আক্কেল দাঁত কেন ওঠে, উঠলেই কেন এত ব্যথা জমে?
মানুষের প্রায় সব দাঁত কৈশোরের মাঝেই উঠে যায়, তবে মুখের একেবারে পেছনের পেষণ দাঁতগুলো ওঠে সবার শেষে, যখন একজন মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে পা বাড়ায়। বয়সের সঙ্গে মানুষের বুদ্ধি ও বিচারবোধ পরিণত হয়—এমন লোকবিশ্বাস থেকেই বাংলায় এই দাঁতের প্রচলিত নাম দেওয়া হয়েছে ‘আক্কেল দাঁত’। একই কারণে ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘উইজডম টুথ’ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘থার্ড মোলার’ বা তৃতীয় পেষণ দাঁত।
তবে সবার ক্ষেত্রে এই দাঁত যেমন ওঠে না, তেমনি যাদের ওঠে তাদের কারও কারও জন্য তা হয়ে ওঠে তীব্র ব্যথা ও চরম ভোগান্তির কারণ। কেন এত দেরিতে ওঠে এই দাঁত, আর উঠলেই বা কেন এত যন্ত্রণা জমে— এসব বিষয় নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।
নামের নেপথ্যে ‘আক্কেল’ ও উঠার বয়স
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত ৩২টি দাঁত থাকে। এর মধ্যে মুখের ওপর ও নিচের চোয়ালের দুই পাশের শেষে প্রতিটি কোণায় একটি করে সর্বোচ্চ চারটি আক্কেল দাঁত থাকতে পারে, তবে সবার চারটি আক্কেল দাঁত থাকে না। কারও একটি, দুটি বা তিনটি থাকতে পারে, আবার কারও একটিও না-ও থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় আট জনের ক্ষেত্রে অন্তত একটি আক্কেল দাঁত গজায়ই না।
যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত ১৭ থেকে ২১ বছর বয়সের মধ্যে আক্কেল দাঁত উঠতে শুরু করে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) জানায়, সাধারণত কৈশোরের শেষভাগ থেকে ২৫ বছর বয়সের মাঝে এই দাঁত বের হয়; তবে এর চেয়ে বেশি বয়সেও তা উঠতে পারে।
আক্কেল দাঁত কেন থাকে?
আক্কেল দাঁত যদি মাড়ির সঠিক অবস্থানে ওঠে, তবে তা মুখের পেছনের অংশে সমর্থন দিতে পারে এবং চোয়ালের হাড় সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে। তবে বর্তমানে অধিকাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এগুলোকে মানবদেহের একটি ‘অবশিষ্টাঙ্গ’ বা অপ্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক জানায়, আমাদের আদিম পূর্বপুরুষদের খাদ্যতালিকায় থাকা কাঁচা উদ্ভিদ, শক্ত বাদাম এবং শক্ত ও আঁশযুক্ত মাংস চিবানোর জন্য আক্কেল দাঁত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু আধুনিক রান্নাবান্না ও খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে এখন আর এই দাঁতের প্রয়োজন পড়ে না। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে বিবর্তনগত মানিয়ে নিতে গিয়ে মানুষের চোয়ালের আকারও আগের চেয়ে ছোট হয়ে গেছে, যার ফলে আধুনিক মানুষের মুখে চারটে আক্কেল দাঁত উঠার পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না।
উঠলেই কেন এত ব্যথা ও যন্ত্রণা জমে?
আক্কেল দাঁত অন্য দাঁতের মতো স্বাভাবিকভাবে ও পর্যাপ্ত জায়গা নিয়ে উঠলে সাধারণত বড় কোনো সমস্যা হয় না। মূল সমস্যাটি তৈরি হয় মূলত জায়গার অভাবে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় এটি মাড়ির শেষে সোজা না উঠে পাশের দাঁতের দিকে হেলে যেতে পারে অথবা মাড়ি কিংবা চোয়ালের হাড়ের নিচে আংশিক বা পুরোপুরি আটকে থাকতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইমপ্যাক্টেড উইজডম টুথ’ বা আটকে থাকা আক্কেল দাঁত।
দাঁতটি আংশিক বের হলে তার ওপর মাড়ির একটি অংশ থেকে যায়, যেখানে সহজে খাবারের কণা ও ব্যাকটেরিয়া জমতে পারে। এতে দাঁতের চারপাশের মাড়িতে প্রদাহ বা সংক্রমণ দেখা দেয়, যাকে বলা হয় ‘পেরিকোরোনাইটিস’। এছাড়া আংশিক বের হওয়া দাঁতের আশপাশে তরল জমে সিস্ট কিংবা পুঁজ (অ্যাবসেস) জমে মাড়ি ফুলে যাওয়া ও মুখ খুলতে কষ্ট হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকের মতে, ইমপ্যাক্টেড দাঁত পাশের সুস্থ দাঁতেরও ক্ষতি করতে পারে।
ঢাকার দন্ত চিকিৎসক ডা. এ. কে. এম. হাসানুজজামান বিবিসিকে জানান, দাঁতের অবস্থান ভালো হলে এবং উঠার পর্যাপ্ত জায়গা থাকলে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে আক্কেল দাঁত স্বাভাবিকভাবে উঠে আসতে পারে, তবে এ সময়ে কয়েক মাস পরপর ব্যথা হতে পারে। তিনি সতর্ক করেন যে, মাড়ির সংক্রমণ দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করে ফেলে রাখলে বিরল ক্ষেত্রে তা মুখ ও গলার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে লুডউইগস অ্যাঞ্জাইনা নামক মারাত্মক রূপ নিতে পারে। এর ফলে শ্বাস নিতে বা খাবার খেতে সমস্যা হয় এবং গুরুতর অবস্থায় শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে।
ব্যথা হলেই কি দাঁত তুলে ফেলতে হবে?
আক্কেল দাঁতে ব্যথা হলেই তা সাথে সাথে তুলে ফেলতে হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, দাঁতটি কোনো সমস্যা তৈরি না করলে তুলে না ফেলে নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করাই যথেষ্ট। তবে বারবার মাড়িতে সংক্রমণ, তীব্র ব্যথা, দাঁত ক্ষয়, পাশের দাঁতের ক্ষতি বা সিস্টের সমস্যা থাকলে চিকিৎসক দাঁতটি তুলে ফেলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
সাধারণত দাঁত তোলার আগে মাড়িতে লোকাল অ্যানেসথেটিক ইনজেকশন দিয়ে জায়গাটি অবশ করে নেওয়া হয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকরা মাড়ি কেটে বা দাঁতটিকে দুই-তিন টুকরো করে বের করে আনেন এবং সেলাই দেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ হয় এবং এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী এতে ৪০ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী একই দিনেই বাড়ি ফিরতে পারেন।
দাঁত তোলার পরবর্তী যত্ন ও সতর্কতা
সাধারণত আক্কেল দাঁত তোলার পরদিন থেকেই স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে ফেরা যায়। তবে পুরোপুরি সেরে উঠতে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত কিছু ব্যথা, ফোলা ভাব বা মুখ খুলতে অস্বস্তি থাকতে পারে। দ্রুত সেরে উঠার জন্য এনএইচএস কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছে—
করণীয়: ব্যথা কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন সেবন করা, নরম বা তরল খাবার খাওয়া এবং কুসুম গরম লবণপানি দিয়ে আলতোভাবে কুলি করা। ক্ষতস্থানে জমাট বাঁধা রক্ত (ব্লাড ক্লট) ঘা শুকাতে সাহায্য করে, তাই সেই অংশ সাবধানে রাখতে হবে।
বর্জনীয়: শক্ত বা মচমচে খাবার এবং ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত, কারণ ধূমপান সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
সম্ভাব্য জটিলতা: ক্ষতস্থানের জমাট রক্ত সরে গেলে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয়, যাকে ‘ড্রাই সকেট’ বলে। এছাড়া সংক্রমণ কিংবা স্নায়ু সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঠোঁট, থুতনি বা জিহ্বায় অসাড় অনুভূতি দেখা দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

আপনার মতামত লিখুন
Array