বর্তমান যুদ্ধ কি কেয়ামতের লক্ষণ, কোরআন-হাদিস কী বলে?
বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, সংঘাত ও অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে মানুষের মনে এক ধরনের অজানা শঙ্কা ও প্রশ্ন জেগে উঠেছে, এই পরিস্থিতি কি কেয়ামতের পূর্বলক্ষণ? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আলোচনায় বারবার উঠে আসছে এই বিষয়টি।
কেউ কেউ মনে করছেন, এত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, রক্তপাত ও নৈতিক অবক্ষয় কেয়ামতের অতি নিকটবর্তী হওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। আবার অনেকেই এ বিষয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন—আসলেই ইসলাম কী বলে, কোরআন-হাদিসে এ বিষয়ে কী নির্দেশনা রয়েছে, আর বর্তমান যুদ্ধবিগ্রহকে কীভাবে দেখা উচিত?
এই প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখে কোরআন-হাদিসের আলোকে কেয়ামতের ধারণা, এর আলামতসমূহ এবং বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে এর সম্পর্ক কতটুকু—ইসলামি স্কলারদের কাছ থেকে তা জানার চেষ্টা করেছে ফরিদপুর প্রতিদিন।
কেয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার ঘোষণা
পবিত্র কোরআন আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগেই ঘোষণা করেছে যে, কেয়ামত নিকটবর্তী। মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘কেয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে।’ (সুরা আল-ক্বামার : ০১)
সিলেটের দারুল উলুম কানাইঘাট মাদ্রাসার নায়েবে শায়খুল হাদিস মাওলানা শামছুদ্দীন দুর্লভপুরী বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আঙুলের ইশারায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া ছিল কেয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার একটি বড় মোজেজা বা নিদর্শন। নবী কারীম (সা.) নিজের আবির্ভাব ও কেয়ামতের দূরত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেছেন যে, তাঁর আবির্ভাব এবং কেয়ামত এই দুটি ঘটনা দুটি আঙুলের মতো পাশাপাশি অবস্থান করছে; অর্থাৎ তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না এবং তাঁর পরের বড় ঘটনাই হবে কেয়ামত।
তিনি বলেন, সামাজে কোনো যুদ্ধ বা দুর্যোগ দেখা দিলেই অনেকে কেয়ামতের দিনক্ষণ গণনা শুরু করেন। কিন্তু কেয়ামতের নির্দিষ্ট সময় বা ইলম একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছেই আছে। নবী কারীম (সা.)-কে যখন কেয়ামত কবে হবে তা জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে, এ বিষয়ে প্রশ্নকর্তার চেয়ে উত্তরদাতা বেশি জানেন না।
কোরআন কেয়ামত নিকটবর্তী বলার পর আরও সাড়ে চৌদ্দশ বছর পার হয়ে গেছে; সামনে আরও কত বছর বাকি আছে, তা ২০ বছর হতে পারে কিংবা ২০০০ বছর- তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তাই চলমান যুদ্ধ দেখে ঘরবাড়ি ছেড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ ইসলামে নেই।
কেয়ামতের আলামতসমূহ
ইসলামি স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ তার ইউটিউব চ্যানেলে এক আলোচনায় বলেন, কেয়ামতের আলামত প্রধানত দুই প্রকার, বড় আলামত ও ছোট আলামত।
বড় আলামত : এগুলো কেয়ামতের ঠিক আগে প্রকাশ পাবে। যেমন—সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া (যার পর তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে), দাজ্জালের আবির্ভাব, ঈসা (আ.)-এর অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশ এবং বড় ধরনের কিছু ভূমিধস। হাদিসে এরকম ১০টি বড় আলামতের কথা বলা হয়েছে।
ছোট আলামত : এগুলো অনেক আগে থেকেই প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। যেমন—নবী (সা.)-এর নিজের আগমনই একটি আলামত। অন্যান্য ছোট আলামতের মধ্যে রয়েছে, সন্তান কর্তৃক মায়ের সাথে দাসীর মতো আচরণ করা, সমাজের নিচু স্তরের বা সাধারণ রাখালদের অট্টালিকার মালিক হয়ে যাওয়া এবং সময়ের বরকত চলে যাওয়া (অর্থাৎ সপ্তাহ যাবে দিনের মতো আর মাস যাবে সপ্তাহের মতো)। কোনো কোনো স্কলারের মতে কেয়ামতের ছোট আলামত প্রায় ১৩১টি।
প্রকৃত প্রস্তুতি কী হওয়া উচিত?
রাজধানীর জামিয়াতুল ইসলামিয়া বায়তুস সালামের সিনিয়র মুফতি আবদুর রহমান হোসাইনী বলেন, এক সাহাবি নবী কারীম (সা.)-কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কেয়ামত কবে হবে?’ উত্তরে নবীজি (সা.) তাকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কেয়ামতের জন্য তোমার প্রস্তুতি কী?’। সাহাবি উত্তর দিয়েছিলেন যে, তাঁর অনেক বেশি আমল না থাকলেও আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা আছে। নবীজি (সা.) তখন বলেছিলেন, ‘মানুষ পরকালে তার সাথেই থাকবে যাকে সে ভালোবাসে।’
সুতরাং, কেয়ামত কবে হবে সেই দিনক্ষণ না খুঁজে মুমিনের প্রধান কাজ হলো আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। কারণ প্রত্যেক মানুষের মৃত্যু মানেই তার ব্যক্তিগত কেয়ামত শুরু হয়ে যাওয়া। বিশ্বের পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবী নশ্বর, তাই সুন্নাহর পথে চলে নিজেকে সেই মহাপ্রলয়ের জন্য প্রস্তুত করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

আপনার মতামত লিখুন
Array