খুঁজুন
, ,

পবিত্র রমজানে পাপে জড়ালে কী ক্ষতি হয়? ইসলাম যা বলে

মাওলানা আবদুল হাকিম
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৭:৩৪ পূর্বাহ্ণ
পবিত্র রমজানে পাপে জড়ালে কী ক্ষতি হয়? ইসলাম যা বলে

জীবনের সব ধরনের পাপ থেকে পরিশুদ্ধতা অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ রমজান। পবিত্র এ মাসে মহান রবের ইবাদত-উপাসনায় আলোকিত হয় মুমিনের জীবন। সফল তো তারাই, যারা অতীতের পাপমোচন করাতে পারে অবারিত রহমত অর্জনের এ মাসে। তবে ব্যর্থ তারা, যারা রমজান মাস পেয়েও নিজের পাপমোচন করাতে পারে না।

রোজা রেখেও পাপে জড়ানোর পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। এদের ব্যাপারে স্বয়ং জিবরাইল (আ.) বদদোয়া করেছেন এবং নবী কারিম (সা.) রাহমাতুল্লিল আলামিন হয়েও ‘আমিন’ বলে সমর্থন জানিয়েছেন।

হাদিসে বর্ণিত আছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববীর মিম্বারের একেকটি সিঁড়িতে পা রাখার সময় ‘আমিন আমিন আমিন’ তিনবার বলেছিলেন। উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আজকে এমন একটি কাজ আপনি করলেন, যা কখনো করতে দেখিনি। এর কারণটা কী? আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, কী বিষয়ে? সাহাবায়ে কেরাম (রা.) বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি ‘আমিন আমিন আমিন’ তিনবার বললেন। তখন নবী কারিম (সা.) বললেন, আমি যখন মিম্বারের প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলাম, তখন জিবরাইল (আ.) বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেয়েও (তাদের খেদমত করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। তখন আমি তাকে সমর্থন করে বললাম ‘আমিন’ (হে আল্লাহ কবুল করো)। অতঃপর তিনি বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে রমজান পেয়েও নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না। আমি তাকে সমর্থন করে বললাম ‘আমিন’। হজরত জিবরাইল (আ.) আবারও বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক যার কাছে আমার নাম আলোচিত হলো অথচ সে আমার ওপর দরুদ পড়ল না। আমি তার বক্তব্যকে সমর্থন করে বললাম ‘আমিন’। (ইবনে হিব্বান: ৯০৮; আল-আদাবুল মুফরাদ: হাদিস ৬৪৬)

অথচ আমাদের যেন বিকার নেই। ভাবনা নেই। রমজান মাস পেয়েও লাগামহীন পাপে বিভোর অনেকে। বড় আক্ষেপের বিষয়, এ পবিত্র মাসেও ভেসে আসে গান-বাজনার আওয়াজ। কেউ কেউ প্রকাশ্যে পানাহার করে বেড়ায়। নামাজ-রোজার কথা ভুলে গিয়ে চলে খেলাধুলার প্রতিযোগিতা। অবসরতা কাটাতে কোথাও জমে ওঠে জুয়া ও আড্ডার আসর। এসব রমজানের পবিত্রতা ও মহত্ত্বকে ধ্বংস করে। কেউ দিনভর রোজা রাখে, আবার গিবত, পরনিন্দা ও মিথ্যা কথাসহ বিভিন্ন পাপ কাজেও লিপ্ত থাকে। এমন ব্যক্তির ভাগ্যে শুধু ক্ষুধাই জোটে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কত রোজাদার আছে, যাদের রোজার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। কত সালাত আদায়কারী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই জোটে না।’ (ইবনে মাজা: ১৬৯০)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও তদানুযায়ী আমল করা বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি: ১৯০৩)

পাপের উপসর্গ নিয়ে বেড়ে উঠেছে যার জীবন, অন্যায়ের প্রবণতা মিশে আছে রক্ত কণিকায়, পবিত্র রমজান মাসেও যে ব্যক্তি পাপ-পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারছে না—তার উচিত আল্লাহর কাছে বেশি বেশি প্রার্থনায় মনোনিবেশ করা। কেননা দোয়া হলো মুমিনের হাতিয়ার। যেভাবে আল্লাহ শারীরিক অসুস্থতা থেকে সুস্থ করেন, সেভাবেই তিনি আত্মার ব্যাধির প্রতিকার করেন। আল্লাহর দরবারে ঝরা অশ্রু, বৃথা যায় না কখনো। পাপের ভারে ন্যুব্জ বান্দা যখন আল্লাহকে ডাকে তখন তিনি সাড়া দেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ডাকো আমায়, সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির: ৬০)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘কে তিনি যিনি আর্তের ডাক শোনেন, যখন সে তাকে ডাকে এবং কে তার দুঃখ দূর করেন!’ (সুরা নামল: ৬২)। পাপের আঁধারে নিমজ্জিত ব্যক্তির পক্ষে রাতারাতি পাপমুক্ত হওয়া দুষ্কর, এর জন্য চাই ধৈর্য ও অবিরাম চেষ্টা। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে পরিচালিত হওয়ার চেষ্টা করে, আল্লাহ তার পথ খুলে দেন। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনকাবুত: ৬৯)

পাপের আনন্দ শেষ হয়ে থেকে যায় এর অশুভ পরিণাম। ইবাদতের কষ্ট শেষ হয়ে থেকে যায় এর শুভ পরিণাম। তাই পাপের শাস্তি ও এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে চিন্তার মাধ্যমে পাপমুক্ত হওয়া সহজ। আখেরাতের অপেক্ষমাণ কঠিন আজাব ছাড়াও এ পৃথিবীতে পাপের নগদ শাস্তি হলো—দুঃখ, দুর্দশা, অশান্তি, অস্থিরতা ও হতাশা। এ ছাড়া পাপের কারণে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার দূরত্ব তৈরি হয়; পাপী ব্যক্তি থেকে তার রহমতের দৃষ্টি উঠে যায়। তারা বিপদাপদ ও বিপর্যয়ে আপতিত হয়, দুরারোগ্য রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয় এবং রুজিরোজগারের সংকটে জর্জরিত হয়। গুনাহ যেমনভাবে মানুষের শারীরিক কষ্ট ও শাস্তির কারণ, তেমনিভাবে তা আত্মিক রোগব্যাধিরও কারণ। কারও থেকে একটি গুনাহ সংঘটিত হলে সেটি আরেকটি গুনাহতে লিপ্ত হওয়ার কারণ হয়। হাফেজ ইবনুল কাইয়্যুম (রহ.) বলেন, গুনাহের একটি নগদ শাস্তি হলো, এর দ্বারা সে আরেকটি গুনাহের শিকার হয়। অনুরূপভাবে নেক কাজের একটি নগদ পুরস্কার হলো, একটি নেক কাজ আরেকটি নেক কাজের দিকে টেনে নেয়। (মায়ারেফুল কোরআন: ৭/৭০১)।

রমজানে অভিশাপ্ত শয়তানকে বন্দি করে রাখা হলেও প্রত্যেকের সঙ্গে ‘নফসে আম্মারা’ কিন্তু ঠিকই রয়েছে, যা মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয় এবং কুপ্রবৃত্তির প্রতি আহ্বান করে। তাই সব ধরনের গুনাহের উপকরণ থেকে দূরে থাকতে হবে, বিশেষত দৃষ্টি হেফাজত করতে হবে।

রমজান সংযমের মাস, সাধনার মাস, ত্যাগের মাস। কিন্তু আমরা রমজানের এ বার্তাকে ভুলে গিয়ে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিদের অনুসৃত পথ পরিহার করে সেহরি ও ইফতারে এতটাই ভোজনবিলাসী হয়ে উঠি—যা রমজানের সংযম, সাধনা ও ত্যাগের বার্তাকে ভুলিয়ে দেয়। ফলে আমাদের কুপ্রবৃত্তি দুর্বল না হয়ে আরও হিংস্র ও পাশবিক হয়ে ওঠে। কাম, লিপ্সা, মোহ আরও বেড়ে যায়। সুকুমারবৃত্তিগুলো বিকশিত না হয়ে আরও নিস্তেজ হয়ে যায়।

রমজানে গুনাহ থেকে বাঁচতে হলে অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করে সৎ সঙ্গ গ্রহণ করতে হবে। কেননা মানুষ পাপ কাজে অসৎ সঙ্গীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই পাপ থেকে বেঁচে থাকতে সৎ ও ভালো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত। মহানবী (সা.) ভালো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘তুমি মুমিন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও সঙ্গী হবে না এবং তোমার খাদ্য যেন পরহেজগার লোকে খায়।’ (আবু দাউদ: ৪৮৩২)।

আমাদের সবার মনে সর্বদা এ চেতনা জাগ্রত রাখতে হবে—প্রতিমুহূর্তে আমরা যা করছি আল্লাহতায়ালা তা দেখছেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখেন।’ (সুরা হুজরাত: ১৮)। আর এভাবে আল্লাহর ধ্যান দিলে জাগরূক রাখতে পারলেই পাপমুক্ত জীবনযাপন সম্ভব। তখন কেউ কারও ওপর জুলুম করবে না, একে অন্যের হক নষ্ট করবে না। আল্লাহতায়ালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করবে না এবং যাবতীয় অন্যায়-অপরাধ ও পাপাচারে লিপ্ত হবে না। এরই নাম তাকওয়া। রহমতের এ বসন্তকালে আসুন আমরা খোদাভীতি অর্জন করি এবং নিজেদের পাপকর্মের জন্য খাঁটি মনে তওবা করে ভবিষ্যতেও যাবতীয় পাপকর্ম থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করে একটি পুণ্যময় রমজান কাটাই। তবেই অনিন্দ্য সুন্দর হবে আমাদের ইহকাল-পরকাল।

লেখক: ইমাম ও খতিব

 

মধুমতির পেটে আশ্রয়ণের ঘর: নদীতীরে ঝুপড়িতে মাখন-হাসিনাদের মানবেতর জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর ও আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
মধুমতির পেটে আশ্রয়ণের ঘর: নদীতীরে ঝুপড়িতে মাখন-হাসিনাদের মানবেতর জীবন

দূর থেকে দেখলে মনে হবে ফেলে রাখা কোনো পরিত্যক্ত কুঁড়েঘর। কিন্তু কাছে পৌঁছাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে রূঢ় বাস্তবতা। ঝুপড়ির ভেতরে মানুষের হাঁসফাঁস লড়াই, টিকে থাকার আকুতি। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের চাপুলিয়া আশ্রায়ণ প্রকল্পে মধুমতি নদীর পাড়ে এখন এমনই এক করুণ চিত্র। নদীভাঙনে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে নদীতীরেই ঝুপড়ি বেঁধে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন নিঃস্ব দুটি পরিবার।

​চাপুলিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পটি মধুমতি নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর বাসিন্দাদের অধিকাংশ অন্যত্র চলে গেছেন। কিন্তু আশ্রয় খোঁজার সামর্থ্য না থাকায় নদীপাড়েই পলিথিন ও ছন দিয়ে তৈরি ছোট ঝুপড়িতে স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন দিনমজুর মাখন রবি দাস।

​হতাশা আর কষ্টের কথা জানাতে গিয়ে মাখন রবি দাস বলেন, “একসময় আলফাডাঙ্গা বারাশিয়া নদীর শ্মশান ঘাটে থাকতাম। পরে ২০১২ সালে সরকার এইখানে থাকার জায়গা দেয়। ভালোই চলছিল দিন। কিন্তু এক সপ্তাহ আগে আমাদের ঘরটা নদীতে চলে গেল! এই দুনিয়ায় আমার আর কোনো জায়গা নেই। তাই পরিবার নিয়ে নদীর পাড়েই রাত কাটাচ্ছি।”

​পাশে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে তাঁর স্ত্রী রিতা দাস বলেন, “অন্যের বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিই। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না, মনে হয় এই বুঝি নদীতে ভেসে গেলাম!”

​একই চিত্র ধরা পড়ে পাশের চাপুলিয়া গুচ্ছগ্রাম এলাকাতেও। ভাঙনের মুখে পড়ে সবাই সরে গেলেও অসুস্থ স্বামী, বৃদ্ধা মা ও চার সন্তানকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে সামান্য ছাউনি টাঙিয়ে দিন পার করছেন হাসিনা বেগম।

​আবেগাপ্লুত হয়ে হাসিনা বলেন, “আমার স্বামীর নিজের কোনো জমিজমা নেই। সরকার গুচ্ছগ্রামে ঠাঁই দিলে এখানে এসেছিলাম। কিন্তু কয়েকদিন আগে আমাদের সেই শেষ সম্বলটুকুও নদী গিলে খেয়েছে। স্বামী খুব অসুস্থ, কাজ করতে পারেন না। ঘরে বৃদ্ধা মা আর চার ছোট সন্তান। নিজে মানুষের বাড়ি কাজ করে যা পাই, তা দিয়েই কোনোমতে সবার পেট চালাই।”

​স্থানীয় বাসিন্দা মো. নাহিদ বলেন, “নদীতে সব হারিয়ে পরিবার দুটো আজ পুরোপুরি নিঃস্ব। তাদের কোথাও যাওয়ার বিন্দুমাত্র জায়গা নেই।”

​বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবুল কালাম কালু বলেন, “বিত্তবানদের উচিত এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো। দ্রুত তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।”

​টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সাহায্যের ব্যবস্থা করতে দ্রুত উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হচ্ছে।

​এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ,কে,এম রায়হানুর রহমান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের কোনো ঘর ফাঁকা আছে কি না তা খুঁজে বের করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি সরকারি কোনো খাস জমিতে তাঁদের ঘর তৈরি করে দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।”

ফরিদপুরের খরসূতী-বেলজানী সড়ক যেন মরণ ফাঁদ, তিন দশকেও মেলেনি পিচ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৩৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের খরসূতী-বেলজানী সড়ক যেন মরণ ফাঁদ, তিন দশকেও মেলেনি পিচ

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বেলজানী-খরসূতী এলাকার মানুষের একমাত্র ভরসা খরসূতী সরকারি কলেজ থেকে খরসূতী ঈদগাহ পর্যন্ত আধা কিলোমিটারের একটু বেশি দীর্ঘ সড়কটি। কিন্তু ইটের সলিং বিছানো দীর্ঘদিনের পুরাতন খানাখন্দে ভরা রাস্তাটি এখন চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠেছে।

​কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, চোখে আগামীর স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন এই পথেই স্কুলে যায় শিশুরা। তবে ভাঙা ইটে পদে পদে হোঁচট খেয়ে ছোট ছোট পাগুলো ছিলে রক্ত ঝরছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর আগেই কোমলমতিদের সইতে হচ্ছে অবর্ণনীয় কষ্ট। এলাকাবাসীর প্রশ্ন—আর কতকাল সইতে হবে এই ভোগান্তি?

​দৈর্ঘ্যে আধা কিলোমিটারের সামান্য বেশি হলেও এটিই পুরো এলাকার যোগাযোগের মূল চালিকাশক্তি। এর পূর্ব প্রান্তে রয়েছে খরসূতী ঈদগাহ ময়দান, যেখানে প্রতি দুই ঈদে ময়না, ঘোষপুর, সাতৈর ও গুনবহাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষ সমবেত হন। কাছেই বেলজানী-খরসূতী কাশেমুল উলুম মাদরাসা, একটি মহিলা মাদরাসা এবং বর্ণী বাজার।

​পশ্চিমে রয়েছে খরসূতী সরকারি কলেজ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চন্দ্র কিশোর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ডাকঘর ও খরসূতী বাজার। এই পথ ব্যবহার করেই পাশের মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার জাঙ্গালিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ ও কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য নিয়ে হাটে যান। বানিয়াড়ী, হাটখোলা, রানীদৌলা-কুঠি ও ইচাখালী গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের গন্তব্য এই জরাজীর্ণ সড়ক।

​স্থানীয় বাসিন্দা ও একটি জাতীয় দৈনিকের সহযোগী ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মিজান উর রহমান জানান, ১৯৯১ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য প্রয়াত জননেতা আব্দুর রউফ মিয়া ফরিদপুর চিনিকলের বরাদ্দে এখানে ইটের সলিং করেছিলেন। এরপর দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকে সংস্কারের কোনো ছোঁয়া লাগেনি।

​যত্ন আর মেরামতের অভাবে ইট উঠে গিয়ে পুরো রাস্তাটি এখন বড় বড় গর্তে পরিণত হয়েছে। ভারী যানবাহন তো দূরের কথা, রিকশা-ভ্যান বা পায়ে হেঁটে চলাই দায়। বর্ষাকালে পানি জমে কাদা-পানিতে একাকার হয়ে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নেয়।

​সম্প্রতি ফরিদপুর-১ (মধুখালী-বোয়ালমারী-আলফাডাঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য ড. ইলিয়াস মোল্লার কাছে সড়কটি দ্রুত পাকাকরণের জোর দাবি জানান স্থানীয়রা। এমপি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। ময়না ইউনিয়নের জামায়াত আমীর মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, “এমপি মহোদয়কে গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি জানানো হয়েছে। আশা করছি, পরবর্তী বাজেটে বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু হবে।”

​এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা প্রকৌশলী পূর্ণেন্দু সাহা জানান, সড়কটির বেহাল দশার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে সড়কটির আইডি ভেরিফিকেশন ও আইডি অন্তর্ভুক্তির প্রাক-প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। নতুন প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) তৈরি করে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হচ্ছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই দরপত্র আহ্বান করে কাজ শুরু করা হবে।

​বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম. রকিবুল হাসান বলেন, “জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ যাতায়াত করেন। সড়কটি দ্রুত মেরামতের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দ্রুত চিঠি পাঠাব, যাতে জনগণের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর হয়।”

​এখন কেবল বাস্তবায়নের অপেক্ষা। হাজারো মানুষের প্রত্যাশা—অচিরেই যেন প্রশাসনিক আশ্বাস বাস্তবায়িত হয় এবং শিশুরা নিশ্চিন্তে মসৃণ পথে স্কুলে যেতে পারে।

সালথায় বিস্ফোরক মামলায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৩২ অপরাহ্ণ
সালথায় বিস্ফোরক মামলায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি গ্রেপ্তার

ফরিদপুরের সালথায় একটি বিস্ফোরক মামলায় আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক স্থানীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কাগদী বাজার এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।

​গ্রেপ্তার হওয়া নেতার নাম হেমায়েত হোসেন (৫৫)। তিনি সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। হেমায়েত মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কাগদী বাতাগ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে।

​পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রবিবার দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সালথা থানা পুলিশের একটি টিম কাগদী বাজারে অভিযান চালায়। এসময় সেখানে অবস্থানরত হেমায়েত হোসেনকে আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে সালথা থানায় বেশ কয়েকটি ধারায় মামলা রয়েছে, যার মধ্যে একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলা অন্তর্ভুক্ত।

​গ্রেপ্তারের সত্যতা নিশ্চিত করে সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, “একটি বিস্ফোরক মামলায় আসামি হেমায়েত হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নাশকতাসহ থানায় আরও একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।”

​ওসি আরও জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে বিকালে ফরিদপুর বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণের প্রক্রিয়া চলছে।