“ওরে বুনে, বুনে রে… আমার বুনের এমন হওয়ার কথা ছিলো রে… ওরে বুনে রে..”
বারবার বুক চাপড়ে এভাবেই চিৎকার করে কাঁদছিলেন লাইজু আক্তার। পাশে কাঠের কফিনে শুয়ে আছে তার বড় বোন দিপালী আক্তারের নিথর দেহ। দীর্ঘ এক মাস অপেক্ষার পর বোনকে ফিরে পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু জীবিত নয়, সাদা কাফনে মোড়ানো নিথর দেহ হয়ে।
শুক্রবার (০৮ মে) সকালে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল পূর্ব শালেপুর মুন্সিরচর গ্রামে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যে দেখা যায়। লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত বাংলাদেশি নারী শ্রমিক দিপালী আক্তারের (৩৪) মরদেহ যখন গ্রামের বাড়ির উঠোনে পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
নিস্তব্ধ চরাঞ্চলের কাঁচা পথ। চারদিকে ভোরের শীতল হাওয়া। সেই নির্জন চরে ঘোড়ার গাড়িতে করে বয়ে আনা হচ্ছিল দিপালীর কফিন। ট্রলার থেকে নামিয়ে আদারচর ঘাট পেরিয়ে যখন মরদেহটি গ্রামের দিকে নেওয়া হচ্ছিল, তখন ঘোড়ার গাড়ির পাশে হাঁটছিলেন স্বজনরা। কারও চোখে পানি, কারও মুখে নীরবতা। শুধু ছোট বোন লাইজুর কান্না বারবার ভেঙে দিচ্ছিল সেই নিস্তব্ধতা।
“বুন রে… তুই তো বলছিলি আবার বাড়ি আসবি… এভাবে আসবি ক্যান রে বুন..”, কফিন লাশ, আর পাশেই কবর খুঁড়ার সময় এভাবে বিলাপ করছিলেন তিনি। উপস্থিত গ্রামবাসী, স্বজন, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের লোকজনের মধ্যে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ২০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দিপালীর মরদেহবাহী উড়োজাহাজ অবতরণ করে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাবা শেখ মুকা, বড় ভাই শেখ ওবায়দুল্লাহ ও ছোট বোন লাইজু আক্তার। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সরকারি ব্যবস্থাপনায় অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে রাতেই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তারা। রাত সাড়ে তিনটার দিকে পৌঁছান ঢাকার দোহার উপজেলার মৈনট ঘাটে। ভোর হওয়ার অপেক্ষার পর ট্রলারে করে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে চরভদ্রাসনের আদারচর ঘাটে পৌঁছানো হয়। এরপর শুরু হয় শেষ যাত্রার সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ, ঘোড়ার গাড়িতে করে নির্জন চর পেরিয়ে বাবার ভিটায় ফেরা।
সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বাড়ির উঠোনে পৌঁছায় দিপালীর মরদেহ। কফিন নামানোর সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা-বাবা, ভাই-বোন ও স্বজনরা। কেউ মাথায় হাত দিয়ে বিলাপ করছেন, কেউ কফিনে হাত রেখে নির্বাক দাঁড়িয়ে আছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দিপালী ছিলেন পরিবারের একমাত্র ভরসা। ছোটবেলা থেকেই অভাবের সংসারে বড় হয়েছেন তিনি। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে খুব অল্প বয়সেই বিদেশে পাড়ি জমান। লেবাননে গৃহকর্মীর কাজ করে বছরের পর বছর সংসারের হাল ধরেছিলেন। তার পাঠানো টাকায় চলত পুরো পরিবার।
ছোট বোন লাইজু আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার বোনটা নিজের সুখের কথা কখনো ভাবেনি। শুধু পরিবারের জন্য কষ্ট করেছে। এত বছর বিদেশে থেকেও বলত, ‘তোদের জন্যই সব করছি।’ আজ সেই বোনটাই লাশ হয়ে ফিরল।”
জানা গেছে, ২০১১ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে লেবাননে পাড়ি জমান দিপালী। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে তিনিই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গত ৮ এপ্রিল বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে রফিক হারিরি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। যুদ্ধাবস্থা ও আন্তর্জাতিক আনুষ্ঠানিকতার কারণে মরদেহ দেশে ফিরতে সময় লাগে প্রায় এক মাস।
শুক্রবার (৮ মে) সকাল ১০টায় নিজ বাড়িতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও শত শত গ্রামবাসী অংশ নেন। পরে সকাল ১১টার দিকে বাবার ভিটার পাশেই দাফন করা হয় দিপালীকে।
দাফনের সময়ও থামছিল না লাইজুর কান্না। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার বলছিলেন, “ওরে বুনে রে… তুই এত দূরে গিয়া আর ফিরলি না রে..”
যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবানন থেকে দিপালীর শেষ ফেরা যেন শুধু একটি মরদেহের প্রত্যাবর্তন নয়, এটি এক প্রবাসী নারীর অপূর্ণ স্বপ্ন, এক পরিবারের ভাঙা নির্ভরতা আর এক বোনের আজীবনের কান্নার গল্প হয়ে থাকবে ভবিষ্যতে।
আপনার মতামত লিখুন
Array