খুঁজুন
, ,

হরমুজ প্রণালি কীভাবে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ
হরমুজ প্রণালি কীভাবে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে?

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ৪০ দিনের সংঘর্ষের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়েছে। সেটি হলো, ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তার পারমাণবিক সক্ষমতা নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার ক্ষমতা।

সংঘাতের শুরুর সময় থেকে অনেকেই এই যুদ্ধকে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও নেতাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক বোমা হামলা চালানো হয়।

এর জবাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তবে সংঘাত বাড়তে থাকলে ইরান তাদের কৌশল বদলে ফেলে।

তারা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার দিকে মনোযোগ দেয়। হরমুজ প্রণালি হলো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ জলপথ, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে।

বিশ্বের বড় একটি অংশের তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। তাই এই প্রণালির ওপর দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হলে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বড় প্রভাব পড়ে।

ইরানের নতুন এই কৌশলের কারণে দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়।

কারণ তাদের অর্থনীতি নির্ভর করে এই প্রণালি দিয়ে অব্যাহতভাবে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ওপর।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কর্মকর্তারা বুঝেছেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে প্রচলিত সামরিক সংঘাতের চেয়ে বেশি কৌশলগত সুবিধা পাওয়া যাবে।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলে ওয়াশিংটনকে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে ইরান।

শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি আলোচনার শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর অগ্রাধিকার দিতে হয়েছে।

ইরান নিয়মিতভাবে হুমকি দিয়ে এসেছে যে, তাদের ওপর আক্রমণ হলে তারা এই প্রণালি বন্ধ করে দেবে। তবে এর আগে কখনোই এটি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি।

এমনকি ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়, যখন তেলবাহী জাহাজে হামলা হয়েছিল, তখনও এই প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি।

বর্তমানে ইরানের কিছু সামরিক কমান্ডার ও কর্মকর্তারা এই প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করছেন।

ইরানের পার্লামেন্ট বিশেষ করে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশন ইতোমধ্যে এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের একটি খসড়া প্রস্তাব দিয়েছে।

ইরানের এক পার্লামেন্ট সদস্য প্রস্তাব করেছেন, প্রতি তিন ব্যারেল তেলের জন্য এক ডলার করে চার্জ আরোপ করা যেতে পারে।

বিজয়ের চিত্র

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যুদ্ধবিরতির পর বিজয়ের একটি চিত্র তুলে ধরে।

কুয়েতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস থেকে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনিকে নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। যার শিরোনাম ছিলো, “যখন আল্লাহর সাহায্যে সফলতা ও বিজয় অর্জিত হয়”।

এটি ইরানের ভেতরে প্রচারিত সেই বার্তাকেই তুলে ধরে, যেখানে বলা হচ্ছে যে, দেশটি বিদেশি চাপকে সফলভাবে প্রতিরোধ করতে পেরেছে।

আইআরজিসি’র ঘনিষ্ঠ ফার্স নিউজ বলেছে, ইরানের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া, আর মার্কিন সেনা প্রত্যাহার কথা বলা আছে।

ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্টের মতে এই যুদ্ধবিরতি “খামেনির মতবাদের” বিজয়। এর মাধ্যমে মূলত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে বোঝানো হয়েছে, যিনি যুদ্ধের শুরুর দিকে নিহত হন।

একই সময়ে, সাবেক আইআরজিসি প্রধান ও ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি সতর্ক করে বলেন, ইরানি বাহিনী এখনো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছে এবং তাদের “আঙুল ট্রিগারে রয়েছে”। অর্থাৎ ইরানের সেনারা যেকোনো মুহূর্তে হামলার জন্য প্রস্তুত।

তবে বিজয়ের এই বয়ানের আড়ালে প্রকৃত বাস্তবতা অনেক বেশি ভঙ্গুর।

ইরানের সামরিক বাহিনী উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে, এবং দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকায় দেশটির অর্থনীতি আরও খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে।

সংঘাত চলাকালে অন্তত ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যাদের অনেকের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ ছিল এবং বেশ কয়েকজনকে জানুয়ারির দেশব্যাপী বিক্ষোভ থেকে আটক হয়েছিলো।

এই পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, দেশের ভেতরে ভিন্নমত নিয়ে সরকার গভীর উদ্বেগে রয়েছে, তাই তারা আবার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

শান্তি আলোচনার আগে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান দাবি। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন সহজ ছিল না বলেই মনে হচ্ছে।

বুধবার ইরান সতর্ক করে যে, রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের অনুমতি ছাড়া প্রণালি দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করবে, সেগুলোকে “লক্ষ্যবস্তু করা হবে এবং ধ্বংস করা হবে”।

পরে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই “অগ্রহণযোগ্য” প্রতিবেদনের বিষয়ে জেনেছেন, তবে তিনি বলেন, গোপনে বা ব্যক্তিগতভাবে যা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে এসব কথা মিলছে না।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ খাতিবজাদেহ বৃহস্পতিবার বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেন সবাই নিরাপদে চলাচল করতে পারে সেই “নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে” ইরান।

তিনি বলেন, এই প্রণালি হাজার বছর ধরে উন্মুক্ত ছিল, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়।

তবে তিনি বলেন, এই প্রণালি পুনরায় তখনই খুলে দেওয়া হবে, “যখন যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে এই আগ্রাসন বন্ধ করবে,” যা সম্ভবত লেবাননে ইসরায়েলের হামলার দিকে ইঙ্গিত করে।

খাতিবজাদে আরো বলেন, ইরান “আন্তর্জাতিক নীতি ও আন্তর্জাতিক আইন” মেনে চলবে, তবে তার মতে, এই প্রণালি আন্তর্জাতিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং নিরাপদ চলাচল “ইরান ও ওমানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে”।

প্রণালিটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন এবং জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যার লক্ষ্য বেসামরিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বিপজ্জনক নজির

তাহলে ইরান এখন পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে কী করতে পারে?

ইরানের পার্লামেন্টে প্রণালি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে প্রস্তাবটি তোলা হয়েছে, তাতে মোট নয়টি ধারা রয়েছে।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় বলা হয়েছে, “শত্রুপক্ষের জাহাজগুলোকে এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হবে না”।

বিকল্প হিসেবে, ইরান নিজেই জাহাজ চলাচলের সব সেবা দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

ইরান বলেছে, এই পথে জাহাজ চালাতে হলে কোম্পানিগুলোকে সেই বাবদ অর্থ ইরানের মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে, ইরানের কোনো একটি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রাখতে হবে, আর জাহাজগুলো কী ধরণের মালামাল বহন করছে তা জানাতে হবে।

এটি একটি অত্যন্ত জটিল প্রস্তাব এবং এখনো এ বিষয়ে ভোটগ্রহণ হয়নি।

যদি ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপ করে, তাহলে মূল প্রশ্ন হবে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা ও আঞ্চলিক মিত্ররা এই পদক্ষেপ মেনে নেবে কি না।

সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া বোঝা যাচ্ছে, এর বিরুদ্ধে অনেক বিরোধিতা থাকবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা মনে করে সমুদ্রে স্বাধীনভাবে চলাচল করা তাদের একটি মৌলিক নীতি।

তাই এমন কোনো শুল্ক আরোপ হলে সেটা একটা বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে বলে মনে করা হবে।

যদি ইরান এতে সফল হয়, তাহলে একে একটি বড় কৌশলগত এবং প্রতীকী বিজয় হিসেবে দেখা হবে, যা প্রমাণ করবে যে তারা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।

তবে এখানেও অনেক বড় ঝুঁকিও আছে। এ ধরনের পদক্ষেপ উল্টো ফল দিতে পারে।

এতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ, নেটোর সদস্য দেশ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো একজোট হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে এবং তারা ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত হয়ে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, এমনকি সামরিক পদক্ষেপও নিতে পারে।

সূত্র : বিবিসি

ফরিদপুরের মধুখালী প্রেস ক্লাবের উন্নয়নে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি এমপি হেলেন জেরিন খানের

মধুখালী প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরের মধুখালী প্রেস ক্লাবের উন্নয়নে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি এমপি হেলেন জেরিন খানের

ফরিদপুরের মধুখালী প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান।

শুক্রবার (১০ জুলাই) রাত ৮টায় মধুখালী প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনিরুজ্জামান মৃধা (মন্নু)।

সভা সঞ্চালনা করেন প্রেসক্লাবটির সাধারণ সম্পাদক মো. মেহেদী হোসেন পলাশ এবং সহ-সভাপতি মো. মতিয়ার রহমান মিয়া।

সভার শুরুতে প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক মো. মেহেদী হোসেন পলাশ। তিনি তাঁর বক্তব্যে প্রেস ক্লাবে যাতায়াতের রাস্তা নির্মাণ এবং প্রেস ক্লাবের সার্বিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার দাবি জানান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান বলেন, “আমি নিজে রাস্তার অবস্থা দেখেছি। রাস্তা নির্মাণে যা যা প্রয়োজন, তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। পাশাপাশি মধুখালী প্রেস ক্লাবের উন্নয়নেও আমি কাজ করব।”

এ সময় উপস্থিত ছিলেন- মধুখালী প্রেসক্লাবের উপদেষ্টা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ সতেজ, মো. হায়দার আলী মোল্লা, মো. আব্দুল আলিম মানিক, মো. ইয়াসিন বিশ্বাস, মো. মোক্তার হোসেন, মো. তারিকুল ইসলাম এনামুল, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান, দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি কে এম রাকিবুল ইসলাম রিপনসহ প্রেস ক্লাবের সদস্যবৃন্দ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নীরব প্রহরী জাকির, ৩৭ বছর পরও টাকার অভাবে ধুকছে চিকিৎসা

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নীরব প্রহরী জাকির, ৩৭ বছর পরও টাকার অভাবে ধুকছে চিকিৎসা

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নতুন ভবনের করিডোরে প্রতিদিনের মতোই ধীর পায়ে হাঁটেন মো. জাকির হোসেন। কারও হাতে এক কাপ চা তুলে দেন, কারও জন্য দরজা খুলে দেন, আবার কখনো কোনো সাংবাদিকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে দেন, চা খাওয়ান। সংবাদ শিরোনামে যাদের নাম উঠে আসে, তাদের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটির নাম খুব কম মানুষই জানেন। অথচ এই প্রেসক্লাবের প্রতিটি ইট, প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি কক্ষ যেন তার জীবনেরই অংশ।

মো. জাকির হোসেনের জন্ম ১৯৭৯ সালের ২৯ মে, ফরিদপুর শহরের মধ্য আলীপুর মহল্লায়। বাবা শেখ আব্দুর রহমান ছিলেন একজন নাইটগার্ড। অল্প আয়ের সেই চাকরিতে সংসার চলত কষ্টে। মা ফাতেমা বেগম ছিলেন গৃহিণী। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেই বড় হয়েছেন জাকির। ফরিদপুরের বাখুন্ডা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু দারিদ্র্য তার বই-খাতা কেড়ে নেয়। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে স্কুলের বেঞ্চ ছেড়ে জীবিকার পথে নামতে বাধ্য করে।

মাত্র দশ বছর বয়সে, ১৯৮৯ সালে, তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তমিজউদ্দীন তাজের হাত ধরে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে পিয়ন হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেই যে শুরু, তারপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে তিন দশক। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, প্রেসক্লাবের ভবন বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি জাকিরের দায়িত্ববোধ।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অসংখ্য সাংবাদিকের উত্থান-পতন দেখেছেন। অনেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব নিতে দেখেছেন, আবার তাদের চিরবিদায়ও প্রত্যক্ষ করেছেন। সভাপতি সৈয়দ ইমামুল আজম আব্দুর রব, শেখ মো. দেলোয়ার হোসেন, জগদীশ চন্দ্র ঘোষ, আব্দুল আলী শিকদার—আজ তারা আর নেই। সাধারণ সম্পাদক মন্টু দাস গোপী, ইউসুফ রেজা মন্টু, আ.জ.ম. আমীর আলী, আলী আশরাফ মো. শোয়াইব ও আরিফ ইসলামও চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আরও কত সদস্য, কত পরিচিত মুখ—এক এক করে হারিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি।

এসব কথা বলতে বলতে জাকিরের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে। তিনি বলেন, “এই প্রেসক্লাবটাই আমার জীবন। এখানে আমার যৌবন কেটেছে, হাসি-কান্না কেটেছে। প্রতিটি দেয়ালে আমার স্মৃতি লেগে আছে।”

জাকিরের ব্যক্তিগত জীবনও সংগ্রামের গল্পে ভরা। স্ত্রী লিপি বেগম একজন গৃহিণী। অল্প আয়ে সংসার সামলাতে গিয়ে প্রতিটি দিনই তাদের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ। এক ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষ করেছেন অক্লান্ত পরিশ্রমে। ছেলে আজিম হোসেন ২০২৪ সালে ফরিদপুরের সরকারি ইয়াছিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে জীবিকার তাগিদে হামিম গ্রুপের একটি গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছেন। মেয়ে মোসা. হাফছার বিয়ে হয়েছে কাপড় তৈরির মেশিনচালক আরিফের সঙ্গে। নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন জাকির।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর যেন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং কোমরের হাড় ক্ষয়ের মতো জটিল রোগে ভুগছেন তিনি। প্রতিদিন ওষুধ কিনতেই খরচ হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা। এই সামান্য টাকাও অনেক সময় জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসার আশায় মানুষের সহায়তায় ছয়-সাতবার ভারতে গিয়েছেন। কিছুদিন সুস্থ থাকলেও আবার ফিরে এসেছে অসুস্থতা। প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা, কিন্তু অর্থের অভাবে সেই চিকিৎসা এখন অধরাই রয়ে গেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, এত কষ্টের মধ্যেও তিনি কখনো কারও দরজায় গিয়ে হাত পাতেননি। নিজের অভাবকে হাসিমুখে আড়াল করে প্রতিদিন যথাসময়ে কর্মস্থলে হাজির হন। যারা তাকে চেনেন, তারা জানেন—জাকিরের মুখে অভিযোগের চেয়ে কৃতজ্ঞতার কথাই বেশি শোনা যায়।

২০২৬ সালের মে মাসে মায়ের মৃত্যুর পর যেন আরও একা হয়ে গেছেন তিনি। সংসারের দায়িত্ব, ওষুধের খরচ, পুরোনো দেনা—সব মিলিয়ে জীবন যেন আরও ভারী হয়েছে। তবুও দায়িত্ব পালনে তার কোনো ক্লান্তি নেই। কেউ প্রেসক্লাবে এলে এখনও আগের মতোই আন্তরিক হাসিতে অভ্যর্থনা জানান তিনি।

জাকির হোসেন কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নন। তিনি সংবাদপত্রের প্রথম পাতার মানুষও নন। কিন্তু সংবাদ তৈরির পেছনে যারা নিরলস শ্রম দিয়ে যান, তাদের একজন তিনি। সাংবাদিকদের ব্যস্ততার ভিড়ে হয়তো অনেকেই তাকে খেয়াল করেন না, কিন্তু প্রেসক্লাবের প্রতিটি দিন, প্রতিটি আয়োজন, প্রতিটি ব্যস্ত মুহূর্তে তার নীরব উপস্থিতি অপরিহার্য।

একটি প্রতিষ্ঠানে টানা প্রায় ৩৭ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা শুধু চাকরি নয়, এটি এক ধরনের ভালোবাসা, এক ধরনের আত্মনিবেদন। সেই ভালোবাসার মূল্য কি শুধু একটি সামান্য বেতন? একজন মানুষ, যিনি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য উৎসর্গ করেছেন, অসুস্থতার সময়ে কি তার পাশে দাঁড়ানো সমাজের দায়িত্ব নয়?

আজও জাকির হোসেনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন খুব সাধারণ—আরও একবার ভালো চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়ে বাঁচতে চান। তিনি বিলাসী জীবন চান না, বড় কোনো বাড়ি বা গাড়িও চান না। শুধু চান একটু স্বস্তিতে বেঁচে থাকার সুযোগ, যাতে প্রতিদিনের ওষুধের চিন্তা আর চিকিৎসার খরচের হিসাব তাকে তাড়া না করে।

হয়তো সমাজে এমন অনেক জাকির হোসেন আছেন, যারা নীরবে দায়িত্ব পালন করে যান, অথচ নিজেদের কষ্টের কথা কাউকে জানান না। তাদের গল্প খুব কমই আলোয় আসে। কিন্তু এমন মানুষেরাই আমাদের সমাজের নীরব ভিত্তি। তাদের ত্যাগ, সততা আর আত্মসম্মান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা পদবি বা সম্পদে নয়, বরং নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতায়।

জাকির হোসেন এখনও প্রতিদিন ফরিদপুর প্রেসক্লাবের দরজা খুলে দেন। হয়তো একদিন সেই দরজাই তার দীর্ঘ কর্মজীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে। কিন্তু তার আগে, একজন সংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এটাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব।

বিয়ের দুই মাস পর মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রাণ হারাল সালথার শোয়াইব

নুরুল ইসলাম নাহিদ, সালথা:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৯:০০ পূর্বাহ্ণ
বিয়ের দুই মাস পর মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রাণ হারাল সালথার শোয়াইব

নিজের অভাবী পরিবারকে স্বাবলম্বী করার জন্য বছর তিনেক আগে মালয়েশিয়ায় গিয়ে পাড়ি জমান মো. শোয়াইব বিশ্বাস (২৩) নামে এক যুবক। সেখানে গিয়ে দীর্ঘদিন একটি কোম্পানিতে কাজ করে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশে আসেন। দেশে এসে গত মাস দুয়েক আগে বিয়ে করেন।

তবে তার বিয়ের মেহেদীর রং শুকানোর আগেই জীবিকার তাগিদে ফের মালয়েশিয়ায় নিজের কর্মস্থলে গিয়ে চলে যান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- কর্মস্থলে কাজ করার সময় মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁর।

নিহত শোয়াইব বিশ্বাস ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মুরুটিয়া গ্রামের মো. শওকত বিশ্বাসের ছেলে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সেজো।

শনিবার (১০ জুলাই) সকালে শোয়াইবের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তার ভগ্নিপতি মো. তুহিন হাসান। এদিকে শোয়াইয়ের খবরে শোকে স্তব্দ হয়েছে পরিবার। এমন অবস্থায় দেশে লাশ আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে চেয়েছেন সরকারের সহযোগিতা।

নিহতের পরিবার জানান, জীবিকার তাগিদে ২০২৩ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে একটি কম্পানিতে কাজ শুরু করেন শোয়াইব। সেখানে কাজ শেষে চলতি বছরের এপ্রিলে ছুটিতে বাড়িতে আসেন। বাড়ি আসার পর গত দুই মাস আগে বিয়ে করেন তিনি। এরপর ছুটি শেষে গত ১ জুলাই মালয়েশিয়া চলে যায়। দেশটির জহুরবারু এলাকায় একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অধীনে বোম্ব ক্রেনের সাহায্যে নির্মাণাধীন ভবনে ফায়ার ফাইটারের পাইপ লাগানোর কাজ শুরু করেন। শুক্রবার সকালে কাজ করাকালীন বোম্বক্রেন চাপায় নিহত হন তিনি।

নিহতের ভগ্নিপতি তুহিন হাসান বলেন, শুক্রবার দুপুরে মালয়েশিয়ার ওই কোম্পানির দায়িত্বরত এক বাংলাদেশী আমাকে ফোন করে নিহতের বিষয়টি জানান৷ তাছাড়া ওই বাংলাদেশী ছবি ও ভিডিও পাঠিয়েছে, তাতে নির্মমভাবে মৃত্যুর বিষয় ফুটে উঠেছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে তার লাশ ফেরত পাঠানোর জন্য তিন সপ্তাহের সময় চেয়েছেন। তবে লাশটি দ্রুত দেশে আনার জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।

ফরিদপুর প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক মো. আশিক সিদ্দিকী বলেন, নিহত ব্যক্তি কোনো কোম্পানির অধীনে কাজ করে থাকলে তাঁরা দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে লাশ পাঠাতে পারবে৷ সেখান থেকে কোনো সহযোগিতার না পেলে নিহতের পরিবার আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। বৈধ কর্মী হয়ে থাকলে আমরা লাশ আনার ক্ষেত্রে দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করব।