নামাজে শয়তানের ‘কুমন্ত্রণা’ থেকে বাঁচার সহজ উপায়
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তাঁর ইবাদতের জন্য। আর ইবাদতের শ্রেষ্ঠতম রূপ হলো নামাজ। প্রত্যেক মুসলমানের ওপর এই নামাজ ফরজ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা আমার স্মরণোদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম করো।’ (সুরা ত্বহা : ১৪)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তুমি সূর্য হেলার সময় থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ কায়েম করো এবং ফজরের নামাজ (কায়েম করো)। নিশ্চয়ই ফজরের নামাজে সমাবেশ ঘটে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল : ৭৮)
তবে, নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে মনোযোগ হারিয়ে ফেলা বা মনে আজেবাজে চিন্তা আসা অনেক মুমিনের জন্যই এক বড় সমস্যা। ইসলামি পরিভাষায় একে ‘ওয়াসওয়াসা’ বা শয়তানের কুমন্ত্রণা বলা হয়।
নামাজে একাগ্রতা বা খুশু-খুজু বজায় রাখা ইবাদতের প্রাণ। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কোরআন ও হাদিসে অত্যন্ত কার্যকর ও মনস্তাত্ত্বিক কিছু সমাধান দেওয়া হয়েছে।
ওয়াসওয়াসা কি ইমানের লক্ষণ
নামাজে কুচিন্তা আসলে অনেকে ভয়ে পেয়ে যান। ভাবেন, হয়তো তাদের ইমান নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু রাসুল (সা.) আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, এক সাহাবি নবীজি (সা.)-এর কাছে মনের কুমন্ত্রণা নিয়ে অভিযোগ করলে তিনি (সা.) বলেন, ‘এটিই হলো স্পষ্ট ইমান।’ (মুসলিম: ২৪০)
হাদিসটির ব্যাখ্যায় সিলেটের দারুল উলুম কানাইঘাট মাদ্রাসার নায়েবে শায়খুল হাদিস মাওলানা শামছুদ্দীন দুর্লভপুরি বলেন, কুমন্ত্রণা আসা ইমান নষ্ট হওয়ার প্রমাণ নয়, বরং ওই খারাপ চিন্তা নিয়ে আপনার মনে যে ভয় বা ঘৃণা তৈরি হচ্ছে, সেটিই আপনার খাঁটি ইমানের পরিচয়। চোর কখনো খালি ঘরে চুরি করতে যায় না, তেমনি শয়তানও ইমানহীন হৃদয়ে কুমন্ত্রণা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না।
বাঁচার উপায় কী
শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো মহান সৃষ্টিকর্তার সাহায্য চাওয়া। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আরাফ: ২০০)
আল-আজহার ফতোয়া কমিটির সাবেক প্রধান শেখ আতিয়্যাহ সাকার (রহ.) এই প্রসঙ্গে একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আপনার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় যদি কোনো পালের কুকুর আপনাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়, তবে লাঠি দিয়ে তাকে ঠেকানো দীর্ঘ ও কষ্টকর কাজ। তার চেয়ে সহজ হলো কুকুরের মালিককে ডাকা, যেন সে কুকুরটিকে থামিয়ে দেয়। শয়তানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তাই, তাকে তাড়াতে সরাসরি লড়াই করার চেয়ে তার মালিক অর্থাৎ আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া বেশি কার্যকর। (আতিয়্যাহ সাকার, ফাতাওয়া আল-আজহার: ১০/১২০, দারুত তাইয়িবাহ, রিয়াদ: ১৯৯৯)
নামাজে মনোযোগ ফেরাতে করণীয়
নামাজে মনোযোগ ধরে রাখতে এবং শয়তানের প্ররোচনা রুখতে শায়খ শামছুদ্দীন কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
ইস্তিগফার ও দোয়া: নামাজের আগে ও পরে বেশি বেশি আল্লাহর কাছে দোয়া করা যেন তিনি মনকে স্থির রাখেন। বিশেষ করে আল্লাহর বড়ত্ব ও মহিমা অন্তরে জাগ্রত করা যে, আপনি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন।
দৃঢ় সংকল্প: শয়তান আসবেই—এটি মনে রেখে নিজের মনকে বারবার নামাজের দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা। একবার মনোযোগ চলে গেলে হতাশ না হয়ে পুনরায় সুরা বা জিকিরের অর্থের দিকে খেয়াল করা।
তীব্র অনীহা: কুমন্ত্রণা আসার সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে গুরুত্ব না দেওয়া। শয়তান যখন দেখবে আপনি তার চিন্তায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন না, তখন সে নিরাশ হয়ে পড়বে।
মনে রাখবেন, শয়তানের কোনো ক্ষমতা নেই তাদের ওপর যারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে (সুরা হিজর: ৪২)। তাই নামাজে কুমন্ত্রণা আসলে আল্লাহর অসীম দয়া এবং সঠিক কৌশলের মাধ্যমে শয়তানের এই প্রতিবন্ধকতা জয় করার চেষ্টা করতে হবে।
সূত্র : কালবেলা

আপনার মতামত লিখুন
Array