হাওয়াকে পৃথিবীতে পাঠানোর আগে যেখানে রাখা হয়েছিল সেই স্থানটির কথা উল্লেখ করতে কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল তার বাল-ই-জিব্রাইল বইয়ের একটি কবিতায় ‘বাগ-ই-বেহেশত’ (বেহেশতের বাগান) শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

একই কবিতায় তিনি সেই স্থান ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ বোঝাতে ‘হাকাম-ই-সফর’ (যাত্রার আদেশ) শব্দটি ব্যবহার করেছেন:

“আমাকে বাগ-ই-বেহেশত ছেড়ে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, যাত্রা এতো দীর্ঘ কেন? এখন আমার জন্য অপেক্ষা করো।”

কোরানের সূরা আল-আ’রাফে এই ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে ধর্মীয় চিন্তাবিদ জাভেদ আহমদ গামিদি তার তাফসিরে লিখেছেন, এখানে যে গাছের কথা বলা হয়েছে, সেই গাছ বোঝাতে, ‘আল-শাজারাহ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

সূরা ত্বা-হার একটি আয়াতে সেই গাছটিকে ‘শাজারাতুল খুলদ’ বলা হয়েছে।

‘এ থেকে স্পষ্ট যে এখানে আল-শাজারাহ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘শাজারাতুল খুলদ’ শব্দটির অর্থ এবং এই গাছের ফল খাওয়ার যে প্রভাবগুলো পরে বর্ণনা করা হয়েছে, তা থেকে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে এখানে মূলত সেই উর্বর গাছের (শাজারা-ই-তানাসুল) কথাই বলা হয়েছে, যার ফল খাওয়ার কারণেই মানুষ এই দুনিয়ায় নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।

তবে আজও পৃথিবীতে মানুষের জন্য যদি সবচেয়ে বড় কোনো পরীক্ষা থেকে থাকে, সেটি এই গাছই। অর্থাৎ যৌন আকর্ষণ ও ভোগ, যার সঙ্গে আদম ও হাওয়া তখনো পরিচিত হননি।”

তবে এ বিষয়ে সাম্প্রতিক বহু নতুন গবেষণার উদ্দেশ্য হলো মানুষের সৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত এই ঘটনাকে নতুন করে ব্যাখ্যা করা, যাতে হজরত হাওয়ার ভূমিকা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ও গভীর ধারণা পাওয়া যায়।

১৮শ শতকে ব্রিটিশ নান জোয়ানা সাউথকোট ইভ অর্থাৎ হজরত হাওয়ার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।

মানবজাতির উৎপত্তির কাহিনি সম্পর্কে নিজের ব্যাখ্যায় তিনি বলেছিলেন, “ইভ মানবজাতির কাছে জ্ঞান পৌঁছে দিয়েছিলেন, আর এই কারণেই তাকে ইডেন উদ্যান থেকে বের করে দেওয়া হয়, যাকে স্বর্গ হিসেবে ধরা হয়।”

জাভেদ আহমদ গামিদির তাফসির অনুযায়ী, এটি সম্ভবত এই পৃথিবীরই কোনো একটি বাগান ছিল, যাকে আদম ও হাওয়ার আবাসস্থল ঘোষণা করা হয়েছিল।

তিনি লিখেছেন, এখানে মূলত ‘ইহবিতু’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ ‘এতে নেমে যাও বা অবতরণ করো’। এই অর্থ সূরা আল-বাকারা’র ৬১ নম্বর আয়াতের ‘ইহবিতু মিসরান’ শব্দের সাথেও মিলে যায়।

অর্থাৎ “হে আদম, হাওয়া ও ইবলিস, তোমরা সবাই এই বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পৃথিবীতে নেমে যাও।”

ব্রিটিশ নান জোয়ানা সাউথকোটের মতে, “এখন ইভকে সেই ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে যিনি শয়তানকে পরাজিত করেছিলেন এবং মানবতাকে মুক্ত করেছিলেন। ইভ অ্যাডামকে প্রলুব্ধ করেননি।”

‘হাওয়া আদমকে প্ররোচিত করেননি’

আমেরিকার গামিদি সেন্টার অব ইসলামিক লার্নিং–এর গবেষক নাঈম আহমদ বালুচ বিবিসিকে জানান, কোরান পড়ে বোঝা যায় যে আদম ও হাওয়া দুজনকেই প্ররোচিত করেছিল ‘শয়তান’।

তিনি বলেন, “বাইবেলের (খ্রিস্টানদের পবিত্র গ্রন্থ) বিপরীতে কোরানে এমন কোনো ইঙ্গিত বা আয়াত নেই, যেখান থেকে বোঝা যায় যে হজরত আদম হজরত হাওয়ার কোনো কথার কারণে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করতে প্ররোচিত হয়েছিলেন”।

বাইবেলের কিছু গবেষকও স্বীকার করেন যে অ্য্যাডামকে ইভের প্রলুব্ধ করার ঘটনাটি স্বাভাবিক।

এই ঘটনার ব্যাখ্যায় নান জোয়ানা সাউথকোটও একই কথা বলেন। তার মতে, “সব অনিষ্টের মূল উৎস হলো সাপ, যা শয়তানের প্রতীক, ইভের নয়।”

১৮৬৯ সালে ব্রিটিশ চিন্তাবিদ হ্যারিয়েট ল ‘বাগ-ই-বেহেশত’-এ হাওয়ার ভূমিকা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

হ্যারিয়েট ল ইভকে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নারীবাদের একটি প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।

হ্যারিয়েট ল বলেন, “ইভ ছিলেন ইতিহাসের প্রথম নারীবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ, যিনি সে সময় নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন। এ কারণেই বাইবেলে বর্ণিত ইভকে বিশ্বের অনেক নারী আজও সম্মানের চোখে দেখেন।”

নারীবাদের পথিকৃৎ, পবিত্র গ্রন্থের অনুবাদক এবং সমকালীন শিক্ষাবিদদের মতে, পৃথিবীর প্রথম নারী হজরত হাওয়াকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

ব্রাজিলের পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত অধ্যাপক মারিয়া ক্লারা বেনজামার বলেন, “আজ ইভকে নতুনভাবে দেখা হচ্ছে।”

তিনি ইভকে এই পৃথিবীর মতো বলে অভিহিত করেছেন, যেখান থেকে সব ধরনের জীবনের জন্ম হয়েছে।

নান ও নারীবাদী দার্শনিক ইউভোন গেবহার্ট বলেন, মানুষের উৎপত্তির ইতিহাসের নানা ঘটনায় ইভকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এর মধ্যে কিছু ব্যাখ্যায় তাকে দুর্বল, নিজের কামনা-বাসনার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ঈশ্বরের আদেশ অমান্যকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতত্ত্ববিদ ফাবিওলা রোডিন ১৯৯৫ সালে রিও ডি জেনেইরোর ফেডারেল ইউনিভার্সিটিতে উপস্থাপিত তার মাস্টার্স থিসিস ‘দ্য ফেমিনিজম অব হোলিনেস’-এ যুক্তি দেন যে, “নারীবাদী ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে ইভ ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা গুরুত্বপূর্ণ মেরি।”

রোডিন উল্লেখ করেন, এই গুরুত্বের একটি কারণ হলো যে কাজটির দায় ইভের ওপর চাপানো হয়েছে, সেটিকেই পরবর্তীতে সব নারীর ওপর আরোপ করা হয়েছে।

তবে রোডিন স্বীকার করেন যে, “অ্যাডাম ও ইভকে ঘিরে থাকা উপকথা ও বর্ণনাগুলোর ব্যাখ্যাকে নতুন করে উপস্থাপন করা একটি জটিল ও চ্যালেঞ্জিং কাজ।”

ফাবিওলা রোডিন তার মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য নারীবাদী দার্শনিক ইউভোন গেবহার্টের লেখালেখি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন।

ইউভোন গেবহার্টের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইভ ও মেরির মধ্যে এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায় এবং তাদেরকে “নারীত্বের দুই প্রতীক” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

রোডিন বলেন, “যদিও সাধারণভাবে ইভকে পাপী নারীর প্রতীক এবং মেরিকে পবিত্র নারীর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, ইউভোন গেবহার্ট এমন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন, যা এই প্রচলিত মূল্যায়নগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা ইভকে নারীত্বের শক্তির ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখি।”

তার মতে, মানুষের কাছে ইভের কাজকে অস্বস্তিকর হিসেবে দেখানো হয়, কারণ তা মানুষের দুর্বলতা, লোভকে প্রতিরোধ করার ব্যর্থতা এবং মানুষের ভেতরে থাকা এক রহস্যময় শক্তিকে প্রকাশ করে।”

তিনি বলেন, “ইভের কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই দুর্বলতা ও রহস্য ইতিহাসজুড়ে সব নারীর ওপর আরোপ করা হয়েছে… প্রতিটি নারীকে একেকজন ইভ হিসেবে দেখা হয়, যিনি মানবজাতির পতন, দুর্বলতা, আকাঙ্ক্ষা, লোভ ও পাপের কারণ।”

অন্যদিকে অধ্যাপক মারিয়া ক্লারা বেনজামার জোর দিয়ে বলেন, “এটি ইভের কাহিনির কেবল একটি অংশ মাত্র। তার চরিত্রে এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু রয়েছে।”

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, “বাইবেলও আসলে এই ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।”

গবেষক নাঈম আহমদ বালুচের মতে, “কোরানের ইঙ্গিত থেকে বোঝা যায়, আদম ও হাওয়া যে বাগানে অবস্থান করেছিলেন, সেটি জান্নাত ছিল না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো জান্নাতে শয়তান প্রবেশ করতে পারে না, কোরানের আয়াতে এ কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “কোরান থেকেই জানা যায় যে, মানুষকে খলিফা হিসেবে পৃথিবীতে নিয়োগ করাই ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। হজরত আদম ও হজরত হাওয়াকে তাদের ভুলের জন্য ক্ষমা করার পরই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল, শাস্তি হিসেবে নয়।”

তোরাহর প্রথম গ্রন্থ জেনেসিস-এ লেখা আছে, “ওই ব্যক্তি তার স্ত্রীকে হাওয়া বলে ডাকতেন, কারণ তিনিই ছিলেন সকল জীবের মা।”

তিনি এই শব্দটির পক্ষে ভাষাগত প্রমাণও তুলে ধরেন যে, হিব্রু ভাষায় ‘হাওয়া’ শব্দের অর্থ ‘জীবন্ত’ অথবা ‘জীবনের উৎস’।

ইউভোন গেবহার্ট বলেন, “বিংশ শতকের পর থেকে আমরা পুরাণ ও উপকথাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে অধ্যয়ন করতে শুরু করেছি। এসব কাহিনির উদ্দেশ্য মানব অস্তিত্বের বহু রহস্য ব্যাখ্যা করা।”

তার মতে, “অন্যভাবে বললে, প্রত্যেক মানুষই অ্যাডাম, ইভ এবং প্রলুব্ধকারী সাপের প্রতিনিধিত্ব করে। এগুলো মানুষের স্বাধীনতার অনুসন্ধান এবং সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সীমা অতিক্রম করার প্রতীকও।”

তিনি বলেন, “অর্থাৎ আমরা শক্তি ও দুর্বলতা, ভয় ও কৌশল, প্রতিরোধ এবং নিজেকে বোঝার জন্য নিরন্তর অনুসন্ধানের এক সমন্বয়।”

গেবহার্টের ভাষায়, “আজ অ্যাডাম ও ইভকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে, এই ধারণার ভিত্তিতে যে আমরা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি।”

তিনি যুক্তি দেন যে, মানবজাতির উচিত “বিদ্রোহ ও বীরত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিজেদের সম্পর্কে একটি সম্মিলিত উপলব্ধিতে পৌঁছাতে দ্বৈততা কাটিয়ে ওঠা।”

সহজভাবে বললে মানুষের উচিত নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব দূর করে, বিদ্রোহ ও সাহসের সীমা ছাড়িয়ে নিজেকে ভালোভাবে বোঝা।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “ইভকে নায়িকা হিসেবে উপস্থাপন করা বা অ্যাডামকে দুর্বল কিংবা অন্য কোনো একতরফা তকমা লাগানো অত্যন্ত ভাসাভাসা সরলীকৃত দৃষ্টিভঙ্গি; এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি করে।”

ধর্মতত্ত্ববিদ হোলি মোরিস তার বই ‘দ্য বাইবেল অ্যান্ড ফেমিনিজম’-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সামনে এগোতে হলে আমাদের প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক ব্যাখ্যাগুলো ভেঙে দিতে হবে, যাতে প্রকৃত অর্থ উন্মোচন করা যায় এবং মূল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব হয়।

মধ্যযুগের শেষ দিকে ইতালীয় দার্শনিক ও কবি ক্রিস্তিনা দে পিজানো (১৩৬৩–১৪৩০) গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন যে, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির উৎকর্ষ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে নারীদের বাদ দেওয়া যায় না।

এ কারণে তিনি হজরত হাওয়ার কাহিনি উল্লেখ করে যুক্তি দেন যে, নারীরাও পুরুষদের মতোই ‘পরিপূর্ণ’ বা ‘নিখুঁত’। শুধু তাই নয়, তিনি ধর্মীয় যুক্তির মাধ্যমে বলেন যে, নারীদের অবমাননা করা মানে ঈশ্বরকে অবমাননা করা।

শ্যাভেজ ডিয়াজ বলেন, প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে কেবল রাজাদেরই ‘ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে দেখা হতো এবং অন্য মানুষদের তাদের সেবক হিসেবে গণ্য করা হতো।

সেই প্রেক্ষাপটে এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি বিপ্লবী ভাবনার প্রকাশ, যেখানে সব মানুষকেই ‘ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

আদম ও হাওয়ার সৃষ্টি

মানবসৃষ্টির বিষয়ে তোরাহর দ্বিতীয় অধ্যায়ে হজরত আদমকে প্রথম সৃষ্ট মানুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শব্দগতভাবে ‘আদম’ নামের অর্থ হলো ‘মাটি থেকে আহরিত’, এবং এটি সমগ্র মানবজাতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

গবেষক নাঈম বালুচ বলেন, সূরা মারিয়ামের ৬৭ নম্বর আয়াত থেকে তিনি বোঝেন যে, পৃথিবী সৃষ্টি হয়ে বসবাসের উপযোগী হওয়ার পরই আল্লাহ এতে মানুষ সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন।

তার মতে, “আর সূরা আলে ইমরানের ৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যখন বলেন যে আদম ও হাওয়াকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, তখন আমি এই ‘মাটি’ বলতে ধুলাবালি (ডাস্ট) বুঝি না; বরং এটিকে ‘পার্থিব উপাদান’ (আর্থলি ম্যাটেরিয়াল) হিসেবে দেখি। সে সময় মানুষ জানত না মাটির ভেতরে কী কী উপাদান রয়েছে। তাই এখানে মাটি বলতে শুধু মাটি নয়, এর মধ্যে পৃথিবীর সব খনিজ উপাদান ও উপকরণ অন্তর্ভুক্ত।”

পিজানো বলেন, “অ্যাডামকে একা দেখে ঈশ্বর তার জন্য একজন সঙ্গী সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন। ঈশ্বর অ্যাডামকে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন করেন, তার একটি পাঁজর নেন এবং সেখান থেকে নারীকে সৃষ্টি করেন।”

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় বিষয় হলো, বাইবেলের অধিকাংশ অনুবাদে হিব্রু শব্দ ‘ৎসেলা’ (Tsela)-কে ‘পাঁজর’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে।

“শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অনুবাদই এমন একটি ব্যাখ্যার ভিত্তি তৈরি করেছে, যার ফলে মনে করা হয়েছে যে নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি হীনমন্যতায় ভোগেন।”

তিনি এই অংশটির বিকল্প অনুবাদ হিসেবে প্রস্তাব করেন—

“এরপর তিনি (ঈশ্বর) তার (হজরত আদমের) একটি পাঁজর নিয়ে তা মাংস দিয়ে ঢেকে দিলেন। পুরুষের দেহ থেকে নেওয়া সেই অংশ ব্যবহার করেই ঈশ্বর একজন নারীকে সৃষ্টি করলেন।”

গবেষক নাঈম বালুচ বলেন, কোরানে হজরত হাওয়ার নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে হজরত আদমের সঙ্গে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসে তার নাম হাওয়া হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

ধর্মীয় আলেম পীর জিয়াউল হক নকশবন্দির মতে, বিখ্যাত মুফাসসির ইমাম তাবারি ও হাফেজ ইবন কাসির আল্লাহ বাণীর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে, হজরত আদম (আ.) এর পাঁজর থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

একটি হাদিসে হজরত হাওয়ার সৃষ্টির বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“নারীকে পুরুষের পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হলো তার ওপরের দিক। তুমি যদি সেটিকে সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙে ফেলবে; আর যদি তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও, সে বাঁকাই থাকবে। তাই নারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো।”

নাঈম বালুচের মতে, এই হাদিসটি রূপক অর্থে বোঝায় যে নারীর প্রকৃতি কোমলতা ও সূক্ষ্মতার ওপর ভিত্তি করে গঠিত, এবং তার সঙ্গে ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে আচরণ করা উচিত।

নকশবন্দি বলেন, “ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী হজরত হাওয়া মানবজাতির মা, আর সব মানুষই তার ও হজরত আদমের সন্তান”।

হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসে হজরত হাওয়ার নাম সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মানবজাতির মা, এবং তার জীবন থেকে আমরা শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচা ও আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা পাই।”

হাওয়া ও আদম, একে অপরের সঙ্গী ও প্রশান্তির উৎস

হিব্রু পাঠ অনুযায়ী নারী হলো পুরুষের সঙ্গী।

শ্যাভেজ ডিয়াজ বলেন, “সাধারণভাবে মনে করা হয় এটি একটি ঈশ্বরীয় গুণ, অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের একমাত্র সাহায্যকারী, এবং তাকে ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে না। আর এটি নারীর কাজ হিসেবে বিবেচিত।”

সহজভাবে বললে মানুষ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বাঁচতে পারে না, আর নারীর কাজ হলো মানুষকে সাহায্য করা বা তার পাশে থাকা।

অনুবাদকরা আরেকটি স্থানের দিকে ইঙ্গিত দেন, যেখানে হিব্রু শব্দ কেনেকতো ‘kenekto’ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ হলো নারীকে পুরুষের জন্য উপযুক্ত সঙ্গী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি ‘বিপরীত’, ‘সামনে’, ‘পিছনে’, ‘নিকটে’ এই সব অর্থ বহন করতে পারে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, “অর্থাৎ নারীকে এমন হতে হবে যে, তিনি আপনার সামনে আপনার সমকক্ষ থাকবেন।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, হিব্রু পাঠ কখনো নারীদের ওপর পুরুষদের আধিপত্য বা পুরুষদের তুলনায় নারীর নিকৃষ্টতা বা অধীনতার স্বীকৃতি দেয় না।

গবেষক নাঈম বালুচ সূরা আর-রুমের ২১ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন যে, আল্লাহ বলেছেন:

“আর তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হলো, যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গী তৈরি করেছেন যাতে তোমরা তাদের মধ্যে প্রশান্তি পেতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রতিষ্ঠা করেছেন। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি চিন্তাশীল মানুষদের জন্য নিদর্শন।”

মধ্যযুগের দার্শনিক ক্রিস্তিনা ডি পিসানো বলেন, এটি বলা ভুল যে পুরুষ বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ অ্যাডামকে ইভের আগে সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুরুষ সৃষ্টির পর নারী সৃষ্টির করে ঈশ্বর তার সৃষ্টিশীল ক্ষমতা আরো প্রসারিত করেছে।

শ্যাভেজ ডিয়াজ জোর দিয়ে বলেন, “বাইবেল একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ। বাইবেল এবং এর অন্যান্য অংশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো মানুষকে জীবনের অর্থ, নিজেদের মধ্যে, ঈশ্বরের সঙ্গে, অন্যদের সঙ্গে এবং সৃষ্টির সঙ্গে পুরুষ ও নারীর ভূমিকা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করে।”

তিনি বলেন, “ইভ একটি প্রাচীন চরিত্র, যার মধ্যে বহু দিক এবং বিভিন্ন অর্থ নিহিত আছে। তার কাহিনি বোঝার জন্য মানুষকে জীবনের মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি সম্পর্কে চিন্তা করতে উৎসাহিত করা এবং চ্যালেঞ্জ করা গুরুত্বপূর্ণ।”

সূত্র : বিবিসি

সাংবাদিক দম্পতি শাকিল-ফারজানা রুপার জামিন

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ১২:০৫ অপরাহ্ণ
সাংবাদিক দম্পতি শাকিল-ফারজানা রুপার জামিন

সাংবাদিক শাকিল আহমেদ ও তার স্ত্রী ফারজানা রুপাকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সোমবার (১১ মে) বিচারপতি কে এম জাহিদ সরওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

তারা পৃথক ১৩টি জামিন আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে রুপার আট মামলা এবং শাকিলের রয়েছে পাঁচ মামলা।

 

শাকিল আহমেদ বার্তাপ্রধান হিসেবে ও ফারজানা রুপা প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে একাত্তর টেলিভিশনে কাজ করছিলেন। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় একাত্তর টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ।

২১ আগস্ট তাদের ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করে পুলিশ। সেদিন তারা টার্কিশ এয়ারলাইনসে প্যারিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন।

কত সম্পদের মালিক থালাপতি বিজয়?

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ
কত সম্পদের মালিক থালাপতি বিজয়?

ইতিহাস গড়ে অভিনেতা থেকে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন থালাপতি বিজয়। প্রায় সাত দশক পর প্রথমবার রাজ্যটিতে ডিএমকে বা এআইএডিএমকের বাইরে অন্য কোনও দল সরকার গঠন করল।

বিজয়ের এমন ঐতিহাসিক জয়ের পর তার সম্পত্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, নির্বাচনি হলফনামায় বিজয়ের মোট সম্পত্তির দেখানো হয়েছে ৬২৪ কোটি রুপির।

এর মধ্যে স্থাবর সম্পত্তির মূল্য প্রায় ২২০ কোটি রুপি এবং অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য প্রায় ৪০৪ কোটি রুপি। কোনও ঋণ নেই তার।
বিজয়ের সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল- একটি সেভিংস অ্যাকাউন্টে জমা থাকা ২১৩ কোটি রুপিরও বেশি অর্থ। ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাংকের সালিগ্রামাম শাখার এই অ্যাকাউন্টেই তার মোট অস্থাবর সম্পদের বড় অংশ রাখা আছে।

২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তার মোট আয় ছিল ১৮৪ কোটি ৫৩ লাখ রুপি।
এ ছাড়া বিজয় বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ১০০ কোটি রুপি ফিক্সড ডিপোজিট হিসেবে রেখেছেন। এর মধ্যে অ্যাক্সিস ব্যাংকে ৪০ কোটি, ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাংকে ২৫ কোটি, এইচডিএফসি ব্যাংকে ২০ কোটি, স্টেট ব্যাংকে অফ ইন্ডিয়ায় ১৫ কোটি রুপি রয়েছে। তার লিক্যুইড সম্পদের বড় অংশই ব্যাংক ডিপোজিটে রাখা।

তবে বিজয়ের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ অত্যন্ত সীমিত। তার মোট ইক্যুইটি লগ্নির পরিমাণ ২০ লাখ রুপিরও কম। এর মধ্যে জয়া নগর প্রপার্টি প্রাইভেট লিমিটেডে শেয়ার ১৯ লাখ ৬৯ হাজার, ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাংকে শেয়ার ৯ হাজার ৬০০ রুপি এবং সান পেপার মিল লিমিটেডের শেয়ার ২৫ হাজার ভারতীয় রুপি।

বিজয়ের স্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ২২০ কোটি রুপি। ১০টি আবাসিক সম্পত্তি প্রায় ১১৫ কোটি, বাণিজ্যিক সম্পত্তি প্রায় ৮২ কোটি ৮০ লাখ, অনাবাদি জমি প্রায় ২২ কোটি এবং কোডাইকানালের ভাট্টাপাট্টি গ্রামে কৃষিজমি রয়েছে ২০ লাখ রুপির।

বিজয়ের নামে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। ২০২৪ টয়োটা লেক্সাস ৩৫০- ৩ কোটি ১ লাখ, ২০২৪ বিএমডব্লিউ ১৭- ২ কোটি, ২০২৪ টয়োটা ভেলফায়ার- ১ কোটি ৬৩ লাখ, ২০২০ বিএমডব্লিউ ৫৩০- ৮০ কোটি ৫০ লাখ, ২০২৪ মারুতি সুইফ্ট- ৫ কোটি ৩৫ লাখ এবং ২০২৫ টিভিএস এক্সএল সুপার- ৬৭ হাজার ৪০০ রুপির।

বিজয়ের কাছে ৮৮৩ গ্রাম স্বর্ণ ও রুপার সামগ্রী রয়েছে, যার মোট মূল্য প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ রুপি। আর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্ত্রী সঙ্গীতা বিজয়কে ১২ কোটি ৬০ লাখ, ছেলে জেসন সঞ্জয়কে ৮ লাখ ৭৮ হাজার এবং মেয়ে দিব্যা সাশাকে ৪ লাখ ৬০ হাজার রুপি দিয়েছেন তিনি।

বিজয়ের আয়ের উৎস হিসেবে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে অভিনয় ও অন্যান্য পেশাগত আয়, ব্যাংকের সুদ এবং ভাড়া থেকে প্রাপ্ত টাকা।

ফলের মধ্যে খেজুরের স্থান এত উপরে কেন?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ
ফলের মধ্যে খেজুরের স্থান এত উপরে কেন?

খেজুর এখন সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। খেজুরের আছে নানা জাত। প্রখ্যাত দার্শনিক প্লিনি দ্য এলডার খেজুরের প্রায় ৪৯টি জাতের কথা বলে গেছেন। পবিত্র কুরআন এবং হাদীসে খেজুরকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে কেবল সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতেই নয়, আধুনিক পুষ্টিতত্ত্বেও খাদ্যমান অনুযায়ী বিভিন্ন ফলের মধ্যে খেজুরের স্থান সবচেয়ে উপরে।

ইসলামে খেজুর আল্লাহ প্রদত্ত অলৌকিক ফল। শরীর ও আত্মার সুস্থতায় ভূমিকা রাখে খেজুর। খেজুরবিহীন বাড়িকে দরিদ্র বাড়ি বলে অভিহিত করেছেন রাসুল (সা.)। কোরআনেও খেজুরের কথা বারবার উদ্ধৃত হয়েছে সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ ও প্রাচুর্যের উদাহরণ হয়ে। বিশ্বাসীদের জন্য জান্নাতে খেজুর গাছ থাকবে। নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খেজুরের স্মৃতি।

একবার এক খেজুর গাছ রাসুলের সামনে মাথা অবনত করে সম্মান জানায় বলে হাদিসে বর্ণিত রয়েছে। মদিনায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মিত হয়েছিল খেজুর পাতায়। মুয়াজ্জিন বেলাল প্রায়ই খেজুর গাছ বেয়ে উঠে দিনে পাঁচবার আজান দিতেন। মুসলিম চিত্রকলায় খেজুর গাছ পাওয়া যায়। মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম বিশেষ উদাহরণ মিনার, যা প্রভাবিত খেজুর গাছ থেকে। বলা হয়, ‘খেজুর গাছের মতো হও, কেউ যখন ঢিল ছুড়বে, জবাব দেবে একটা মিষ্টি খেজুর ছুড়ে’।

আরব পরিচিতির স্মারক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে খেজুর গাছ। আরবরা যখন বাগদাদ থেকে স্পেনের আন্দালুসিয়ায় গেল, বিস্তার ঘটে খেজুরের। যা পরবর্তী ছড়িয়ে পড়েছে ইতালি ও ইউরোপের অন্যান্য অনুকূল আবহাওয়া অঞ্চলে। খেজুরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সঙ্গে খেজুরকেন্দ্রিক উৎসবের উদাহরণও কম নেই। দক্ষিণ লিবিয়া ও উত্তর শাদের সীমান্তবর্তী গ্রাম টিবেস্টিতে দেখা যায় খেজুরকেন্দ্রিক উৎসব। বর্তমানে খেজুর চাষ তাদের জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। উৎসবে খেজুর গাছকে কেন্দ্র করে নৃত্য ও খেজুরের মদ পান করা সাধারণ দৃশ্য।

মধ্যপ্রাচ্যে খেজুর সামাজিক উৎসবে প্রবেশ করেছে। বাহরাইনে বিয়ের অনুষ্ঠানে ফটক সাজানো হয় খেজুরের শাখা দিয়ে। খেজুর সেখানে আনন্দ ও আশীর্বাদের প্রতিনিধিত্ব করে। ওমানে এখনো ছেলেসন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গে একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হয় প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে। উপসাগরীয় অঞ্চলে খেজুর চাষীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। সবচেয়ে ভালো খেজুরচাষী লাভ করেন পুরস্কার। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে খোদ ক্যালিফোর্নিয়ায় উদযাপিত হয় খেজুর উৎসব।

মানবসভ্যতায় খেজুর চাষের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের। খেজুর গাছের মধ্যে নারী ও পুরুষ রয়েছে। শুধু নারী গাছেই খেজুর জন্মায়। একটি প্রাপ্তবয়স্ক গাছ থেকে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার খেজুর পাওয়া যায়। এই পরিমাণ খেজুরের ওজন ১০০ কেজিরও বেশি।

শুকনো বা তাজা উভয় অবস্থাতেই খেজুর গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও হজমের জন্য সহায়ক আঁশ বা ফাইবারে পূর্ণ। এছাড়া বিভিন্ন রোগ ও অসুখ-বিসুখ থেকে মানবদেহকে রক্ষাকারী যে উপাদান সেই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেরও একটি বড় উৎস এই খেজুর। পবিত্র মাহে রমজানে উচ্চমাত্রার প্রাকৃতিক চিনি বা ফ্রুকটোজ সমৃদ্ধ এই ফলটি উচ্চমাত্রার শক্তিবর্ধক হওয়ায় বেশ কাজে লাগে।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন স্বাদের, আকারের ও রঙের খেজুর পাওয়া যায়। তবে জনপ্রিয়তার বিচারে বৈশ্বিক বাজারে এগিয়ে আছে ৫টি জাতের খেজুর।

১. আজওয়া খেজুর : বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং পছন্দনীয় খেজুর আজওয়া। মদিনাসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে এই খেজুর উৎপাদন হয়। মাঝারি আকারের কালচে বাদামি রঙ্গের এই খেজুর বেশ নরম, গোশতল, রসালো ও খুবই মিষ্টি।

২. মেডজুল খেজুর : এই ধরনের খেজুরগুলো আকারে বড়, স্বাদে বেশ মিষ্টি এবং সুগন্ধী হয়। সাধারণত দু’ধরনের মেজদুল খেজুর পাওয়া যায় বাজারে কিং মেজদুল ও ব্ল্যাক মেজদুল।

৩. মাবরুম খেজুর : দৈর্ঘের তুলনায় কিছুটা বেশি প্রসারিত এই খেজুরের রং হয় লালচে বাদামী। মাবরুম খেজুর আঁশসমৃদ্ধ এবং অন্যান্য জাতের খেজুরের তুলনায় এর স্বাদ খানিকটা কম মিষ্টি।

৪. দেগলেত নূর খেজুর : মাঝারি আকারের বাদামি রঙ এই খেজুরের মিষ্টতা খানিকটা কম। তবে মিষ্টি খাবার রান্না ও কেক-রুটি তৈরির জন্য এই খেজুর আদর্শ।

৫. পিয়ারোম খেজুর : প্রায় কালো রঙের পিয়ারোম অন্যান্য খেজুরের তুলনায় খানিকটা শুকনো এবং অনন্য স্বাদের জন্য বিখ্যাত।

তবে বিশেষ খেজুরের মধ্যে আছে ইরাকের জাইদি। এটি বাগদাদের মূল অর্থনৈতিক ফসল বলা চলে। জাইদি দামে সস্তা এবং যেকোনো আবহাওয়ায় ভালো থাকে। চিনি বেশি থাকার কারণে বাগদাদের বিশেষ অ্যালকোহল ‘আরক’ তৈরিতে জাইদি ব্যবহার করা হয়।

মিসরে সবচেয়ে মূল্যবান খেজুর হায়ানি। হায়ান নামক গ্রামের নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। হজযাত্রীরা এককালে এ গ্রামে থেমে বিশ্রাম করতেন। তিউনিসিয়ার মানখির খেজুর বেশ লম্বা আকারের। দেখতে নাকের মতো। খেতে অনেকটা দেগলেত নূর খেজুরের মতো। এ ছাড়া আলজেরিয়ার থুরিও, দক্ষিণ ইরানে মাজাফাতি নামের খেজুর ফলে।

আপস

বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ টন খেজুর উৎপাদন হয়। খেজুর উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে মিসর, সৌদি আরব, ইরান, আলজেরিয়া ও ইরাক উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে মিসর একাই বছরে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টন খেজুর উৎপাদন করে এবং বিশ্ব উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশ সরবরাহ করে, অর্থাৎ প্রতি পাঁচটি খেজুরের একটি মিসরে উৎপাদিত হয়। সৌদি আরব ও ইরান যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শুধু পাকিস্তান এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

খেজুর রপ্তানির ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এগিয়ে। সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় খেজুর রপ্তানিকারক দেশ, যা ২০২১ সালে প্রায় ৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের খেজুর রপ্তানি করেছে। এর পরেই রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তিউনিসিয়া। অন্যদিকে ইসরায়েল খেজুর রপ্তানিতে সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, মাত্র এক বছরে তাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের শীর্ষ দেশ। ২০২১ সালে দেশটি প্রায় ২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের খেজুর আমদানি করেছে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে মরক্কো ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাংলাদেশও খেজুর আমদানিতে এগিয়ে যাচ্ছে। মূলত ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, আলজেরিয়া ও পাকিস্তান থেকে বেশি খেজুর আমদানি করে থাকে বাংলাদেশ।

বিশ্বে খেজুর উৎপাদন, রপ্তানি ও আমদানির বাজারে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর আধিপত্য এখন সবচেয়ে বেশি, আর বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশগুলো এসব দেশের ওপর আমদানির জন্য নির্ভরশীল।