খুঁজুন
, ,

সাংবাদিকতার চার দশক : পান্না বালার সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
সাংবাদিকতার চার দশক : পান্না বালার সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প

ফরিদপুরের সাংবাদিকতা অঙ্গনে যে কজন মানুষ সততা, পেশাদারিত্ব ও ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তায় আলাদা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তাদের অন্যতম প্রবীর কান্তি বালা—যাকে সবাই বেশি চেনেন পান্না বালা নামে। কয়েক দশকের নিরলস সাংবাদিকতা জীবনে তিনি কেবল একজন সংবাদকর্মী হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি, বরং হয়ে উঠেছেন সাংবাদিকতার এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন, সাহসী অবস্থান এবং মানবিক ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি ফরিদপুরের সাংবাদিক সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত এক নাম।

১৯৬৪ সালের ৮ জানুয়ারি এক বনেদি ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন পান্না বালা। তাঁর বাবা গৌর চন্দ্র বালা ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাবেক যুক্তফ্রন্ট সরকারের বন ও খাদ্যমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম রচয়িতা। সমাজ ও রাজনীতিতে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। অন্যদিকে মা অঞ্জলী বালা একজন সমাজসেবী ও শিশু সংগঠক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী শিশু সংগঠন ‘ফুলকি’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই পান্না বালা বেড়ে উঠেছেন সংস্কৃতি, শিক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধের পরিবেশে।

পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। তাঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও সফল। বড় ভাই বিপ্লব বালা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। সংস্কৃতি ও নাট্যাঙ্গনে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয় ভাই প্রণব বালা পেশায় চিকিৎসক এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। তৃতীয় বোন তন্দ্রা বালা অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। ছোট বোন তৃপ্তি বালা একজন চিকিৎসক, যিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে রয়েছেন। এমন উচ্চশিক্ষিত ও প্রগতিশীল পরিবারে বেড়ে ওঠা পান্না বালার চিন্তা-চেতনা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন মনোযোগী ও মেধাবী। ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। কলেজজীবনেই তাঁর সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি বুঝতে পারেন, সংবাদপত্র কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজ পরিবর্তনেরও শক্তিশালী হাতিয়ার। সেই উপলব্ধি থেকেই ১৯৮২ সালে ফরিদপুর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘আল মুয়াজ্জিন’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা করেন তিনি। তখন তিনি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র।

এরপর ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করতে থাকেন। স্থানীয় দৈনিক গণসংহতি, সাপ্তাহিক প্রগতির দিন, দৈনিক ভোরের রানারসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেন। মাঠে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ, মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প তুলে ধরা, সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি—এসবের মধ্য দিয়ে তিনি অর্জন করেন দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ফরিদপুরের প্রায় সব স্থানীয় পত্রিকাতেই তাঁর লেখা কলাম ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখার ভাষা ছিল সহজ, প্রাঞ্জল ও বাস্তবমুখী। সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, দুর্নীতি, অনিয়ম, উন্নয়ন ও সামাজিক সমস্যাগুলো তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তুলে ধরতেন।

দীর্ঘ সাংবাদিকতা অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর ফরিদপুর প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন পান্না বালা। এটি ছিল তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। জাতীয় দৈনিকে কাজ করার মাধ্যমে তাঁর দায়িত্ব ও পরিধি আরও বেড়ে যায়। মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের কারণে তিনি অল্প সময়েই পাঠক ও সহকর্মীদের আস্থা অর্জন করেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে পেশাগত দক্ষতা ও সততার স্বীকৃতি হিসেবে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ পদে পদোন্নতি দেয়।

পান্না বালার সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব। তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী কিংবা প্রভাবশালী মহলের মুখপাত্র হয়ে সংবাদ পরিবেশন করেননি। পক্ষপাতহীন অবস্থান বজায় রেখে তিনি সব পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে অন্যায়, দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার দেখলে নির্ভীকভাবে সমালোচনাও করেছেন। সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি কখনো আপস করেননি। অর্থ, প্রভাব কিংবা পেশিশক্তির কাছে মাথানত না করার দৃঢ় মানসিকতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

ফরিদপুরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই তাঁকে সম্মানের চোখে দেখেন। কারণ তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে সংবাদকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা মানে দায়িত্ববোধ, জবাবদিহিতা ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকার। তিনি বিশ্বাস করেন, সাংবাদিক যদি সত্যের পথে অবিচল না থাকেন, তাহলে সমাজে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে।

তাঁর সহকর্মীরা বলেন, পান্না বালা শুধু একজন সাংবাদিক নন, তিনি নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তরুণ সাংবাদিকদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও সহযোগিতার মনোভাব প্রশংসনীয়। অনেক তরুণ সাংবাদিক তাঁর কাছ থেকে সংবাদ লেখার কৌশল, তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব এবং পেশাগত নৈতিকতা সম্পর্কে শিখেছেন। তিনি নিয়মিত নবীনদের পরামর্শ দেন, ভুল ধরিয়ে দেন এবং ভালো কাজের জন্য উৎসাহিত করেন। ফলে ফরিদপুরের সাংবাদিক সমাজে তিনি একজন অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।

জেলার প্রতিটি উপজেলার সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কোনো সাংবাদিক সমস্যায় পড়লে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। সাংবাদিক সংগঠনের অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা কিংবা পেশাগত যেকোনো আয়োজনে তাঁকে প্রায়ই দেখা যায়। এসব অনুষ্ঠানে তিনি সাংবাদিকতার নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করেন। বয়স বাড়লেও তাঁর কর্মস্পৃহা ও প্রাণচাঞ্চল্য একটুও কমেনি।

সত্য কথা বলার কারণে জীবনে নানা প্রতিকূলতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও সাহসী সংবাদ প্রকাশের কারণে একাধিকবার প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েছেন। হামলা, হুমকি ও চাপের শিকারও হয়েছেন। কিন্তু কখনো কলম থামিয়ে দেননি। বরং আরও দৃঢ়ভাবে সত্য প্রকাশের কাজ চালিয়ে গেছেন। তাঁর মতে, একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সততা ও সাহস। এই দুটি গুণ হারিয়ে গেলে সাংবাদিকতা কেবল পেশা হয়ে দাঁড়ায়, সমাজের জন্য আর কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।

ব্যক্তিজীবনেও তিনি অত্যন্ত সাদামাটা ও বিনয়ী। বনেদি পরিবারের সন্তান হয়েও কখনো অহংকার তাঁকে স্পর্শ করেনি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। তাঁর সঙ্গে কথা বললে বোঝার উপায় নেই যে তিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্রের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। সবসময় হাসিমুখে কথা বলেন, আন্তরিক আচরণ করেন এবং মানুষের কথা মন দিয়ে শোনেন। তবে ভুল তথ্য, মিথ্যাচার কিংবা অন্যায় দেখলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করেন। এই স্পষ্টবাদী মনোভাবই তাঁকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

পান্না বালা মনে করেন, সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের পক্ষে কথা বলা। তাঁর ভাষায়, “সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সৎ সাহস থাকতে হবে। জনগণের অধিকার, কষ্ট আর বঞ্চনার কথা তুলে ধরতে হবে। ক্ষমতাসীনদের ভুলত্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়াই সাংবাদিকতার দায়িত্ব। কারো পক্ষ নিয়ে তোষামোদ করা সাংবাদিকতা নয়।”

তিনি আরও বিশ্বাস করেন, গণমাধ্যম সমাজের আয়না। সেই আয়নায় যদি বিকৃতি দেখা যায়, তাহলে পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সাংবাদিকদের সততা, নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সময়ে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে তথ্যের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে গুজব ও অপতথ্যের ঝুঁকিও। এ পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।

দীর্ঘ চার দশকের সাংবাদিকতা জীবনে পান্না বালা শুধু সংবাদ পরিবেশন করেননি; তিনি সমাজকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। মানুষের কান্না, বেদনা, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার গল্প তিনি তুলে ধরেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। তাঁর সংবাদে যেমন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তেমনি ছিল মানবিকতার স্পর্শ। এ কারণেই তিনি পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য এবং সহকর্মীদের কাছে অনুপ্রেরণার নাম।

ফরিদপুরের সাংবাদিকতা অঙ্গনে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। নতুন প্রজন্ম যখন সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও আদর্শ নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়, তখন পান্না বালার মতো ব্যক্তিত্বরা পথ দেখান। তিনি প্রমাণ করেছেন, সততা ও পেশাদারিত্ব ধরে রেখেও দীর্ঘদিন সম্মানের সঙ্গে সাংবাদিকতা করা সম্ভব।

সময়ের পরিক্রমায় প্রযুক্তি বদলেছে, সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি পান্না বালার আদর্শ। এখনও তিনি একই নিষ্ঠা, সততা ও সাহস নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সংবাদপত্রের পাতা, ল্যাপটপের কিবোর্ড আর মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতা যেন তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। সাংবাদিকতা তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, এটি এক ধরনের দায়বদ্ধতা, এক ধরনের জীবনদর্শন।

ফরিদপুরের মানুষ তাই তাঁকে শুধু একজন সাংবাদিক হিসেবে নয়, একজন সৎ, সাহসী ও মানবিক মানুষ হিসেবেও মূল্যায়ন করেন। তাঁর মতো সাংবাদিকরা থাকেন বলেই গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা এই মানুষটির জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

লেখক: হারুন-অর-রশীদ, সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

অতিরিক্ত চিন্তা বন্ধ করার সহজ ১৪ উপায়

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:১৮ পূর্বাহ্ণ
অতিরিক্ত চিন্তা বন্ধ করার সহজ ১৪ উপায়

রাতের নিস্তব্ধতায় যখন চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, তখনো কি আপনার মাথার ভেতর অজস্র অপ্রয়োজনীয় ভাবনার ঝড় থামে না? ‘আগামীকালের মিটিংয়ে কোনো ভুল হবে না তো?’, কিংবা ‘গতকালের সেই কথাটি কি বলা ঠিক হয়েছিল?’—এমন শত শত অনিশ্চিত ও কাল্পনিক দুশ্চিন্তার চক্রে জড়িয়ে পড়ার নামই মনস্তত্ত্বের ভাষায় ‘ওভারথিংকিং’ বা অতিরিক্ত চিন্তা।

দৈনন্দিন জীবনের নানাবিধ মানসিক চাপ ও ব্যস্ততার ভিড়ে এটি কেবল ক্ষণিক মেজাজ খারাপের কারণ হয় না; বরং অবিরত একই নেতিবাচক ভাবনার চাকা ঘুরতে থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক জীবনধারা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সংবাদ মাধ্যম হেলথলাইন-এ প্রকাশিত এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. বেখানি জুবি’র চিকিৎসাগত পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, মনের এই অবিরত শোরগোল থামিয়ে শান্ত ও সুনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করা মোটেও কঠিন নয়।

হেলথলাইনের উক্ত প্রতিবেদনে সুপারিশকৃত অতিরিক্ত চিন্তা কমানোর ১৪টি পেশাদার ও বৈজ্ঞানিক কৌশল নিচে পাঠকদের জন্য সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরা হলো:

১. নিজের ভাবনার প্রতি সচেতনতা

যখনই মন একই জায়গায় বারবার আটকে যাচ্ছে বলে মনে হবে, তখন থামুন এবং নিজের অনুভূতির দিকে নজর দিন। চিন্তাটি আপনাকে উদ্বিগ্ন, বিরক্ত নাকি অপরাধবোধে ফেলছে এবং এর মূল কারণ কী—তা চিহ্নিত করাই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।

২. পছন্দের কাজে মনোযোগ ঘোড়ানো

চিন্তার ক্ষতিকর বৃত্ত ভাঙতে প্রিয় কোনো কাজে যুক্ত হন। নতুন কোনো রান্নার রেসিপি চেষ্টা করা, পছন্দের ব্যায়াম ক্লাসে অংশ নেওয়া, ছবি আঁকার মতো নতুন শখ গড়ে তোলা কিংবা স্বেচ্ছাসেবী কাজে অংশ নেওয়া মনের গতিপথ বদলে দেয়।

৩. গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম

তীব্র দুশ্চিন্তায় মন ছটফট করলে চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে নাকে শ্বাস নিন ও ছাড়ুন। প্রতিদিন অন্তত ৩ বার ৫ মিনিট করে বুক ও পেটের ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করে শ্বাস নেওয়ার এই চর্চা স্নায়ুকে শান্ত করে।

৪. নিয়মিত মেডিটেশন বা ধ্যান

প্রতিদিন মাত্র ৫ মিনিট নিস্তব্ধ জায়গায় বসে মেডিটেশন করা মানসিক অস্থিরতা দূর করতে গবেষণাসিদ্ধ একটি উপায়। যেকোনো সাধারণ ধ্যান পদ্ধতি বেছে নিয়ে নিয়মিত চর্চা করলে মনের অপ্রয়োজনীয় কোলাহল দূর হয়।

৫. সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি রাখা

যে বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত, আগামী ৫ বা ১০ বছর পর আপনার জীবনে তার কতটুকু প্রভাব থাকবে—তা ভেবে দেখুন। তুচ্ছ ছোটখাটো বিষয় এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোতে নজর দিলে অনর্থক দুশ্চিন্তা কমে আসে।

৬. অন্যের উপকারে এগিয়ে আসা

নিজের নেতিবাচক ভাবনার জগৎ থেকে বের হওয়ার সেরা উপায় হলো অন্যকে সাহায্য করা। বিপদগ্রস্ত বন্ধুকে সময় দেওয়া বা অসুস্থ প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে নিজের মনে ইতিবাচক অনুভূতির জন্ম হয়।

৭. স্বয়ংক্রিয় নেতিবাচক চিন্তা প্রতিরোধ

ভয় বা রাগ থেকে জন্ম নেওয়া স্বয়ংক্রিয় নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে খাতায় লিখে ফেলুন। কেন এমন চিন্তা আসছে তা বিশ্লেষণ করে ‘আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি’—এ জাতীয় যুক্তি দিয়ে মনকে পুনর্গঠিত করুন।

৮. ছোট সাফল্যগুলো উদ্যাপন করা

অতিরিক্ত চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকলে নিজের অর্জনের কথা ভুলে যাওয়া সহজ। প্রতি সপ্তাহে আপনার ভূমিকা ছিল এমন অন্তত ৫টি ছোট ইতিবাচক অর্জনের তালিকা করুন; যেমন—বাজেট মেনে চলা বা ঘর পরিষ্কার করা।

৯. বর্তমান মুহূর্তে বেঁচে থাকা

অতীতের ভুল বা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে না ভেবে বর্তমানে মনোযোগ দিন। দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় মোবাইল/কম্পিউটার বন্ধ রাখা, মনোযোগ দিয়ে খাবারের স্বাদ উপভোগ করা কিংবা প্রকৃতির মাঝে হাঁটা আপনাকে বর্তমানে ধরে রাখতে সাহায্য করবে।

১০. বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা

পরিস্থিতিকে কেবল নিজের চশমা দিয়ে না দেখে অন্য কারো অবস্থান থেকে ভেবে দেখুন। আপনার মনের দুশ্চিন্তাগুলোর আদৌ কোনো বাস্তব প্রমাণ আছে কি না, তা ঠাণ্ডা মাথায় যাচাই করুন।

১১. বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া

কেবল মনে মনে একই চিন্তা বারবার না ঘুরিয়ে সমস্যার সমাধানের জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করুন এবং সে অনুযায়ী কাজ শুরু করুন।

১২. নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া

অতীতের ভুলের জন্য নিজেকে অপরাধী মনে করা বন্ধ করুন। ‘আমি যেমন, নিজেকে সেভাবেই গ্রহণ করছি’—এ জাতীয় ইতিবাচক ও স্বান্তনাদায়ক বাক্যের মাধ্যমে নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হন।

১৩. অনিশ্চয়তা ও ভয়কে মেনে নেওয়া

জীবনের সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না—এই সত্যকে স্বীকার করে নেওয়া মানসিক শান্তির মূল চাবিকাঠি। গবেষণায় দেখা গেছে, নেতিবাচক চিন্তা ও ভয়কে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতা বৃদ্ধি করে।

১৪. বিশেষজ্ঞ বা প্রিয়জনের সাহায্য নেওয়া

একাকী চিন্তার তোড় সামলাতে না পারলে বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের সদস্য কিংবা পেশাদার থেরাপিস্টের সাহায্য নিন।

ফরিদপুরে জোড়া খুন: তথ্যপ্রযুক্তির জালে ধরা পড়ল আসামি মারুফ

মো. ইকবাল হোসেন, আলফাডাঙ্গা:
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৪২ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে জোড়া খুন: তথ্যপ্রযুক্তির জালে ধরা পড়ল আসামি মারুফ

Oplus_131072

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় বহুল আলোচিত চা-দোকানি রবিউল শেখ ওরফে পাইচো হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ১৫ নম্বর আসামি মারুফ শেখকে (৫৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

​রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তাকে ফরিদপুরের বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে শনিবার গভীর রাতে যশোরের কোতোয়ালি থানা এলাকা থেকে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

​গ্রেপ্তার মারুফ শেখ আলফাডাঙ্গা উপজেলার বড়ভাগ গ্রামের মৃত জান্নাত শেখের ছেলে।

​মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে কাশিয়ানী-আলফাডাঙ্গা সড়কের মালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তর পাশে রবিউল শেখের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়।

​নিহত রবিউল শেখ গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা সদর বাজারে চা বিক্রি করতেন। ঘটনার রাতে দোকান বন্ধ করে বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের ছেলে হোসাইন শেখের নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান রবিউল। হামলায় তার সঙ্গে থাকা আরও তিনজন গুরুতর আহত হন।

​হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর নিহতের ভাতিজা নাজমুল শেখ বাদী হয়ে ২৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ২০-২৫ জনকে আসামি করে আলফাডাঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করেন।

​স্থানীয়রা জানান, বড়ভাগ গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুটি পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। এই বিরোধের জের ধরে গত ২৬ জুন সুমন শেখ (৩০) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত রবিউল শেখ ছিলেন সুমন শেখের চাচা। সুমন হত্যা মামলার আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে সাত সপ্তাহের জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই রবিউলকে হত্যা করা হয়।

​আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল সারোয়ার জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় রবিউল হত্যা মামলার ১৫ নম্বর আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ফরিদপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৩৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন

নারী ও শিশু নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ ও বলাৎকার বন্ধের দাবিতে ফরিদপুরে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

​রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় ফরিদপুর পৌরসভার বেলতলায় জেলা খেলাঘর ও নবীন সাথী খেলাঘর আসরের যৌথ উদ্যোগে এ প্রতিবাদী মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।

​জেলা খেলাঘরের সভাপতি আলতাফ হোসেনের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তারা দেশে ক্রমাগত নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

​বক্তারা বলেন, শিশু ও নারীদের ওপর একের পর এক বর্বর হামলা ও নির্যাতন সমাজের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবিলম্বে এসব অপরাধ বন্ধে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তারা।

​মানববন্ধনে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।