খুঁজুন
বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১০ বৈশাখ, ১৪৩৩

আল্লাহর একত্ববাদ ইসলামের প্রধান ও মূল স্তম্ভ

উম্মে আহমাদ ফারজানা
প্রকাশিত: রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
আল্লাহর একত্ববাদ ইসলামের প্রধান ও মূল স্তম্ভ

আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য; আর এই ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো তাওহিদ তথা একত্ববাদ। একত্ববাদ মানে শুধু আল্লাহকে উপাসনা করা নয়; বরং তাঁর সঙ্গে কাউকে বা কিছুকেই শরিক না করা এবং একমাত্র আল্লাহকে প্রভু, স্রষ্টা ও উপাস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। তাই নবী করিম (সা.) মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদের পথে আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘আর আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, কেবলমাত্র আমার ইবাদতের জন্য।

’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)
মানবজাতির প্রথম ও মূল দায়িত্ব হলো তাওহিদ তথা একত্ববাদ। কেননা আল্লাহ ছাড়া কোনো স্রষ্টা বা রিজিকদাতা নেই, এবং তাঁর তুল্য বা সমতুল্য কেউ নেই। যেমনটা আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেন, ‘তাঁর কোনো সমতুল্য নেই, এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ১১)
এই একত্ববাদই হলো ইসলামের মূল ভিত্তি

নবী করিম (সা.) মক্কায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষকে একত্ববাদের আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি প্রথমে মানুষকে আল্লাহ ছাড়া কাউকে উপাসনা না করার প্রতি উৎসাহিত করেছিলেন, তারপর নামাজ, রোজা এবং অন্যান্য ইবাদত ফরজ করেছিলেন। যখন নবী করিম (সা.) মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনে প্রেরণ করেছিলেন, তিনি তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা প্রথমেই তাদের আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আহ্বান জানাও।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৩৭২)
আল্লাহর ডাককে যারা মেনে নেয় এবং একমাত্র তাঁকেই উপাসনা করে, তাদের জন্য আছে জান্নাত; এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি।
নবী (সা.) মুয়াজ (রা.)-কে আরো বলেছিলেন,  ‘হে মুয়াজ, তুমি কি জানো বান্দাদের ওপর আল্লাহর অধিকার কী এবং আল্লাহর ওপর বান্দার অধিকার কী? মুয়াজ (রা.) বললেন, ‘আমি জানি না, শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।

’ নবী করিম (সা.) বললেন,
‘বান্দাদের ওপর আল্লাহর অধিকার হলো তাঁরা শুধু আল্লাহর ইবাদত করবে এবং কোনো কিছুকে তাঁর সঙ্গে শরিক করবে না। আর আল্লাহর ওপর বান্দাদের অধিকার হলো, যারা আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করে না, তাদের তিনি শাস্তি দেবেন না।’
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩০)
অতএব, প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো একত্ববাদের ভিত্তিতে জীবন যাপন করা, যাতে আল্লাহ তার ঈমানকে দৃঢ় ও শক্তিশালী করেন; বিশেষ করে যখন সে এই জীবনের যাত্রা থেকে বিদায় নেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যার এই পৃথিবীতে শেষকথা হবে ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।


(আবু দাউদ, হাদিস : ৩১১৬)
আর একত্ববাদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করা হলো সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধ।

এটি আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় পাপ। এমনকি কেউ যদি এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই, আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করা ক্ষমা করবেন না, কিন্তু এর চেয়ে কম যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শরিক স্থাপন করে, সে নিশ্চয়ই মহাপাপ রচনা করেছে। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪৮)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ডাকতে গিয়ে মারা যায়, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৪৯৭)
সুতরাং আল্লাহকে ভয় করা এবং তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা একজন মুমিনের একান্ত কর্তব্য। তাহলেই একজন মুমিন দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হতে পারবে। সেই কঠিন সময়ে যখন অন্যরা ভয়, দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত থাকবে। সেদিন একত্ববাদীরা মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে, যিনি তাদের সরল পথে অবিচল থাকার তাওফিক দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘এবং তারা বলবে, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের সঙ্গে করা তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং আমাদের পৃথিবীর উত্তরাধিকারী করেছেন, যাতে আমরা যেখানে ইচ্ছা জান্নাতে বসবাস করতে পারি। পরিশ্রমকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম!’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৭৪)
অন্যদিকে কাফির ও মুশরিকদের ভাগ্য হবে ভয়ংকর। তাদের ফুটন্ত পানিতে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে এবং আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হবে। আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের গলায় থাকবে শিকল, তখন তাদের টেনে নিয়ে যাওয়া হবে ফুটন্ত পানিতে, তারপর আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হবে।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৭১-৭২)
তাইতো  নবী করিম (সা.) অনন্ত অসীম জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামের সতর্ক করে বলেন, ‘তোমাদের কারোর জন্য জান্নাত তার জুতার ফিতার চেয়েও নিকটবর্তী, এবং জাহান্নামও।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৮৮)
প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য তিনটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করা আবশ্যক। এই তিনটি বিষয় তাওহিদ তথা একত্ববাদের প্রকার বা শাখাবিশেষ।
১.  (তাওহিদুর রুবুবিয়াহ) তথা রব (স্রষ্টা, পালনকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী ইত্যাদি) হিসেবে আল্লাহকে এক মানা।
২. (তাওহিদুল উলুহিয়াহ/ইবাদত) তথা ইবাদতের ক্ষেত্রে (একমাত্র ইবাদতের যোগ্য) আল্লাহকে এক মানা।
৩. (তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত) তথা আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলির ক্ষেত্রে তাঁকে এক মানা। কেউ উল্লিখিত তিনটি ক্ষেত্রের কোনো একটিতে আল্লাহকে এক না মানলে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। কাফিররা শুধু প্রথম ক্ষেত্রে (রুবুবিয়াহ) আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু দ্বিতীয় (ইবাদত) ও তৃতীয় ক্ষেত্রে (আসমা ওয়াস সিফাত) আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করে না। তাই তারা কাফির বা অস্বীকারকারী।

 

“আধুনিকতার দূরত্ব মুছে ফিরে আসুক বিদ্যুৎহীন সন্ধ্যার উঠোনের আড্ডা”

শরিফুল ইসলাম
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:৪৬ অপরাহ্ণ
“আধুনিকতার দূরত্ব মুছে ফিরে আসুক বিদ্যুৎহীন সন্ধ্যার উঠোনের আড্ডা”

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা ছিলো অন্যরকম এক পরিবেশ। বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকার নেমে এলে মানুষ একে একে জড়ো হতো কারও বাড়ির উঠোনে। শুরু হতো গানের আসর – কখনও ভাটিয়ালি, কখনও পালাগান, আবার কখনও মুর্শিদী গানে। আপন মুর্শিদের প্রতি আবেগে ঝড়তো চোখের জল।

সেই আসর ছিল না শুধু বিনোদনের জায়গা, বরং ছিল ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সংযোগস্থল। দিনভর ক্লান্তি, দুঃখ-কষ্ট, অভিমান – সব কিছু মিলিয়ে যেত একসাথে বসার আনন্দে।

আজ প্রযুক্তির যুগে আমরা অনেক এগিয়েছি, কিন্তু সেই উঠোনভরা সম্প্রীতি যেন হারিয়ে গেছে। বিদ্যুতের আলো আমাদের ঘর আলোকিত করেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের মন যান্ত্রিক ও স্বার্থের আখরা বানিয়েছে । এখন প্রত্যেকে নিজ নিজ মোবাইল বা টেলিভিশনের পর্দায় ডুবে থাকে; পাশের মানুষের সাথে কথা বলার সময়ও যেন কমে গেছে।

গ্রামের সেই সন্ধ্যার গান আমাদের শিখিয়েছে – সম্পর্ক গড়তে বড় আয়োজন লাগে না, দরকার শুধু আন্তরিকতা আর একসাথে থাকার ইচ্ছা। সমাজে ভেদাভেদ, হিংসা, দূরত্ব কমাতে আবারও দরকার এমন ছোট ছোট উদ্যোগ।

হয়তো আমরা পুরোপুরি সেই দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে পারব না, কিন্তু চেষ্টা করলে অন্তত মানুষের মাঝে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা আর ভ্রাতৃত্ববোধকে জাগিয়ে তুলতে পারি।

লেখক: সাংবাদিক, ফরিদপুর

‘ফেলো’ সম্মাননা পেলেন ফরিদপুর-৩ আসনের এমপি নায়াব ইউসুফ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৩০ অপরাহ্ণ
‘ফেলো’ সম্মাননা পেলেন ফরিদপুর-৩ আসনের এমপি নায়াব ইউসুফ

ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ দেশের সর্বোচ্চ কৌশলগত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি) থেকে ‘ক্যাপস্টোন কোর্স ২০২৬/১’ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। কোর্সটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে তিনি ‘ফেলো অব দ্য ক্যাপস্টোন কোর্স’ হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন, যা দেশের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।

রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গত ৫ এপ্রিল শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সমাপ্ত হয়। সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। অনুষ্ঠানে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন, যা কোর্সটির গুরুত্ব ও মর্যাদাকে আরও স্পষ্ট করে।

এনডিসির কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল এমডি ফয়জুর রহমান স্বাক্ষরিত সনদপত্রে উল্লেখ করা হয়, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নায়াব ইউসুফ জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত নেতৃত্ব, নীতি প্রণয়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই কোর্সে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিরাই বেশি থাকেন, ফলে এখানে অর্জিত অভিজ্ঞতা বাস্তব নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ক্যাপস্টোন কোর্সটি মূলত দেশের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক, সামরিক কর্মকর্তা, বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের জন্য বিশেষভাবে পরিকল্পিত একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।

এতে অংশগ্রহণকারীদের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

কোর্স চলাকালে বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা, গ্রুপ আলোচনা, কেস স্টাডি এবং বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে গভীরভাবে কাজ করার সুযোগ পান। এছাড়া নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমন্বিত নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নায়াব ইউসুফ এই প্রশিক্ষণে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার নেতৃত্বগুণ, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং নীতি নির্ধারণের সক্ষমতা আরও সমৃদ্ধ করেছেন। সহপাঠী ও প্রশিক্ষকদের মূল্যায়নেও তিনি একজন মনোযোগী ও দক্ষ অংশগ্রহণকারী হিসেবে প্রশংসিত হন।

ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নায়াব ইউসুফ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও জনসেবামূলক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তার এই নতুন অর্জন ভবিষ্যতে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

ফরিদপুরে তেল সংকটে চাষাবাদে চরম ভোগান্তি, সেচ বন্ধের শঙ্কায় ধান-পাট উৎপাদন

নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:৩৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে তেল সংকটে চাষাবাদে চরম ভোগান্তি, সেচ বন্ধের শঙ্কায় ধান-পাট উৎপাদন

বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রভাব এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে। জেলায় তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় চাষাবাদে নেমেছে স্থবিরতা। ডিজেল সংকটে সময়মতো সেচ দিতে না পারায় ধান ও পাটসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে চাহিদামতো ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষক, পরিবহন চালক ও সাধারণ ভোক্তারা। অধিকাংশ পাম্পে অনিয়মিত সরবরাহ, কোথাও ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড, আবার কোথাও দীর্ঘ সারি, সব মিলিয়ে অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কৃষক কার্ড নিয়েও অনেকে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়াও পাম্পে এসে লাইনে দাড়িয়ে ডিজেল নিচ্ছেন। তবে অধিকাংশ মানুষের কাছে কৃষক কার্ড দেখা যায়নি। কৃষক কার্ড ছাড়াও ডিজেল নিচ্ছেন পুরুষদের পাশাপাশি নারী কৃষাণীরাও।

ফরিদপুর দেশের অন্যতম প্রধান পাট উৎপাদনকারী জেলা। বর্তমানে পাট আবাদের মৌসুম চলমান থাকলেও জ্বালানি সংকটে মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষি অফিসের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত তেলের স্লিপেও চাহিদা পূরণ হচ্ছে না বলে অভিযোগ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পারলে ধান ও পাটের চারা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে পুরো মৌসুমের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সালথা উপজেলার সোনাপুর গ্রামের কৃষক তারা শেখ বলেন, কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন পাম্পে ঘুরেও তেল পাচ্ছি না। একদিন সামান্য ডিজেল পেলেও তা দিয়ে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়নি। সময়মতো পানি দিতে না পারলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি দীর্ঘদিনের হতাশা ও বঞ্চনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সতেরো বছর পর আবার ধান লাগিয়েছি, কিন্তু এখন তেলের অভাবে জমিতে পানি দিতে পারছি না।’ ফসল বাঁচাতে পারবো কি না জানি না। আমরা এখন দিশেহারা।

বোয়ালমারী উপজেলার ময়েনদিয়া গ্রামের কৃষক কবির শেখ বলেন, বোয়ালমারী নাহার ফিলিং স্টেশনে ডিজেল নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও নিশ্চিত হতে পারছি না তেল পাব কি না। টোকেন নিয়েও অনেক সময় তেল পাওয়া যায় না। এভাবে চলতে থাকলে চাষাবাদ চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে।

শুধু কৃষকরাই নয়, ট্রাক্টর চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরাও পড়েছেন বিপাকে। ট্রাক্টর চালকদের অভিযোগ, একেকজনকে মাত্র ১০ লিটার করে ডিজেল দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে দীর্ঘ সময় জমি চাষ করা সম্ভব নয়। পরিবহন চালকরাও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে গাড়ি চালাতে পারছেন না। এতে যাত্রী পরিবহনেও বিঘ্ন ঘটছে।

জেলার বিভিন্ন পাম্পে তেল সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় কোথাও কোথাও টোকেন পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরো বেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নির্দিষ্ট কিছু পাম্প থেকে তেল নেওয়ার জন্য পরিবহন মালিকদের চাপ প্রয়োগ করা হয়। এজন্য অনেক পাম্প মালিক হতাশায় ভুগছে।

জেলা পেট্রোল পাম্প মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানান, জেলায় প্রায় ৪০টি পাম্পে প্রতিদিন আড়াই লাখ লিটার জ্বালানির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ডিপো থেকে নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

ফরিদপুর জেলা পেট্রোল পাম্প মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার বদিউজ্জামান পলাশ বলেন, জেলায় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক নেই। ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল না আসায় পাম্পগুলো চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছে না। আমরা পাম্পগুলোকে সীমিত তেল হলেও নিয়ম মেনে দেওয়ার অনুরোধ করেছি।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, ফরিদপুরে কার্যত পাম্প মালিকদের মধ্যে সমন্বয় নেই। বাস মালিক সমিতির প্রভাবে মাত্র দুইটি নির্দিষ্ট পাম্প থেকে তেল নিতে অনেককে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে অন্য পাম্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি নির্ধারিত পাম্প থেকে তেল নেওয়ার টোকেন না দেখাতে পারলে পরের দিন বাস চলাচলেও সমস্যা করা হচ্ছে, যা দেশের অন্য কোথাও সাধারণত দেখা যায় না।

কৃষকদের দাবি, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে চলতি মৌসুমে ধান ও পাট উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। তারা জরুরি ভিত্তিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।